ভারতে বৈদিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

জৈন ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, শৈবধর্ম, নাথিজম (শৈব ধর্মের সাথে তন্ত্রের সংযোগ) এবং নাস্তিক্যবাদ (পুনর্জন্মে এবং নিয়তিতে বিশ্বাসী) ইত্যাদি ধর্ম বিশ্বাস সমূহ অ-বৈদিক, অনার্য অথবা ব্রত্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত। ব্রত্য ধর্ম সমূহ মানুষের ব্যক্তিগত যোগ্যতা, পছন্দ বা আগ্রহের ভিত্তিতে ব্রাহ্মন, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য, এবং শূদ্র সমূহের মত বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণীতে বিন্যস্ত ছিল।

তবে, ব্রত্য সমাজে উত্তরাধিকার ভিত্তিতে অথবা ব্যাক্তি বিশেষের জন্মগত বা পারিবারিক অধিকার সুলভ “শ্রেণী বিন্যাস” স্বীকৃত ছিলনা। এই সমাজ শুধু কোন ব্যক্তির নিজস্ব যোগ্যতাতে বিশ্বাস করতো, কারও সন্তান বা উত্তরসূরি হিসাবে নয়। প্রকারান্তরে, ব্রত্য সমাজ ছিল শ্রেণীহীন সমাজেরই অন্যরূপ এবং ব্রাম্মন্যবাদী সমাজের তুলনায় প্রগতিশীল।

ভারতীয় অধিবাসীদের মধ্যে অতীতে উপনিষদ, জৈন, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য দর্শন বিকশিত হচ্ছিল। তাদেরকে, পরবর্তীতে আর্যদের কর্তৃত্বকে গ্রহন করার জন্য নিজেদের প্রাচীন প্রথা সমূহ বিসর্জন দিয়ে বৈদিক সামাজিক শ্রেণী প্রথা গ্রহন করতে বাধ্য করা হয়।

প্রাচীন ভারতীয় সমাজ

জৈন ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, শৈবধর্ম, নাথিজম (শৈব ধর্মের সাথে তন্ত্রের সংযোগ) এবং নাস্তিক্যবাদ (পুনর্জন্মে এবং নিয়তিতে বিশ্বাসী) ইত্যাদি ধর্ম বিশ্বাস সমূহ অ-বৈদিক, অনার্য অথবা ব্রত্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত। ব্রত্য ধর্ম সমূহ মানুষের ব্যক্তিগত যোগ্যতা, পছন্দ বা আগ্রহের ভিত্তিতে ব্রাহ্মন, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য, এবং শূদ্র সমূহের মত বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণীতে বিন্যস্ত ছিল।

তবে, ব্রত্য সমাজে উত্তরাধিকার ভিত্তিতে অথবা ব্যাক্তি বিশেষের জন্মগত বা পারিবারিক অধিকার সুলভ “শ্রেণী বিন্যাস” স্বীকৃত ছিলনা। এই সমাজ শুধু কোন ব্যক্তির নিজস্ব যোগ্যতাতে বিশ্বাস করতো, কারও সন্তান বা উত্তরসূরি হিসাবে নয়। প্রকারান্তরে, ব্রত্য সমাজ ছিল শ্রেণীহীন সমাজেরই অন্যরূপ এবং ব্রাম্মন্যবাদী সমাজের তুলনায় প্রগতিশীল।

যেভাবে বৈদিক শ্রেণী প্রথা ভিত্তিক ধর্মের প্রবর্তন করা হয়

প্রাচীন ভারতে প্রাথমিক ভাবে, শ্রম বিভাগ গঠন করা হয় ব্রত্য সমাজের মাধ্যমে ব্যাক্তি বিশেষের যোগ্যতা এবং আগ্রহের উপর ভিত্তি করে। যদি কেউ কবিতা লিখে বা রচনা করে সমাজের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে জনপ্রিয় হয়ে উঠতো অথবা সন্মান লাভ করতো, তাহলে সে “ব্রাম্মন” হিসাবে স্বীকৃতি পেত। অথবা, যদি কোন ব্যাক্তি অস্ত্র ব্যাবহারে বিশেষ যোগ্যতা প্রদর্শন করতো, তাহলে সে “ক্ষত্রীয়” হিসাবে স্বীকৃতি পেত, ইত্যাদি। “ব্রাম্মন” অথবা “ক্ষত্রীয়” শব্দদ্বয়ের শ্রেণী বিন্যাসের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না, তেমনি কারও জন্ম বা পারিবারিক সূত্রের সাথেও এদের কোন সম্পর্ক ছিলনা।

এই নিয়মানুসারে, কোন ব্যাক্তি নির্দিষ্ট কোন শ্রেণী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও স্বীয় যোগ্যতার কারনে অন্য শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেত। এভাবে, কোন শূদ্র পুরুষ ব্রাহ্মণের পদ মর্যাদা পেতে পারতো অথবা ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কোন বালককে তার কৃত কর্মের কারনে সূদ্র পর্যায়ে নেমে আসতে হতো। এভাবেই, গোত্র সমূহের মাঝে এমন এক সমাজ গঠনের সূত্রপাত হয়, যেখানে সকল কিছুই সমাজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। ব্রাম্মন্যবাদের জন্য লাভজনক পরিগণিত হওয়ার কারনে সমাজের এই শ্রম পদ্ধতিতে বিন্যাসের প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু শাসক অথবা কার্যনির্বাহী সদস্যদের সহযোগিতা ভিন্ন এই এককেন্দ্রিক নীতির প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে উঠে। সেই সুত্রে প্রবর্তিত হয় শ্রেণী প্রথা।

সে জন্যই প্রধান কার্যনির্বাহীকে সর্বোচ্চ পদ প্রদান করা হতো এবং এমন এক নিয়মের পালন করা হতো, যে নিয়মানুসারে কোন রাজপুত্র নিয়মতান্ত্রিক ভাবেই রাজার উত্তরাধিকারী হিসেবে গন্য হতো, যার মাধ্যমে সে সকল প্রকার বিশেষ সুযোগ সুবিধার অধিকারী হতো, শুধু তাই নয়, এ নিয়ে সকল প্রকার বিতর্কেরও বিলুপ্ত সাধন করা হয়। এ ভাবেই প্রধান কার্যনির্বাহীর সন্তানও নিয়মতান্ত্রিক ভাবে প্রধান কার্যনির্বাহীর পদ লাভ এবং কোন ব্রাহ্মণের সন্তান ব্রাম্মণের মর্যাদা লাভ করতো।
প্রধান কার্যনির্বাহী বা শাসনকর্তাকে রাজা হিসেবে অভিহিত করে দেবতার প্রতিনিধি বা সমাজের রক্ষাকর্তা হিসেবে তাকেই বিধাতার স্থলাভিষিক্ত করা হতো। এই নিয়মানুসারে রাজাকে সমাজের আপামর জনসাধারণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। অন্যান্য কার্যনির্বাহীদের, যাদের সহায়তা ব্যাতিরেকে নতুন আইন বা নিয়ম কানুন সমাজে প্রয়োগ করা সম্ভব হতো না, সেহেতু শুধু তাদেরকেই প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পদ্ধতি সমাজের সর্বত্র শ্রেণী প্রথার মাধ্যমে স্থায়ী ভাবে প্রচলিত হতে থাকে। তবে, এমন ব্যক্তি বা ব্যাক্তি সমষ্টিও ছিল যারা এই শ্রেণী প্রথা এবং একাধিপত্যের বিপক্ষে ছিল। অ-বৈদিক অথবা ব্রত্য পদ্ধতির বিশেষত্ব ছিল প্রকারান্তরে শ্রেণীহীনতা।

