জেনোসাইড, মাস কিলিং, কিছু স্মৃতি ও বিক্ষিপ্ত কিছু ভাবনা!



জেনোসাইড, মাস কিলিং, কিছু স্মৃতি ও বিক্ষিপ্ত কিছু ভাবনা!

১. প্রখ্যাত শিল্পী হাসেম খানের স্মুতিতে ১৯৪৭ সালে সংঘঠিত গ্রেটার নোয়াখালী কিলিং এর খন্ড চিত্র

“নোয়াখালীর কাছেই আমাদের বাড়ী। বয়েসটা কতই বা হবে তখন, ৪ কিংবা ৫ বছর, সময় ১৯৪২-১৯৪৪ সাল। দেখেছি হিন্দুবাড়ী গুলোতে লাগানো আগুনের কুন্ডলী পাঁকানো ধোঁয়ায় আকাশটাকে অন্ধকার করে ফেলতে। দেখেছি কত কত লাশ পড়ে থাকতে। আমাদের বাড়ীর পাশ দিয়ে নদী চলে গেছে, সে নদীতে ছোট বড় নৌকায় হিন্দু নারীরা, উদোম গায়ে পূরুষ, হাফ প্যান্ট পরা কিংবা ন্যাংটা শিশু সহ ভয়ার্ত কিছু মানুষ পালাতে। এর মধ্য থেকে আমাদের গাঁয়ের অনেকইকে দেখেছি নৌকার অসহায় মানুষগুলোকে আক্রমন করতে। আক্রান্ত মানুষ গুলোর সাথে অনেক শিশু ছিলো কারো কারো বয়েস সে সময়ে আমারই মতো হবে। আমি আমার কাকার হাত ধরে মাঝে মাঝে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে এসব বীভষ্মতা প্রত্যক্ষ করেছি। কেন এসব হচ্ছে কিছু বুঝতে না পারলে মনে মনে প্রশ্ন করেছি। উত্তর পাইনি। শিশু বয়েসে কাকাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম “কাকা এসব কেন হচ্ছে? তোমরা বাঁধা দিচ্ছো না কেন?” পরে অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমার কাকা বাঁধা দিয়েছেন। এসবেরই উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দু নিমূল করা।” ………কোট করা অংশটি কল্প কথা কিংবা বানানো ঘটনার অংশ বিশেষ নয়। প্রখ্যাত শিল্পী হাসেম খান জুলাই ২০১৩ইং মাসের কোন একদিন সকাল বেলায় এনটিভি’র স্বাক্ষাৎকার মূলক শোতে দেশ বিভক্তির পূর্বে সম্প্রদায়িক দাঙ্গার স্মৃতিচারণ মূলক ঘটনার যে মৌখিক বর্ণনায় দিয়েছিলেন, তা এনটিভিতে দেখেছিলাম এবং স্মৃতি থেকে সেই অনুকরনে লেখা।

