কাগজের বর [ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব-৩ )]

ঘড়ির কাঁটায় রাত দুটো বাজে।দুপুরে ক্যামেরা হাতে পল্লীতে যাওয়া লোকটি রাস্তায় হাটছে।রাস্তার ওপাশে তিনটে কুকুর ঘ্যাউ ঘ্যাউ করছে।লোকটি কুকুর তিনটিতে কর্ণপাত করলো না।লোকটি দাড়িয়ে আছে।এবার হাতে ক্যামেরা ছিল না।সম্ভবত ক্যামের ব্যাগে রেখেছে।হাতে কালো একটা ডায়েরী।বার বার ডায়েরীটা খুলছে আবার বন্ধ করছে।খুব অসস্তিকর অবস্থা।মনে হচ্ছে কারও অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে।মানুষের অপেক্ষার ধৈর্য্য বেশিক্ষন থাকে না।ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললে বিরক্তিকর ভাব চলে আসে।
এবার লোকটি ফুটপাতে বসে পড়ল।পকেট থেকে কলম বের করলো।ডায়েরীটা খুলল।কি যেন লেখা শুরু করলো।আবার লেখা বন্ধ।মানুষের মনে সস্তি না থাকলে কখনও লেখা বের হয় না।লোকটি ডায়েরীর কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টালো।এখন আর লিখছে না।কি যেন আঁকাযোকা করছে।
ক্যামেরা হাতের লোকটি কি রকম আঁকাযোকা করে জানা নেই।তবে তার আঁকার ধরণ দেখে বুঝলাম ভালোই আঁকাযোকা পারে।

লোকটি মন স্থির করে আঁকছে।সাধারণত আঁকাযোকায় মন স্থির রাখতে হয়।তা না হলে আঁকাযোকা ভালো হয় না।

আঁকাযোকা ছবি যদি একটু বাস্তব বাস্তব না মনে হয়।তবে সেটাকে বলে না।সেটা অছবি।বর্তমানে কবিদের ক্ষেত্রে অনেকেই অকবি শব্দটা ব্যাবহার করে।তেমনি এদেরও অশিল্পী বললে ভুল হবে না।
যাক সে সব কথা।আগে লোকটি আঁকাযোকা শেষ করুক।পরে না হয় সমালোচনার ঝড় বসিয়ে দিবো।বাঙালী সমালোচনা প্রিয় একটু বেশিই।কারণে অকারণে সমালোচনা থাকবেই।তাই বলে সমালোচনার ভয়ে কেউ তার প্রতিভা গোপন রাখে নি।তাতে হউক যত আলোচনা-সমালোচনা।তবে আমার মতে এই সমালোচকদের ইয়া বড় ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।কারণটা বলবো না।

লোকটির ছবি আঁকা প্রায় শেষ।অনেক দ্রুত আঁকে।হাত পাকা।মনে হচ্ছে জাত শিল্পি।একজন জাত শিল্পি না হলে এত দ্রুত ছবি আঁকা সম্ভব না।
নিয়ন আলোতে সাদা-কালো ছবিটা জ্বলজ্বল করে।
হঠাৎ অদূর ক্যামেরা হাতে লোকটির চোখে কি যেন ধরা পড়ল।হলুদ পোশাকে কে যেন এদিকটায় আসছে।লোকটি পথে দিকে তাকিয়ে রইলো।হলুদ পোশাকটি যখন কাছে এলো।ক্যামেরা হাতে লোকটির চিনতে কষ্ট হল না।লোকটি এগিয়ে যেয়ে বললো।
-হৈমন্তী।কেমন আছেন আপনি?

হৈমন্তি চমকে গেল।বুকে থুঁথুঁ দিলো।মনে হচ্ছে হৈমন্তি অনেক ভয় পেয়েছে।হৈমন্তি কথা বললো না।ক্যামেরা হাতে লোকটি হৈমন্তির পথ আগলে দাড়ালো।হৈমন্তি তার অবস্থান থেকে একটু সরে সামনে এগোতে চাইলো।লোকটি সে পথও আগলে দাড়ালো।কোন উপায় না পেয়ে হৈমন্তি বললো।
– কে রে তুই?এই রাতে ভিমরতিতে ধরছে তোরে?
-ভাষা ঠিক করে কথা বলুন।