এভাবেই, শ্রেণী প্রথার পক্ষে ও বিপক্ষের জনগনের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়।
ঐতিহাসিক ভাবে, বৌদ্ধ, জৈন, ধর্মাবলম্বী এবং নাস্তিকতার অনুসারীগন এই শ্রেণী প্রথার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে। এদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীগন শুধু প্রতিপক্ষই হয়ে উঠে নাই বরং তারা এর বিরুদ্ধে যুদ্ধও ঘোষণা করে। এভাবে এঁরা ব্রাম্মন্যবাদের কট্টর অনুসারীগনের প্রধান শত্রু এবং অত্যাচারের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠে। তথাপি, বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের বিলুপ্ত না করা পর্যন্ত এই শ্রেণী প্রথা প্রতিষ্ঠিত করা অসম্ভব হয়ে উঠে। এই কারনে, অন্যান্য শ্রেণীর জনগনের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়ে পরে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সাক্ষ্য দেয় যে, ব্রাম্মণ এবং ক্ষত্রিয়গনের সম্মিলনের মাধ্যমেই শ্রেণী প্রথা বা বর্ণাশ্রম অদম্য শক্তি অর্জন করে।

ভারত জনের ইতিহাসে বিনয় ঘোষ লিখেছেন- ‘বেদের বিরুদ্ধে বিরাট আক্রমণ হয়েছিল এক দল লোকের দ্বারা। তাদের বলা হতো লোকায়ত বা চার্বাক। বৌদ্ধগ্রন্থে এদের নাম আছে। মহাভারতে এদের নাম হেতুবাদী। তারা আসলে নাস্তিক। তারা বলতেন, পরকাল আত্মা ইত্যাদি বড় বড় কথা বেদে আছে কারণ ভণ্ড, ধূর্ত ও নিশাচর এই তিন শ্রেণীর লোকরাই বেদ সৃষ্টি করেছে, ভগবান নয়। বেদের সার কথা হল পশুবলি। যজ্ঞের নিহত জীবন নাকি স্বর্গে যায়। চার্বাকরা বলেন, যদি তাই হয় তাহলে যজ্ঞকর্তা বাজজমান তার নিজের পিতাকে হত্যা করে স্বর্গে পাঠান না কেন…‘… এই ঝগড়া বাড়তে বাড়তে বেদ ভক্তদের সংগে বৌদ্ধদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঝাপ দিতে হয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা যে নাস্তিক, চার্বাকদের উক্তিতেই প্রমাণ রয়েছে। অতএব বৌদ্ধরা মূর্তিপূজা যজ্ঞবলি বা ধর্মাচার নিষিদ্ধ করে প্রচার করছিল পরকাল নেই,জীব হত্যা মহাপাপ প্রভৃতি। মোটকথা হিন্দু ধর্ম বা বৈদিক ধর্মের বিপরীতে জাত ভেদ ছিল না।’গতিশীল বৌদ্ধবাদ যখন জনসাধারণের গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করল তখন থেকে শরু হল ব্রাহ্মণ্যবাদের সাথে বৌদ্ধবাদের বিরোধ।

সংঘাত ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্র হয়ে উঠল। উভয় পক্ষই পরস্পরকে গ্রাস করতে উদ্যত হল। হিন্দুরা তাদের রাজশক্তিরআনুকুল্য নিয়ে বৌদ্ধদের উৎখাতের প্রাণান্ত প্রয়াস অব্যাহত রাখে। কখনো কখনো বৌদ্ধরা রাজশক্তির অধিকারী হয়ে তাদের মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রয়াস নেয়। বৌদ্ধবাদ কেন্দ্রিক নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ভাঙন সৃষ্টির জন্য হিন্দুরা চানক্য কৌশল অবলম্বন করে। বৌদ্ধদের মধ্যকার অধৈর্যদের ছলেবলে কৌশলে উৎকোচ ও অর্থনৈতিক আনুকূল্য দিয়ে বৌদ্ধবাদের চলমান স্রোতের মধ্যে ভিন্ন স্রোতের সৃষ্টি করা হয় যা কালক্রমে বৌদ্ধদের বিভক্ত করে দেয়। বৌদ্ধবাদকে যারা একনিষ্ঠভাবে আঁকড়ে থাকে তাদেরকে বলা হতো হীনযান। আর হিন্দু ষড়যন্ত্রের পাঁকে যারা পা রেখেছিল যারা তাদের বুদ্ধি পরামর্শ মত কাজ করছিল তাদেরকে ব্রাহ্মণ্য সমাজ আধুনিক বলে অভিহিত করে। এরা মহাযান নামে অভিহিত। এরাই প্রকৃত পক্ষে পঞ্চমবাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

মহাযান নতুন দল হিন্দুদের সমর্থন প্রশংসা পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে বৌদ্ধবাদের মূল আদর্শ পরিত্যাগ করে মূর্তিপূজা শুরু করে। ফলে বৌদ্ধ ধর্মের ভিত্তিমূলও নড়ে যায়। বৌদ্ধদের এই শ্রেণীকে কাজে লাগিয়ে প্রথমত নির্ভেজাল বৌদ্ধবাদীদের ভারত ভূমি থেকে উৎখাত করে এবং পরবর্তীতে মহাযানদেরও উৎখাত করে। কিন্তু যারা একান্তভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের আশ্রয় নিয়ে বৌদ্ধ আদর্শ পরিত্যাগ করে হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে তাদের জাতি সত্তাকে বিসর্জন দেয় তারাই টিকেথাকে। সে কারণে আজ বৌদ্ধের সংখ্যা বৌদ্ধবাদের জন্মভূমিতে হাতে গোনা। কোন জাতি তার আদর্শ ও মূলনীতি পরিত্যাগ করে অপর কোন জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করলে সেই জাতিকে স্বাতন্ত্রবিহীন হয়ে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হতে হয়। ছয়শতকে যখন আরবে জাহেলিয়াতের অন্ধকার বিদীর্ণ করে ইসলামের অভ্যুদয় হয়েছে সে সময় বাংলায় চলছিল বৌদ্ধ নিধন যজ্ঞ।

৬০০ থেকে ৬৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলার শিবভক্ত রাজা শশাঙ্ক বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে উৎখাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন বুদ্ধদেবের স্মৃতি বিজড়িত গয়ার বোধিদ্রুম বৃক্ষ গুলিতিনি সমূলে উৎপাটন করেন। যে বৃক্ষের উপর সম্রাট অশোক ঢেলে দিয়েছিলেন অপরিমেয় শ্রদ্ধা সেই বৃক্ষের পত্র পল্লব মূলকাণ্ড সবকিছু জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করা হয়। পাটলিপুত্রে বৌদ্ধের চরণ চিহ্ন শোভিত পবিত্র প্রস্তর ভেঙে দিয়েছিলেন তিনি। বুশিনগরের বৌদ্ধ বিহার থেকে বৌদ্ধদের বিতাড়িত করেন।