২. শিশুর স্মৃতিতে মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি দিন
“দিন, তারিখ ও মাস ঠিক মনে নেই, তবে সময়টায় ছিলো গোলাগুলির ভয়ংকর আওয়াজে ভরা তপ্ত দুপুর। আমার ঠাকুরমা আমাকে তাঁর কাঁখে নিয়ে আমাদের বাড়ীর দক্ষিণ সীমানায় দাঁড়িয়ে দূরের পথের দিকে তাকিয়ে কার জন্য যেন অপেক্ষা করছিলেন মনে হলো। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম আমার বাবা গায়ে আকাশী রংয়ের খাদি কাপড়ের হাফ হাতা কোর্তা আর পরনের মাসলাইটের নীল রংয়ের লুঙ্গির নিচের কাঁছাটা বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুলে উল্টো করে ধরে প্রায় দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বাড়ীর দিকে ছুটে আসছেন। এতক্ষন পর বুঝতে পারলাম ঠাকুরমা তাঁর ছেলের জন্য উৎকণ্ঠা নিয়ে বাড়ী দক্ষিণ আঙ্গিনায় অপেক্ষা করছিলো। যে সময় ঠাকুরমা আমাকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, তার আগে থেকেই আমাদের বাড়ীর নিকটবর্তী দূরত্বের উত্তর দিকের কুমোর ও চাওর পাড়া (দূরত্ব প্রায় একমাইল হবে) থেকেই নানান ধরনের ভয়ংকর সব আঁওয়াজ থেকে থেমে আসছে। একই দিকের আকাশে কখনো কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়া আর আগুনের ফুলকি দেখা যাচ্ছে। বাবা বাড়িতে আসার পর কালবিলম্ব না করে সবাইকে নিয়ে প্রথমে বাড়ীর নিকটবর্তী বাগিচায় আশ্রয় নিলেন এবং এর কিছুক্ষন পর সকল মহিলারা আমাকে নিয়ে বাগিচা সংলগ্ন ও আমাদের বাড়ীর উত্তর দিকের প্রতিবেশী ভূঁইয়া বাড়ীর থাকার ঘরের পেছনের গোয়াল ঘরে আশ্রয় নিলো। এ বাড়ীর ভুঁইয়া পরিবারের সকল মানুষ আগে থেকেই আমাদের বাড়ীর মানুষ বিদ্বেষী ছিলো। তথাপি মা, ঠাকুমা প্রাণের তাগিয়ে আমাকে নিয়ে এবাড়ীর গোছালায় আশ্রয় নিলে ঐবাড়ী বয়োজৈষ্ঠ্যদের কোন একজন তেড়ে এসে গো-ছালা থেকে আমাদের সবাইকে তাড়িয়ে দিলো। ঐ অসহায় পরিস্থিতিতে ভূঁইয়া বাড়ীর আরেক পরিবারে মিঞার বৌ (অপেক্ষাকৃত গরীব ও দূর্বল পরিবার) আমার মা, ঠাকুর মা, অবিবাহিতা পিসিদের – সবাইকে তাঁদের থাকার ঘরে আশ্রয় দিয়ে আল্লা আল্লা করতে উপদেশ দিলেন। ঘরের ভিতরে হিন্দু মহিলা ও শিশু অবস্থান করছে এটা যেন বুঝতে না পারে এজন্যে ঘরের ভেতর দিকে মুলিবাঁশের বেড়ার সাথে শাড়ি কাপড় টাঙ্গিয়ে দিলেন। আমরা যে বাড়িতে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় করছিলাম, পর্যায়ক্রমে এবাড়ীর উত্তর দিক, পরে পশ্চিম দিক আর সবশেষে দক্ষিণ পূর্ব কোনে ভীষন আওয়াজ, আর ধোঁয়া ও অগ্নি শিখা অনেকক্ষন ধরে জ্বলতে থাকল। এভাবে অনেক সময় পার হবার পর আওয়াজ আস্তে আস্তে কমে একসময়ে এক্কেবারে নিরব হয়ে গেলা। অন্যদিকে সূর্য্য দেবতাও পাঠে বসে গেছে। সন্ধ্যা হলো হলো সময়ে মিঞার বৌ ঘরে ঢুকে আমার মা, ঠাকুরমাকে আশ্বস্ত করে জানিয়ে বললো “বিপদ কেঁটে গেছে, তোমরা তোমাদের বাড়ী যেতে পারো”। পাঞ্জাবিরা আমাদের বাড়ীর দিকে না এসে উত্তর দিকের কুমোর ও চাওর বাড়ী, পূর্ব দিকের তেলিবাড়ী আর এবং দক্ষিণ পূর্ব দিকের সাহা পাড়ার হিন্দু বাড়ী গুলোতে আগুন লাগিয়ে শেষে তাদের ক্যাম্পে ফিরে গেছে।

এরপর দেশ স্বাধীন হলে ঠাকুর মায়ের আঁচল ধরে আমি আমাদের বাড়ীর তিন দিকের ঐসব বাড়ীগুলি ঘুরে বেড়িয়েছি। বলাবাহুল্য আমাদের বাড়ীর নিকটবর্তী ও নিকট দূরত্বের এসব হিন্দুবাড়ী কিংবা পাড়ার দূরত্ব আধা মাইল থেকে একমাইলের কিছু বেশী হবে। আমার দেখা ক্ষতিগ্রস্হ এসব হিন্দুবাড়ী ব্যতীত হিন্দুদের প্রতিবেশী কোন মুসলিম বাড়ীর ধ্বংস যজ্ঞ চোখে পড়েনি। আমাদের বাড়ীর চারপাশে এক মাইল সীমার মধ্যে কোন হিন্দুবাড়ী অস্থিত্ব ১৯৭১ এর আগের ছিল না এবং ’৭১ সালেও ছিল না। একারণে পাকিরা আমাদের বাড়ী অবস্থান সঠিক ভাবে নির্নয় করতে পারেনি কিংবা একটি মাত্র হিন্দুবাড়ীতে আসতে সময় পায়নি। পুরো আশি দশক জুড়ে যখন আস্তে আস্তে স্কুলের ক্লাসগুলো এক এক করে অতিক্রম করছিলাম ঠিক ঐ সময়ে কোন কারণ ছাড়াই ঠাকুরমার শাড়ীর আঁচল ধরে ক্ষতিগ্রস্থ নিকট দূরত্বের সকল বাড়ীর প্রায় সব ক’টিতে আমার যাওয়া হয়েছে। চোখে পড়েছে একাত্তরের ক্ষয় ক্ষতির চিহৃগুলি, আর শিশু মনে শুধু বারংবার প্রশ্ন এসেছিল পাকিরা একতরফা কেনইবা বেছে বেছে শুধুমাত্র হিন্দু বাড়ীগুলো পোঁড়ালো? কিন্তু ঐ সময় উত্তর পাননি।

