ঈমামের জন্য সম্মান! ধর্মান্ধতার পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে স্বদেশ!

তরুনটি পাশের টুলে বসা পঞ্চাশোর্ধ ফর্সা গোলগাল নুরানি চেহেরার অধিকারীকে হাতের ইশারায় দেখিয়ে আমাকে বলল, -দেখুন উনি আমাদের মসজিদের ঈমাম। আমাদের সবাইকে নামাজ পড়ায়। এলাকায় আমরা সবাই উনাকে সম্মান করি। উনার সামনে সিগারেট খাওয়া বেমানান, এটা উনাকে অসম্মান করা!


বেশ কিছুদিন আগের কথা। তখন সন্ধ্যা ৭টা কি সাড়ে ৭টা হবে হয়তো। সেদিন এক অপরিচিত জায়গায় রাস্তার পাশের ফুটপাতে টঙের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম, একই সাথে সিগারেটও টানছিলাম। এক চুমুক চা, একটা সিগারেটের টান। তখন আমার মাথার ভিতর ঘুরছে মাইকে ভেসে আসা ওয়াজ মাহফিলের বক্তব্যগুলো। চা-সিগারেটও খেলাম কিছুক্ষন মুসলমানদের উস্কানিমুলক ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক বক্তব্যও শুনলাম। না শুনলে এর বিরুদ্ধে আমি লিখবো কি করে? কিছুক্ষন পর আমার পাশের টুলে এসে বসেছে দুজন মৌলবী, দুই জনের মোচহীন গালভরা লম্বা দাঁড়ি। বয়স পঞ্চাশোর্ধ। একজন খুব ফর্সা, গোলগাল চেহেরা। যদিও ছাগলের মতো লাগছে না। একটু গাম্ভীর্য ভাব আছে! তাদের দেখে আমি ভাবলেশহীন চায়ে চুমুক দিয়ে দিয়ে সিগারেট টানছি। দুজন বসা মাত্রই আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো, আমার এইটুকু বুঝতে কষ্ট হয়নি যে, আমি তাদের সামনে সিগারেট টেনে যেন খুব অপরাধ করে ফেলেছি!

এরইমধ্যে একটি তরুন কোত্থেকে এসে আমাকে বলল, -এই ভাই ঈমামের সামনে সিগারেট খাচ্ছেন কেন? জ্ঞাণবুদ্ধি কিছু নেই নাকি?

আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, -ঈমাম? কোন ঈমাম? আর হ্যাঁ ধুমপান এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে নাক গলার আপনি কে? আর এখানে জ্ঞাণবুদ্ধির কথা আসছে কেন? এ্যাঁ…

তরুনটি পাশের টুলে বসা পঞ্চাশোর্ধ ফর্সা গোলগাল নুরানি চেহেরার অধিকারীকে হাতের ইশারায় দেখিয়ে আমাকে বলল, -দেখুন উনি আমাদের মসজিদের ঈমাম। আমাদের সবাইকে নামাজ পড়ায়। এলাকায় আমরা সবাই উনাকে সম্মান করি। উনার সামনে সিগারেট খাওয়া বেমানান, এটা উনাকে অসম্মান করা!

আমি হালকা হেসে বললাম, -উনার সামনে সিগারেট টানলে এটা উনার প্রতি কিভাবে অসম্মান হয়? আর আমি তো উনার ঘরে গিয়ে উনার সামনে সিগারেট ধরায়নি উনাকে অসম্মান করার জন্য। উনি এসেই আমার সামনের টুলে বসেছেন।

আমার,সামনের টুলে বসা এবার ঈমাম সাহেব নাক মুখ ফুলিয়ে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, -তোমার লজ্জা করে না! এ্যাঁ একজন ঈমামের সামনে এভাবে সিগারেট খাচ্ছো? এ্যাঁ! তোমার মা বাবা তোমাকে বড়দের সম্মান করার শিক্ষা দেয়নি এ্যাঁ…..

