শাপলা চত্বরে হেফাজত এবং হাসিনার সাথে হেফাজত

২০১৩ সালের ৫ মে লংমার্চ করে বিশাল জনশক্তি নিয়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হাজির হয় কাওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম।হজরত মুহাম্মদ সা: কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদে মূলত আন্দোলনে নামে হেফাজত।তবে তথাকথিত নাস্তিক ব্লগারদের ফাসির দাবির পাশাপাশি হেফাজত সে সময় আরো কিছু দাবি উত্থাপন করে যেগুলো রাস্ট্রের অসাম্প্রদায়িকতা, নারী অধিকার,মুক্তিচিন্তা,সাহিত্য এবং সংস্কৃতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।হেফাজতের ১৩ দফা দাবি ছিল নিম্নরূপ:
১. সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা।

২. আল্লাহ্, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস।

৩. কথিত শাহবাগি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা।

৪. ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।

৫. ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।

৬. সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।

৭. মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা।

৮. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ে বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করা।

৯. রেডিও-টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামি কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসিঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস-পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করা।

১০. পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও এবং খ্রিস্টান মিশনারিগুলোর ধর্মান্তকরণসহ সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।

১১. রাসুলপ্রেমিক প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও তৌহিদি জনতার ওপর হামলা, দমন-পীড়ন, নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং গণহত্যা বন্ধ করা।

১২. সারা দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ ও মসজিদের ইমাম-খতিবকে হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি দানসহ তাদের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করা।

১৩. অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাছাত্র ও তৌহিদি জনতাকে মুক্তিদান, দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আহত ও নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণসহ দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

হেফাজতের আন্দোলনের সময়েই যুদ্ধপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগে হচ্ছিল গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন যার সূত্রপাত ঘটেছিল ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিস্টদের দ্বারা। কিন্তু এতে অংশ নিয়েছিল দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী সকল ছাত্র-জনতা।একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধে জামাতে ইস্লামের নেতাদের বিরোধীতা এবং খুন,ধর্ষণ সহ সকল অত্যাচারের নেতৃত্ব দানের কারণে মূলত তাদের ফাসির দাবিটাই বেশি উত্থাপিত হয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চে।এই কারণে জামাত শিবির ভিত্তিক বিভিন্ন ব্লগ ও প্রচার মাধ্যমের মাধ্যমে শাগবাগে আন্দোলনকারীদের নাস্তিক ঘোষণা দিয়ে হেফাজতকে উস্কানি দেওয়া হয় আন্দোলনে নামার জন্য।জামাত শিবিরের এ কৌশল কাজে লেগেছিল।হেফাজত গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে যদিও সরকার তা দৃঢ় হাতে প্রতিহত করে।৫ মের সমাবেশে পুলিশের সাথে রাতে হেফাজতের বারবার সংঘর্ষ হয়।হেফাজতের দাবি মতে পুলিশের গুলিতে কয়েক হাজার জনতা নিহত হয়েছে যদিও তার উপযুক্ত প্রমাণ পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি।সরকার এবং প্রচার মাধ্যমে হতাহতের ঘটনা অস্বীকার করা হলেও কয়েকটি নিউজ পোর্টালে ৩০ জন নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়।

যাই হোক, ৫ মের এই ব্যর্থ আন্দোলনের পর হেফাজতের নেতারা বুঝতে পারেন লাখো জনতা নিয়ে শাপলা চত্বরে জিহাদির বেশে ত্রিশ পাক দিলেও কপালে বুলেট ছাড়া একটা ছেঁড়া স্যান্ডেলও জুটবে না।তাই পরবর্তীতে মিডিয়াতে মাঝে মাঝেই আন্দোলনের ডাক দিলেও এমন বড় আন্দোলনে আর নামেনি হেফাজত।তবে দাবি – দাওয়া আদায়ের লক্ষে ধর্মভিত্তিক সংগঠনটি প্রকাশ্যে-গোপনে শুরু করে আওয়ামীলীগ ও শেখ হাসিনার সাথে আলাপ – আলোচনা যার প্রথম রেজাল্ট দেখা যায়,পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল লেখকদের লেখা অপসারণ ও হেফাজতের মত অনুসারে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন।এরপরে ওঠে আরকটা দাবি, সুপ্রিমকোর্ট থেকে দেবী থেমিসের মূর্তি অপসারণ। এ ব্যাপারে স্বয়ং প্রধাণমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেফাজতের পক্ষে কথা বলেন।সর্বশেষ হেফাজতের নেতা নারীদের তেঁতুলের সাথে তুলনাকারী আল্লামা শফি শেখ হাসিনার সাথে হাসিমুখে আলোচনায় বসে কাওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি আদায় করে নেন।মাস্টার্স পাস এবং কাওমি থেকে পাস এখন সমমানের।দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থে শেখ হাসিনা হেফাজতের সকল দাবি-দাওয়া মেনে নিচ্ছেন।তবে কি সংবিধান থেকে সব ক্ষেত্রে শাসন শুরু করবে হেফাজত?অসাম্প্রদায়িক রাস্ট্র থেকে বাংলাদেশ পরিণত হবে একটা ইসলামি রাস্ট্রে?বাংলাদেশকে বাংলাস্তান বানানোর কাজটা কিন্তু শুরু হয়েছে।আমি নিশ্চিত, খুব শিঘ্রি হেফাজতের প্রধাণ দাবি’ব্লাসফেমি আইন’ এর মত একটি অমানবিক আইন প্রণয়ন করবে সরকার।দেশ পরিণত হবে জঙ্গিরাস্ট্রে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 + = 57