অন্ধজাতি! ইতিহাসে বাঙ্গালীর বধিরতার।

বাংলাদেশের মানুষ মাত্র ৪০/৪২ বছরের ইতিহাসটাই ঠিক জানে না। স্বাধীনতার পর ১৯৯০-৯১ এর ঘনঘটা ইতিহাসটাই বেমালুম ভুলে গেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ এর পূর্বের ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ধারাবাহিক ইতিহাসতো দূরের কথা। আরো দূরের কথা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, দ্বি-জাতিতত্ব কিংবা দেশ বিভাগের ইতিহাস। ইতিহাসের বিশ্লেষনতো দূরের কথা – গল্পের মতো ইতিহাসের ধারাবাহিক জ্ঞানও আজকের বিভিন্ন বয়েসীদের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না।



অন্ধজাতি! অন্ধজাতি! ইতিহাসে বাঙ্গালীর বধিরতার।
ভবিষ্যতের প্রয়োজনে প্রতিটি মানুষের উচিত ইতিহাসের পাঠ নেয়ার। তবে ইতিহাসের সে পাঠ অবশ্যই তথ্য নির্ভর সঠিক হওয়া উচিত। যতি তা না হয়, তাহলে মিথ্যা ও ভুল বাল ইতিহাস থেকে মানুষ ভুল ধারণা অর্জন করবে এবং মিথ্যাচার শিখবে এবং একসময় জাতি বধির হবে। আশাকরি অনেকেই এ বিষয়ে একমত হতে পারেন। হয়তঃ অনেকই আরো একমত হতে পারেন যে, বাংলাদেশের মানুষ মাত্র ৪০/৪২ বছরের ইতিহাসটাই ঠিক জানে না। স্বাধীনতার পর ১৯৯০-৯১ এর ঘনঘটা ইতিহাসটাই বেমালুম ভুলে গেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ এর পূর্বের ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ধারাবাহিক ইতিহাসতো দূরের কথা। আরো দূরের কথা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, দ্বি-জাতিতত্ব কিংবা দেশ বিভাগের ইতিহাস। ইতিহাসের বিশ্লেষনতো দূরের কথা – গল্পের মতো ইতিহাসের ধারাবাহিক জ্ঞানও আজকের বিভিন্ন বয়েসীদের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না।


বাংলাদেশের সামাজিক অবস্হা দেখে ধারনা করা যায় বাঙ্গালী জাতি তার ভুল বাল ইতিহাস নিয়ে বধির হয়ে আছে। এটি হঠাৎ করে এমনি এমনি তৈরী হয়নি, বরং এটি একটি গোষ্ঠি কর্তৃক অত্যন্ত সচেতনভাবে তৈরী করা হয়েছে। যা শুরু করা হয়েছিল অখন্ড ভারতকে ভাগ করার উদ্দেশ্যে দ্বিজাতিতত্বের সূচনা লগ্ন থেকে। যদিও এটি বৃটিশ পরবতী পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্হায় ইতিহাসের ভুলবাল পাঠ্য শুরু করেছিল, দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে স্বাধীনতা পরবতী বাংলাদেশের প্রায় সব ক’টি সরকার পাকিস্হানীদের সেই ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে এবং অব্যাহত রাখছে। যাকে এক কথায় বলা যায় ইতিহাস বিকৃতির অব্যাহত ধারা। জ্ঞান পিপাসু শিক্ষাথীদের কাছে ইতিহাসের সত্যিকারের ঘটনা উপস্হাপন না করে আংশিক পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন করে উপস্হাপন করাটাই হলো ইতিহাস বিকৃতি। এর ফলে প্রকৃত ঘটনা হারিয়ে যায় এবং প্রকৃত ইতিহাসের নতুন অবয়ব প্রকাশিত হয়। শিক্ষার্থীরা বিকৃত সেই ইতিহাস পড়ে বিকৃত চিন্তা ধারন করে বিধায় আজ দেশের সকল কর্মক্ষেত্র ও মানুষের সামাজিক জীবনের সকল স্তরে এর প্রতিফলন চোখে পড়ে।