গয়ায় বৌদ্ধ মন্দিরে বৌদ্ধদেবের মূর্তিটি অসম্মানের সঙ্গে উৎপাটিত করে সেখানে শিব মূর্তি স্থাপন করেন। অক্সফোর্ডের Early History of India গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে রাজা শশাঙ্ক বৌদ্ধ মঠগুলি ধ্বংস করে দিয়ে মঠ সন্নাসীদের বিতাড়িত করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান নেপালের পাদদেশ পর্যন্ত বৌদ্ধ নিধন কার্যক্রম চালিয়েছিলেন কট্টর হিন্দু রাজা শশাঙ্ক। ‘আর্য্যা মুখশ্রী মূলকল্প’ নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে শুধুমাত্র বৌদ্ধ ধর্ম নয় জৈন ধর্মেরওপরও উৎপীড়ন ও অত্যাচার সমানভাবে চালিয়েছিলেন তিনি। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের সাংস্কৃতিক চেতনা একই রকম।

উভয় ধর্মে জীব হত্যা নিষেধ। ভারত থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে উৎখাত করা হল এবং বৌদ্ধদের নিহত অথবা বিতাড়িত হতে হল অথচ মহাবীরের ধর্ম জৈন আজো ভারতে টিকে রয়েছে। এটা বিস্ময়কর মনে হলেও এর পেছনে কারণ বিদ্যমান রয়েছে। সেটা হল বৌদ্ধরা শুরু থেকে হিন্দুদের দানবীয় আক্রমণ প্রতিরোধ করেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী তারা প্রতিক্রিয়াশীল-চক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। পক্ষান্তরে জৈনরা হিন্দুদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়নি। হিন্দুদের সাথে সহ অবস্থান করেছে তাদের ধর্মীয় রীতি নীতি সভ্যতা সংস্কৃতি জলাঞ্জলি দিয়ে। তারা মেনে নিয়েছে হিন্দুদের রীতিনীতি ও সংস্কৃতি, তারা ব্যবসায়ের হালখাতা, গনেশ ঠাকুরকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, দুর্গাকালি স্বরস্বতী পূজা পার্বন হিন্দুদের মত উদযাপন করতে শুরু করে। ভারত জনের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে- ‘হিন্দু মতে যদিও জৈন ও বুদ্ধ উভয়ে নাস্তিক তাহা হইলেও হিন্দু ধর্মের সহিত উভয়ের সংগ্রাম তীব্র ও ব্যাপক হয়নি।হিন্দুদের বর্ণাশ্রম হিন্দুদেব দেবী এবং হিন্দুর আচার নিয়ম তাহারা অনেকটা মানিয়া লইয়াছেন এবং রক্ষা করিয়াছেন।

সেন হিন্দু ব্রাহ্মণরা পাল রাজাদের হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে ও বিহার গুলো ধ্বংস করে ॥ ১২৬ বছর বাংলায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে॥ এবং বৌদ্ধের হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করে ॥ এবং সৃষ্টি করে বর্ণবাদী জাত প্রথা ॥ এর জন্য সেন রাজাদের অত্যাচার নির্যাতন থেকে বাঁচতে দেশ ত্যাগ করে অসংখ্য বৌদ্ধ ॥

ঐতিহাসিকগণ মতামত প্রদান করেন যে, সমূদ্র গুপ্তের (রাজত্বকাল খ্রিস্টীয় ৩৩৫ – ৩৮০ অব্দ) সময় কাল থেকে শঙ্কারাচার্যের (খ্রিস্টিয় ৮ম শতাব্দী) সময় কাল পর্যন্ত বৈদিক ব্রাহ্মণগণ বৌদ্ধ ধর্মকে বিলুপ্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। জানা যায় যে, শঙ্করাচার্যই বৌদ্ধ ধর্মের উপর সর্বশেষ আঘাত হানে। এতদসত্তেও বৌদ্ধ ধর্ম সম্পূর্ণ রূপে বিলুপ্ত করা সম্ভব হয়ে উঠেনি, এমন কি শঙ্কারাচার্যের শাসনকালের পরও টিকে থাকে কিন্তু অগাধ আকর্ষণীয় সুযোগ সুবিধার লোভে অগনিত বৌদ্ধ পণ্ডিতদের বৈদিক ধর্মে ধর্ম্যান্তরিত হওয়ার কারনে ভারতের বেশীর ভাগ অঞ্চলেই তাদের শক্তি এমন ভাবে লোপ পায় যে বৌদ্ধ ধর্মের শক্তি কার্যত পঙ্গু হয়ে পরে। সর্বশেষে, ১৪ শতাব্দীতে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু বারানসিতে বৌদ্ধ ধর্মের অবশিষ্টাংশ বিলুপ্ত করে।

ব্রাম্মণ্যবাদ ক্রমশঃ রাজা বা শাসকের এবং ধনিক শ্রেনীর সহযোগিতা নিয়ে বৌদ্ধ, জৈন, শৈব ধর্ম বিধ্বংস করে এবং এসব ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুসারীদের ব্রাম্মন্যবাদে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ব্রাম্মণ্যবাদ উত্তরোত্তর প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহ থেকে ধারণা করা যায়, কি ভাবে বৈদিক ধর্মের নামে শ্রেণী প্রথা বিস্তার লাভ করে। রাণী এবং প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশে সুবিখ্যাত শৈব আপ্পার এবং তিরুঙ্গনা সাম্বান্দর, মহারাজা মৌর্য বর্মণকে জৈন ধর্ম থেকে শৈব ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে সক্ষম হয় এবং ধর্মান্তরিত হওয়ার দিন ৮০০০ জৈন পুরোহিতের শীরচ্ছেদ করা হয়। এমন কি আজও মাদুরাই মন্দিরে এই দিবস পালন করা হয়। তারপর, এই সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তিরুগনানা সাম্বান্দার এর মূর্তি পূজার উদ্দেশ্যে সকল মন্দিরে স্থাপন করা হয়। খৃস্টীয় ১০ম শতাব্দীতে নম্বি অন্দর নম্বি এবং ১২শ শতাব্দীতে শেক্কিঝার মহারাজা মৌর্য বর্মণকে ধর্মান্তরিত করার এবং জৈন পুরোহিতদের হত্যা করার বিষয়টিকে শৈব ধর্মের মহা বিজয় বলে গন্য করে।
তিরুমাঙ্গাই আলোয়ার, নাগপত্তিনাম মন্দির থেকে স্বর্ণ দ্বারা তৈরি বৌদ্ধমূর্তি চুরি করে এবং এই চুরি করা ধন দিয়ে সুবিখ্যাত শ্রী রঙ্গনাথ মন্দির নির্মাণ করার জন্য সে বিখ্যাত হয়ে উঠে। বৌদ্ধ, জৈন মন্দিরকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করার বহুল ঘটনাই ঘটে।

