অথবা একটি কাল্পনিক ভুল জন্মের গল্প

হঠাৎ কোথা থেকে যেন জন্ম হলো আমার!
ঠিক ধরতে পারলাম না প্রথমে। আচ্ছা, আমি কোথায়? মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করলাম। প্রচন্ড ঠান্ডা এখানে। চারপাশে আমার মতো আরো অনেক নবজাতক! অনেক বললে ভুল হবে, অসংখ্য! এখানে এরা সবাই ঠিক আমারই মতো! কেন? এতো ঠান্ডাই বা কেন এখানে?
হঠাত বাবা-মা কে দেখলাম। হ্যাঁ! আমার চিনতে ভুল হয়নি। এরাই তো আমার বাবা-মা! বাবা-মা কে চিনতে সন্তানের ভুল হয়না। এদের থেকেই তো আমার জন্ম।
আমি বাবাকে ডাকলাম, “এই বাবা! এই! এই! শুনতে পাচ্ছ বাবা?” বাবা কোথায় যেন ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলো। তাকে ডেকে থামালাম বলে মন খারাপ হলো একটু। ভাবলাম বাবা বকা দিবে। কিন্তু বাবা বকা না দিয়ে একটু হেসে বললো, “কি বাবা? কিছু বলবে? তাড়াতাড়ি বলো। আমার তো থেমে থাকার সময় নেই!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ বাবা! বেশিক্ষণ লাগবে না! আচ্ছা বলো তো বাবা আমি কে? আমি কী? কিছুই তো বুঝছি না!”
বাবা বললো, “তুমি হলে প্রবল প্রতাপশালী মেঘের সদ্য জন্মানো পুত্র-সন্তান। তুমি বজ্র। অপরিসীম ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছ তুমি।”
বাবার কথায় শিহরিত হলাম! আমার অপরিসীম ক্ষমতা? কিরকম তা জানতে ইচ্ছা হলো। জিজ্ঞেস করতে গেলাম, “বাবা! আমার ক্ষমতা কিরকম?”
বাবা ততক্ষণে অনেকটা দূরে সরে গেছে। উত্তর দেয়ার সময় পেল না। আমি পাশেই মা কে দেখলাম এখনো ততোটা দূরে যায়নি। আচ্ছা এরা আমাকে রেখে এভাবে পালিয়ে যাচ্ছে কেন?
“মা! এই মা! আমি তো কিছুই বুঝছি না! বাবা চলে গেলো কেন? এখন আমিই বা কি করবো?”
মা একটু আলতো করে মাথায় হাত রেখে বলল, “আমার কাছেও তো সময় নেই রে বাবা! আমরা হলাম মেঘ! আমাদের আকাশ থেকে আকাশে ঘুরে বেড়ানোই হলো কাজ। তোর বোন হলো বৃষ্টি। তাকে জন্ম দেই আমরা। সে বাঁচিয়ে রাখে নিচের সবুজ পৃথিবী। আর তুই হলি আমাদের পুত্র সন্তান। তুই বজ্র। অনেক ক্ষমতা তোর। সবাই ভয় করে তোকে। তুই যেখানে খুশি যেয়ে যাকে খুশি তাকে ছারখার করে দিতে পারিস। একদম পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারিস! আমার আর সময় নেই বাবা! বাতাস তখন থেকে তাড়া দিচ্ছে আকাশের ঐ ঐখানটায় যেতে! ওখানে যেতে হবে আমার। যাই রে বাবা! তুই তোড় জন্ম স্বার্থক কর! তোর ক্ষমতা ব্যাবহার কর যথাস্থানে! বিদায়…”
ততক্ষনে টের পেলাম আমি আস্তে আস্তে নিচে নামতে শুরু করেছি। বেশ অনেকখানি নেমে গেছি। আচ্ছা আমি আমার গতি নিয়ন্ত্রন করতে পারছি না কেন? আমি কোথায় যাচ্ছি? নিচে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে? কিছুই তো বুঝলাম না আমি! সব এতো দ্রুত হয়ে যাচ্ছে কেন?

নিজের মন কে শান্ত করলাম। মা-বাবা দুইজনই বললো আমার নাকি প্রচন্ড ক্ষমতা। আমি যাকে খুশি তাকে ছারখার করে দিতে পারি পুড়িয়ে? আচ্ছা, পোড়ায় কিভাবে? মন চাইলেই পুড়িয়ে দিতে পারবো? এটাই কি আমার দায়িত্ব? আমার কাজ? মা বলেছিলো নিচে পৃথিবী। সবুজ পৃথিবী। সেখানে একটা জায়গা পুড়িয়ে দেয়াই কি আমার কাজ? ধুর! জন্মানোর সাথে সাথে এতো কাজ ভাললাগে? একটু ঘুরে দেখবো তা-না! ইশ! কেন যে মেঘ হলাম না!

