বিষটি হচ্ছে পুরুষতন্ত্র আর বিষপ্রয়োগকারী হচ্ছে পুরুষ

নারীবাদ নিয়ে পশ্চাৎপদ সমাজ এখনো রয়েছে বেশ ভ্রান্তিতে। তারা গুলিয়ে ফেলেন মানবতাবাদ আর নারীবাদ বিষয়টিকে এক করে। মানবতবাদও যে নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকার করেতে চায় নি এর প্রমাণ, রুশোসহ আরো অনেকে আছেন। ফরাশি বিপ্লবের দার্শনিক যিনি সমস্ত শৃঙ্খলের বিরোধী ছিলেন তিনিও নারীর জন্যে আর পুরুষের জন্যে আলাদা শিক্ষা, আলাদা জীবন ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন।


নারীবাদের বেশ কয়েকটি রকমফের আছে। উদার, মুক্তমনা, প্রগতিশীল, নাস্তিকরাও বেশ ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করে থাকেন নারীদের জীবনযাপন পদ্ধতিতে। নারীবাদের রকমফের যাই থাক না কেনো একটি বিষয় স্পষ্ট যে, নারীবাদ নারীর ওপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ কে পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। আর এই মূলনীতিটুকুই নারীবাদের জন্যে যথেষ্ট।

নারীবাদ নিয়ে পশ্চাৎপদ সমাজ এখনো রয়েছে বেশ ভ্রান্তিতে। তারা গুলিয়ে ফেলেন মানবতাবাদ আর নারীবাদ বিষয়টিকে এক করে। মানবতবাদও যে নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকার করেতে চায় নি এর প্রমাণ, রুশোসহ আরো অনেকে আছেন। ফরাশি বিপ্লবের দার্শনিক যিনি সমস্ত শৃঙ্খলের বিরোধী ছিলেন তিনিও নারীর জন্যে আর পুরুষের জন্যে আলাদা শিক্ষা, আলাদা জীবন ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন।

সাম্যবাদেও যে চরম লিঙ্গবৈষম্য বিরাজ করতে পারে এর কথা সরাসরিই বলে দিয়েছেন সিমোন দ্য বোভোয়ার। নিজেকে প্রথমত নারীবাদী হিসেবে উপস্থাপন করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও পরে তিনি নারীবাদী হিসেবেই নিজেকে উপস্থাপন করেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন সমাজতন্ত্রের মধ্য দিয়েই নারী মুক্ত হবে পুরুষতন্ত্রের কবল থেকে। পরে উপলব্ধি করেন সমাজতন্ত্রও একধরনের পুরুষতন্ত্র। সমাজতন্ত্রও যে একধরনের পুরুষতন্ত্র হিসেবে সণাক্ত হয়েছে তা সমাজতন্ত্রের ক্রুটি নয়, সমাজতন্ত্রের চর্চাকারীদের মানসিকতার ফসল এটি।

নারীবাদ আর মানবতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। নারী আর পুরুষের শোষণ হবার প্রক্রিয়া এক রকম নয়। নারীবাদী না হয়ে মানবতার দিকে পা বাড়ানো অসম্ভব। দেশে দেশে যুগে যুগে মানবতাবাদীর আবির্ভাব ঘটেছে বেশ কিন্তু নারীদের ব্যাপারে তাদের বেশীরভাগই ছিলেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল। তাদের মধ্যে আবার অনেকে ছদ্ম নারীবাদী ছিলেন, মুখে বললেও তারা প্রায়োগিক জীবনে নারীবাদী তো ছিলেনই না বরং ছিলেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল। আবার অনেকে ঘোষণা দিয়েই ছিলেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল। তাদের মানবতাবাদে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলো শুধু পুরুষেরাই। নারীকে তারা দেখেছেন পুরুষের সহযোগী হিসেবে। নারীকে পৃথক ব্যক্তিসত্ত্বা হিসেবে দেখার মানসিকতা তাদের ছিলো না। এর মূল কারণ একটাই আর তা হলো নারীর কাছ থেকে পুরুষের সুবিধে হারানো। নারীর গর্ভ ধারণ, গায়ের শক্তি কম ইত্যাদি নানাবিধ অজুহাতে নারীকে রেখেছে দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে।

