বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়- শিক্ষা একটি পণ্য?

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী প্রতি সরকারের বার্ষিক ব্যয় “এক লাখ দুই হাজার ৫৫৭” টাকা- এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা, কম হোক-বেশি হোক দেয়া হচ্ছে ক্যান্টিনে ভর্তুকি, পরিবহণ সুবিধা ইত্যাদি; সরকারের যে টাকা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যে ব্যয় হচ্ছে; তার চেয়ে বেশি টাকা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে কি পাচ্ছে?


২০১৫ সালে সরকার একটি স্বীদ্ধান্ত নিয়েছিল যে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির সাথে ৭.৫% ভ্যাট সংযুক্ত করার, তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার তখন পিছু হটতে বাধ্য হয়; কিন্তু সরকার সেই স্বীদ্ধান্ত নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছিল যে সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখে এবং কার্যত তাই।

শিক্ষার পণ্যায়ন এর চূড়ান্ত উদাহারন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যাল কিন্তু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এখন একটি বাস্তবতা- দেশের ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্যে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দারস্থ হচ্ছে বলা চলে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হচ্ছে; এক দিকে শিক্ষাখাতে সরকার সংকোচন নীতি ; শিক্ষার্থীদের অনুপাতে নতুন করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছেনা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দিন দিন অথর্ব প্রতিষ্ঠানের মাত্রার দিকে নিয়ে যাওয়া সহ নানানভাবে শিক্ষার্থীরা একপ্রকার উপায় না দেখেই ভর্তি হচ্ছে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এক সময় মনে করা হতো বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরাই পড়ালেখা করে , কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন – বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ালেখা করা শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ শিক্ষার্থী আসছে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো থেকে; পরিবারের শেষ সম্পত্তি বিক্রয় করে সন্তানের টিউশন ফি জোগাড় করা অনেক পরিবারই আমার পরিচিত!

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে নানান সমস্যা, আমি দুটি বিষয় নিয়ে কথা বলবো
ক)টিউশন ফি
খ)ছাত্র অধিকার

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে টিউশন ফি কেমন হবে সে বিষয়ে বলা হয়েছিল “দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উপর টিউশন ফি নির্ধারিত হবে” বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় একই বিষয়ে ডিগ্রী প্রদানের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন অংকের টাকা আদায় করে টিউশন ফি হিসেবে; যা গড় হিসেবে বছরে শিক্ষার্থী প্রতি গুনতে হয় “এক লাখ তিন হাজার ৭৯৫ টাকা” ;

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা তাহলে কিভাবে নির্ধারিত হলো? এদেশের কতভাগ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এমন আছে যে তার সন্তানের পেছনে বছরে শুধুমাত্র টিউশন ফি হিসেবে “এক লাখ তিন হাজার ৭৯৫ টাকা” খরচ করবেন?

টিউশন ফি নির্ধারনের ক্ষেত্রে “একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান” হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সেই মুখভরা কথার কোন মিল নেই; এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ রমরমা ব্যাবসার বাজার!

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী প্রতি সরকারের বার্ষিক ব্যয় “এক লাখ দুই হাজার ৫৫৭” টাকা- এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা, কম হোক-বেশি হোক দেয়া হচ্ছে ক্যান্টিনে ভর্তুকি, পরিবহণ সুবিধা ইত্যাদি; সরকারের যে টাকা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যে ব্যয় হচ্ছে; তার চেয়ে বেশি টাকা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে কি পাচ্ছে?