অনেকখানি নেমে এসেছি আমার জন্ম স্থান ছেড়ে। বৃষ্টির সাথে দেখ হলো। আমার বোন এই মেয়েটা? আহ! কি সুন্দর আমার বোনটা!
“এই মেয়ে! তুমি আমার বোন?” জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ ভাই! তুমি তাড়াতাড়ি নেমে যাও নিচে! নাহলে তো ফুরিয়ে যাবে! কি সর্বনাশ! আর তো বেশি সময় হাতে নেই তোমার!”, বোনের কণ্ঠে আশঙ্কা!
আমি বললাম, “কেন? ফুরিয়ে যাবো কেন?”
“তুমি বড় ক্ষণ-জন্মা ভাই! হাতে সময় নেই! নেমে যাও। গতি বাড়াও! নিজের ক্ষমতা ব্যাবহার করো। আঘাত করো কোথাও একটা। জেনে রাখো, তুমি বীর! এটাই তোমার কর্তব্য!”
আমি আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত নেমে যেতে লাগলাম!
নিজের মধ্যে আমার শক্তি অনুভব করতে লাগলাম! পুড়িয়ে ছাই করে দেবো সব আমি!

অনেক নিচে নেমে এসেছি আমি। আর কিছুক্ষণ পরেই মাটি। এটাই পৃথিবী। আঘাত করে চৌচির করে দেবো একটু পরে একে!
আচ্ছা, নিচে ঐটা কি? সাদা একটা কি যেন পরা? নড়ছে তো! ওরও কি জীবন আছে? এরাই কি পৃথিবীর বাসিন্দা? বৃষ্টি কি এদেরই বাঁচিয়ে রাখে? এরাই বোধ হয় মানুষ!

আহ! মানুষ এতো স্নিগ্ধ মায়াময় কেন হয়! কি অপার্থিব সৌন্দর্য! নিশ্চয়ই এট মেয়ে। আমার বোনের মতো!
মেয়েটার মধ্যে এতো সৌন্দর্য কেন? মেয়েটার চুলগুলো একদম…একদম আমার মা মেঘের মতো দেখতে! যেন আকাশ থেকে এক টুকরো মেঘ কে যেন কেটে এনে বসিয়ে দিয়েছে!
মেয়েটার একটু উপরের দিকে তাকি হাসলো!
আমাকে দেখছে না তো আবার? আমিও কি সুন্দর? দুই দিকে দু’হাত ছড়িয়ে রেখেছে কেন? আমাকে আলিঙ্গন করে অভ্যর্থনা জানাতে?
নিশ্চয়ই তাই! আমার জন্যই অপেক্ষা করছে মেয়েটা!
আমি আরো দ্রুত গতিতে নিচে যেতে লাগলাম! মেয়েটা আবার না অপেক্ষা করতে করতে চলে যায়! খুব খারাপ হবে তাহলে!

আচ্ছা, আমার তো অনেক ক্ষমতা। আমি যেখানে যাবো তার সবই তো ধ্বংস হয়ে যাবে! আমি তো মেয়েটার কাছে যাচ্ছি। মেয়েটার কাছে গেলে মেয়েটাও কি……!
না! আমি এটা হতে দিতে পারিনা! কিছুতেই না! আমার অবশ্যই দিক পরিবর্তন করতে হবে! না হলে মেয়েটা…!
পৃথিবীর এই অপার্থিব সৌন্দর্য, মেঘের এক অংশ যে নিজেতে ধারন করে, তাকে আমি কিছুতেই ধ্বংস হতে দিতে পারিনা! কিছুতেই না!

কিন্তু আমি দিক পরিবর্তন করতে পারছিনা কেন? আমি তো অনেকখানি কাছে চলে এসেছি! আমি এটা কি করছি!
না! আমাকে মেয়েটাকে বাঁচাতেই হবে! কিছুতেই আমি একে আঘাত করব না! কিছুতেই না!

মাথায় আসলো কথাগুলো…আমার অনেক ক্ষমতা! আমি বীর! আমার কাজ ধ্বংস করা!
ধুর! চুলোয় যাক সব ফালতু বীরত্ব! যত্তোসব!

এ আমার ভুল জন্ম! আমি বজ্র না! আমি বজ্র হতে পারি না! ভুল জন্মের শেষ সময়ে একটা ঠিক কাজ করবো আমি! নিজেকে ধ্বংস করে দেব আমি! এ ছাড়া আর উপায় নেই। মাটির কাছাকাছি চলে এসেছি আমি।
এখনই সময়!
চোখ বুজলাম। নিজের অস্তিত্ব কে বললাম, “বিলীন হয়ে যাও তুমি! নিঃশেষ হয়ে যাও!”
শেষ মুহূর্তে একটা কথাই মাথায় আসলো শুধু…মেয়েটা কি কখনো জানবে আমার এই আত্মত্যাগ এর কথা?

বজ্র জানতে পারলো না, তার পিছে পিছে আসা ভয়ানক শব্দটা মেয়েটাকে ভয়ে চোখ বোঁজাতে পেরেছিলো শুধু।
__________________________________________________________________________

উপরের লেখাটা নিছকই একটা গল্প। বাস্তবটা এমনটা হয়নি। বজ্র এতোটা উদার, আত্মত্যাগী হয়নি। জগতের সকল মায়া পরিমাপের পদ্ধতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অপার্থিব অপরিমেয় মায়ার পসরা সাজানো সেই জল-ভরা চোখের অধিকারিণীর জন্য বজ্র একটুও ভালোবাসা অনুভব করেনি। সে আলিঙ্গন করেছিলো মেয়েটাকে! টেনে নিয়েছিলো নিজের বুকে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “অথবা একটি কাল্পনিক ভুল জন্মের গল্প

  1. লিখেছেন , খারাপ
    :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:
    লিখেছেন , খারাপ না
    =======================================================================

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 8