সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে (পর্ব-১)

বৃষ্টিরা দুই ভাই-বোন। শুনেছি বৃষ্টির বড় ভাই অনেক ভালো ছাত্র। সে এখন বুয়েটে পড়ে। পারফরমেন্সও বেশ ভালো। কয়েকদিনের মধ্যে বিদেশে যাবে। তবে বড় ভাই ভালো ছাত্র হলে ছোট বোনদের উপর কেমন আগুন বয়ে যায় তা বৃষ্টিকে দেখলেই বেশ বোঝা যায়।

সুন্দর এক সকাল বৃষ্টি শুয়ে আছে। সে এবার নবম শ্রেণীর পরীক্ষা দিয়ে দশম শ্রেণীতে উঠেছে। প্রতিবারের মত এবারও সে দ্বিতীয় হয়েছে। বাড়িতে সবাই বেশ খুশি। শুধু তার বাবা বাদে।

তার বাবা চায় বৃষ্টি যেন প্রথম হয় জীবনের প্রতিটা যুদ্ধে। বাবা হিসেবে এটা চাওয়া বেশ স্বাভাবিক। তবে বৃষ্টির তা ভালো লাগে না। তার খুব ইচ্ছা সে ভালো গায়িকা হবে। সে গানও গায় বেশ ভালো। দুই একবার শুনেছি, তার গলা অসাধারণ। রবীন্দ্রনাথ যেন ওর জন্যই তার সমস্ত গান লিখেছে।
সে ঠিক করে আজ তার বাবার সাথে এই বিষয়ে কথা বলবে। সে নিজেকে ভালোভাবে গুছিয়ে নিয়ে বাবার কাছে যায়।
সে ভয়ে ভয়ে বলে -বাবা, একটা কথা ছিল।

-কী কথা, মা?
-ইয়া মানে……।  আমি একটা গানের স্কুলে ভর্তি হতে চাচ্ছি।
-মানে! তুমি জানো না সামনে তোমার পরীক্ষা? আর এখন গান?
-তা জানি। তবে আমার খুব ইচ্ছা আমি বড় গায়িকা হবো।
-বলো কী! তুমি আমার মেয়ে হয়ে গায়িকা হবা! তোমার বড় ভাইকে দেখ, কিছু শিখো তাকে দেখে।

তার মনে হয় খারাপ লাগতো না, যদি না তার বাবা তার বড় ভাইয়ের কথা বলতেন।
বৃষ্টি আবছা গলায় বলে- আচ্ছা।

বৃষ্টি ঘর থেকে বের হবে তখনি তার বাবা তাকে ডাকে, বলে- শুনো মা। এটা জীবনের প্রাথমিক পর্যায়। গান তো তুমি সবসময় শিখতে পারবা। তবে এস.এস.সি বারবার আসবে না। তাই আমি বলবো যে, তুমি ওসব চিন্তা বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দাও।
-আচ্ছা।
-তোমার আরও শিক্ষক লাগলে বলো কিন্তু। প্লাসটা মিস যেন না হয়।
বৃষ্টি কিছু বলে না। সে দুইটা গৃহশিক্ষক এবং একটা কোচিং করে।
বৃষ্টির স্বপ্নটা ছিল পেয়ালার মতো, একটু বাতাস লাগতেই ভেঙ্গে চুরমার। তবে তাকে দেখে ওতোটাও শোকার্ত মনে হলো না। হয়ত সে আগে থেকে জানতো এমন কিছু একটা হবে।

                                           ২

বৃষ্টি এখন স্কুলে। ক্লাসে বসে আছে। তাদের রসায়ন ক্লাস হচ্ছে। রসায়ন তার প্রিয় সাবজেক্ট। শুনেছি সে রসায়নে সমস্ত স্কুলের মধ্যে সেরা। হঠাৎ ক্লাসে হেড স্যার এসে হাজির।
এসে সে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে- বৃষ্টি, I want to see you in my office in 10 minutes।

বৃষ্টি ভয় পেত না যদি সে ভূত দেখতো। তবে সে হেড স্যারকে দেখেছে। সে হেড স্যারকে খুব ভয় পায়। যেহেতু হেড স্যার ডেকেছে, সেহেতু সে গেল।
বৃষ্টিকে ঢুকতে দেখেই হেড স্যার বলে উঠলো – ও এসেছো। good girl.

– Thank you, Sir.
– Ok. So বৃষ্টি, What you think about you? I mean, কী মনে হয় এস.এস.সি তে তুমি কী পাবা?
বৃষ্টি এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না, ওর মুখ দেখে তো তাই মনে হলো। তবুও সে বললো- স্যার, আমি আমার সর্বাত্মকটা চেষ্টা করবো।
– Good. But শুধু চেষ্টা করলেই হবে না। তোমার নামের পোস্টার যেন আমার স্কুলে ঝুলোয় রাখতে পারি। Understand?
– জ্বী, বুঝেছি।
– Well, now you can go. And remember that you have to do something bigger.

বৃষ্টি হাসি মুখে বেরিয়ে গেল। তবে তার মনে এক তীব্র আগুন জ্বলতে থাকলো। সে তার স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছে তা সে আগেই জানতো। তবে সে এখন এমন এক প্রতিযোগিতায় নামতে চলছে যা তার জন্য তৈরি না বা যার জন্য সে তৈরী না।
টিফিনের সময়, ক্লাস চলাকালীন সময়, ছুটির সময়- তার বান্ধবীরা তাকে মনে করিয়ে দিতে শুরু করলো যে সে এই দূষিত প্রতিযোগিতার অংশ। বৃষ্টি বুঝতে থাকে সে আর তার স্বপ্নের দিকে এগোতে পারবে না। সে সমস্ত ব্যাথা চেপে রাখে, কাউকে বলতে পারে না। কেউ শুনতে চায় না- এ কথা বললেও ভুল হবে না।
যত দিন যেতে থাকে বৃষ্টির উপর চাপ তত বাড়তে থাকে। তবে সে তার সর্বাত্মক দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। 

(চলবে……………)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে (পর্ব-১)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 + = 72