নিষিদ্ধ ভালোবাসা ( পরান সখা বন্ধু হে আমার )

পরান সখা বন্ধু হে আমার।
==================
ভালোবাসা বিষয়টা আমার কাছে বেশ গোলমেলে, কলেজে থাকা কালীন সময়ে একবার এক সহপাঠীকে দেখলেই গানটা মনে হতো “আমি কেবলই স্বপনও করেছি বপনও….”। মানুষের ভালোবাসায় যে জাত, ধর্ম, বর্ণ আর লিঙ্গের ভেদাভেদ থাকেনা সেটা বুঝতে আমার বহুকাল সময় লেগে গেল, একটু খটকা লেগে গেল তাই নাহ, জী-হা ঠিকই শুনেছেন।
সেদিন রাতে বৃষ্টি হলেও দুপুরের দিকে গরমের প্রকোপটা তেমন কমেনি। আমার মা’র জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে বেশ কিছু ঝামেলা নিষ্পত্তি করার তাগিদেই গৌরীপুর আসা, দুপুরের কাঠ ফাটা রোদ মাথায় নিয়েই স্টেশনের দিকে যাত্রা করি, মামাতো ভাই বিপ্লব একটা ট্রেনের সিট আগে থেকেই রিজার্ভ করে রেখেছিলো, আজ রাতেই আমাকে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকা পৌঁছতে হবে। ট্রেনের কামরার ঠিক শেষ প্রান্তে আমার সিট। পাশে একজন মধ্য বয়সের ভদ্রলোক বেশ আয়েশ করেই সিগারেট ফুকে যাচ্ছেন। ট্রেন ভর্তি লোকজনের মাঝে ভদ্রলোকের এ ভাবে আয়েশ করে সিগারেট ফুকে যাওয়াটা কেমন যেন বিদঘুটে লাগছিলো। আমি নিজেও সিগারেট ফুঁকি বটে তবে এ ভাবে লোকজনের মাঝে সিগারেট ফুকার অভ্যাসটা অনেকদিন থেকেই নেই। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি বার বার, কেউ যেন কোন ভাবেই বুঝতে না পারে আমি একজন প্রবাসী বাঙালী আর বহুদিন পর নিজের দেশে এসেছি। পরিবারের সবাই আমাকে বার বার সতর্ক করে দিয়েছে ট্রেনে কারও দেয়া কোন খাবার খাওয়া যাবে না, সর্বদা হাতের ব্যাগটাকে শক্ত করে ধরে রাখতে হবে, অপরিচিত লোকজনের কাছ থেকে বিনা কারণে সাহায্য নেয়া চলবে না এই সব না-না নিয়ম কানুন। সামনের সিটে এক নবদম্পতি বসে আছে, বেশ বোঝাই যাচ্ছে তাদের নতুন বিয়ে হয়েছে। ট্রেনের গতি অনেকটা, আমি যদি খুব জোরে দৌড় দেই তা হলে হয়তো অন্তত ৪০০ মিটার পর্যন্ত ট্রেনের গতিকে অতিক্রম করতে পারবো।
খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো ব্যাগ থেকে আমার ডি এস এল আর ক্যামেরাটা বের করে কিছু ছবি তুলি কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না, পাছে কেউ বুঝে ফেলে আমি সদ্য আগত একজন প্রবাসী বাঙালি, নিজের উপর বেশ রাগ হচ্ছিলো, নিজের দেশে নিজের মত করে চলতে পারছি না। শ্রীপুর স্টেশন হবে হয়তো, ট্রেনটা হঠাৎ করেই একটা লম্বা বিরতিতে দাড়িয়ে গেল, আমার বগির অপর প্রান্তের দরজা দিয়ে দুজন মহিলা বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে ট্রেন কামরাতে উঠে যেতেই লোকজন কেমন যেন আড় চোখে তাদের দিকে তাকাতে থাকলো, মহিলা দুজনকে দেখে বেশ ভালই তো লাগছিলো, বুঝতে পারছিনা লোকজন এমন নড়ে চড়ে বসলো কেন? মহিলা দুটো প্রতিটা সিটের যুবক যাত্রীদের কাছে যাচ্ছে আর তড়িঘড়ি করে ছেলেগুলো নিজেদের পকেট থেকে কেউ ৫ কি ১০ টাকা অবলীলায় দিয়ে দিচ্ছে, বিষয়টা বুঝতে পারছি না, দুজনার মাঝে একজন মহিলাকে বেশ লাগছে বটে, আমি অপলক দৃষ্টিতে সেই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছি, অপূর্ব সুন্দর দেহের গঠন, কেমন যেন উদাস হয়ে তাকিয়ে আছি, তাকিয়ে থাকার