৪ বছর পরে কেবলই একটা সার্টিফিকেট; এই চার বছর তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন থেকে উচ্চ মূল্যে খাবার খেতে হচ্ছে যে ক্যান্টিন থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে বিশ্ববিদ্যালয়, তাকে বাসা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৪ বছর, তাকে যাতায়াত বাবদ খরচ করতে হচ্ছে ৪ বছর, তাকে নানা অজুহাতের জরিমানা দিতে হচ্ছে! অথচ আইনের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে এই টাকার বিপরীতে সে হলের সুবিধা , পরিবহন সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল -কথা ছিল এই টকার মধ্যে সুলভ মূল্যে ক্যান্টিনের খাবার- নয়তো টিউশন ফি বর্তমান ফির অর্ধেকে নামার কথা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বাংলাদেশের শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ছিল ৪৫০ কোটি টাকার; যা ছাত্র প্রতি গড়ে ১ লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা (শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, ছাত্র-শিক্ষক এর আবাসিক সুবিধা,পরিবহন সুবিধা ,ক্যান্টিনে ভর্তুকি, গবেষণা খাত এবং অন্যান্য ); একই অর্থ বছরে অনাবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র প্রতি গড় বাজেট ছিল ২২ হাজার ৩৮০ টাকা (শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন,পরিবহন সুবিধা ,ক্যান্টিনে ভর্তুকি (!), গবেষণা খাত এবং অন্যান্য ) ; একই অর্থ-বছরে বাংলাদেশের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জন প্রতি ব্যক্তিগতভাবে খরচ করেছে “এক লাখ তিন হাজার ৭৯৫” টাকা ;জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল আবাসিক সুবিধা না থাকার কারনে জন প্রতি খরচ যেখানে মাত্র ২২ হাজার টাকা; ঠিক সেই জায়গাটিতেই স্পষ্ট কেন মোড়ে মোড়ে গজিয়ে উঠছে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়; ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররা রাস্তায় নামতে পেরেছিলো -কিন্তু এই যে বিশাল অংকের টাকার ব্যবসা করা হচ্ছে এই বিষয় নিয়ে সোচ্চার হওয়ার জন্যে ছাত্রদের সুযোগ থাকবেনা, ভ্যাট আরোপের সময় মালিকপক্ষের ব্যবসা নিয়েও একটা ভয় ছিল যে কারনে তারা সেই জায়গায় ছাত্রদের বাঁধা দেয়নি; কিন্তু এই বিষইয়ে নূন্যতম কথা বলতে গেলে দেখতে পারবেন ছাত্র অধিকার সেখানে কেবল বিপন্ন নইয়- সেখানে অধিকার বলেই কিছু নেই; বাজারে ক্রেতার যে অধিকারটুকু থাকে সেই অধিকারটুকুও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেই; ইচ্ছেমত নতুন নতুন বছরে টিউশন ফি বৃদ্ধি অথচ সেটা নিয়ে ছাত্রদের কথা বলার সুযোগ থাকে না; কেন থাকে না??

নতুন নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, যে টিউশন ফি দেখে ভর্তি হয়, শেষ পর্যন্ত তার একই পরিমাণ টিউশন ফি থাকে হয়তো, কিন্তু তার পরবর্তী ব্যাচ এর টিউশন ফি বৃদ্ধি করা হয়; আর সেই বিষয়ে কিছু বলার যে রাজনৈতিক চেতনা প্রয়োজন -কিংবা ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কাজ করার জন্যে যে ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজন তা করার সুযোগ নেই; এর মধ্যেতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে বড় করে লিখে রাখা হয় রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাস (খোয়াড়); অথচ মালিকপক্ষের সুবিধা বাস্তবায়নে ঠিকই “বিশ্ববিদ্যালয় ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন” রয়েছে; সেখানে ক্রিয়াশীল প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর রাজনীতি করার অধিকার যদি থাকতো তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকেরা ছাত্রদের উপর এই শোষণ এত সহজেই করতে পারবে না তা তারা জানে; নাহ ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের রাজনীতির পরিবেশ তো দূরের কথা সাধারন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহনে সেখানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনও যদি হতো এই সুযোগটি থাকতো না!

আমি আশাবাদী মানুষ, আমি ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে থাকি… একদিন ছাত্ররা ঠিকই ফোঁসে উঠবে,শিক্ষার এই পণ্যায়ন এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, সেই নজির সৃষ্টি সম্ভব এবং ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন তারই দৃষ্টান্ত!

ইউজিসি বছর বছর কিছু ছবক দেয়, দেখা যায় কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, কিন্তু দেখবেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিকই কার্যক্রম চালাচ্ছে; এই হুশিয়ারিটা কেবলই ইউজিসির কিছু কর্মকর্তার টাকা আত্মসাতের চেষ্টা; নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করে ছাত্রদের টাকা লুটেরা মালিকদের কাছ থেকে কিছু টাকা খেয়ে নেয়; ঐ যে বেড়ায় খেত খাওয়ার মত; আর বেড়ায় যখন খেত খায়, দেখবে কে??

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 39 = 40