৩. একটি অবুঝ শিশুর স্মৃতিতে ২০১৩ সালের মাওলানা দেলোয়ার সোহেন সাঈদীর রায় ঘোষনার দিন=
আট বছরের ‘অক্ষর’ বয়স মাত্র বছর চারেক হবে। স্কুলের পে গ্রুপে আসা যাওয়া করছে । অক্ষর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্লে গ্রুপের ছাত্র। কিন্তু ইতোমধ্যে ওর মধ্যে স্কুলে না যাবার জেদটা বেশী কাজ করছে। স্কুলে যেতে কেন অনাগ্রহ – কারণ চার বছরের অক্ষর থেকে সহজে পাওয়া না। অক্ষর এককথায় বলে স্কুলে নাকি তার বাললাগেনা। অক্ষরের মা স্কুলের হেড মাষ্টারের সাথে দেখা করে জেনে নিয়েছেন যে, স্কুলের মেম/মাস্টারটা অক্ষরের গায়ে হাত তোলাতো দূরের কথা, কখনো ধমকও দেয়নি। তথাপি কেন সে স্কুলে যেতে চায় না। অক্ষরের অনাগ্রহের কারণ তা মা বুঝতে পারে না। অক্ষরের কাছে এবিষয়ে বারংবার জানতে চাইলে একসময় সে জানায় ক্লাসে তাঁর কোন বন্ধু নেই এবং ক্লাসের অন্যান্যরা তাকে হিন্দু বলে খেপায়। ক্লাসের অন্যান্যদের মধ্যে একে অন্যকে অক্ষরের বন্ধু হতে কিংবা মেলামেশা করতে বারণ করে। অক্ষর তার ক্লাসমেটদের পরস্পরের কথাবার্তা থেকে জেনেছে অক্ষর ‘হিন্দু’ এবং হিন্দুদের সাথে নাকি মেলা মেশা করা গুনাহ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু অক্ষর বুঝতে পারে না ‘হিন্দু’ কি ও তার বন্ধুরাই বা কি? তার কাছে সবাইকে দেখতে সমান মনে হয়েছে। এখন স্কুলে এসে জেনেছে সে একজন হিন্দু এবং ক্লাসে সে একা। একারণেই অক্ষরের স্কুলে যেতে তার মন চায় না। সে তার বাবা মা ও ঘরের মানুষদের কাছে শিখেছে মানুষ হলো দু’রকমের (এক) ভাল মানুষ ও (দুই) মন্দ মানুষ। অথচ মাত্র অল্প ক’দিন স্কুলে গিয়ে অক্ষর বুঝতে পেরেছে মানুষ আছে (১) মুসুলমান ও (২) হিন্দু এ দু’ প্রকার। অক্ষর তার সহ শিক্ষার্থীদের পারস্পারিক আলাপ শুনেছে, ওরা বলাবলি করছিল যে “হিন্দু” নামের মানুষগুলো ভালো না, পঁচা এবং অক্ষর সেই পঁচা হিন্দু পরিবারেরই একজন।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী মাওলানা সাঈদীর রায় হল। সেদিন পড়ন্ত বিকেলে অক্ষর নিজেরদের উঠোনে আপন মনে খেলা করছিল। হঠাৎ সে দেখতে পেল তাদের বাড়ীর নিকটতম দূরত্বে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে সমস্বরে চিৎকার দিচ্ছে । থেমে থেমে শব্দ আসছে – “আল্লাহু আকবর”, “নারায়ে তকবীর”, “আম-বাম-রাম ধর, ধরে ধরে জবাই কর” ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব শব্দ জোরালো থেকে আরো জোরালো হচ্ছে। উৎসুখ হয়ে বাড়ীর আঙ্গিনার বাইরে গিয়ে স্লোগান আর জড়ো হওয়া মারমুখো লোকগুলোর দিকে এগুতে চাইলে অক্ষরের ছোট কাকু এসে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে অক্ষরকে কোলে তুলে উল্টো দিকে দৌঁড়াতে থাকলো। অক্ষর দেখলো তাকে কোলে তুলে শুধু তার ছোট কাকা একা দৌড়াচেছ না, ওদের বাড়ীর অন্যান্য ঘরের মানুষগুলো একইভাবে যে যার মতো বাড়ী থেকে দৌঁড়ে পালাচ্ছে । ইতোমধ্যে আওয়াজ আরো মুখর হয়েছে এবং অসহিষ্ঞু মানুষের দল অক্ষরদের বাড়ীতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এদের কেহ কেহ বাড়ীর প্রতি ঘরে ঢুকে কিছু কিছু জিনিস যে যার মতো তুলে চলে যাচ্ছে, কেহবা বাড়ীর ঘরের বেড়া, দরজা ভাংচুর করছে, কেহবা বাড়ী আঙ্গিনায় খড়ের গাঁদা, থাকার ঘর, রসুইঘর, গরুঘরে ব্যস্ত হয়ে আগুন লাগাচেছ। মুহুর্তের মধ্যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। বাড়ীর কোন কিছুই রক্ষা পেল না। সবই জ্বলতে থাকল। অতি অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের বাড়ীর উপর ঘটে যাওয়া এধরনের বীভষ্মতা দেখে অক্ষর ভয়ে কুকড়ে পড়ল এবং কাকুর বুকে মুখ লুকিয়ে লেপটে রইল। এভাবে ঘন্টা খানেক কাটার পর অসহিষ্ঞু মানুষ গুলো যখন অক্ষরদের বাড়ী ও পরে এলাকা ছাড়ল, তখন বাড়ীর পালিয়ে থাকা সদস্যরা সবাই বাড়ীতে ফিরলো এবং যে যার ঘরের আগুন নেবাতে লাগল। অক্ষরও তার কাকুর সাথে বাড়ী এসে ছোট হাতে কাকুর সাথে ঘরের আগুন নেবাতে নেমে পড়ল। অবশ্য ইতোমধ্যে যা হবার তা হয়ে গেছে, আগুনে পুড়ে সবই ছারখার হয়ে গেছে। ঐদিন রাত্রে বাড়ী সবাই পোড়া বাড়ীর উদোম উঠোনে রাত কাটাতে হয়েছে। অক্ষর খেয়াল করেছে, অসহিষ্ঞু অচেনা মানুষ গুলো এএলাকার চেনা পরিচিত কেহ ছিল না, তবে এরা শুধু অক্ষরদের বাড়ীসহ কয়েকটি হিন্দু বাড়ীতেই আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে, স্কুলে সহপাঠীদের কাছে নতুনভাবে ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত কোন মুসুলমান সহপাঠীদের বাড়ীতে আগুন লাগানো হয়নি।

