প্রকৃতি ও জুম এবং আদিবাসী

তাঁরা বিভিন্ন চিকিৎসার কাজে বনজ ঔষধি লতা, গুল্ম, গাছের ছাল বাকল ব্যবহার করে থাকে। ফলে এদের কাছে এসব গাছের কদর আছে এবং এরা বনার্জি ঔষধ তৈরি করার সময় পুরো গাছটি সব সময় উপড়ে নেয় না। দিনের কোনও বিশেষ সময় সূর্যের আলো গাছের কোন অংশের উপর পড়ছে তাঁর উপর ভিত্তি করে নির্বাচিত অংশ কেটে নেয়। এই ক্ষেত্রে আদিবাসীদের অর্জিত ঔষধি গাছ সম্পর্কিত জ্ঞান বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় আদিকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

২০১৩’র শেষের দিকটায় রোয়াংছড়ি গিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য প্রথাগত মার্মা গ্রাম দেখা। ক্যাচিং ঘাট থেকে রওনা দেয়ার দেড় ঘন্টা পর আরও মিনিট বিশেক হাঁটার পর পৌঁছালাম; গ্রামের নাম খুমোং খিয়ং, নব্য প্রদত্ত নাম বেতছড়ি। শীতের মধ্যভাগে কুয়াশাছন্ন আর ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে কিছুটা পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিতে হয়ছিল, পায়ের স্যান্ডেল কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় গ্রামে পৌঁছানোর আগে ঝিড়িটিতে পা ধুতে যাচ্ছিলাম আর সাথে থাকা সদ্য পরিচিত হওয়া বন্ধুটি(গ্রামটির বাসিন্দা) ঝিড়ির ধার ঘেঁষা কাঁদা দিয়ে হালকা বাঁধের মত করে ঘেরা দেয়া জলাধারটি দেখিয়ে দিল। ওখানে পা, স্যান্ডেল ধুয়ে নিলাম। ঝিরি পেরুতেই খেয়াল করলাম আমাদের পিছু পিছু আসা লোকটি তাঁর গরুটির পাগুলোও ওখানে ধুয়ে নিচ্ছে, সাথে নিজের পাগুলোও। ঝিরি পাড় হতে সময় খেয়াল করেছিলাম ঝিড়ির বাঁকে কিছু বাঁশের ফালি(‘কাইম’ বলা হয়)গাঁথা, এবং তাঁর উপর চৌকো করে আরও কাইম বাঁধা, আমার উৎসুক দৃষ্টি দেখে বন্ধুটি মনে করিয়ে দিল যে এগুলোর মাধ্যমে ঝিড়ি পূজো করা হয়। হুম, আগেও দেখেছিলাম। গ্রামে ঢুকার পথে এবং বের হওয়ার পথে একটি করে গাছ থাকে, গ্রামবাসীরা এই গাছগুলোকে পূজো করে, তাঁদের বিশ্বাস বাহির থেকে কেউ এলে এবং আগত ব্যক্তির সাথে কোনও অশুভশক্তি থাকলে এই গাছের এখানে এলে তা সরে পড়ে। গাছগুলো এভাবে বেঁচে থাকে প্রকৃতিতে ‘হলি গার্ড’ হিসেবে।

এটি আমার দেশের পার্বত্যাঞ্চলে একটি ভ্রমণ কাহিনীর প্রাথমিক অংশ। পুরোটা না লিখার চাইতে এর উপর ভিত্তি করে মূল কথার উপর আলোকপাত করতে চাই। এই যে ঝিড়ির কথা বললাম, এই ঝিড়ির উপর ভিত্তি করে বেঁচে আছে পাহাড়ের আদিবাসীরা, এই ঝিড়িই হচ্ছে তাঁদের পানির একমাত্র উৎস। শুধু তাই নয়, এই ঝিড়ির সাথে পাহাড়ের অনেক প্রাণীর সখ্যতা। হরিণ, বানরসহ নানান প্রানী এই ঝিড়ির পানি পান করে। যেই ঝিড়ির পানির উপর জীবন নির্ভর করে তাঁর আরাধনা তথা পূজো করছে আদিবাসীরা, এর পানির পবিত্রতা কিংবা বিশুদ্ধতা রক্ষায় পাশে কাঁদামাটি দিয়ে বাঁধ দিয়ে আলাদা জলাধার বানিয়ে নিয়েছে, যেখানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সারা যায়। এই ছড়া ঝিড়ির নামেই যে পার্বত্যাঞ্চলে কত গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে তাঁর হিসেব নেই। এই সব ঝিরির উপর বুড়িগঙ্গা বা চাক্তাই খালের পাড়ে গড়ে ওঠা ল্যাট্রিন খুঁজে পাবেন না।

এরপর আসি ঐ গাছ গুলোর কথায়। চিন্তা করুন, তাঁদের চিন্তাধারাকে আপনি হয়তো পূজো অর্চনায় সীমাবদ্ধ করে দেখছেন, কিন্তু বড় সত্যি কি জানেন- এর মাধ্যমে অন্তত দুটো বড় গাছ গ্রামে বেড়ে উঠছে, তাতে পাখি বসছে।