আমি চায়ে চুমুক দিয়ে আবার সিগারেটে টান দিয়ে উপরে ধোয়া ছেড়ে, চোয়াল শক্ত করে খুব গম্ভীর গলায় তরুনটির দিকে চেয়ে বললাম, -আমি সিগারেট খাই, এটা আমার অভ্যাস। উনি কে আমি চিনিও না জানিও না। আর সিগারেট খাওয়ার মতো একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আপনারা আমাকে শাঁসাচ্ছেন কেন? ঠিক কোন অধিকারে শাঁসাচ্ছেন? আমি কি জোর করে আপনাদের পকেট থেকে টাকা নিয়ে সিগারেট খাচ্ছি? আর হ্যাঁ কোন মানুষ, কোন শিক্ষককে সম্মান করতে হবে তার যথার্থ জ্ঞাণ আমার আছে! আপনারা যা করছেন এটা অনধিকার চর্চা! আপনারা যেচে এসে গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাঁচ্ছেন! আমি যেচে এখানে ঝগড়া করতে আসিনি…. একজন পরকালের বেহেস্তর ৭২ হুর লোভী ধর্মান্ধ ইতর ইমামকে শ্রদ্ধা করব এতোটা গদর্ভ আমি নই। কথাটা আবার মনে মনে বললাম।

তরুনটি বলল, -ভাই আপনাকে সিগারেট খেতে বারণ করেছি, আপনি খান খান সিগারেট খান। বেশি করে খান। আপনাকে দুটো ভালো কথা বলতে এসেছি। সিগারেট খাওয়া ভাল জিনিস না। আপনি এতোটা কথা শুনিয়ে দিবেন ভাবিনী বলে ছেলেটি চলে গেল…..

আমারও সিগারেট আর চা পান করা শেষ। উঠতে যাব এমন সময় ঈমাম সাহেব বললেন, -এই কোথায় থাকিস তুই?

ঈমাম সাহেবের তুই তোকারি সম্বোধন শুনে মাথাটা হুট করে গরম হয়ে যায়। নিজেকে কোনরকম সামলে নিয়ে খুব শান্তভাবে বললাম, -দেখুন ঈমাম সাহেব, একজন অচেনা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে কথা বললে তাকে আপনি সম্বোধন করতে হয়। আর সেই শিশু হলে তুমি সম্বোধন করতে হয়। মানুষের অন্তত এইটুকু ভদ্রতা জ্ঞাণ থাকা উচিত।

ঈমামের পাশে থাকা লোকটি বলল, -ভাই এখান থেকে যান তো!

আমি চা আর সিগারেটের বিলটা মিটিয়ে দিয়ে রাস্তার পার হয়ে হাঁটা শুরু করলাম……

বিবেচনাঃ হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি আমার দেশটা কোথায় যাচ্ছে? কোন দিকে যাচ্ছে? আগে আমরা স্কুলের শিক্ষকদের সম্মান করতাম। যেখানে দেখতাম সেখানে খুব শ্রদ্ধাভরে শিক্ষকের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতাম। আর এটা আমাদের শেখানো হতো শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। এখন সেই শিক্ষকের জায়গায় দাঁড়িয়ে জোর করে সম্মান পাবার জন্য মুখিয়ে আছে ঈমাম-মুয়াজ্জিনরা! একজন ঈমাম মসজিদে চাকরীরত অবস্থায় সারা জীবন মুসলমানদের মনে অমুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়, মুসলমানদের মননে ধর্মান্ধতার বীজ বুনে দেয়, মিথ্যে জান্নাত নামক এক অলৌকিক রুপকথার গালগল্প বলে মুসলমানদের রক্তক্ষয়ী জিহাদ করার জন্য প্ররোচিত করে, সেই জঘন্য সাম্প্রদায়িক মনের ঈমাম কি করে আমার সম্মানের পাত্র হবে?