৪. তিনটি পৃথক সময়ে তিনজন শিশু মনে তিনটি আলাদা ঘটনার প্রভাব সম্পর্কীত পয্যালোচনাঃ
উপরের তিনটি অংশ সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা তিনটি পৃথক সময়ের ঘটে যাওয়া ঘটনা সমূহের অতি ক্ষুদ্র চিত্র মাত্র। প্রথমতঃ (=১=) প্রখ্যাত শিল্পী হাসেম খানের শিশু বেলার স্মৃতিচারন করেছেন ১৯৪২-৪৫ এর সময় কালের। দ্বিতীয়তঃ (=২=) লেখকের নিজস্ব স্মৃতিচারনের অংশ ছিলো এবং সময়কাল ১৯৭১ এর প্রেক্ষাপট। পরিশেষে(=৩=) ২০১২-১৩ সালে অক্ষর নামের একটি শিশুর অভিজ্ঞতা, যেটা অতি সম্প্রতি সময় কাল অর্থাৎ বিগত বছরের আঠাশে ফ্রেরুয়ারী ২০১৩ সালের এক বিকেলে কোন একটি এলাকায় সংঘঠিত হয়েছে – এমন ঘটনার চিত্রকল্প। তিনটি ঘটনার অংশবিশেষ সম্পূর্ণ আলাদা ও ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটের। তবে এগুলির মিল একটা জায়গায় এবং সেটা হলো সহিংসতা সংঘঠিত হয়েছে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এবং সেটা সংখ্যালঘু হিন্দুদের বিরুদ্ধে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, কিন্তু প্রায় একই বয়েসী তিনটি শিশু মনে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এবং ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা, তবে ফলাফল ও তিন সময়ের তিনটি শিশু মনে রকম প্রতিক্রিয়া ছিলএকই। আর আর তাহলো শিশু মনে একটি প্রশ্ন “শুধু হিন্দুদের বিরুদ্ধে কেন?”