কথা হলো মানুষকে যদি মানুষ হিসেবে সণাক্ত করার মানসিকতা অর্জন হয় তাহলে নারীর প্রাকৃতিক বিষয়গুলি কী করে নারীর সমানাধিকারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়? মূল বিষয়টা হলো মানসিকতা। উদার মুক্তমনা, প্রগতিশীল, নাস্তিকরাও প্রত্যেকে নারীবাদী হয়ে উঠেন না। অথচ এমনটি হবার কথা ছিলো না। তাদের তালিকাতেও নারী দ্বিতীয় লিঙ্গ। তাদের মানবতাবাদে নারীর স্থান নেই। কারণ ওই একটাই নারীর কাছ থেকে পুরুষের সুবিধে হারানোর ভয়। মুক্তমনাদের তত্ত্বটি যদি এমন হয় যে- যা মন চায় তাই বলবো এবং করবো তাহলে মানবপ্রজাতির মনুষ্যত্বমূলক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যায়। নাস্তিকরা যদি মনে করেন, পরকাল বলে কিছু নেই, এ পৃথিবীটাই যেহেতেু সব, তাহলে নিজেকে যথাসম্ভব সুবিধেপ্রাপ্ত করে নিতে হবে তাহলেও বিশৃঙ্খলা তৈরি হবার ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যায়।

উদার, মুক্তমনা, প্রগতিশীল, নাস্তিকরা নারীকে বাদ দিয়ে অথবা শুধু সম্পূরক হিসেবে স্থান দিয়ে তাদের চিন্তা-চেতনার চর্চা করতে থাকেন তাহলে নারী-পুরুষের সংঘর্ষ অব্যাহত থাকবে-এটা অনিবার্য। এখন কথা হলো নারী-পুরুষের সংঘর্ষটি অব্যাহত থাক-এটা আমরা চাই কীনা? এমনিতেও বর্তমান পেক্ষাপটে নারী-পুরুষের সংঘর্ষ খুব অস্বাভাবিক বিষয় নয়। পুরুষতন্ত্রের প্রতি বিদ্বেষ থাকলে খুব স্বাভাবিকভাবেই পুরুষবিদ্বেষ থাকতে পারে। কেননা পুরুষতন্ত্রটি পুরুষই তৈরি করেছে এবং বেশীরভাগ সময়ই পুরষ এটির ধারক ও বাহক।

অনেকে বলে থাকেন, নারী কেনো পুরুষ বিদ্বেষী হবে, সে পুরুষতন্ত্র বিদ্বেষী হতে পারে। এটা অনেকটা এরকম যে-পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়। মনে রাখতে হবে কোনো চেতনাই তার ধারক ও বাহক ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। পাপটিকে ঘৃণা করে পাপ থেকে বিরত থাকা যায় হয়তো কিন্তু পাপীর শাস্তি হবে না বা পাপীকে তিরস্কার করা যাবে না- এটি কেবলই একটি গালভরা উদারনৈতিক কথা।

ধরা যাক, একটি মানুষকে হত্যা করার জন্যে আর একটি মানুষ বিষ প্রয়োগ করলো, যে বিষক্রিয়ার ফলে প্রথমোক্ত মানুষটি মারা গেলো অথবা বেঁচে গেলেও সে তার স্বাভাবিক জীবন যাপনে ব্যর্থ হলো। কাকে দোষ দেবো আমরা? বিষকে, নাকি বিষ প্রয়োগকারীকে? খুব স্বাভাবিক চেতনাতেই বিষপ্রয়োগকারীকে দোষী হিসেবে সণাক্ত করবো আমরা। ঠিক এরকমই মানবসমাজে বিষটি হচ্ছে পুরুষতন্ত্র আর বিষপ্রয়োগকারী হচ্ছে পুরুষ। পুরুষেরা এবার ভাবতে পারেন, বিষপ্রয়োগকারী হিসেবে কতোদিন তারা বিদ্বেষ কুড়াবেন? যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, শারীরিক নির্যাতন এসবই কেবল পুরুষতন্ত্রের বিষয় নয়। নারীকে লিঙ্গিয় চেতনা থেকে নারীকে পর্যবেক্ষণ এবং সে অনুযায়ী আচরণই পুরুষতন্ত্র। আর এ দৃষ্টিকোণ্ থেকে দেখলে এ বাঙলাদেশে কয়টি পুরুষ আছে-যে নারীর ‍ওপর পুরুষতন্ত্র প্রয়োগ করে না অর্থাৎ নারীকে বিষপ্রয়োগ করেন না?

উদার, মুক্তমনা, প্রগতিশীল, নাস্তিক যা-ই বলেন না কেনো’ মানবমুক্তির পথ একটাই আর তা হলো নারীকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে সনাক্ত করার মানসিকতা অর্জন। এর বাইরে যতো আধুনিক আর উদার দর্শনই আনা হোক না কেনো, নারী থেকে যাবে সেই দ্বিতীয় লিঙ্গস্তরেই। সকল সময়ে আনা সকল দর্শনই সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে নারীর মানুষের অধিকারগুলো পেতে। একটাই পথ-নারীবাদ যা নারীর ওপর থেকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ বিলোপ করবে, নারীকে করবে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =