একটি খুন

“থাকুক না একটুখানি নীরবতা
কোলাহল থেকে মুক্ত কিছু সময়
বেশ ভালোই তো লাগছে নীরবতাটুকু
তবু কেনো নিজেকে খুঁজি কোলাহলের মাঝে?”

জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আনমনে চারটি লাইন মিলিয়ে ফেলে আকাশ। ট্রেনের প্রতিটি কামরায় নীরবতা ছেয়ে গেছে। এখন সময় রাত ২ টা বেজে ৪৫ মিনিট। নীরবতাটাই এখন স্বাভাবিকতা। দূরে বাড়ির মৃদু আলো চোখটা ঝলসে দিচ্ছে। গাঢ় অন্ধকারের মাঝে ওদের মনে হচ্ছে রাজা; যার হুকুমে বাকীরা চলছে। হঠাৎ মনে পড়ে যায়ঃ

“তবে কেন চলে যাচ্ছি সবকিছু ফেলে?
আমার প্রাণ ভালোবাসা সবই তো এখানে,
তবু কেন চলে যাচ্ছি এদেরকে ছেড়েছুড়ে?
অথচ এদেরই তো আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছি,
এদের মাঝেই তো নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি,
তবে কি এমন হলো যে আমাকে চলে যেতে হচ্ছে,
কিইবা সেই ব্যথা যা আমাকে আলাদা করে ফেলেছে সবার থেকে,
তবে কি আমি চলে যাচ্ছি আমাকে ফেলেই অচেনা গন্তব্যে?”

আচমকা পানি এসে পড়লো মুখে। অন্য এক ভুবন থেকে বাস্তবতায় ফিরে এলাম। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। মুখে এসে পড়ছে পানির ঝাপটা। ভালোই লাগছে, কিন্তু জানলা খোলা রাখা যাবেনা। কোলে রাখা গিটারটা ভিজে গেলে নষ্ট হয়ে যাবে। গিটারটাকে সিটে রেখে জানলা বন্ধ করে দিলাম। ব্যাগ থেকে দিয়াশলাইটা বের করে চললাম ট্রেনের দরজায়। সেখানে কেউ নেই। একটা সিগারেট মুখে নিয়ে দিয়াশলাই দিয়ে জ্বালিয়ে নিলাম। এরপর বাহিরে তাকিয়ে সিগারেটে টান দিতে দিতে ভাবতে লাগলাম “এমন কি হলো যে আমাকে চলে আসতে হলো? তেমন কিছু কি হয়েছিল?”

রাতটা ছিল এরকম বৃষ্টির। নিঃশব্দে হাঁটছিলাম। দূরে জাহেদের রুমে আলো জ্বলছিলো। তখন বেশি রাত ছিলনা ১১ টা কি ১২ টা হবে। তবু কেন যেন ঐ আলোটা বেমানান লাগছিলো। ভেতরটা কেমন যেন কেপে কেপে উঠছিলো। আমি ঐ আলোর কাছে না গিয়ে পারলাম না। জাহেদের ঘরের একটা অতিরিক্ত চাবি আমার কাছেই ছিল। খুব কাছের বন্ধু হওয়ায় সে নিজেই দিয়েছিলো। আমি অন্ধের মতো অনুকরণ করছিলাম আলোটাকে। নিজ হাতেই অতিরিক্ত চাবি দিয়ে নিঃশব্দে দরজা খুললাম। ভিতরে ঢুকেই হাঁসির শব্দ শুনতে পেলাম পাশের রুম থেকে। দরজাটা খোলাই আছে। আমি অন্ধের মতো এগিয়ে গেলাম আলোকে পেতে। রুমের সামনে দাঁড়াতেই আমি অন্ধ হয়ে গেলাম। আমার সমগ্র দেহ অবশ হয়ে গেলো। শিরা দিয়ে মল ঢুকতে লাগলো, নিঃশ্বাসের সাথে মল ঢুকতে লাগলো; মনে হলো সমগ্র দেহ মলে ভর্তি হয়ে গেছে। আমি সেই মল ঝেড়ে ফেলার জন্য ব্যগ্র হলাম। পাশেই একটা দাঁ ছিলো; তা দিয়ে সব মল কেটে ঝেড়ে ফেললাম।