নিচে অতি সংক্ষেপে কয়েকটি উদাহরন তুলে ধরা হ’ল।
০১) উপমহাদেশের মধ্যযুগের ইতিহাস পড়ার সময় একটু খেয়াল করলে দেখা যায় ক্ষুদ্র পরগনার মালিক থেকে মুসলিম রাজা বাদশাদের কিভাবে মহান করে উপস্হাপন করা হয়েছে। মধ্যযুগের ইতিহাসে উপমহাদেশের বড় কিংবা ছোট যত কৃর্তিমান ও জনকল্যান মূলক স্হাপনা চোখে পড়ে, সেসব স্হাপনা গুলোর নামের সাথে হিন্দু রাজা মহারাজাদের নাম জড়িত। অথচ ইতিহহাসের পাঠ্য বইয়ে এসব হিন্দু রাজা মহারাজাদের নাম খুঁজে পাওয়া ভার। যদ সামান্য পাওয়া যাবে, তাও তাদেরকে সুশাসক হিসেবে উপস্হাপন করা হয়নি। অথচ ইতিহাসের পাঠ্য বইয়ে সুলতান মাহমুদ ঘোরীর মত দস্যুম যে কিনা ১৭ বার এ বাংলায় আক্রমন করে লুটতরাজ করেছে, বিধর্মীদের জোর করে ধর্মান্তর, দাস হিসেবে বিক্রি, নারীত্বের অববমনাননা ও সম্পদ লুন্ঠন করেছে – তাকে বীর হিসাবে উপস্হাপন করা হযেছে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিকট একজন দুস্যুকে বীর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং ফলে বিগত দশকের পর দশক শিক্ষার্থীরা মাহমুদ ঘোরীকে দস্যু হিসাবে নয়, মুসলীম বীর হিসাবে জানে। কিন্তু যা বুঝতে পারে না, তা হলে সেই শিক্ষার্থীর পূর্বপূরুষদের কেহ না কেহ এই দস্যুর হাতে নিগৃহিত হতে হয়েছিল।

০২) ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজুদ্ধৌলা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়। বাংলার ইতিহাসে নবাব সিরাজুদ্ধৌলাকে দেশদেশ প্রেমিক এবং তাঁরই সেনাপতি মীর জাফর আলী খাঁকে বিশ্বাস ঘাতক হিসেবে হিসেবে চিত্রায়ন করা হয়েছে এবং এটা কম বেশী জানে সবাই জানে পাঠ্য বইয়ে লিখিত ইতিহাসের বদৌলতে। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধে মীর মদন ও মোহনলালদের বীরত্ব, দেশ প্রেম ও অসমযুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়তে গিয়ে বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছিল পাঠ্য বইয়ে লিখিত ইতিহাসের পাতায় সেভাবে উপস্হাপন করা হয়নি। বরং অত্যন্ত দায় সারা ভাবে তাদেরকে ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরা হয়েছে।

০৩) ইষ্ট ইন্দিয়া কোম্পানী বাংলার শাসনভার দখলে নেবার পর পর্যায়ক্রমে উপমহাদেশের বিভিন্ন রাজ্যগুলি বিভিন্ন কৌশলে দখল করে। ভারতবর্ষের এসব রাজা কিংবা মহারাজারা সহজে ইংরেজদের বৈশ্যতা স্বীকার করেননি। অনেকে যুদ্ধ করেও রাজ্য হারিয়েছেন, অনেকে যুদ্ধ করে বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছিলন। তাদের দেশ প্রেম ও বীরত্বের কথা বাংলাদেশের ইতিহাসের পাঠ্য বইয়ের স্হান পায়নি। বরং সে সব শূণ্যস্হানে তুলে ধরা হয়েছে, টিপু সুলতান, ফরাজী আন্দোলন সহ ভারতবর্ষের মুসলিম ইতিহাস। আবার উল্টো চিত্রও দেখা মেলে কোথাও কোথাও। যেমন দেশোপ্রেমী হিন্দু বীর ও বীরগতি প্রাপ্ত রাজা মহারাজাদের উপস্হাপন করা হয়েছে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ভাবে। এর কারণ হিসাবে ধারনা করা যেতে পারে – যাতে হিন্দু শিক্ষার্থীরা পাঠগ্রহন কালে বিব্রতকর অবস্হায় পড়তে হয় এবং তাদের নিজ ধর্ম, কৃষ্টির প্রতি ভীতশ্রদ্ধ হয়।