হৈমন্তি লোকটিকে ধাক্কা দিল।শালা।দম আছে তোর? দেখে তো মনে হয় কিছুই বুঝো না।কত টাকা আনছো এই হৈমন্তিরে ছোঁয়া পাইতে?
লোকটি বলল।
-দেখুন আমি আপনার ছোঁয়া পাওয়ার জন্য পথ আগলে দাড়াইনি।
-তো চেহার দেখার জন্য দাড়াইছো?সবাই একই কথা বলে।সুযোগ পাইলেই গায়ে হাত দেয়।
-আপনার সাথে কিছু কথা বলার ছিলো।একটু সময় দিলে বলতে পারবো।
-হাতে সময় নাই।সাহেবগো আদর সোহাগ করতে করতে রাত শেষ।এই হৈমন্তির সময়ের চড়া দাম।টাকা দিবা বাবু?টাকা দিলে যত সময় চাও দিবো।
-আচ্ছা টাকা দিবো।
-টাকা দিলেই চলবে।তোর কেনা সময় তখন কথা বলে পার করতে পারো।আবার চাইলে সোহাগ আদর করেও পার করতে পারো।আমার দরকার টাকা।
-টাকা দিবো।আগে বলুন তো দেহের চেয়ে কি টাকাই বড়?
-হ্যাঁ। বাবু আমাগো কাছে টাকাই বড়।তোর মত কত মানুষ মুখে বড় বড় বক্তব্য দিয়ে মাইক ফাটায়।রাতে বিছানায় ঠিকই আমাগো চায়।না দিলে কুত্তার বাচ্চারা হিংস্র জানোয়ারের মত এই দেহ ছিড়ে ছিড়ে খেত।ছিন্ন-বিছিন্ন যৌনাঙ্গের ব্যাথায় কুঁকড়ে কুঁকড়ে কান্নার চেয়ে দু-চার পয়সা পাইলে সমস্যা কোথায়?

ক্যামেরা হাতে লোকটি মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করলো।হৈমন্তির হাতে দিল।হৈমন্তি হাতের মুঠোয় টাকা ব্লাউজের ভিতর ঢুকালো।
হেমন্তি লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল।
-চলো।এখন যা খুশি করতে পারো। ত্রিরিশ মিনিট।
-ত্রিরিশ মিনিট?
-যে টাকা দিছো।এর চেয়ে বেশি সময় পায় না।
-আচ্ছা হবে।চলুন হাটতে হাটতে না হয় কথা বলি।

দুজন হাটা শুরু করলো।ক্যামেরা হাতে লোকটি বললো।
-আমি রেজা সিদ্দিক।জানালির্স্ট।দুপুরে আপনাদের পল্লিতে গিয়েছিলাম।বালা নামে কাউকে খুঁজেছিলাম।ওখানে গিয়ে পুরো নামটা শুনলাম।বিন্দুবালা।
-বিন্দুকে কিসে দরকার?
-এক্সজাস্টলি আমি উনাকে চিনি না।অনেক দিনের স্বপ্ন পতিতা পল্লি নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানাবো।কিন্তু আমি কখনও আপনাদের কারও সাথে কথা হয়নি।জানা হয়নি আপনাদের জীবন।ডকুমেন্টারি বানাতে হলে বাস্তব জীবনে আসতে হবে।বিষয়টা নিয়ে আমার এক বন্ধুর সাথে আলাপ করি।ও আপনাদের অনেকের সাথে দৈহিক মেলামেশা করছে।ও বিন্দুবালার কথা বললো।এই পল্লির ঠিকানা দিল।এখানে আসলে আমার ডকুমেন্টারি বানানো যাবে নাকি? দুপুরে যখন পল্লি থেকে ফিরে আসলাম।এখানকার এক লোকের সাথে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করি।ওই ভদ্র লোক আপনার কথা বললো।আরও বললো। এই রাস্তায় অপেক্ষা করলে শেষ রাতে আপনার সঙ্গে দেখা হতে পারে।ভদ্রোলোকের কথায় অপেক্ষা করলাম।দেখাও হলো।বাকিটা দেখতেই পাচ্ছেন।

হৈমন্তি কথা শুনছে।কিছু বলছে না।রেজা সিদ্দিক কথা বলেই যাচ্ছে।
-আপনি আমাকে এইটুকু সাহয্য করবেন।বিনিময় আমি আপনার সময় হিসাব করে টাকা দিবো।

হৈমন্তির চোখে জল টলটল করছে।কিছুই বলছে না।রেজা সিদ্দিকের কথার কোন উত্তর দিল না।হৈমন্তি খুব খারাপ লাগছে। তাই রেজা সিদ্দিকের কাছে বিদায় নিতে চায়।রেজা সিদ্দিক বললো।
-আমার প্রশ্নের কোন উত্তর পেলাম না।তবে কি আপনি আমাকে সাহায্য করছেন না?

হৈমন্তি শুকনা গলায় বললো।
-জানতাম না পুরুষরা এত ভালোও হয়।তোর কথা শুনে মনে হলো।পৃথিবীর সব পুরুষ মানুষ এক না।তোরে সাহায্য।আগামীকাল রাত দশটায় ঠিক এখানে আমি তোর জন্য অপেক্ষা করবো।

রেজা সিদ্দিকের মুখে হাসি ফুটলো।অবশেষ বহুদিনের পোষা স্বপ্ন সফল হতে চলছে।হৈমন্তিকে ডায়েরী খুলে ছবিটা দেখালো।
হৈমন্তি আঁকা ছবিটা দেখে বিস্মিত।এ যেন হৈমন্তির তৈলচিত্র। রেজা সিদ্দিকের কল্পনার হৈমন্তির সাথে বাস্তব হৈমন্তি অমিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

হৈমন্তি রেজা সিদ্দিকের কাছে তৈলচিত্রটা চেয়ে নিল।তৈলচিত্রটা পেয়ে হৈমন্তি খুব খুশি।হয়ত প্রথম কেউ তার ছবি আঁকলো।
হৈমন্তি চলে গেল।রেজা সিদ্দিক হৈমন্তির চলে যাবার দিকে তাকিয়ে রইলো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2