মত না হলে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে বুকের কোথায় যেন একটা ক্ষীণ ব্যথার অনুভব হতো না, এ যেন এমন কেউ যাকে অনন্তকাল পলকহীন দৃষ্টি নিয়ে দেখা যায়। মেয়ে দুটো যতই কাছে আসছে লোকজন খুব তাড়াতাড়ি তাদের চলার পথের পাশ থেকে কেমন যেন সটকে পরছে, সবার মাঝেই কেমন যেন একটা ঘেন্না ঘেন্না দৃষ্টি, মেয়ে দুটো খুব কাছাকাছি চলে আসার পর মনে হচ্ছে তারা ঠিক মেয়ে না তবে ছেলেও না, আমার সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তাদের একজন যার শরীরের গঠন একটি লতাময়ী গাছের মত, সে আমার পাশের যাত্রী কে বলে উঠলো, .- “পাঁচটা টেহা দে তাড়াতাড়ি, না দিলে তোর কোলের উপরে বৈইয়া পরাম”।
সত্যই ভাবতেই অবাক লাগছে যে হিজরারা দেখতে এতো সুন্দরী হয়? মনের ভেতর হঠাৎ করেই একটা বসন্তের হাওয়া বয়ে গেল, মনের মাঝে মুহূর্তের মাঝে না-না প্রশ্ন এসে ভীর করছে, আচ্ছা হিজরারা কি কখনো প্রেম করে না? তাদের কি সংসার হয়না ? কেউ কি তাদের সত্যিকার অর্থে প্রেম নিবেদন করে না?
যে কিনা দেখতে খুব সুন্দরী আমার কাছে এসেই টাকা চেয়ে বসলো আর আমি যেন আমার জীবনের সব সঞ্চিত অর্থ নিয়ে তারই অপেক্ষায় দিন গুনছি, একটু হাসিও পাচ্ছিল, ভাবছিলাম আমি তাকেই বলে বসি “ শুধু তোমার বাণী নয় গো বন্ধু হে প্রিয় , মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশ খানি দিও ………”। আমার এই পুঞ্জীভূত ভালো লাগাটা কি তার কাছে প্রকাশ করবো? কতো কিছুই তো জানতে ইচ্ছে করছে, সব কিছু কি জানা হবে? আমি অপলক দৃষ্টি নিয়ে তার দিয়ে তাকিয়ে আছি। নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোট লাগছে, কতবার যে হিজরা (তৃতীয় লিঙ্গ) শব্দটাকে অশ্লীল বা গালি হিসাবে ব্যবহার করেছি তার হিসেব নেই, অথচ একজন হিজরা তার সৌন্দর্যের অপরূপ আলোর ছটায় একজন বাজারের হট-কেক জাতিও শিক্ষিত পাত্র, ইউরোপের স্থায়ী ভাবে বসবাসরত যুবকের মন কত সহজেই কাবু করে ফেললো ! আমি নিজেকে বার বার বোঝাতে চেষ্টা করছি আসলে সে একজন হিজরা (তৃতীয় লিঙ্গ) তার প্রতি ভালো লাগাটা কোন বিধানের মাঝেই পরে না, আইনের মাঝে পরে কিনা আমার জানা নাই, কিন্তু মনের তো বিধান থাকেনা, আইন থাকে না, বাঁধ থাকে না , মনের উপর আমি কোন ভাবেই জোর করতে পারছি না, আমার এই ভালোলাগাটা যে কত দিনের সঞ্চিত সম্পদ তা ঠিক এ মুহূর্তে কলমের ভাষায় লিখে বোঝানো যাবে না।
আমার পাশের লোকটা হিজরা (তৃতীয় লিঙ্গ) দুজনকে পাঁচটা টাকা দিয়েই হাতে একটা সিগারেট ধরিয়ে দরজার দিকে উঠে চলে গেল, পাশের সিটটা খালি হতেই সুন্দরী হিজরাটা আমার পাশেই হুট করে বসে গেল আর আমি যেন তার এই বসে যাওয়ার অপেক্ষায় একটা জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি। ট্রেনের সব যাত্রীরা আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে, বিশ্বাস করুণ আমার মাঝে বিন্দু মাত্র ঘেন্না তো দুরের কথা একটা ভালো লাগার মত অনুভূতি আমাকে অবশ করে দিচ্ছে | মনে হচ্ছে এই সুন্দর মানুষটি এতো দিন কোথায় ছিল। এই মানুষটিও আমারই মত একজন রক্ত মাংসে গড়া বাঙালি। এই দেশে আমার যতটুকু অধিকার এই হিজরারও (তৃতীয় লিঙ্গ) ঠিক একি অধিকার, তার পরিচয় সে