একটি সাইকেল ও কয়েকটি জীবন


সুন্দর এক সকাল। জসিম হেঁটে স্কুলে যাচ্ছে। সে থাকে  এক বস্তিতে। বস্তির জীবন কেমন তা আমি জানি না। লোকে বলে বস্তির জীবন নাকি বেশ কষ্টকর, তারা নাকি জীবিত থেকেও মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করে! তবে জসিমকে দেখে তা মোটেও বোঝা যায় না। তার মত সুখী মানুষ যেন এ পৃথিবীতে আর একটিও নেই!

শুনেছি, জসিম জন্মের পর পর তার মাকে হারায় । সে তার মা-বাবার তৃতীয় সন্তান। তার আরও দুইটা বোন আছে। সে সর্বশেষ। তার বাবা ট্রেনে পেপার বিক্রি করে কিছু টাকা জোগাড় করে। তা দিয়ে তাদের পরিবার চলে না। তাই জসিমে দুই বোন অন্যের বাড়িতে কাজ করে। তারা দুইজনেই অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। জসিমের বাবা এবং তার বোনদের অনেক ইচ্ছা যে জসিম অনেক শিক্ষিত হয়ে ভালো জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই তারা জসিমকে কোনো কাজ করতে দেয় না। কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও জসিমকে তারা স্কুলে পাঠায়।

একদিনের কথা। আমাদের এক সহপাঠী শিহাব স্কুলে এক নতুন সাইকেল নিয়ে আসে। আমরা সবাই ভিড় করি তার সাইকেল দেখার জন্য। সবাই সাইকেলটাকে ছুয়ে দেখে। জসিমও দেখতে যায়। তবে শিহাব তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। সে বলে,” এমন সাইকেল বাপ জন্মেও দেখেছিস কোথাও? গাইয়া কোথাকার।”

জসিমের মন খারাপ হওয়ার কথা। তবে তা হয় না। হয়ত তার মনও এখন তার শরীরের মত দৃঢ় হয়ে গেছে। সে মুখে আবছা হেসে সেখান থেকে উঠে পড়ে। তার মনে বিন্দু মাত্রও কষ্ট নেই। তবে তার চোখ দুটো থেকে টপ টপ করে পানি পড়তে থাকে। সে অনেক চেষ্টা করে দুনিয়ার সামনে তা লুকোনোর। কিন্তু পারে না। সে এভাবে বাড়িতে চলে আসে। জসিমের বড় বোন তার চোখ দেখেই বুঝে যায় কিছু একটা হয়েছে। সে জসিমকে বলে,”কী হয়েছে ভাই?”

জসিম তার বড় বোনকে সব কথা বলে। এটিও বললো। তার বড় বোন এসব শোনে জসিমকে চিপে ধরে কাঁদতে শুরু করলো।

বাড়ির বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা জসিমের বাবার কানে সব কথা চলে যায়। তিনি তার দু-চোখের পানি থামাতে হিমশিম খেতে থাকেন। তিনি ঠিক করেন আজকেই জসিমকে তিনি একটা নতুন সাইকেল কিনে দিবেন। তিনি চলে যান তার মালিকের কাছে। তিনি তার কাছ থেকে চার হাজার টাকা ধার নেন। সে টাকা দিয়ে তিনি জসিমের জন্য একটা সাইকেল কিনেন। সাইকেলটা কম দামী, তবে দেখতে বেশ সুন্দর। তিনি চলে যান বাড়িতে, জসিমকে উপহার দিতে সেই সাইকেলটা। তিনি বাহির থেকেই জসিমকে ডাকেন। জসিম বের হয়ে আসে। জসিম নতুন সাইকেল দেখে অবাক হয়ে যায়। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে সাইকেলটাকে নাড়তে থাকে। জসিমের বাবা তার আনন্দ দেখে কেঁদে ফেলেন। তিনি জসিমের মুখের দিকে তাকিয়ে পিছাতে থাকেন। তিনি যেন আনন্দে বধির হয়ে যান, তিনি যেন কিছুই  শুনতে পান না। তাদের বাড়িটা রেল লাইনের পাশে। এমন সময় একটা ট্রেন পওওওওওও…. আওয়াজ করতে করতে ছুটে আসে। জসিমের বাবা জসিমের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি তার আনন্দে আত্নহারা চোখ দুইটি দেখেন, সতেজ দুইটি হাত দেখেন, আর দেখেন জসিমের  মুখটি শেষবারের মত। তিনি পিছাতে থাকেন। পিছাতে পিছাতে লাইনের উপর চলে আসেন। ট্রেনটি তীব্র বেগে তাকে ধাক্কা মারে।

চারিদিক স্তব্ধ। শুধু তিনজনের ‘বাবাআআ…’ বলে তীব্র চিৎকার শোনা যায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

83 − = 76