আমার বউ কোনদিন আমাকে গাড়ি কিনে দিবে না !!

সকালের নাস্তা সেরে বিনতিকে বললাম টেবিল থেকে অফিসের ফাইল টা নিয়ে আসতে। সে ভ্রু কুচকে টেবিল থেকে ফাইলটা এনে আমার সামনে রাখলো। আমি তার ভ্রু কুচকানো উপেক্ষা করে ফাইলটা হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম। বিনতি আমার স্ত্রী। মোটামুটি উচ্চতার হালকা গড়নের অতি সুশ্রী মেয়ে বিনতি। আমাদের দুজনের সংসারের বয়সকাল এগারো বছর। সাত্ বছরের ফুটফুটে মেয়ে আছে আমার। এইতো কিছুদিন হল স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। মেয়ে আমার মায়ের সব রূপ পেয়েছে। আচার আচরনে কিছুটা উদাসীন। সেটা আমার থেকেই প্রাপ্ত হয়েছে বলে আমি মোটামুটি তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। বিনতি সব কাজেই বেশ সিরিয়াস থাকে। রিলাক্সের ইস্যুটাকে সিরিয়াস কিংবা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে পরিনত করতে বিনতির কোন জুড়ি নেই। বিনতির এই সিরিয়াস ব্যক্তিত্বের ছিটেফোটাও নেই জয়ন্তিকার মানে আমার মেয়ের মধ্যে। মেয়ের এই আচরনে আমার স্ত্রী মোটামুটি হতাশ হলেও আমি খুব খুশী। বিনতি তার বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। বিনতির বাবা ছিল মফস্বল শহরের মস্ত বড় ব্যাবসায়ী। সেই সুবাধে বিনতির মধ্যে অভিজাত সেন্স টা প্রবল। আমাদের বিয়ের সময়ে আমার আর বিনতির বয়স ছিল যথাক্রমে ছাব্বিশ ও পচিশ। আমরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। সমবয়সী বিয়ের ব্যাপারে আমাদের সমাজে একটা ট্যাবু থাকলেও আশ্চর্যজনক ভাবে বিনতির বাবা তার মেয়ের জন্য সমবয়সী পাত্র খোঁজার জন্য দিনরা্ত এক করেছে। বিনতি আমার কথা তার বাবাকে বলার পর তার বাবা আমার সম্পর্কে কিছুটা খোঁজ খবর নিয়ে একবাক্যে রাজি হয়ে যায়। আমার সাথে বিনতির কোন প্রেম ছিল না। কিন্তু আমি বিনতি কে খুব পছন্দ করতাম, কাছে-পিছে ঘুর ঘুর করতাম। বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র শেষ করে সবে একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে স্বল্প বেতনে চাকরি শুরু করেছি। হঠাৎ একরাতে বিনতি আমাকে ফোন দিয়ে বলল, তোমার কথা আমার বাবাকে বলেছি। এখন তুমি তোমার বাবাকে পাঁঠাও কথা বলতে। আমি অনুভব করলাম যেন কেও স্বর্গ আমার নামে লিখে দিয়েছে । আমি সেই রাতে আমার বাবাকে ফোন দিয়ে সবিস্তারে সবকিছু বললাম। বাবা সবকিছু শুনে যেতে রাজি হলেন। আমার বাবা ছিলেন পুরনো ধ্যান ধারনার মানুষ। তাই কিছুটা ভয়ে ভয়ে ছিলাম । কিন্তু বাবা বিনা আপত্ততে রাজী হয়ে গেলেন। প্রায় মাসখানেক পর আমাদের বিয়ে হল। বিনতির বাবা অবশ্য বলেছিল সংসারের সকল খরচ সে বহন করবে। কারন আমরা এখনো খুব একটা প্রতিষ্ঠিত না। কিন্তু বিনতি খুব প্রতিবাদ করে তার বাবার প্রস্তাব অস্বীকার করল। বিনতির তার বাবাকে বলেছিল, দুজনের সংসার খরচ খুব একটা বেশী না। তাছাড়া প্লাবন চাকরি করে, আর আমিও একটা কোম্পানিতে অফার পেয়েছি। মাসখানেক পর জয়েন করব। বিনতি একটা স্বনামধন্য মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব পেল। বিনতির জব পাওয়ার পর সত্যি সত্যি আমাদের দুজনের সংসার মোটামুটি বিলাসিতাকে সঙ্গে নিয়েই চলল।

গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি প্রায় আধাঘন্টা ধরে । অফিসের ফাইলটার তাকাতেই দেখি বিনতি আমাকে ভুল ফাইলটা দিয়েছে। এখন আর বাসায় গিয়ে ফাইলটা আনতে ইচ্ছা করছে না। বিনতিও এতক্ষনে বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিয়ে দিয়েছে। বিনতির অফিস তাকে এলিয়ন জি ২০০৪ মডেলের একটা গাড়ি দিয়েছে। সেই গাড়ির ই এম আই সাত বছর ধরে চলছে। সেই ই এম আই আমি দিচ্ছি। কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন নয় বলে সেই গাড়ি করে আমি আমার অফিস যেতে পারি না। কারন বিনতির অফিস মতিঝিল আর আমারটা উত্তরায় কিন্তু বাসা আমাদের গুলশান নিকেতনে। ফাইলের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে বাসে উঠলাম। কোনমত একপায়ে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে গেটের একটা অংশ ধরে ঝুলতে ঝুলতে কোনরকম উত্তরাতে পৌছালাম। মাঝে মাঝে ভাবি আমার বউ এলিয়েন হাকিয়ে অফিস করে অথচ সমমর্যাদায় চাকরি করেও আমি বাসে ঝুলে অফিস করি। এতে আমার কোনদিন দুঃখবোধ হয়নি বরং প্রসন্নবোধ করি। অফিসে ঢুকতেই দেখি মেহেদী আমার জন্য একগ্লাস ঠান্ডা পানিসমেত বসে আছে। মেহেদী আমার এক পোস্ট জুনিয়র। কিন্তু মেহেদীর সাথে আমার সম্পর্ক বন্ধুর মত। সে হেসে পানির গ্লাস হাতে দিয়ে বলল জনাব এবার একটা গাড়ি কিনে ফেলুন। সেকেন্ড হ্যান্ড হলেও ভাল। আমার পরিচিত আছে অল্পতে নিয়ে দিতে পারবো। আমি হেসে বললাম বিনতির গাড়ির ইম এম আই টা শেষ না হতে বড় খরচ করলে চাপে পরে যাব। মেহেদী ভ্রু কুচকে তার রুমে চলে গেল।

অফিস শেষে বাসায় ফিরে দেখি বিনতি সোফায় বসে টিভি দেখছে। আমাকে ঘর্মাক্ত দেখে কিছুটা আহ্লাদের সূরে বলল একটা গাড়ি কিনতেই হয় তোমার।

আমি বললাম আর গাড়ি!! মেয়ে কি করছে ?

বিনতি বেশ হাসিমুখেই বলল টিচার আসছে। পড়ছে। তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো, জুস করা আছে টেবিলে। একটু তাড়াতাড়ি করো। কথা আছে তোমার সাথে।

আমি বললাম ধন্যবাদ। আমি ঝটপট রেডি হয়ে আসছি।

আমি জুস খেয়েই বিনতির পাশে বসতেই বিনতি জিজ্ঞাসা করল, বলত সাতদিন পর কি ?

আমি নির্বাক ভঙ্গিতে বললাম কি ?

তোমার এই ভুলে যাওয়ার অভ্যাস কি কখনো যাবে না ? হোপলেস।

বিনতির মুডের এই আকস্মিক পরিবর্তন দেখে আন্দাজ করতে পারলাম সাতদিন পর অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা হবে। কিন্তু সেটা কি আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। ভাবতে ভাবতেই বিনতি বলল, সাতদিন পর আমাদের বারোতম বিবাহবার্ষিকী। মানে একযুগের সংসার জীবন। দিনটা খুবই স্পেশাল।

আমি বললাম হ্যা অবশ্যই স্পেশাল। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম একযুগ পূর্তি আসলেই অনেক কিছু। দিনটাকে স্পেশাল করা উচিত। আমাকে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে। আমি বিনতিকে বললাম, শোন আমি দু একদিনের মধ্যে সব প্লান করে জানাবো তোমাকে। একটা সারপ্রাইজও প্লানও করতে হবে।

