বাংলার মুসলমান অথবা বাঙালি মুসলমানের জাতীয়তাবাদী ভাবধারার রূপান্তর (তৃতীয় পর্ব)


অধ্যাপক নেহাল করিম ‘জাতি’ সম্পর্কিত বিভিন্ন পণ্ডিতের ধারণা বিশ্লেষণ করে ‘জাতি’র কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায় “nation is characterised by solidarity,common will,strong urge to become or to remain self-governed and independent.” এই যে solidarity (সংহতি)র কথা বলা হয়েছে সেটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরী হয়। একই ভৌগোলিক এলাকাতে বসবাস,অভিন্ন ইতিহাস- ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার,একই রকমের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবন এবং অভিজ্ঞতা থেকে জাতীয় সংহতির উৎপত্তি হয়। আরেকটা কথাও বলে রাখা প্রয়োজন যে ভৌগোলিক অখন্ডতা জাতি গঠনের একটা প্রয়োজনীয় শর্ত, তবে এটাই সব নয়। ( necessary condition but not a sufficient condition) ।

জাতি ও জাতীয়তাবাদ:

একটা জনসমষ্টি ঠিক কখন একটা জাতি হয়ে ওঠে সে বিষয়ে এখন একটু আলোচনা করা যায়। জন স্টুয়ার্ট মিল লিখেছেন জনগন তখনই একটা জাতি গঠন করে “if they are united themselves by common sympathy, which do not exist between them and any others,which make them co-operate with each other more willingly than other people .”জাতি গঠনে কিংবদন্তী বা মিথেরও ভূমিকা আছে। ইজরায়েলি সমাজবিজ্ঞানী Yuval Noah Harari তাঁর বই Sapiens :A Brief History of Humankind এ লিখেছেন “As far as we know, only Sapiens can talk about entire kinds of entities that they have never seen, touched or smelled.”তিনি বলছেন মানুষ আজ যে সারা পৃথিবীকে শাসন করছে, তার মূলে এই মিথ ও ফিকশন রচনার ক্ষমতা, যা অনেক মানুষকে একত্রিত করতে পারে।

অধ্যাপক নেহাল করিম ‘জাতি’ সম্পর্কিত বিভিন্ন পণ্ডিতের ধারণা বিশ্লেষণ করে ‘জাতি’র কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায় “nation is characterised by solidarity,common will,strong urge to become or to remain self-governed and independent.” এই যে solidarity (সংহতি)র কথা বলা হয়েছে সেটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরী হয়। একই ভৌগোলিক এলাকাতে বসবাস,অভিন্ন ইতিহাস- ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার,একই রকমের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবন এবং অভিজ্ঞতা থেকে জাতীয় সংহতির উৎপত্তি হয়। আরেকটা কথাও বলে রাখা প্রয়োজন যে ভৌগোলিক অখন্ডতা জাতি গঠনের একটা প্রয়োজনীয় শর্ত, তবে এটাই সব নয়। ( necessary condition but not a sufficient condition) ।

Benedict Anderson কে উদ্ধৃত করে তপন রায়চৌধুরী লিখেছেন “Anderson দেখিয়েছেন যে জাতীয়তাবোধ প্রকৃতির নিয়ম না, শুধু কৃষ্টি বা ঐতিহ্যগত ঐক্য থাকলেই তার উদ্ভব হয় না। উনিশ ও বিশ শতকে যে সব দেশ বা সমাজে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ হয়েছে তার সব ক্ষেত্রেই কতগুলি সাধারণ কারন দেখা যায় বিশেষ করে ইউরোপশাসিত দেশগুলোতে যে শ্রেণীর মানুষ ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্রে অংশগ্রহণ করে অথবা বৃত্তিমূলক পশ্চিমি শিক্ষার সুবাদে নতুন সব পেশা অবলম্বন করে তারাই আঞ্চলিকতার সীমা অতিক্রম করে আবিষ্কার করল যে জীবিকাবৃত্তি, নতুন সংস্কৃতির ভিত্তি বিদেশী ভাষাজ্ঞান, বিদেশী শাসনের সীমিত সুযোগ সুবিধা, তজ্জনিত আশা-নিরাশা নিয়ে তাদের যে জীবনবোধ, দেশের নানা জায়গায় বহু অপরিচিত মানুষ তার সামিল, ফলে কাছের মানুষ। এক জাতির কল্পনার ভিত্তি এখানেই। ”

ভারতীয় জাতি বলতে প্রকৃতপক্ষে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের যে রাজনৈতিক ঐক্য বোঝায়,সেটা ব্রিটিশ ভারতীয় রাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। ব্রিটিশের আগমনের পূর্বে মোগল সাম্রাজ্য প্রায় পুরো ভারতবর্ষ জুড়েই প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কিন্তুু সেই রাষ্ট্রীয় ঐক্য ভারতের অধিবাসীদের মধ্যে কোন রাজনৈতিক ঐক্য চেতনা কোন জাতীয় আন্দোলন সৃষ্টি করেনি। কারন সেই রাষ্ট্রীয় ঐক্য ভারতবাসীর জীবনকে কোন সাধারণ সূত্রে গ্রোথিত করেনি,তাদের কোন সাধারণ চরিত্র গঠন করেনি এবং সাম্রাজ্যভুক্ত কোটি কোটি মানুষের মধ্যে কোন পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও একাত্মতার জন্মদান করেনি। (বদরুদ্দিন উমর:২০০০)