তাঁরা বিভিন্ন চিকিৎসার কাজে বনজ ঔষধি লতা, গুল্ম, গাছের ছাল বাকল ব্যবহার করে থাকে। ফলে এদের কাছে এসব গাছের কদর আছে এবং এরা বনার্জি ঔষধ তৈরি করার সময় পুরো গাছটি সব সময় উপড়ে নেয় না। দিনের কোনও বিশেষ সময় সূর্যের আলো গাছের কোন অংশের উপর পড়ছে তাঁর উপর ভিত্তি করে নির্বাচিত অংশ কেটে নেয়। এই ক্ষেত্রে আদিবাসীদের অর্জিত ঔষধি গাছ সম্পর্কিত জ্ঞান বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় আদিকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

পৃথিবীর এমন অনেক আদিবাসী আছে যাদের গোত্রের চিহ্ন হয় বিভিন্ন পাখি, গাছপালা। একটি গোত্র যদি অন্য আরেকটি গোত্রের চিহ্ন পাখিকে হত্যা করে বা গাছ কাটে, তাহলে সেখানে বিচার বসবে, কিংবা যুদ্ধও লেগে যেতে পারে! এই ধরণের প্রথা ঐসব পাখি ও গাছ প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার সুযোগ দিল।

আদিবাসীদের বিশ্বাস, রীতিনীতি, জীবনধারা প্রভৃতি বিষয় প্রাকৃতিক জীবন ও পরিবেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির সাথে এদের সহাবস্থান সহস্রাব্দ ধরে।

এমন সব সমাজ হতে আধুনিক রীতিনীতির অনেক কিছুই ধার নেয়া হয়েছে, Jared Diamond এর বিখ্যাত ‘The World Until Yesterday: What We Can Learn From The Traditional Societies’ হতে এমন অনেক কিছুরই হদিস পাওয়া যাবে।

এবার হয়তো প্রশ্ন থাকতে পারে যে তাঁদের জুম চাষ প্রকৃতির জন্যে ক্ষতিকর, এটা সমর্থন যোগ্য কিনা।

একবার কোনও জমিতে জুম চাষ করার পর থেকে একই জমিতে পরবর্তীতে চাষ করার আগে পর্যন্ত যে সময়ব্যাপ্তি তাঁকে ‘Fallow Period’ বলে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই সময়কাল যদি ৮-১০ বছর হয় তাহলে তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, কারণ এতদিন বিরতি থাকলে মাটি আবার তাঁর জুম পূর্ববর্তী গুণাবলি ফিরে পায়, এবং ফসলের উদপাদনও স্থির থাকে। কিন্তু বর্তমানে পার্বত্যাঞ্চলে এই সময়ব্যাপ্তি এখন হ্রাস পেয়ে স্থান বিশেষে ২-৩ বছরেও নেমে যেতে দেখা গেছে যা অবশ্যই পরিবেশের জন্য হুমকি স্বরূপ। কিন্তু কেন এই ব্যাপ্তিকাল হ্রাস পেয়েছে তাঁর জন্যে ইতিহাসের দিকে নজর দিতে হবে। এই কাপ্তাই লেইকের তলদেশে হারিয়ে গেছে এখানকার মোট চাষযোগ্য ভূমির ৪০% যা পরিমাণে ৫৪ হাজার একর! কাপ্তাই লেইক পরবর্তী সময়ে কানাডার কোম্পানী ‘ফরেস্টাল’ এর জরিপ অনুযায়ী পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের কেবল ২% হচ্ছে চাষাবাদযোগ্য ভূমি। তাঁর উপর সেটেলার পুশ ইন করার মাধ্যমে এবং তাঁদেরকে জমি বন্টন করে দেয়ার মাধ্যমে আরও ঘাটতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এই কাপ্তাই লেইক হওয়ার আগেও ‘Fallow Period’ গড়ে ৮-১০ বছর ছিল। এই কাপ্তাই লেইক হওয়ার ফলে রাইনখিয়ং রিজার্ভ ফরেস্ট বনজ সম্পদ পাচারকারীদের জন্য স্বর্গ রাজ্য হয়ে উঠেছে। ক’বছর আগেও সহজে এর ভেতর যাওয়া যেত না, এখন পানি পথেই এর সম্পদ আহরন ও পাচার সম্ভবপর হয়ে উঠেছে। জুম চাষে সমতলের মত কঠিন কোনও যন্ত্র তথা পাওয়ার টিলার কিংবা লাঙ্গল ব্যবহৃত হয় না। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় কিছু সাধারণ জিনিস যেমন কাইম, কঞ্চি এসব, ফলে মাটির অতটা গভীরে কিছু হয় না, এবং এখানে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না ফলে পরবর্তীতে মাটির গুরুত্বপূর্ন গুণাবলি ফিরে পাওয়ার অবকাশ থাকে(এখন কিছু কিছু জায়গায় সারের ব্যবহার শুরু হয়েছে, এর অন্যতম কারনও কিন্তু ঐ সময়ব্যাপ্তি হ্রাস পাওয়া এবং ফলশ্রুতিতে মাটির গুণাগুণ হারানো এবং ফসল উদপাদন হ্রাস পাওয়া)। ভূমি সমস্যার সমাধান হলে, এটারও একটা সমাধান হবে।

আদিবাসীদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার লড়াই সফল হোক। তাহলে টিকবে প্রকৃতি, বৈচিত্র।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

76 + = 77