বিনতি আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। আহ্লাদের সূরে বলল ইউ আর এ ভেরি নাইস এন্ড কিউট হাজব্যান্ড। আই এম হ্যাপি উইথ ইউ। এটা বলে বিনতির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরল। আমি চোখের জল মুছে বিনতিকে বললাম , ক্ষুদা লেখেছে কিছু খাবার দেয়া যাবে। বিনতি হাসিমুখে খাবার তৈরি করতে গেল। কিছুক্ষন বাদ আমার খুব পছন্দের চানাচুর আর মুড়ির সাথে পেয়াজ মরিচ দিয়ে মেখে নিয়ে এসেছে। বিনতি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার জন্য এবার একটা স্পেশাল গিফট আছে। যেটা তোমার কাছে মোটামুটি আরাধ্য। গতবছর জন্মদিনে তুমি আমাকে ফ্লাট কিনে দিয়েছো। এই জন্য আমিও চিন্তা করেছি তোমাকে এবার দামি কিছু গিফট করবো। এটা বলে মুচকি হাসি দিয়ে বিনতি রান্না ঘরে ঢুকলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, ফ্লাট তো কেনারই কথা ছিল। জন্মদিন তো উপলক্ষ্য মাত্র। ফ্লাট কেনার সময় বিনতি আমাকে এক টাকাও দেয় নাই। কিন্তু বিনতি বলল, স্পেশাল গিফট দিবে তার মানে কি বিনতি আমাকে গাড়ি কিনে দিবে। গাড়ির চাবি দিয়ে বলবে এখন থেকে যেন শার্টে যেন আর ঘাম লেগে না থাকে। আমি মনে মনে ভেবে বেশ পুলকিত বোধ করলাম। মেহেদীকে ফোন দিয়ে বললাম বিনতি তোকে গাড়ির কথা বললে অল্প দামের গাড়ির কথা বলিস। মেহেদী আমাকে বলল ভাবী তাহলে গাড়ি গিফট করবে ? আমি বললাম এখনো নিশ্চিত না তবে অনুমান করছি। তোকে যেটা বললাম সেটাই করিস। এটা বলে ফোন রেখে দিলাম।

আজকে আমাদের বিবাহবার্ষিকী। আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। বিনতিও অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সরাসরি পার্লারে চলে গিয়েছে। আমি একটা অভিজাত রেস্টুরেন্টে পার্টির আয়োজন করেছি। সন্ধ্যার দিকে বিনতি এসেছে। তাকে শুধু সুন্দরীই লাগছে না বরং তার চেয়ে বেশী কিছু মনে হচ্ছে। কিছু বন্ধুবান্ধব আর নিকট আত্মীয়ের উপস্থিতিতে বেশ জমকালো ভাবেই আমরা বিবাহবার্ষিকীর কেক কাটলাম। আমি বিনতিকে ডায়মন্ডের একটা নেকলেস পরিয়ে দিলাম। বিনতি বেশ খুশী হল। এবার বিনতির পালা। আমি মেহেদীর দিকে তাকিয়ে আছি। মেহেদী চোখের ইশারায় বোঝাল যা হবে ভালোর জন্য হবে। আমি নিজেকে বুঝাচ্ছি একটা গিফটের জন্য আমার মন কেন এমন অশান্ত আচরন করছে। অথচ আমি বরং গিফটের প্রতি কোন আকর্ষণ বোধ করি না বলে বিনতি আমাকে কত কথা বলে। তাহলে আমার আচরনের এহেন পরিবর্তনের মানে কি? একটা অজানা চাপা আনন্দে আমার মন ভেসে চলছে গহীন কোন অরন্যে যেখানে শ্বাপদসংকুলের কোন ভয় নেই শুধু পাখির কোলাহল ঝিরি পাতার গান আর বাতাস বইছে অবিরত। এবার মনে মনে ভাবলাম বিনতির হাতে ফ্লাটের চাবি দেয়ার আগে বিনতির এরকম অনুভূত হয়েছিল। এই আনন্দ অসীম কল্পনাতীত। এটা দামী কোন সামগ্রী পাওয়ার আনন্দ নয়। এই আনন্দ হল ভালবাসার মানুষ যখন স্বপ্ন পূরণ করে দেয়। এই আনন্দ স্বপ্নের থেকেও অনেক অনেক বড়।

বিনতি কাছে এসে আমাকে একটা বক্স থেকে দামী একটা ঘড়ি উপহার দিল। আমি মনে মনে ভাবলাম এরপরের গিফট টা মনে হয় একটা চাবি যেখানে লেখা আছে স্বামীকে সুখ উপহার দিলাম। কিন্তু তা হল না। ওই একটা ঘড়ি পেয়েই আমাকে সন্তুষ্ট থাকতে হল। হাসতে হল কিছুটা অভিনয় করে। মেহেদী আমার দিকে হতাশভরা দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকলো।

বাসায় ফিরছি বিনতির গাড়িতে করে। বিনতি আমাকে জিজ্ঞাস করল গিফট টা পেয়ে খুশী হও নাই ?