একজন হিজরা, শুধু মাত্র এই একটা পরিচয়ের কারণে সবাই তাদের দিকে ঘেন্নার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। ট্রেনে টি টি উঠলো সবার কাছে টিকিট দেখতে চাইলো শুধু মাত্র এই হিজরা (তৃতীয় লিঙ্গ) দুজনের টিকিট দেখতে চাইলো না। ইচ্ছে হচ্ছিলো ওই টি টির টুটি চেপে ধরে বলি, হিজরারাও ঠিক আমারই মত একি ট্রেনের যাত্রী, আমার তোমার মতই এ দেশের নাগরিক, সবার টিকিট দেখতে চাইলে তাদের টিকিটও দেখতে হবে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে সেই সাথে লজ্জাও, মনে হচ্ছে তাদের প্রতি কেন এই অন্যায় অসভ্য আচরণ? আমরা কি কোনদিন মানুষকে সম্মান করতে শিখবো না। হঠাৎ কানের কাছে ফিসফিস করে অপরূপ সেই হিজরাটা বলে উঠলো – “পাঁচটা টেহা দে তাড়াতাড়ি, না দিলে তোর কোলের উপরে বৈইয়া পরাম”, আমি এক গাল হেসে উত্তর দিলাম – পাঁচ টাকা কেন পাঁচশত টাকা দিচ্ছি তবে আমার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করতে হবে। আমার কথা শুনেই আসে পাশের যাত্রীরা আমার প্রতি সন্দেহের দৃষ্টি দিয়ে আরও নিরাপদ দূরত্বে চলে গেল। আমার সে দিকে ভ্রূক্ষেপ একে বারেই নেই, নিজেকে একজন বিজয়ী সৈনিকের মত মনে হচ্ছে, এর মাঝে ট্রেন চলতে শুরু করেছে, সুন্দরী সেই হিজরা যেন আর একটু গা ঘেঁষেই বসলো, মনে হচ্ছিলো এই প্রচণ্ড গরমের মাঝেও শরীরের উপর দিয়ে একটা ভালো লাগার হিমেল বাতাস বয়ে গেল। পাশের সিটের লোকটির আসার নাম গন্ধ পর্যন্ত নেই।
আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা বাংলাদেশে তো আপনি আমারই মত স্বাধীন দেশের নাগরিক, সরকার আপনাদের সব নাগরিক অধিকার দিয়েছে, এমন কি নিজেদের পরিচয়ে পাসপোর্ট পর্যন্ত বানাতে পারবেন, এ দেশে বেচে থাকার জন্যে আমার যেমন অধিকার আপনার তো একি অধিকার, তা ভিক্ষে না করে কাজ করে খাচ্ছেন না কেন? হিজরাটা আমার দিকে হা করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পাল্টা একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, – “আমিও তো আপনের মত আমার এই সঙ্গীরে বিয়া কইরা সংসার করবার চাই, আপনা-গো আইন কি আমারে একটা পালক বাচ্চা নিয়া মানুষ করবার দিবো? একটা বাড়ি বানাইয়া সব পরিবারের মত ঘর করবাম চাই, আপনাগো আইন কি আমারে বিয়া পরাইয়া দিবো? দেন দেন টেহাডা তাড়াতাড়ি দেন, খাজুইরা প্যাঁচালের টাইম নাই। আমি হিজরাটার হাতে একটি পাঁচশত টাকার নোট দিতেই সে তার সঙ্গীকে সাথে নিয়ে পরের স্টেশনে নেমে গেল, আমি অপলক দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবছি, মানুষ কেন এতো সুন্দর হয়।
আমাকে যেতে হবে অনেক দূর। ভালো লাগার মানুষটি আস্তে আস্তে দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেল, আমাকে যেতে হচ্ছে, যেতে হবে, পিছনে রেখে গেলাম আমার নিষিদ্ধ প্রেম. যা কিনা তাকে জানানো হলো না, আসলে সমাজ নিয়ম, রীতি, নীতি, রাষ্ট্র সব কিছুর মাঝে আজ আমি কত অসহায়, চোখের কোনায় একটু পানি জমতেই দুরের দৃশ্য ঝাপসা হয়ে এলো।
— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “নিষিদ্ধ ভালোবাসা ( পরান সখা বন্ধু হে আমার )

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

44 − = 41