নিম্নে এসবের কয়েকটি উল্লেখ করা হলোঃ
১। কুঝিথুরাই এর নিকটবর্তী বর্তমানের হিন্দু তিরুচানম মন্দির ছিল মূলত একটি জৈন মন্দির। এই মন্দিরে পার্সোনাথ, মহাবীর এবং পদ্মাবতী দেবীর মূর্তি সংরক্ষিত আছে।
২। নগরকইলে নাগরাজ মন্দিরও ছিল একটি জৈন মন্দির, যা হিন্দু মন্দিরে রূপান্তর করা হয়।
৩। পেরুম্বাভুর নিকটবর্তী কলিল গুহা মন্দির ছিল প্রকৃতপক্ষে জৈন মন্দির।
৪। মাদিয়াম পল্লি মন্দির ছিল জৈন মন্দির। জৈন দেবী পদ্মাবতীকে দেবী ভগবতী হিসেবে রূপান্তর করা হয়।
৫। অন্ধ্র প্রদেশের চেয়ারলা এলাকার কপোতেশ্বরা মন্দিরকে আনুমানিক পঞ্চম/ ষষ্ঠ শতাব্দীতে রূপান্তর করা হয়।
৬। মহারাষ্ট্রের শোলাপুর এলাকার তাকাড়া মন্দির ছিল বৌদ্ধ মন্দির যা ৫ম শতাব্দীতে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তর করা হয়।
৭। জৈন ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, সুবিখ্যাত দেবতা ভেঙ্কটেশ্বর এর তিরুপতি মন্দির ছিল জৈন মন্দির। জৈন তিরথামকার “নেমিনাথ” কে এই মন্দির উৎসর্গ করা হয়েছিল। এমনও বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে বর্তমান দেবতা ভেঙ্কটেশ্বর এর মূর্তি প্রকৃতপক্ষে ছিল “নেমিনাথ” এর মূর্তি। এই মন্দিরকে ব্রাম্ম মন্দিরে রূপান্তর করা হয়।

উত্তর ভারতেও এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে বৌদ্ধ মন্দির সমূহ হিন্দু মন্দিরে রূপান্তর করা হয়েছে, গৌতম বুদ্ধ কে বিষ্ণু রূপে অথবা তাকে বিষ্ণুর পুনর্জন্ম হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসবের মধ্যে একটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে, গয়ার বৌদ্ধ মন্দিরকে এবং গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণু হিসেবে রুপান্তর করা। এই মন্দিরে প্রতিটি হিন্দুকে তার পূর্ব পুরুষের আত্নার মুক্তি এবং পরমাত্মার মাঝে বিলীন হওয়ার প্রার্থনায় বিষ্ণুর নামে বুদ্ধের পদ্মপাতা সদৃশ চরণে পিন্দাদনম বিসর্জন দিতে হয়। বোধগয়ার নিকটে বর্তমানের “কাল-ভৈরব” বা মহাকাল মন্দির প্রকৃত পক্ষে একটি বৌদ্ধ মন্দির ছিল। কালো পাথরের তৈরি বৌদ্ধ ভিক্ষুর আকৃতিতে বুদ্ধের মূর্তিকেও মহাকাল রূপে পরিবর্তন করা হয়।

কাঠমুন্ডুর বিশ্ব বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দিরও বাস্তবে একটি বৌদ্ধ মন্দির ছিল যা পরবর্তীতে শীব মন্দিরে রূপান্তর করা হয়। ভগবান বিষ্ণুর “অনন্ত শয়ন” মূর্তিও ছিল গৌতম বুদ্ধের যা বর্তমান রূপে পরিবর্তিত হয়। সম্ভবত, এই রূপান্তরের ঘটনা ঘটে ৫০০ খ্রিঃ গুপ্ত যুগে। ৫০০ খ্রিঃ এর পূর্বে হিন্দু ধর্মগ্রন্থের কোথাও বিষ্ণুর মূর্তি বা কোন দলিল পাওয়া যায় নাই।

বিখ্যাত চিন্নামস্ত দেবী, বাংলা-উড়িষ্যার দেবী তারা বা তারিণী ছিল প্রকৃতপক্ষে বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবী যা রূপান্তর করা হয়। বর্তমান কালে তাকে শক্তিদেবী কালী রূপে ধারণা করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মের পূর্বে, ব্রাহ্মণ্য ধর্মগ্রন্থ সমূহে বিষ্ণুর অথবা কৃষ্ণের সুদর্শন চক্রের কোন প্রমান পাওয়া যায় না। বৌদ্ধ ধর্মই তাদের ধর্মে ধর্ম চক্রের প্রচলন করে। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে এটাকে অশোক চক্র বলে গন্য করা হতে থাকে। পরবর্তীতে, ব্রাম্মন্যবাদ এই চক্র বৌদ্ধ ধর্ম থেকে গ্রহণ করে, বৌদ্ধ ধর্মকে ভারতে নিশ্চিহ্ন করে।

মন্দির ও মঠ সমূহের মাধ্যমে বিদ্যাচর্চা, গ্রন্থাগার, হাসপাতাল ইত্যাদীর পরিচালনার অনুশীলন বৌদ্ধ ধর্মের অনুশীলন থেকে গ্রহণ করা হয়। ব্রাম্মন্যবাদ এসবও বৌদ্ধ ধর্ম থেকে অনুকরণ করে। বৌদ্ধ ধর্মই সর্বপ্রথম জনসাধারণের ধর্মশিক্ষার জন্য মঠ জাতীয় শিক্ষালয়ের প্রতিষ্ঠা করে। শঙ্কারাচার্যের মঠ নির্মাণ এরূপ একটি জ্বলন্ত উদাহরন।

শিক্ষিত ব্যক্তি বা কবিগন যারা বর্ণ প্রথায় উৎসাহিত ছিল তাদেরকে ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগনকে তাদের স্বীয় সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী শ্রেণীভুক্ত করা হয়। এভাবেই, ব্রাহ্মণ্য গ্রন্থ সমূহে আদি কবি, বাল্মিকি, বৈশ্য দেব প্রমূখ ব্রাহ্মণ হিসেবে স্বীকৃত হয়। ইতিহাসবিদ ও গবেষকগণ মত প্রদান করেন যে, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের বিলুপ্তির মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় সমাজ যখন পুনর্গঠিত হচ্ছিল, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মানুসারী পরিবার সমুহের কোন কোন সদস্যকে ব্রাহ্মণ হিসেবে এবং অন্যান্যদের তাদের সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী অন্যান্য শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইতিহাসবিদ এবং গবেষকগণ এমনও উল্ল্যেখ করেন যে সামাজিক এই পুনর্গঠনের প্রাক্কালে দরিদ্র ব্রাহ্মণদেরকেও শূদ্র শ্রেণীভুক্ত করা হয় অথচ ধানাঢ্য এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সমূহকে সমাজে তাদের প্রভাব ও ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয় এবং বৈষ্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জনগনের যে অংশ এই বর্ণ প্রথার বিরোধিতা করেন তারা রাজার বা এই প্রথার অনুসারীদের শত্রু হিসেবে পরিগণীত হয় এবং তাদেরকে শূদ্র ও অস্পৃশ্য শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

ঐতিহাসিকদের মতে, দক্ষিন ভারতে “পানা” নামক এক সম্প্রদায় আছে, যারা বর্তমানে হরিজন বা অস্পৃশ্য হিসেবে গণ্য হয় অথচ এই “পানা” সম্প্রদায় ৪০০ খ্রিঃ ব্রাহ্মণদের তুলনায় অধিক সন্মানের অধিকারী ছিলেন। তবে খ্রিঃ ৫০০ তারা পুনরায় ব্রাহ্মণদের সম মর্যাদা লাভ করেন। বর্ণপ্রথামুখি সামাজিক পুনর্গঠনের প্রাক্কালে অনেক শিক্ষিত “পানা” এবং কাব্যিক নিজেদেরকে ব্রাহ্মণ হিসেবে ঘোষণা দেন। যে সকল “পানা” ঐ শ্রেণী প্রথার বিপক্ষে ছিলেন, তাদেরকে ব্রাহ্মণ সমাজ থেকে বহিস্কার করা হয়, এবং তারা বর্তমানে হরিজন বলে পরিচিত। মজার বিষয় এই যে, মালয়ালম ব্রাহ্মণগণ সকলেই “নামবুদিরি পদ ব্রাহ্মণ” হিসেবে পরিচিত ছিল। এই “পদ” শব্দটি শুধুমাত্র বৌদ্ধ সমাজেই প্রচলিত ছিল। ধারণা করা হয়, এই “নামবুদিরি” গন সকলেই অতীতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন।

উত্তর ভারতে, “পানা” দের মতই বাল্মিকি, মৌর্য, বৈশ্য, মাল, কাপিল, নিসাদ বা তদ্রুপ সম্প্রদায় সমূহ শূদ্র বা অস্পৃশ্য শ্রেণীর হরিজন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হন।

লক্ষণীয় বিষয় এই যে, যে সকল শাসনামল ব্রাম্মন্যবাদ ভিত্তিক শ্রেণী প্রথাকে সহযোগিতা প্রদান করে এবং শ্রেণী প্রথা ভিত্তিক সমাজ গঠনে কাজ করে, ব্রাম্মন্যবাদী সমাজের লেখকগন ভারতীয় সাহিত্য সমূহে, ঐ সকল শাসনামলেরই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও গৌরবান্বিত করে এবং ঐ সকল শাসনামলকেই ভারতের স্বর্ণ যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এভাবেই, মগধের গুপ্ত বংশ, বাংলার সেন বংশ, দক্ষিন ভারতের চোলাস, পান্ডিয়া এবং কূলাসেকর বংশের রাজত্ব কালকে হিন্দু সাহিত্যে স্বর্ণ যুগ আখ্যায়িত করা হয়।

এই সমাজ পুনর্গঠনের প্রাক্কালে, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য ব্রত্য ধর্ম গ্রন্থাদি সম্পূর্ণরূপে পুড়িয়ে ফেলা হয়, তাদের স্থাপত্য এবং মঠ সমূহ বিধ্বংস করা হয়। কথিত আছে, বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সুবিখ্যাত “নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়”x কে এক সপ্তাহের অধিক সময় যাবত অগ্নিদগ্ধ করা হয়।

x নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ভারতের বিহার রাজ্যের রাজধানী পাটনা থেকে ৫৫ মাইল দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত “বড়গাঁও” গ্রামের পাশেই। তৎকালীন সময়ে নালন্দায় বিদ্যা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০, তাদের শিক্ষাদান করতেন প্রায় আরো ২,০০০ শিক্ষক। বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি বেধ, বিতর্ক, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতিষ বিদ্যা, শিল্প কলা, চিকিৎসাশাস্ত্র সহ দান চলত এখানে। শিক্ষকদের পাঠ দান আর ছাত্রদের পাঠ গ্রহণে সর্বদা মুখরিত থাকত এই বিদ্যাপীঠ।

ধারণা করা হয় যে, গুপ্ত সম্রাটগণই নালন্দা মহাবিহারের নির্মাতা এবং সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তই সম্ভবত এক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কনৌজের হর্ষবর্ধন (৬০৬-৬৪৭ খ্রি.) নালন্দা বিহারের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

বাংলার পাল রাজগণ নালন্দার প্রতি তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রেখেছিলেন। এটি পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মপাল বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। লামা তারনাথ উল্লেখ করেন যে, ধর্মপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিক্রমশীলা মহাবিহার তত্ত্বাবধানকারী প্রধান ব্যক্তি নালন্দা দেখাশোনা করার জন্যও রাজা কর্তৃক আদেশপ্রাপ্ত হন। সুবর্ণদ্বীপের শৈলেন্দ্র রাজা বালপুত্রদেব জাভার ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য দেবপালএর অনুমতি নিয়ে নালন্দায় একটি বৌদ্ধ মঠ নির্মাণ করেন। এদের প্রতিপালনের জন্য দেবপাল ৫টি গ্রামও দানকরেন। সে সময় নালন্দা বিহার ছিল বৌদ্ধ সংস্কৃতিজগতের বিশেষ কেন্দ্র এবং এর অভিভাবক হিসেবে পাল রাজগণ সমগ্র বৌদ্ধ জগতে উচ্চস্থান লাভ করেন। ঘোসরাওয়া শিলালিপি থেকে নালন্দা বিহারের প্রতি বিশেষ আগ্রহ এবং বৌদ্ধ ধর্ম ওবিশ্বাসের প্রতি দেবপালের গভীর অনুরাগের কথা জানা যায়।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ দ্বারে একটি মিথ্যা বানোয়াট ও অমার্জনীয় তথ্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে… বিশ্ববিদ্যালয়টি ১১০০ খৃস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি ধ্বংস করেছেন। ভারতীয় ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বখতিয়ারের এই আক্রমণের তারিখ দিয়েছে ১১০০ খৃস্টাব্দ। অথচ স্যার উলসলি হেগ বলছেন, বখতিয়ার উদন্ত পুরীআক্রমণ করেছেন ১১৯৩ খৃস্টাব্দে আর স্যার যদুনাথ সরকার এই আক্রমণের সময়কাল বলছেন ১১৯৯ খৃস্টাব্দ। মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দুভারত মুসলিম বিজেতাদের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার জন্য ইতিহাসের তথ্য বিকৃত করতেও কুণ্ঠিত নয়।

তুর্কী সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলা আক্রমণ ও বিজয়ের পটভূমিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৬৯ইং মৃণালিনী নামে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেন। যেখানে বখতিয়ার খলজীকে এবং মুসলমানদের গালাগালি মূলক শব্দ যবন, বানর, অরন্যনর ও চোর হিসেবে উল্লেখ করে লিখেন। মৃণালিনী উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন বখতিয়ার খলজী অভিযানের প্রাক্কালে, সে সময়ের বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে সুরক্ষিত দূর্গ মনে করে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয় এবং ভিক্ষু বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে হত্যা করে ৷ অথচ ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে, বখতিয়ার খলজী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংস করেননি বরং বঙ্কিম তাঁর সাহিত্যে ঐতিহাসিক সত্যের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে, নালন্দা বেশ কয়েকবার বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রমণের মুখে পড়ে। যতদূর জানা যায় সেই সংখ্যাটা মোট তিনবার। প্রথমবার স্কন্দগুপ্তের সময়ে (৪৫৫-৪৬৭ খৃষ্টাব্দে) মিহিরাকুলার নেতৃত্বে মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানাদের দ্বারা। উল্লেখ্য মিহিরকুলার নেতৃত্বে হানারা ছিল প্রচণ্ড রকমের বৌদ্ধ-বিদ্বেষী। বৌদ্ধ ছাত্র ও ধর্মগুরুদের হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। স্কন্দগুপ্ত ও তার পরবর্তী বংশধরেরা একে পূণর্গঠন করেন।