আমি বললাম হ্যা।

কিন্তু মনে হচ্ছে না।

আমি মুখ ফসকে বলেই বললাম , আমি মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম তুমি বুঝি আমাকে গাড়ি দিবে। আমি হাসি দিলাম যেটা শুধু হতাশায় বের হয়।

বিনতি থমকের সূরে বলল , ছি ! তোমাকে আমি বেশ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ ভেবেছিলাম। বউর টাকায় কেনা গাড়িতে চড়তে তোমার মানসম্মানে একটুকুও লাগবে না ? তুমি এত বড় অফিসার হয়ে এই কথাটা কিভাবে বললা বা এই আশাও কর কিভাবে। সামান্য বিবেকবোধ তোমার নেই। ব্যক্তিত্ব তো শিকেয় তুলেছো মনে হচ্ছে। ইগোকে নষ্ট কর না। ওইটাকে স্যাটিস্ফাই কর পারলে।

আমি মেজাজ ধরে রাখতে পারলাম না। বিনতিকে বললাম, তোমার গাড়ির ই এম আই তো আমি পরিশোধ করছি তাতে তোমার যদি লজ্জা না লাগে তবে আমার লাগবে কেন। তুমি গাড়ি উপহার দেয়ার মত স্বাবলম্বী ।সেই হিসাবে তোমার কাছে গিফট হিসাবে গাড়ি বাড়ি আমি চাইতেই পারি। শোন কিছু কথা বলি , তুমি নিজে একজন সমানঅধিকারে বিশ্বাস করা নারী। কিন্তু পরোক্ষভাবে এই তুমিই আবার আমাকে প্রভু বানাচ্ছো। হিসাব করে দেখো তোমার নিজের কিন্তু কিছু নেই। গাড়ি আমার বাড়ি আমার। তোমার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তুমি কিছু কর নাই এর মানে তুমি নিজেই বিশ্বাস কর এগুলো স্বামীর দায়িত্ব মানে তোমার জীবনের সকল ব্য্যয়ভার বহন করার দায়িত্ব আমার। তাহলে এই বিশ্বাস করা মন নিয়ে তুমি কিভাবে মনে কর আমি তোমার প্রভু হব না ? কিভাবে মনে কর তোমার মতামত কে প্রাধান্য দিব ? কিভাবেইবা মনে কর তোমাকে আমি একপাক্ষিক নিয়ন্ত্রন করব না ?

আর একটা কথা , যেকোন উৎসব পার্বণে কেন বরাবর আমাকেই প্লান করতে হবে। সব ব্যাবস্থা আমাকেই করতে হবে। সারপ্রাইজ পাওয়ার অধিকার যেমন তোমার আছে তেমনি কাউকে সারপ্রাইজ দেয়ার মত নুন্যতম যোগ্যতা তোমার থাকা উচিত। হিসাব করে দেখো তো তুমি কোনদিন আমাকে তোমার স্বীয়কার্যাবলী দ্বারা আনন্দিত করেছো। আমিই বরং তোমাকে আনন্দ দিতে গিয়ে আনন্দিত হই। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবা আমার আনন্দের জন্য তোমার কোন হাত নেই। তুমি যে ধারনা বিশ্বাস কর তাতে তোমাকে ভালবাসার জন্য শরীর বাদে অন্য আর কিছুই নেই।

বিনতি উচ্চস্বরে কান্না করছে। আমি গাড়ির জানালা দিয়ে শহর দেখছি আর ভাবছি সবকিছুতেই পুরুষের অবদান নারী শুধু উপলক্ষ্য মাত্র। বিনতি কান্না করুক, অথবা আমাকে ছেড়ে চলে যাক কোনকিছুতেই বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই আমার। আমার দরকার জীবনসঙ্গিনী কোন দাসীকে আমি স্ত্রীরূপ স্বীকার করবো না।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.