আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, বিশ্বাস রাখুন


হুম, বাংলাদেশ এখন এমন এক নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে রুপান্তরিত হয়েছে যেখানে প্রশ্ন পত্র ফাঁস, গুম, ধর্ষণ, ইম্পিউনিটি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অর্থনীতি এগুচ্ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে(উভয়ই সম্পূর্ণ পরিসংখ্যানগত ব্যাপার)- এটাই মুখ্য ব্যাপার, হাতে গোনা মানুষের হাতে আয়ের সিংহভাগ যাচ্ছে, তাতে কোন উপায় অবলম্বন করা হচ্ছে তাতে কিছু আসে যায় না।

হুম, বাংলাদেশ এখন এমন এক নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে রুপান্তরিত হয়েছে যেখানে প্রশ্ন পত্র ফাঁস, গুম, ধর্ষণ, ইম্পিউনিটি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অর্থনীতি এগুচ্ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে(উভয়ই সম্পূর্ণ পরিসংখ্যানগত ব্যাপার)- এটাই মুখ্য ব্যাপার, হাতে গোনা মানুষের হাতে আয়ের সিংহভাগ যাচ্ছে, তাতে কোন উপায় অবলম্বন করা হচ্ছে তাতে কিছু আসে যায় না।

ক’বছর আগে অমর্ত্য সেন যখন বলেছিলেন যে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অর্থনৈতিক সূচকে পিছিয়ে থাকলেও সামাজিক সূচকে এগিয়ে আছে, তখন মিডিয়া ঢালাওভাবে একে বিশাল অর্জন হিসেবে অভিহিত করে। তিনি তার(Jean Dreze’র সাথে যৌথভাবে লেখা) ‘An Uncertain Glory: India and its Contradictions’ তে বলেন ‘India is climbing up the ladder of economic indicators while slipping down the slope of social indicator’. বইটির শুরুতে তিনি বলেন বাংলাদেশ স্বাধীনতা প্রাপ্তির সময় অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে ছিল, কিন্তু কালক্রমে এর উল্টোটা ঘটেছে। সামাজিক সূচকে এগিয়ে থাকার এই জিনিসটাকে আমরা শক্তি হিসেবে কাজে লাগিয়ে অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি, কিন্তু গত ক’বছরের চিত্র তা পারার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

১৯৯০’র দশকে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ ধারণাটা খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং এরপর থেকে এটি অনেক আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সময়কার প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা এর উপর ভিত্তি করে ‘Trust: The Social Virtues and The Creation of Prosperity’ বইটি লিখেছেন। তার বইটির রেফারেন্স টানতে গিয়ে বিখ্যাত নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ তার সাড়া জাগানো বই ‘Price of Inequality’ তে বলেন ‘Throughout history the economies that have flourished are those where a man’s word is his honor, where a handshake is a deal………………The idea of trust underlies all notions of social capital. People can feel confident that they will be treated well, with dignity, and fairly. And they reciprocate.’ এই সোশ্যাল ক্যাপিটালের মূল ভিত্তি হল বিশ্বাস, ভ্রাতৃত্ব, আস্থা, নিয়ম/আইন পালন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উজবেকিস্তানে গিয়ে দেখা গেল গ্রীণ হাউজ গুলো কাঁচ শূণ্য হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কারণে অকারণে কাঁচ চুরি করে গৃহে ব্যবহার করা শুরু করল। তাদের মনে এই অপরাধকে বৈধতা দেয়া হয়ে গিয়েছিল। তাদের একজন উজবেককে কারণ দর্শাতে বললে সে বলে এই কাজ সে না করলেও অন্য কেউ করত। অর্থাৎ হঠাতই আইন শৃঙ্খলার শিথিলতা তাদের মূল্যবোধের ক্ষয় ধরাল। আবার এই শৃঙ্খলা কিংবা বিশ্বাস সবসময় আইন দ্বারা প্রবর্তনের প্রয়োজন পড়ে না। যেমন- ভূটানের যেটুকু বন আছে তা সংরক্ষণে আইনের প্রয়োজন পড়েনি। মানুষের মধ্যেই একধরণের সংরক্ষণশীলতা কাজ করে যে কতটুকু পর্যন্ত গাছপালা কাটাটা পরিবেশের জন্য সহনীয়; তাদের নিজস্ব একটা ন্যায়বোধ গড়ে উঠেছে যুগযুগ ধরে। আবার দেখুন- মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও তাদের দেশ তালিকার প্রথমদিককার সুখী মানুষের দেশ! অর্থাৎ, অর্থই সকল সুখের মূল নয়। উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এক করে দেখার কোনও কারণ নেই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুটি কয়েক মানুষের আয়ের বৃদ্ধির জন্যে হতে পারে, কিন্তু উন্নয়ন জিনিসটা অনেক সূচকের সাথে সম্পর্কিত; তাতে গড় আয়ু, শিক্ষার হার, সুষ্ঠু আইন প্রয়োগ, দুর্নীতির সূচক, গুড গভরনেন্স, ফ্রিডম প্রভৃতির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।

কিছু দিন আগে নগরীর এক ব্যস্ত এলাকায় দেখেছিলাম পুলিশ এসে রাস্তার পাশের এক পান-সিগারেটের দোকানদারকে অবৈধ দখলদার বলে উচ্ছেদ করতে চাইল আর দোকানদার বলল –‘আমার পিছেই মালিকে সরকারী জায়গা দখল কইরা এত্ত বড় বিল্ডিং করল আর আপনাগো চোখে পড়ল না; আর আমি তারডার সামনে এল্লা খানেক জায়গায় এইডি বেচি আর আপনারা আমারে উইডা যাইবার কন!’ হুম সেই পুলিশও যেমন জানে ঐ মালিকের ওনেক অবৈধ ক্ষমতা আছে যেটার বলে সে টিকে থাকতে পারবে, তেমনি ঐ দোকানদারও জানে এই অসম ব্যবস্থার কাছে সে অসহায়। সমাজের বিভিন্ন প্রথা এমনই দাঁড়িয়ে গেছে যে তাতে সবাই বিশ্বাস করা শুরু করেছে, কারণ অসম উন্নয়ন, নিরাপত্তার অভাব।

আর আমরা এখন ফাঁসকৃত প্রশ্নে যোগ্যতার প্রমাণ খুঁজি, আইন বহির্ভূত হত্যাকান্ডে নিরাপত্তা খুঁজি, পরাধীন বিচার বিভাগের দ্বারা সুষ্ঠু আইনের প্রয়োগ খুঁজি, সংখ্যালঘুদের উপর শক্তির চর্চায় নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ খুঁজি।

আর কিছুদিন পর আমরা নৈরাজ্যে আমাদের অপচ্ছায়া দেখতে পাব। দ্যা নাইট ইজ স্টিল ইয়াং, বাট দ্যা এপারিশন ইজ টু সেক্সি টু ডিল উইথ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 3