শিল্পী হাসেম খানের শিশু বেলায় সময়টা ছিলো দ্বিজাতি তত্বের প্রয়োগের মাধ্যমে নিরীহ হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিম, আবার উপমহাদেশের কোন কোন অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের উস্কে দিয়ে দ্বিজাতি তত্বের যৌক্তিকতা প্রমানের প্রাণান্ত চেষ্টা করার শ্রেষ্ট সময়। এক্ষেত্রে দ্বিজাতি তত্বের প্রনেতারা সফল হয়েছে এবং ফলাফল হিসাবে ভারত ও পাকিস্হানের জন্ম। এদেশের মানুষ ইংরেজদের কাছ থেকে দেশটা উদ্ধার করেছে, তবে অখন্ড ভারতবর্ষকে শুধুই ধর্মের ভিত্তিতে দু’টি খন্ডে বিভক্ত করে সম্পূর্ণ দুটি দেশ উপহার দিয়েছে সেই দ্বিজাতিতত্ব। কিন্তু একাত্তর এবং মুক্তিযুদ্ধ? এটি ছিলো দ্বিজাতিতত্বের ধারনার সম্পূর্ণ বিপরীতে শক্তিশালী বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার একটি আদর্শিক লড়াই। যেখানে গনমানুষের ধর্ম নয়, বর্ণ নয়, শুধু সংস্কৃতির ভিত্তিতে এমন একটি দেশ প্রতিষ্ঠা পাবে যেখানে প্রতিটি মানুষ যে যার মত ধর্মাচারন করবে, আর রাষ্ট্র সবার জন্য সমানাধিকারের ব্যবস্থা করবে। কেহ কাউকে হিংসা বা ঘৃনা করবে না। এজন্যই মুক্তিযুদ্ধ আর এযুদ্ধে বাঙ্গালীদের মূল্য দিতে হয়েছে, তবে বরাবরের মতো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হিন্দুদেরকে খুব বেশী মূল্য দিতে হয়েছিলো। কমবেশী সবার জানা আছে যে, পাকিস্তানি ও তাদের এদেশীয় রাজাকারদের ধারনা আর বিশ্বাস যাই বলা হোক না কেন, তাদের বদ্ধমূল ধারনা ছিলা পেয়ারে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হতে চাওয়া কোন মোমেন মোসলেম এর চাওয়া নয়, কোন খাঁটি মোমেন মোসলেম পাকিস্তানি কখনোই পাকিস্তান ভাঙ্গুক – এটা চাইতে পারেনা। এটি শুধু ভারতীয় দালাল হিন্দুদের অযৌক্তিক দাবী মাত্র। সুতরাং এদের খতম করতে পারলে পেয়ারে পাকিস্তান রক্ষা করা যাবে। এজন্যই পাকিস্তানি সৈন্যরা যেখানেই সার্চ করেছে, সেখানেই ক’টি শব্দ উচ্চারণ করেছে, আর তা’ছিল – “মুক্তি কাঁহা, “মালাউন কাঁহা”? পাকিদের কাছে মুক্তি মানে মালাউন, আর মালাউন মানেই মুক্তি। পেয়ারে পাকিস্তান শুধু মালাউন নিধন করতে পারলে পবিত্র পাকিস্তান রক্ষা হবে। একারণেই মহান মুক্তিযুদ্ধে সময়ে এদেশের গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র ১০০% হিন্দু পরিবার কোন না কোন ভাবে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল।

সংখ্যালঘু হিন্দু কর্তৃক স্বাধীন বাংলাদেশে পৃথক পৃথক সময় ও পৃথক পৃথক রাজনৈতিক দলের শাসনের স্বাদ আশ্বাদন
ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্র নয়, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাঙ্গালী জাতিসত্বাকে প্রাধান্য দিয়ে দেশ নতুন একটি দেশ গড়বো এপ্রত্যয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী অসামান্য ক্ষয়ক্ষতির পরও বহু আশা নিয়ে এদেশে রয়ে যাওয়া হিন্দু ও ভারতের শরনার্থী শিবির ফেরত হিন্দুরা নিজ বাস্তুভিটায় ফেরত এসে নতুন আশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলো। ১৯৭৫ এর বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অসম্প্রাদিক রাষ্ট্র চিন্তার পরিবর্তে ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণার বাস্তবায়নের ধাবমান যাত্রার গতি পাবার ফলেই পর্যায়ক্রমে ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১-২০০৪, এবং ২০১২-১৩ একতরফা সহিংসতা এদেশের হিন্দু তথা সংখ্যালঘুরা সহ্য করতে হয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর অগনিত মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময় যেখানে বেশীর ভাগই হিন্দুর সহায় সম্পদ ও মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে নতুন একটি নাম ও মানচিত্র পেলেও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন আজও সম্ভব নয় নাই। বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক দলগুলি একাত্তরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ভুলে গিয়ে শুধু ক্ষমতার লোভে ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করে ক্ষান্ত হয় নাই, বরং সর্বস্তরে এর প্রয়োগ করে চলেছে এবং কোন রাজনৈতিক দল কতটা মুসলিম ও ইসলাম বান্ধব সে প্রতিযোগিতা চলছে। এরফলে ধর্মীয় পরিচয়ের ভ্তিত্তিতে সমাজে ঘৃণার জন্ম দিচ্ছে এবং সে ঘৃনা জঙ্গীবাদ রুপে প্রকাশিত হচ্ছে। মূলতঃ একারণে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক দল ও ব্যক্তিত্ব পাওয়া ভার। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বাঙ্গালী জাতিসত্বার ভিত্তিতে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হওয়া ও শেষে রক্তস্নাত স্বাধীনতা পাওয়া পর বিগত কয়েকটি দশক সমাজের সর্বস্তরে বৈষম্য আর অনাচার ও অত্যাচরের বলি হয়েছে সত্যিকারের বাঙ্গালীরা এবং ধর্মীয় পরিচয়রে ভিত্তিতে দেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরা।

গনহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে সংঘঠিত অপরাধ ও ট্রাইব্যুনালের রায়
ইংরেজী “জেনোসাইড” শব্দটি বাংলায় “গণহত্যা” বলে জানতাম বহুদিন ধরে। বর্তমান সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবার পর নানা ভাবে জানতে পারলাম “জেনোসাইড” ও “গণহত্যা” শব্দ দুটির অর্থগত পার্থক্য অনেক। বাংলা গণহত্যার ইংরেজী শব্দ পরিভাষা হলো “Mass Killing” যার মানে ধর্ম বর্ণ আবাল বৃদ্ধা বনিতা বাচ বিচার না করে হত্যা করার মতো অপরাধ সংঘঠন করাকে বুঝায়। অন্য দিকে ইংরেজী শব্দ “Genocide” এর সংজ্ঞা হলো “ধর্ম, গাত্রবর্ণ বা অন্যকোন পরিচয়ে পরিচিতি বিশেষ কোন জাতি গোষ্ঠিকে চিহ্নিত করে নির্মূল, নিচিহৃ করার উদ্দেশ্যে সংঘঠিত যে অপরাধ তাকে বুঝায়, যা এদেশে বর্তমানের প্রচলিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুন্যালের এতদ্ সংক্রান্ত— শদ্ধের ব্যাখায় বলা হয়েছে। “Mass Killing” ও “Genocide” এ দুটি শব্দের ব্যাখার দিকে তাকালে পরিস্কার বোঝা ১৯৪৭ পূর্ব সময়ে এদেশে শুধু ধর্মের ভিত্তিতে এদেশে হিন্দু শূণ্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য রাজনৈতিক সহযোগীতায় সামাজিক ভাবে “Genocide” সংঘঠিত হয়েছিলো । কিন্তু একাত্তর? বাংলাদেশের স্বাধীনতা তো শুধু এদেশের হিন্দুরা এককভাবে চায়নি। অতি নগন্য সংখ্যক পাকিস্তান প্রেমী দূরাত্মা ছাড়া ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ স্বাধীনতা চেয়েছিল। তথাপি ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহর থেকে যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত “Mass Killing” পাশাপাশি বাছাই করে হিন্দু নিধন পর্ব তথা “Genocide” ভয়ংকর ভাবে সংঘঠিত হয়েছিলো। সুতরাং ১৯৭১ সালের আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিরা যত না যুদ্ধ জয় করার জন্য ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আবাল বৃদ্ধা বনিতা নর নারী হত্যা করা হয়েছে, তার চেয়েও বহুগুন বেশী মানুষ হত্যা করা হয়েছে হিন্দু মুক্ত করে ধর্মের ভিত্তিতে জন্ম নেয়া পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে। স্বাধীনতার পর বিগত প্রায় চার দশক দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সব ক’টি রাজনৈতিক দল কখনো পরোক্ষ কিংবা কখনো প্রত্যক্ষ ভাবে ১৯৭১ এর হিন্দুদের বিরুদ্ধে জেনোসাইডকে অস্বীকার করেছে। এর ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে এ প্রজম্নের তরুনেরা স্বাধীতার সময়কার এদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের ক্ষয় ক্ষতির বিষয়ে অশুধু অন্ধকারে রয়ে যায়নি, বরং নতুন প্রজম্নের তরুনা বিশ্বাসই করতে চায় না যে একাত্তরে হিন্দুদের ক্ষতির পরিমান ১০০% ভাগ। এদের মধ্যে মানুষ হারিয়েছে, কেহ সম্পদ হারিয়ে, কোন পরিবারের মা-বোনদের সম্ভ্রম হারিয়েছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলি এধরনের ফলাফল পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে জানানো কিংবা গণমাধ্যমে প্রচারনায় উদাসীন ছিলো এবং থেকেছে স্বাধীনতার পর দশকের পর দশক। এটি সম্পূর্ণ সচেতন ভাবে রাজনৈতিক কারনে করা হয়েছে বললে খুববেশী ভুল বলা হবে বলে মনে হয় না। একারণেই মূলতঃ স্বাধীনতার এতবছর পরও আমাদের দেশে পাকিস্তান প্রীতি মানুষের সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে।