প্রায় দেড় শতাব্দী পরে আবার ধ্বংসের মুখে পড়ে। আর তা হয় বাংলার শাসক শশাঙ্কের দ্বারা। শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার অন্তর্গত গৌড়’র রাজা। তার রাজধানী ছিল আজকের মুর্শিদাবাদ। রাজা হর্ষবর্ধনের সাথে তার বিরোধ ও ধর্মবিশ্বাস এই ধ্বংসযজ্ঞে প্রভাব বিস্তার করে। রাজা হর্ষবধন প্রথমদিকে শৈব (শিবকে সর্বোচ্চ দেবতা মানা) ধর্মের অনুসারী হলেও বৌদ্ধ ধর্মের একজন পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। কথিত আছে, তিনি সেই সময়ে ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠা ব্রাহ্মণদের বিদ্রোহও দমন করেছিলেন। অন্যদিকে রাজা শশাঙ্ক ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একজন শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক ও এর একান্ত অনুরাগী। উল্লেখ্য রাজা শশাঙ্কের সাথে বুদ্ধের অনুরুক্ত রাজা হর্ষবর্ধনের সবসময় শত্রুতা বিরাজমান ছিল এবং খুব বড় একটি যুদ্ধও হয়েছিল। রাজা শশাঙ্ক যখন মগধে প্রবেশ করেন তখন বৌদ্ধদের পবিত্র তীর্থ স্থানগুলোকে ধ্বংস করেন, খণ্ড বিখণ্ড করেন বুদ্ধের ‘পদচিহ্ন’কে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তার বিদ্বেষ এত গভীরে যে তিনি বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মীয় তীর্থস্থান বুদ্ধগয়াকে এমনভাবে ধ্বংস করেন যাতে এর আর কিছু অবশিষ্ট না থাকে । হিউয়েন সাঙ এভাবে বর্ণনা করেছেন (চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬২৩ সালে গুপ্ত রাজাদের শাসনামলয়ে নালন্দা ভ্রমণ করেন): Sasanka-raja, being a believer in heresy, slandered the religion of Buddha and through envy destroyed the convents and cut down the Bodhi tree (at Buddha Gaya), digging it up to the very springs of the earth; but yet be did not get to the bottom of the roots. Then he burnt it with fire and sprinkled it with the juice of sugar-cane, desiring to destroy them entirely, and not leave a trace of it behind. Such was Sasanka’s hatred towards Buddhism.

প্রকৃত ঘটনা হল একজন ব্রাহ্মণ কর্তৃক সম্রাট হর্ষবর্ধনকে হত্যা তারপর ব্রাহ্মণ মন্ত্রী ক্ষমতা দখল করেন। এই সময় ব্রাহ্মণদের নেতৃত্বে একদল উগ্রবাদী ধর্মোন্মাদ হিন্দু নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস ও ভস্মীভূত করে। ৪০০ খৃষ্টাব্দে চীনা পর্যটক ফা হিয়েন যখন গান্ধারা সফর করেন তখন উত্তর ভারতে বিকাশমান বৌদ্ধ ধর্মের গৌরবোজ্জল অধ্যায় দেখতে পান। কিন্তু ৬২৯ খৃস্টাব্দে অপর একজন চীনা বৌদ্ধ সন্নাসী ১২০ বছর পর নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। ৬২৯ সালে আর একজন চীনা পর্যটক গান্ধারা সফর করে বৌদ্ধবাদের করুণ পরিণতি দেখে মানসিকভাবে বিপন্ন হন।

বখতিয়ার বৌদ্ধদের ওপর কোন ধরনের নির্যাতন করেছেন এমন কথা ইতিহাস বলে না বরং বৌদ্ধদের ডাকে বঙ্গ বিজয়ের জন্য বখতিয়ার সেনা অভিযান পরিচালনা করেন। এমনকি বিজয়ান্তে তিনি বৌদ্ধদের কাছ থেকে জিজিয়া কর আদায় থেকে বিরত থাকেন। বাংলায় ১৪ শতকের অভিজ্ঞতা: ১২ শতকে বাংলার ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরালে আমরা দেখতে পাব ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তির উত্থান। ১৩ শতকের প্রথম দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার দুশ’ বছরের মধ্যে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিধ্বস্ত হিন্দু শক্তির উত্থান সম্ভব হয়নি। কিন্তু ১৫ শতকে রাজাগনেশের আকস্মিক উত্থান কিভাবে সম্ভব হল? এ জিজ্ঞাসার জবাব পেতে সমকালীন ইতিহাস বিশ্লেষণের প্রয়োজন হবে।

উপমহাদেশের বৌদ্ধবাদের উৎখাতের পর বহিরাগত আর্য অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদীরা এখানকার মূল অধিবাসীদের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হলেও অপরাজেয় শক্তি হিসেবে মুসলমানদের উপস্থিতি তাদের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দেয়। মূলত হিন্দুরাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বখতিয়ার খলজি বাংলার মানুষকে মুক্তি দান করেন।

অত্যাচারিত নির্যাতিত বৌদ্ধরা দুবাহু বাড়িয়ে বখতিয়ার খলজিদের স্বাগত জানালো। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের ভাষায়-‘বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরাব্রাহ্মণ্যবাদীদের আধিপত্য ও নির্মূল অভিযানের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে বাংলার মুসলিম বিজয়কে দু’বাহু বাড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ড. নিহার রঞ্জন রায় বাঙালির ইতিহাস আধিপূর্বে উল্লেখ করেছেন-‘যে বঙ্গ ছিলো আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে কম গৌরবের ও কম আদরের সেই বঙ্গ নামেই শেষ পর্যন্ত তথাকথিত পাঠান মুসলিম আমলে বাংলার সমস্ত জনপদ ঐক্যবদ্ধ হলো।’ সবচাইতে মজার যে ব্যাপার সেটা হচ্ছে বখতিয়ার খলজি বঙ্গ বিজয় করেন ১২০৪ সালের ১০মে, স্যার যদুনাথ সরকার বখতিয়ারের বঙ্গ আক্রমণের সময়কাল বলছেন ১১৯৯ খৃস্টাব্দ। অন্যদিকে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে বৌদ্ধদের নালন্দাবিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করা হয় ১১৯৩ খৃস্টাব্দে। যে লোকটি ১২০৪ খৃস্টাব্দে বঙ্গে প্রবেশ করেন সে কিভাবে ১১৯৩ খৃস্টাব্দে নালন্দা ধ্বংস করেন এটা ইতিহাস বিকৃতিকারীরাই ভালো বলতে পারবেন। বখতিয়ার খলজি মাত্র ১৭জন সঙ্গী নিয়ে ঝাড়খন্ডের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দ্রুত বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে কৌশলে সেনরাজা লক্ষণ সেনের প্রাসাদে হামলা করেন। এসময় লক্ষণ সেন দুপুরের খাবার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন- তিনি বখতিয়ারের আগমনের খবর পেয়ে ভয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান, প্রায় বিনা রক্তপাতে বঙ্গ বিজয় করেন বখতিয়ার খলজি।