০৪) ইংরেজ শাসনের ২০০ বছরের মধ্যে বিরোধী বা ইংরেজ বিতাড়ন আন্দোলনে নেতৃত্ব ও প্রান দিয়েছিল তাদের (সূচনা থেকে শেষোব্দি) শতভাগ স্বদেশী হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এসব হতভাগ্য বীর স্বদেশী শহীদ হিন্দু যুবকদের নানের কিছু অংশ ঠাঁই পেয়েছে ঢাকায় অবস্হিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দেয়ালে। কিন্তু তাদের বীরত্ব, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস তেমন ভাবে ঠাঁই হয়নি শিক্ষার্থীদের পাঠ্য ইতিহাস বইয়ের পাতায়, যেমন উপস্হাপন করা প্রয়োজন ছিল।

০৫) ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের জন্য হিন্দুদের দায়ী করা হয়। কোন এক অজানা কারণে ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরা হয়নি দ্বিজাতিতত্বের প্রণেতা মুসলিগের নেতা কায়দা আযম জিন্নাহ্ সাহেবের একান্ত ব্যক্তিগত কারণে রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছিলেন, আর তিনি পতিত অবস্হা থেকে উত্তোরণের জন্য টু নেশন থিওরী (দ্বি-জাতি তত্ব) দিয়ে রাজনীতির মঞ্চে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং ধর্মের ভিত্তিতে আবাসস্হল প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম জনগনকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে সামপ্রদায়িকতাকে উস্কে দিয়েছেন এবং এসব করেছেন ক্ষমতার স্বাদ নেয়ার উদ্দেশ্যে।

০৬) পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে বাংলা, অখন্ড পাকিস্তানের জাতীয় পার্লামেন্টে এদাবী প্রথম উত্থাপন করেছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য শ্রী ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। অথচ বাংলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের পাতায় স্বাধীনতা পরবর্তীতে পাঠ্য পুস্তকে সেভাবে উপ্স্হাপন করা হয়নি। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে টিভি টক শো তে খুব বেশী আলোচনা হয় না। অথচ ভাষা আন্দোলনে শ্রীধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ভূমিকা প্রশ্নাতীত। এরকারণ হিসাবে ধারনা করা যেতে পারে শ্রী ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

০৭) ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের একজন হিন্দুও রাজাকার হিসেবে পাওয়া যাবে না। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যেখানে সার্চ করেছিল সেখানেই ওরা বলতো – মুক্তি কাঁহা? “মালাউন কাঁহা”? পাকিস্তানী সৈন্যদের ধারণা ছিলো বাংলাদেশের “মুক্তি মানে হিন্দু”, আর “হিন্দু মানে মুক্তি”। মূলতঃ মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের শতভাগ হিন্দু পরিবারের মধ্যে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু হারাতে হয়েছে। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের হিন্দুদের ভূমিকা সেভাবে আজ অবধি উপস্হাপন করা হয়নি শিক্ষার্থীদের কাছে যেভাবে হিন্দুরা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছে।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৪৭ (পাকিস্তান) হতে আজ অবধি বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে সদনধারী (ডিগ্রী প্রাপ্ত) মানুষের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুন। কিন্তু ইতিহাসের বধিরতার কারণে প্রকৃত শিক্ষিত হয়েছেন কত জন? এর কারণ হলো ১৯৪৭ (পাকিস্তান) হতে আজ অবধি প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্হা। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সরকারগুলি একদিকে বক্তৃতা ও বিবৃতিতে আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলছে, অন্যদিকে ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে জাতিকে গোঁড়া, ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠার ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। আজকের দিয়ে বাংলাদেশ যে অবস্হানে আছে এর অনেকটাই হলো ইতিহাস বিকৃতির সুফল!!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “অন্ধজাতি! ইতিহাসে বাঙ্গালীর বধিরতার।

  1. ইতিহাস বিকৃতি হিন্দুদের অবদান
    ইতিহাস বিকৃতি হিন্দুদের অবদান লুকানোর কৌশল।মুসলিম দুস্যরা অন্যায় ভাবে যুদ্ধ করে রাজ্য দখল করে, কিন্তু ইতিহাসে তাদের বীর হিসাবে দেখানো হয়।অার হিন্দু বীরদের নাম ইতিহাসে নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

22 − 17 =