যত বির্তক থাকুক, আর যেকারণেই হোক, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুন্যাল গঠিত হবার পর অন্ততঃ জেনোসাইড শব্দের ব্যাখার মাধ্যমে ১৯৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের হিন্দুদের অবধানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরোক্ষভাবে হলেও স্বীকৃত মিলেছে বলা চলে। ১৯৭১ সালে ধর্মের ভিত্তিতে চিহ্নিত করে এদেশে একটি গোষ্ঠি তথা হিন্দু নিমূর্ল করার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘঠিত হয়েছিলো এটি সেকথাই স্মরন করিয়ে দেয় এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ঘোষিত রায়ে বর্ণিত বিবরণ। অন্ততঃ সেটি প্রতীয়মান হয়েছে কয়েকটি রায়ে। যেমনঃ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় ঘোষিত হয়েছিল ছিল বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে। ট্রাইবুন্যাল শুরু এবং রায়টি মিড়িয়া আসার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ মানুষ এই লোকটিকে এনটিভির বদৌলতে জানত একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে। অথচ ট্রাইবুন্যাল এলোকটির বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগের মধ্যে যে ক’টি প্রমানিত সত্য বলে বিচারক আমলে নিয়েছেন, ঐগুলোর প্রায় সব ক’টি ছিলো হিন্দু নির্যাতন ও নির্মূল করার অভিযোগ অর্থাৎ মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ “Genocide”। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের আমলে প্রতিষ্ঠিত ট্রাইবুন্যালে বিচার হচ্ছে অথচ দূঃখের বিষয় এই যে, বর্তমান সময়েও রাষ্ট্রীয় প্রচার যন্ত্রে ১৯৭১ সালের জেনোসাইটটিকে শুধুমাত্র “গণহত্যা” হিসেবে তুলে ধরা আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে। এদেশের মুক্তিযুদ্ধ হিন্দু নির্মূল করার যুদ্ধ বা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ ছিল একথা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে খোদ আওয়ামীলীগের স্থানীয় ও মাঝারী পর্যায়ের নেতারাও কুন্ঠাবোধ করেন। অথচ সেই আওয়ামীলীগ সরকারের আমলেই মাননীয় আদালত বাচ্চু রাজাকার ও অন্যান্য জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে বিচারের রায় প্রদান কালে হিন্দু নির্যাতন তথা জেনোসাইডের জন্য আসামীদের দোষী সাব্যস্ত করেছেন।

এরশাদ, খালেদা ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘঠিত ঘটনা সংক্ষিত বিবরণ

১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১-২০০৬, কিংবা ২০১২, ২০১৩ কিংবা ২০১৪ সালের জানুয়ারী নির্বাচন পর সময়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দেখা যায় এদেশের হিন্দুদের বাড়ীঘর, মন্দির, হিন্দু মেয়ে অপহরন, আক্রমন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলেও যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে ঐসকল দল হিন্দু তথা সংখ্যালঘু নির্যাতনের মত অপরাধ গুলি দমন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এর মানে হলো ক্ষমতাসীন দল গুলো এধরনের অপরাধ গুলিকে কখনো কখনো প্রত্যেক্ষ আবার কখনো কখনো পরোক্ষভাবে সমর্থন করে। বিশেষতঃ ১৯৯০, ১৯৯২, ও ২০০১ সালের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা দল তথা সরকারগুলিকে এধরনের অপরাধের জন্য দায়ী করা যায়। ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী দল গুলিও সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিপক্ষে জোরালো বক্তব্য দিতে সংসদের বাইরে কিংবা ভেতরে দেখা যায়নি। ১৯৭১ সালের বাচ্চু রাজাকার, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে যে ধরনের অপরাধ করেছিল, স্বাধীনতা পরবর্তী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১-০৪, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে সংঘঠিত অপরাধ গুলির অধিকাংশের ধরন এর চাইতে কম ভয়াবহ ছিলো বলে মনে করার কোন কারণ নেই। যেমন ২০০১ সালে মায়ের সামনে কিশোরী পূর্ণিমাকে গণধর্ষণ, ভোলা সহ সারা অসংখ্যা ধর্ষণ. হিন্দু মন্দির ও স্থাপনায় লুটপাঠ ও অগ্নি সংযোগ, কিংবা ২০১২ সালের সাতক্ষীরা, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, রামু, উখিয়া, মীরেরশ্বরাই, ২০১৩ সালের ২৮শে ফ্রেরুয়ারীর সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষিত হবার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে নোয়াখালীর দত্তের হাট, মাইজদী, রামগঞ্জ, সাতকানিয়া, লোহাগড়া র্ধ্বংষাত্বক ঘটনা গুলি উল্লেখ করার মতো। এসব ঘটনা এদেশ থেকে হিন্দু শূণ্য করার চিন্তা নিয়ে ঘটনানো হয়েছে এটা জোর দিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এ সকল ঘটনা কোন কোনটাতো ১৯৭১ সালের চাইতেও জঘন্য ছিলো বলে এগুলোও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ তথা জেনোসাইড হিসেবে বিবেচনা না করার কোন কারণ থাকতে পারে না।

