কাগজের বর (ধারাবাহিক উপন্যাস) (পর্ব-১)

মন্টু মিয়ার এ বছর রমরমা ব্যাবসা। এই অপ্সরীকে পেয়েতো মন্টু খুব খুশি। মন্টু মিয়ার যাত্রার অন্য মেয়েরা মাসে যা রোজগার করে। অপ্সরীর এক দিনের রোজগার।

শহরের অদূরে ছোট্ট একটি পল্লী।এই পল্লীর জায়গাটা একটা সময় চরণ বিল ছিল।গ্রীষ্ম ঋতুতে চরণ বিল শুকিয়ে চৌচির হত।বিলটি ছিল জমিদার সেরেশ্তা আলীর। বহু বছর আগে এই অঞ্চলে যাত্রাদল আসতো। মাস ব্যাপি যাত্রা হত। যাত্রা দেখতে দূর দূরান্ত থেকে অনেক লোকজন আসতো। জমিদার সেরেশ্তা আলী সুরা পান করতো আর মেয়ে মানুষ নাচাতো। কথিত আছে এই মদ আর মেয়ে মানুষের নেশায় তার জমিদারি ধ্বংস হয়েছিল। মৃত্যুর আগে ঠিক মত তিন বেলা খাবারও জুটতো না। যাক সে সব কথা।

প্রতি বছরের মত মন্টু মিয়ার যাত্রাদল এবারও আসে।এ বছর মন্টু মিয়ার যাত্রাদলে এক অপ্সরী এসেছিল। যেই চেহারা, সেই দৈহিক গঠন। ভরা যৌবন। যুবক-বৃদ্ধ সবাই অপ্সরীর পাগল। যাত্রার স্ট্রেজে যখন নাচতে উঠতো সবাইর কলোরব ছিলো সুন্দরী অস্পরীকে নিয়ে। কোমরের দোলন পদ্মার ঢেউ।

সবাই বিছানায় অপ্সরীর ঢেউ দেখতে মুখিয়ে। কিন্তু অপ্সরীর ডিমান্ড অনেক। কেউ কেউ জমি বিক্রয়ের টাকা মন্টু মিয়ারে দিলো। বিনিময় অপ্সরীকে এক রাত বিছানায় যেতে হবে। অপ্সরীও অনেক টাকার বিনিময় প্রতি রাতে যাত্রা শেষে বিছানায় যেত। আজ এর বিছানায় কাল অন্যর। বৃষ্টির মৌসুম আসার আগে যা কামাই করতে পারে। আবার প্রায় ছয় মাস বেকার সময়ই কাটাতে হবে। অবশ্য অপ্সরীর বেকার সময় কাটে না। মাঝে মাঝে বিভিন্ন জমিদার মহলে নাচের ডাক পড়ে। তখন নাচ সহ জমিদারের বিছানার সঙ্গীও হতে হয়।

মন্টু মিয়ার এ বছর রমরমা ব্যাবসা। এই অপ্সরীকে পেয়েতো মন্টু খুব খুশি। মন্টু মিয়ার যাত্রার অন্য মেয়েরা মাসে যা রোজগার করে। অপ্সরীর এক দিনের রোজগার।

সেরেশ্তা আলীর নাচের মহলে প্রায়ই ডাক পড়ত অপ্সরীর।সেরেশ্তা আলী অপ্সরীর কোমরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে টাকা ছিটাতো। অপ্সরীও টাকা কুড়িয়ে নিজের বুকের ভিতর গুজে দিত। সেরেশ্তা আলী নেশার ফাঁকে অপ্সরীকে ছুঁয়ে দিত। অপার এক আনন্দ পাইতো সেরেশ্তা আলী। অনেক আগেই স্ত্রী গতর হয়েছে। সেরেশ্তার বয়স এখন ষাটের ঘরে। কেউ সেরেশ্তা আলীকে দেখলে বুঝার উপায় নাই। সবাই বলবে সেরেশ্তা আলীর বয়স চল্লিশের মাঝামাঝি। সাত পুরুষের জমিদারি। ছোট বেলা থেকেই সেরেশ্তা আলীর মেয়ে মানুষের নেশা ছিল। বড় হওয়ার সাথে সাথে মদ ও মেয়ে দুটোরই নেশায় আসক্ত হয়ে যায়।স্ত্রী সেরেশ্তার ভয়ে কখনও মুখ খুলে কিছু বলতে পারেনি। মরে গিয়ে বেচারি বেঁচে গেছে।

অপ্সরীকে সেরেশ্তা আলীর নাচ মহলে প্রথম বার দেখে বড় মেয়ের জামাতা। সেদিন থেকেই অপ্সরীকে বিছানায় আনার স্বপ্ন বুনে। মন্টু মিয়াকে অনেক ভয় দেখায়। শেষমেষ অপ্সরা জামাতার বিছানায় যেতে বাধ্য হয়। খবর পৌছালো সেরেশ্তা আলীর কানে গিয়ে। সেরেশ্তা আলী জামাইয়ের কর্মকান্ড শুনে রেগে গেল। সুরার আসর ছেড়ে বন্দুক হাতে জামাইর রুমে গেল। অপ্সরা ও জামাইকে ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ল। এতে অপ্সরী গুলি বিদ্ধ হল।
খবর শুনে মন্টু মিয়া দল সহ ছুটে আসলো। অপ্সরীর ততখনে সময় ঘনিয়ে এসেছে। গুলি বিদ্ধ অংশে প্রচুর রক্ত ঝড়ে। অপ্সরী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

অপ্সরীর মৃত্যুতে যুব সমাজ, বৃদ্ধ সবাই ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এক পর্যায় সেরেশ্তা আলী ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়ে। মন্টু মিয়ার দলকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তখন এই চরণ বিলটা লিখে দেয়। সেই থেকে ধীরে ধীরে এখানে বসতি গড়ে উঠে। এই চরণ বিল এখন লোকজনের কাছে পরিচিত নিষিদ্ধ পল্লী নামে।

অনেক মেয়ের শেষ আশ্রায়ে এসে দাড়ায় এই পল্লী।দু-মুঠো ভাত জুটে পল্লীতে। এখানে সব ধরণের মানুষ আছে। এমন কিছু নেই যা এখানে পাওয়া যায় না।

বৃহস্পতি ও শনিবার প্রচুর ভিড়।সপ্তাহে এই দুই দিন বিন্দুবালার নাচ দেখতে আসে। বিন্দুবালা খুব ভালো নাচে। সবাই বলে ওর মাঝে নাকি অপ্সরার ছোঁয়া আছে। তাই বিন্দুবালাকে মাঝে মাঝে অপ্সরা বলে ডাকে।

মন্টু মিয়ার নাতনী সুলতান মিয়া এই পল্লী দেখভার করে। প্রথমে মন্টু মিয়া দশ জন মেয়ে নিয়ে পল্লীর শুরু করে। সেই দশ জন আজ দুইশো জনে দাড়িয়েছে। এইসব নিয়েই জমজমাট কোলাহল পূর্ণ এই নিষিদ্ধ পল্লী।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

57 − 47 =