সুতরাং বখতিয়ার কতৃক নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের ঘটনা একটা মিথ্যা অপবাদ ছাড়া কিছু নয়। নালন্দার ধ্বংস হয় সর্বোমোট তিনবার, এর মধ্যে প্রথমবার মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানদের দ্বারা, দ্বিতীয়বার ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুসারী বাংলার শাসক শশাঙ্ক দ্বারা ও শেষবার অত্যাচারী সেনরাজাদের দ্বারা। নালন্দাকে প্রথম দুইবার ধ্বংসস্তুপ থেকে দাঁড়করানো গেলেও তৃতীয়বার সম্ভব হয়নি গুপ্ত ও পাল রাজাদের মতো পৃষ্ঠপোষক না থাকায়। দূর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বর্ণহিন্দু ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের ফলে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধদের ব্যাপকহারে দেশত্যাগ ও বৌদ্ধদের জ্ঞানার্জনের চেয়ে তান্ত্রিকতার প্রসারও এর জন্য দায়ী।

বখতিয়ার খলজির অভিযান ছিলো সেনরাজা লক্ষণসেনের বিরুদ্ধে, বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে নয়। বৌদ্ধরা বখতিয়ারের অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছিলো। সুতরাং বিনা রক্তপাতে বঙ্গবিজয়ের পরে বৌদ্ধদের বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করার কাহিনী মুসলিম বিজয়ীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার বৈ অন্য কিছু নয়।

দক্ষিন ভারতে, সম্রাট অশোক যে কাঁচি পুরাম বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেন তা ছিল প্রকৃতপক্ষে বৌদ্ধ শিক্ষালয়। দক্ষিন ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্বানগন সেখানে পাঠদান ও পাঠ গ্রহণ করতেন। পরিণতিতে, গ্রাম ও শহরের মঠ সমূহকে ব্রাহ্মণদের মন্দিরে রূপান্তরিত করা হয়, সকল জনসাধারণকে ব্রাম্মন্যবাদের কর্তৃত্বের অধিনে আনার মাধ্যমে “আদি শঙ্কর” ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের হত্যাকারী হিসেবে বিখ্যাত হয়ে উঠে।

অন্যদিকে, সকল জনসাধারনকে ব্রাম্মন্যবাদের কর্তৃত্বের অধীনে আনার লক্ষ্যে ব্রত্য সমাজের সমুদয় প্রথা ও রীতি এই নতুন সমাজ প্রথায় সন্নিবেশ করা হয়। এ সবের মধ্যে রয়েছে কোন কোন প্রাণীকে যেমন হনুমান, গরু, মৈয়ুর, নাগ (সর্প), হাতি এবং কিছু বৃক্ষ যেমন, ডুমুর (পিপাল), তুলসী, এবং নীম ইত্যাদি পূজা করা। সকল দেবতা ও দেবী কে ব্রাম্মনীয় দেব দেবী রূপে গ্রহণ করা হয়।

এভাবেই, উন্নততর ও প্রগতিশীল ব্রত্য সমাজের ধ্বংসাবশেষের উপর ভিত্তি করে অপ্রগতিশীল “হিন্দু ধর্ম” নামে ব্রাম্মন্যবাদের জন্ম হয়। এই বিষয় স্মরনে রেখে বাংলায় শ্রেণী প্রথার বিশ্লেষণ করা যায়।

রাঢ় বঙ্গের (পশ্চিম বঙ্গ) উচু শ্রেণীর ব্রাহ্মণদের ঐতিহাসিক পরিচিতি

বঙ্গদেশে, “উপাধ্যায়” সম্বোধনধারী যেমন মুখোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায়, বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং গঙ্গোপাধ্যায়গন ছিল তথাকথিত উচু শ্রেণীর ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য ব্রাহ্মণগণ ছিল নিম্ন শ্রেণীর। খৃস্টীয় শাসনামলে, খ্রিষ্টান শাসকগন এই সকল নাম সমূহকে নিজেদের পছন্দানুসারে মুখার্জী, চ্যাটার্জী, ব্যানার্জী এবং গাঙ্গুলিতে পরিবর্তন করে। পরবর্তীতে, তাদের কর্ম ও আবাসস্থলের উপর ভিত্তি করে আরও নতুন নতুন শ্রেণী তৈরি করা হয়। এদের বেশির ভাগই পশ্চিম বঙ্গের গঙ্গা তীরবর্তী রাধ অথবা রাধা অঞ্চলে যেমন বর্ধমান, বীরভূম, হুগলী এবং তদসংলগ্ন এলাকায় বসবাস করে। তারা কূলীন ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচিত।

ঐতিহাসিকভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চল বিশেষভাবে, প্রাচীন রাঢ বঙ্গ ছিল জৈন ধর্মের উৎস স্থান, মিথিলা ছিল উপনিষদ দর্শন সমূহের রচনার স্থান। প্রাচীন গৌড়ের বির বাহু জৈন মুনি ছিল চন্দ্র গুপ্ত মৌর্যের গুরু। এছাড়াও ছিল গৌড় পদ যে উপনিষদ সমূহের ব্যাখ্যা প্রদান করতেন।
আধুনিক হিন্দু সাহিত্যে ৫১টি শক্তি পীঠের কথা উল্লেখ আছে। এই ৫১টি পিঠের অন্ততপক্ষে ২৫টি পীঠই অবস্থিত প্রাচীন বঙ্গে এবং ৭টি বঙ্গ সংলগ্ন বিভিন্ন অঞ্চলে। ৫১টির মধ্যে ৪টি পীঠকে বলা হয় আদি শক্তিপীঠ। এই পীঠ সমূহ হচ্ছে ১) উড়িষ্যার গঞ্জম জেলায় অবস্থিত দেবী তারার পীঠ। ২) জগন্নাথপুরির দেবী বিমলা ৩) কামরূপ এর দেবী কামাখ্যা এবং ৪) কলকাতা কালিঘাটের মা কালি মন্দির। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রথম তিনটি ছিল অতীতে বৌদ্ধ মন্দির। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, “মাতসেন্দ্রনাথ” কামাখ্যা পীঠে তন্ত্র সাধনা করতো। খুব সম্ভবত,মাতসেন্দ্রনাথই বৌদ্ধ তন্ত্রপীঠকে “শৈব শক্তি তন্ত্র পীঠ” এ রূপান্তরিত করে।

ঐতিহাসিক ভাবে স্বীকৃত যে কালীঘাটের মা কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ছিল গোরখ নাথ এবং তার অনুসারী চৌরঙ্গী নাথ ছিল এর তত্ত্বাবধায়ক। পূরীর দেবী বিমলা এবং গঞ্জমের তারা তারিণী উভয় পিঠকেই বৌদ্ধ পীঠ থেকে শিব শক্তি পীঠে রূপান্তর করা হয়। বঙ্গদেশের শুধুমাত্র রাধা অঞ্চলে (বর্ধমান, বীরভূম, হুগলী এবং তৎসংলগ্ন এলাকা) অবস্থিত এরূপ ৯টি শক্তি পীঠ।