অসংখ্য ক্ষত বিক্ষত মনোজাগতিক চিন্তার মাঝেও এদেশের অসম্প্রদায়িক চেতনাধারী মানুষদের জন্য কিছুটা শান্তনার জায়গা হলো, যখন দেখে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এদেশে “Mass Killing” ও “Genocide” এর দায়ে অভিযুদ্ধদের ট্রাইবুন্যাল বিচার হচ্ছে। অনেকের রায় দেয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের রায় ঘোষিত হবার পর রায়ের বিপক্ষে কিছু কিছু মানুষ অসন্তুষ্ঠ হলেও এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ উল্লাসিত হয়েছেন একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসকল মানুষরা মনে করে এধরনের বিচার যেভাবে করা হউক না কেন, এগুলি একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। এসব ট্রাইব্যুনালের রায় গুলির মাধ্যমে আরো একটি সত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হল যে, অপরাধ যত পুরোনো হোক, আর অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, অপরাধীকে একদিন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। অন্ততঃ বাংলাদেশে ট্রাইবুন্যাল সেটি প্রমান করেছে। কেননা আজ যারা আসামীর কাঠ গড়ায় আছেন, এদের অনেকই ক্ষমতার সর্বোচ্চ বেদী মূলে ছিলো এবং এরা কেহই দূর্বল অবস্থার মধ্যে ছিলেন না। সুতরাং এ ধরনের যুগান্তকারী রায় ও বিচার ব্যবস্থা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং এটি প্রচার করলে দেশের মঙ্গল বৈ ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না।

উপসংহারঃ
দেশের সকল সুনাগরিকের মত আমারো চাওয়া, বর্তমান ট্রাইবুন্যাল তাদের কার্যক্রম অতিদ্রুত শেষ করার পাশাপাশি বর্তমান সরকার এ ট্রাইবুন্যালকে অস্থায়ী ভিত্তিতে না রেখে আইন সংস্কারের মাধ্যমে এটিকে চিরস্থায়ী রূপ দেবেন যাতে অদূর ভবিষ্যতে ১৯৭১ পরবর্তী আজ অবধি হিন্দুদের বিরুদ্ধে সংঘঠিত অপরাধ গুলির তদন্ত ও বিচার করা যেতে পারে। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, এ ট্রাইবুন্যাল যদি বর্তমান অবস্থায় না রেখে এটিকে সংবিধানিক ভাবে চিরস্থায়ী রূপ দেয়া যায়, এবং ট্রাইবুন্যালে যদি ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১-২০০৪ ও ২০১২-২০১৩ সালের ঘটনা গুলির মধ্যে অতি অল্প সংখ্যক ঘটনার যদি এ ট্রাইবুন্যালের আওয়তায় এনে বিচার করা যায়, তাহলে এদেশে ভবিষ্যতে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটন রোধ কল্পে ব্যাপক ভূমিকা রাখার পাশাপাশি এদেশের বিচার ব্যবস্থা বহির্বিশ্বে প্রসংশিত হবে। নচেৎ এদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতণের ঘটনা ধারাবাহিক ভাবে চলার পাশাপাশি ইতিহাসেরই পুনরাবৃতি ঘটতে থাকবে। অর্থাৎ যে দল গুলি ক্ষমতা থাকাকালীন এ ধরনের অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে কিংবা হচ্ছে একদিন তাদেরকেও বিচারের মুখোমুখি দঁড়াতে হবে। যেমন স্বাধীনতার ৪২ বছর পর ’৭১ এ মানবতা বিরোধী অপবাধের যেমন বিচার হচ্ছে, ঠিক তেমনি ভবিষ্যতে একদিন ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১-২০০৪ ও ২০১২-২০১৩ ও তার পরেও সালের ঘটনার দায়ীদের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো কোন কাকতালীয় ঘটনা হবে না।

——

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

46 + = 47