১৩ সালের আগেও এই বাংলাদেশটা অতোটা ধর্মান্ধতায় পতিত হয়নি, এখন যতটা হয়েছে। আমার স্পষ্টত মনে আছে, হাটহাজারী মাদ্রাসার হেফাজত ইসলামের প্রধান আল্লামা শফী নারীদের তেঁতুল বলায় বর্ত্তমান ইসলামাশ্রয়ী ক্ষমতালোভী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ফুঁসে উঠে জোর গলায় তা প্রতিবাদ করেছিলেন। কেন আল্লামা শফী নারীকে তেঁতুল বলেছে এই নিয়ে শেখ হাসিনা শফীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। আজ শেখ হাসিনার ভীন্ন চরিত্র! শফীর সাথে গলায় গলায় ভাব। শফীকে ধর্মান্ধ মাদ্রাসা-শিক্ষার ব্যবসা বড় করার জন্য ৩২ কোটি টাকার জমি দান করেছেন। এরপর ১৩ সালের শেষের দিকে এসে শফী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যা যা বায়না ধরেন, তা তা তিনি করে দেন। শফীরা চাইলো বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন, তা তিনি বাঁধাহীন ভাবে করে দিলেন। শফীর ধর্মপ্রাণ চেলারা ব্লাসফেমী সম ৫৭ ধারা বর্বর কালো আইন চাইলো, অমনি শেখ হাসিনা তা পাশ করে দিলেন। শফীরা চাইলো মাদ্রাসার পাঠ্য বই থেকে প্রগতিশীল লেখকদের লেখা উঠিয়ে নিতে হবে, তাও তিনি করে দিলেন। শফীরা চাইলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রগতিশীল শিক্ষাহীন ধর্মান্ধতায় ভরা মাদ্রাসা-শিক্ষার সার্টিফিকেটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের সাথে সমমর্যাদা দিতে হবে, শেখ হাসিনা তাও করে দিলেন। এখানে মেবাধী শিক্ষার্থী আর ছাগলের কোনো পার্থক্য রইলো না!

শফীর ধর্মান্ধ ইসলামানুসারীরা চেয়েছিল হাইকোর্ট-এর চত্ত্বর থেকে লেডি অফ জাস্টিসের (ন্যায় বিচারের প্রতীকী দেবী) গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য অপসারণের জন্য, তাতেও শেখ হাসিনা শফীদের সাথে গলা মেলালেন। ১লা বৈশাখের বাঙ্গালীর মঙ্গল শোভাযাত্রা শফীর দল তথা হেফাজত ইসলামের পছন্দ নয়, এটা ইসলাম বিরুদ্ধ। শেখ হাসিনাও আল্লামা শফীদের কথা গুরুত্ব দিয়ে ১লা বৈশাখের মঙ্গল শোভা যাত্রাকে বেলা ৫টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেন। আজ আল্লামা শফীর পাশে বসলে শেখ হাসিনাকে একটি রাষ্ট্রের একজন ব্যক্তিবান প্রধানমন্ত্রী বলে মনে হয়না, মনে হয় শফীর পদলেহী কুকুর। গনতন্ত্রের মানস কন্যা নামে খ্যাত লৌহ মানবীটি এখন ক্ষমতার নেশায় মুর্খ, অশিক্ষা আর ধর্মান্ধতার কাছে মাথা নোয়াতে নোয়াতে এতোটা নুইয়ে ফেলেছে যে, এই এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি মেরুদণ্ডহীন অযোগ্য অক্ষম রাষ্ট্রচালক বলেই মনে হয়। শুধু তাই নয়, সংখ্যাগুর মুসলমানদের ভোট পাবার নেশায় তিনি এখন প্রতিটি গ্রামাঞ্চলে কুশিক্ষা,ধর্মান্ধতা আর কুপমন্ডতাকে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাঁজিয়েছেন ইসলামকে প্রাধান্য দিয়ে।

আমেরিকার কোনো তরুন যখন মহাকাশ নিয়ে গবেষনায় ব্যস্ত, জার্মানীর কোনো শিক্ষার্থী যখন মানুষ ও মনুষ্যত্বের পৃথিবী গড়ার জন্য ভাবছে, কিউবার কোনো শিক্ষার্থী যখন জীববিজ্ঞানের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করার চিন্তায় মগ্ন, তখন আমাদের দেশের অধিকাংশ তরুন ইসলামকে ভালোবেসে অলীক কল্পিত জান্নাত পাবার আশায় ধর্মান্ধতাকে বেছে নিচ্ছে। এদেশে ওয়াজ মাহফিল আর ইসলামিক আন্দোলনের জনসংখ্যার বহর দেখলে বুঝা যায় দেশের তরুন সমাজের বিরাট একটি অংশ ধর্মান্ধতায় কতোটা পতিত হয়েছে। ইদানিং ইসলামি জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাদবাদের কার্য্যক্রম দেখে আরো মনে হয় বাংলাদেশ ধর্মান্ধতার পথ ধরে অনেকখানি পথ এগিয়ে গেছে। এখন পাকিস্তান-আফগানিস্তানকে ছাড়িয়ে যাবার পালা….

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2