বঙ্গে বর্ণ প্রথা ভিত্তিক সমাজ ব্যাবস্থার ক্রমবিকাশ
ঐতিহাসিক ভাবে এ বিষয় পরীক্ষিত যে বৌদ্ধ ধর্মই ছিল তন্ত্রবিদ্যার উৎস কেন্দ্র। ঐতিহাসিকদের মতে, পরবর্তী কোন সময়ে শৈব, জৈন, বৈষ্ণ ধর্ম এবং সর্বশেষে বৈদিক জনগণও তন্ত্রবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরে। আমরা আজও দেখতে পাই অবশিষ্ট বৌদ্ধ, জৈন এবং সকল বৈদিক সাধকগন সকলেই “ভৈরব” এবং “কাল ভৈরব” সাধনা করে থাকে। কালক্রমে, মাতসেন্দ্রনাথ এবং শিব গোরখা নাথ সাধনার ধারণা এবং পদ্ধতি পরিবর্তন করে এবং তন্ত্র সাধনার প্রয়োজনে ভৈরব চরিত্রকে “মা” চরিত্রে পরিবর্তন করে। মাতসেন্দ্রনাথ এবং শিব গোরখা নাথ উভয়ই ছিল “নাথ শৈব” এবং “নাথ কৌল”। লক্ষ্য করা যেতে পারে যে, শিব দেবতাকে “মহা কৌল” হিসেবেও ডাকা হয়।

মাতসেন্দ্রনাথকে ভারতে কুল (শক্তি) বংশের অভিভাবক হিসেবেও দেখা হয়। সেই সূত্রে, মাতসেন্দ্রনাথ এর সামাজিক অনুসারীগন “কূলিন” (দেবী মাতা শক্তির পূজারী) নামে পরিচিত ছিলেন।

রাধা অঞ্চলে এই কূল সাধনার গভীর প্রভাব সম্মন্ধে ধারণা করা যায়, এই অঞ্চলে শক্তি পীঠের সংখ্যা থেকে, মোট ৫১টি শক্তি পীঠের মধ্যে ১০টি পিঠই এই রাধা অঞ্চলে অবস্থিত। এ সম্ভবপর হয়ে উঠত না, যদি এই অঞ্চলের প্রভাবশালী এবং বিদ্বান লোকজন এর পৃষ্ঠপোষকতা না করতো। বৈদিক সমাজ ব্যাবস্থা শক্তিধর এবং প্রভাবশালী গনের জন্য খুবই লাভজনক বলে প্রতিয়মান হয়। শ্রেণী প্রথার প্রতিষ্ঠার পেছনে এই শ্রেণীর লোকজনই ছিল মেরুদন্ড। এই শ্রেণী প্রথার বিশেষ সুবিধা ছিল এই যে, ইহা শুধু তাদের জন্যই লাভজনক ছিল না, বরং তাদের সন্তান এবং বংশধরদের জন্যও একটি স্থায়ী লাভজনক ব্যাবস্থা ছিল।

এভাবেই ভবিষ্যতের রাজা হিসেবে কোন রাজপুত্রের ভবিষ্যৎ এমন কি যোগ্যতা, সক্ষমতা নির্বিচারে ব্রাহ্মণের সন্তানের ব্রাহ্মণ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্তিও পূর্বনির্ধারিত হয়ে যায়, যা ব্রত্য সমাজে স্বীকৃত ছিল না। ব্রত্য সমাজে শুধু ব্যাক্তিগত যোগ্যতাকেই স্বীকৃতি দেয়া হতো।

অংগ বা রাঢ় বঙ্গের বৈদিক প্রথার অনুসারীগন অ-বৈদিক অথবা ব্রত্য সমাজের অনুসারীগণের সাথে সামাজিক ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এই কারনে ১২ শতাব্দীতে সেন বংশের শাসনামলের পূর্ব পর্যন্ত অংগ বা রাঢ় বঙ্গে শ্রেণী প্রথার উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় নাই, যদিও তা মধ্য দেশে (বর্তমানে বিহার এবং উত্তর প্রদেশ) ৩য় শতাব্দীতে গুপ্ত বংশের শাসনামলের সময় থেকেই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এও লক্ষ্য করা যেতে পারে যে, বঙ্গের শ্রেণী প্রথা বৈদিক শ্রেণী প্রথার অনুরূপও নয়। বঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী ছিল হয়তো “ব্রাহ্মণ- বৈদ্য- কেষ্ট- অথবা শূদ্র” কিন্তু তাদের মধ্যে ক্ষত্রীয় এবং বৈশ্য ছিল না।

এভাবেই ভারতীয় সমাজ বিভিন্ন শ্রেণীতে এবং উপ শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। ফলে, “বিভক্তি এবং শাসন” পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা শ্রেণী প্রথার সমর্থকদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠে এবং তাদের পারিবারিক আধিপত্য সুদৃঢ় হয় এবং এভাবেই শ্রেণীহীন সমতা ভিত্তিক সমাজের বিলুপ্তি ঘটে। এই পদ্ধতি ভারতের পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিন তথা সর্বত্রই গৃহীত হয়। রাজাকে বিধাতার স্থলে অথবা বিধাতার প্রতিনিধির স্থলাভিষিক্ত করা হয় এবং তার উত্তরসূরিদের প্রদান করা হয় সর্বোচ্চ স্থান, তার বিনিময়ে রাজা বা তার উত্তরসূরিগণ নিজেদের স্বার্থেই ব্রাম্মন্নবাদী অথবা বৈদিক শাসনকে সহযোগিতা করতে থাকে।

এখানে লক্ষ্য করা যেতে পারে, যে রাজা বা রাজবংশ ব্রাম্মন্যবাদী শাসনকে পৃষ্ঠপোষন এবং এই শ্রেণী- প্রথা প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করে, সে সকল রাজা বা রাজবংশের শাসনামলকে তাদের রচিত সাহিত্যে মহিমান্বিত এবং ভারতের স্বর্ণ যুগ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এভাবেই, মগধের গুপ্ত বংশ, বাংলার সেন বংশ, দক্ষিন ভারতের চোলাস, পান্ডিয়া এবং কূলাসেকর বংশের রাজত্ব কালকে ব্রাহ্মন্য সাহিত্যে স্বর্ণ যুগ আখ্যায়িত করা হয়।

উল্লেখযোগ্য যে, সেন বংশীয় রাজাগন স্বয়ং ব্রাম্মন্যবাদী শাসনের অনুসারী ছিল। এভাবেই রাজা বল্লাল সেন এবং লক্ষন সেন বঙ্গে শ্রেণী প্রথা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর স্বীকৃতি স্বরূপ ব্রাহ্মন্য সাহিত্যে তাদের শাসন আমলকে বাংলার স্বর্ণ যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

ব্রাম্মন্যবাদের এই“এক শ্রেণীর আধিপত্য” এবং “বিভক্তি এবং শাসন” পদ্ধতি আজও ভারতবর্ষ জুড়ে বিদ্যমান যার ফলে শোষিত, নিষ্পেষিত, অত্যাচারিত হচ্ছে ভারতেরই আদি অধিবাসী তথাকথিত নিম্নবর্ণের এবং অন্যান্য ধর্মের জনসাধারন। শুধু তাই নয়, অত্যাচারের ব্রাম্মন্যবাদী খড়গ আজ প্রতিবেশী দেশ সমুহের দিকেও প্রসারিত।

তথ্যসূত্রঃ

  • Dr. K.K. Debnath, Development of Vedic social system of casteism in Bengal
  • storyofbangladesh.com/…/dui-po…/93-chapter-1.html
  • shodalap.org/shams/8918/
  • dailysangram.com/news_details.php?news_id=93844
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

48 − = 39