কি দেখেছিলাম আমি? এই যা সিগারেটের আগুনটা পড়ে গেলো। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে ভাবতে লাগলাম। এমন কি দেখলাম যে আমাকে সব ছেড়ে চলে আসতে হলো?

জাহেদের ওষ্ঠে দেখেছিলাম আমার প্রিয়তমা নীলার ওষ্ঠ।

এতোটুকু দেখেই চলে এসেছি?

না, নীলা আর জাহেদ দু’জনেই অসীম সুখে আবদ্ধ ছিলো। নীলার চাঁদের মতো শরীর নিয়ে খেলা করছিলো জাহেদ। নীলার শরীরের সাথে জাহেদের শরীর মিলছিলো না। চন্দ্র সদৃশ দেহের সাথে রাস্তায় পড়ে থাকা নেড়ি কুকরের মিলন মনে হচ্ছিলো জাহেদ-নীলার মিলনকে। একদিকে অপরূপ সৌন্দর্য, তারসাথে আছে কুৎসিত এক বর্জ পদার্থ। আমার চোখ এরকম সৌন্দর্য-কুৎসিতের খেলা দেখে অন্ধ হয়ে গেলো।

এইতো সেই নীলা যার ওষ্ঠে ওষ্ঠ রেখে অমৃত পান করেছি। এইতো সেই নীলা যার দেহের দু’টো চাঁদকে নিজের জীবনের আলো ভেবে বেঁচেছিলাম। এইতো সেই নীলা যার মন আমার মনের সাথে মিলে যেতো। এইতো সেই নীলা যার নাভির নীচে নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দরজা ভেবেই দিব্যি জীবন কাটাচ্ছিলাম। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম অক্ষত যে নাভীর নীচকে ভেবেছিলাম নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দরজা; সেটি অক্ষত নয়- বার বার ব্যবহারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। সতীত্ব নিয়ে যদিও খুব একটা মাথাব্যথা নেই তবুও নীলার ব্যপারে সঙ্কীর্ণতা এসেই যেতো। হয়তো আমার দোষে না; কেননা ওর কথার কারণেই এমন ভেবেছিলাম।

নীলার সত্যগুলো আজ মিথ্যা হলো; আমার পৃথিবীটাই ভেঙে পড়লো। এরকম আপার্থিব সুখ-দুঃখের খেলা আমি মেনে নিতে পারিনি। পাশের পড়ে থাকা দাঁ দিয়েই খুন করে ফেললাম জাহেদকে। নীলাকে কিছুই বলতে পারিনি। আকস্মিক আক্রমনে হতভম্ব হয়ে পড়ে। ওর দিকে একবার তাকিয়ে মুখ ফিরেয়ে চলে এলাম।

কোন বিচার ছাড়াই মেরে ফেললাম একটি প্রাণকে। এমন কিছুই করেনি যে তাকে মারতে হবে; তবু মেরে ফেললাম। কেনো? কারণ সত্যটা মেনে নিতে পারিনি। সত্যটাকে মিথ্যে করতে পারবো ভেবেছিলাম খুন করে।

অতঃপর বুঝতে পারলাম সত্যকে কখনো মিথ্যে করা যায়না। সেই থেকে শুরু আমার অজানা গন্তব্যে পথচলা। প্রতিনিয়ত আমি পালিয়ে বেরাই আইনের কাছ থাকে; প্রকৃতপক্ষে আইনের কাছ থেকে না নিজের কাছ থাকে। কারন নিজের চেয়ে বড় সত্য আর কেউ নেই…..।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 + = 69