স্যার যদুনাথ সরকার সম্পাদিত ‘বাংলার ইতিহাস’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে লিখেছেন “দুইশত বৎসরের ব্রিটিশ শাসন এবং পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ সমাজের উদাহরণ বাঙালি গোষ্ঠীর বড় বড় অনেকগুলি অংশকে এমনভাবে যাঁতাকলে পিষে গুঁড়া করেছে যে তাদের প্রাণ ও ভাবনা এক হয়ে গিয়েছে। একমাত্র এই ধরনের পিষাপিষি হলেই জাতি হওয়া সম্ভব হয়। (সরকার:১৯৭৬)

জাতীয়তাবাদের শিকড় এক গভীর জীবনধর্মী আবেগে,যা মানুষকে ব্যক্তিগত বা সম্প্রদায়গত ক্ষুদ্রতর স্বার্থবোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর পরিচয়ের অংশীদার করে। মূল্যবোধের দিক থেকে এই উত্তরণ বোধহয় জাতীয়তাবাদের সপক্ষে প্রধান যুক্তি-যতক্ষণ এই বৃহত্তর পরিচয় আগ্রাসী রূপ পরিগ্রহ না করে।(তপন রায়চৌধুরী:)

জাতীয়তার বোধ জিনিসটা খুব একেবারে বদ্ধ ধারনা নয়। এটা অনেকটা কাল্পনিক : “it(nation) is an imagined political community – – and imagined as both inherently limited and sovereign.” (Benedict Anderson:1983)এই কাল্পনিক মানে কিন্তুু অবাস্তব এবং অনস্তিত্ব নয়। তাঁর মতে মানুষ তার নিজ জাতির খুব অল্প সংখ্যক সদস্যকেই চেনে। বাকীদের সাথে তাদের কোনদিন দেখা সাক্ষাৎ হয় না। যাদেরকে চেনে তাদের সাথেই একটা ‘বাস্তব সম্প্রদায়’ এর বন্ধন তৈরি হয়। আর যাদেরকে চেনে না, সেই বৃহৎ সংখ্যক সদস্যদের মধ্যেও জাতিগত চেতনার কারনে গড়ে উঠে আরেকটা সম্প্রদায়গত বন্ধন। সেই বন্ধনটাকেই এ্যন্ডারসন বলছেন “ইম্যাজিনড কমিউনিটি”। অর্থাৎ বলা যায় Nation lives in the minds of the people.

শ্রেণী সচেতনতা না থাকলেও যেমন অতীতে মানব সমাজে শ্রেণীর অস্তিত্ব ছিল,তেমনিভাবে জাতিচেতনাসম্পন্ন কোন বাঙালি জাতি আদিতে না থাকলেও, এই জাতি তার অস্তিত্বের সমস্ত উপাদানসহ বিরাজ করেছে আধুনিক যুগের বহু আগে থেকেই।ইতিহাসের এক একটা বিশেষ পর্বে বাঙালির জাতীয়তার চেতনায় রূপান্তর হতে হতে বিশ শতকের সত্তরের দশকে বাংলার মুসলমান জাতি হিসেবে নিজেদের একটা জ্বলন্ত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের প্রয়াস নেয়।

অনেকেই বলেন যে ভারত এক জাতি নয় ;বহু জাতি।সে কথা অবশ্যই সত্য। পুরো ভারতবর্ষ নানান জাতি (ethnic groups) এবং ভাষাভিত্তিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত। সেই সাথে ছিলো হিন্দুদের মধ্যে বর্ণের পার্থক্য এবং বর্ণহিন্দুর বাইরে “তফসিলি সম্প্রদায়”। (“তফসিলি সম্প্রদায়” নামকরণটা ব্রিটিশ আমলের। ইংরেজিতে Depressed Class, Schedule Caste ইত্যাদি নামে সম্বোধন করা হয়। মহাত্মা গান্ধী এর নাম দিয়েছিলেন “হরিজন”)। সম্রাট আকবর বিশাল ভারতবর্ষের অধিকাংশ এলাকাকেই মুঘল সাম্রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত করতে সমর্থ হলেও রাজপুত, শিখ, মারাঠা প্রভৃতিরা বিদ্রোহ জারী রেখেছিল। আওরঙ্গজেবের প্রায় পুরোটা রাজত্বকাল কেটেছে মারাঠাদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন ওইসব বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে পদাবনত করতে সক্ষম হয়। এর ফলে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো তারাও একই ভাগ্য বরণ করতে বাধ্য হয়। এই অভিন্ন ভাগ্য -পরাধীনতার গ্লানি আর শোষণমূলক শাসন- সারা ভারতবাসীকে একসূত্রে গেঁথে দেওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করেছিল। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সঠিকপথে চললে সর্বভারতীয় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।জাতিসমূহের ঐক্যে চিন্তার রাজনৈতিক প্রতিফলনই জাতীয়তাবাদ।বিচক্ষণ নেতৃত্বের পক্ষে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটানো সম্ভব ছিল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 + = 73