মুক্তি

নিরিবিলি নির্জন স্থানে, শহর হতে বেশ দূরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টি। পাহাড়ী এলাকা, গাছাপালা জঙ্গলে ঘেরা অবারিত ক্যাম্পাস।

এখানে অগ্রগামী হওয়ার সুযোগ যেমন সহজে মেলে আবার পা ফশকানোর সম্ভাবনাও বেশি। কেউ যখন পাশে থেকে দেখে তখন সে শুধু স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না একইসাথে বিপদটাও তার চোখে পড়ে। অপরদিকে নির্জনতার সৌন্দর্য আছে, কদর্যতাও আছে।

প্রকৃতিকে আমরা দেখি কিন্তু প্রকৃতি আমাদের দেখে না। প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক খুবই একপেশে, এমনকি অন্য কোনো প্রাণীও বিশেষত নয়, শুধু মানুষ, মানুষকে আমরা দেখি মানুষও আমাদের দেখে। এ সম্পর্ক অসাধারণ, শ্রদ্ধার্ঘ।

তিন্নি মাত্র দুই মাস হল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। অশিক্ষিত আত্মীয়-পরিমণ্ডলের ধনীর মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে যা হয়- তারা তিলকে তাল বানিয়ে বিষয়টি আলোচনা করতে চায়।

তিন্নি দেখতে সুন্দর, শরীরের গড়ন আরো সুন্দর। ওকে দেখেই যে কোনো পুরুষ তার উদ্দেশ্য ঠিক করে ফেলে। লক্ষ্যার্জনে ব্যর্থ না হয়ে কোনো পুরুষ তার সমালোচনায় মনোযোগী হয় না। তিন্নিও শিখে গিয়েছে কীভাবে কালক্ষেপণ করে করে তোষামোদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকতে হয়।

আসলে অনেক উচ্চপদাসীন এবং ‘মর্যাদাসম্পন্ন’ মানুষও শয্যা পাতার আশায় কামিনীর গুরুত্বহীন কথায় কর্ণপাত করে, শুধু কর্ণপাত করে না, একেবারে মর্মপাত করার ভাণ করে।

প্রথম প্রথম কিছুদিন বিরক্ত-বিভ্রান্ত হলেও তিন্নি এখন মজা পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক কোন ছার, ছাত্ররা তো ছারপোকা, অধ্যাপকেরাই ওকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে আরম্ভ করেছে। ওর নিজের বিভাগের সকল পুরুষ অধ্যাপক কোনো না কোনো অজুহাতে ওকে রুমে ডেকে নিয়েছে ইতোমধ্যে।

দিন যায় ওকে পাত্তা দেয়ার মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। ওর পাশে ঘুরঘুর করা পুরুষের মধ্যে প্রতিযোগিতার বিষয়টিও ওর চোখ এড়ায় না। ও উপভোগ করতে থাকে তাদের ওকে যারা ভোগ করতে চায়।

ধীরে ধীরে ওরও কারো কারো প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। ও বাছাই করার সুযোগ পায়। কখনো কখনো ফাঁদেও পড়তে হয়, তাই ছাত্র নেতা থেকে ভালো ছাত্র হয়ে ভালো শিক্ষক সব খানেই যাওয়া হয়েছে এই এক বছরে ওর।

প্রথম বর্ষ শেষ না হতেই নন্দীনীর কোমরের নিচে হাটু গেড়ে স্থান পেয়েছে ডজন খানেক বুদ্ধিজীবীও, যাদের মধ্যে অধ্যাপক আছেন কয়েকজন।

এই এক বছরের অভিজ্ঞতায় তিন্নির একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। সম বয়সী এবং কম বয়সীদের তুলনায় সফল-সক্ষম পুরুষদের ও বেশি পাত্তা দিতে শুরু করেছে যদিও তারা বেশ বয়স্ক হয়, তারপরেও এটাকে ও নিরাপদ ভাবছে।

পঞ্চাশোর্ধ একজন পুরুষের সাথে বিশ বছরের একটি মেয়ে চললে সেখানে অনেক সম্পর্ক অাঁচ করা যায়, এবং মানুষ প্রথমত ভদ্র হতে চায় বলে স্বাভাবিক সম্পর্কগুলোর কথাই চিন্তা করে।

তাছাড়া সক্ষমতা থাকার কারণে তাদের সাথে নির্বিঘ্নে চলাও যায়। তাদের গাড়ি থাকে, বাড়ি থাকে, নিয়ে ভালো হোটেলে ওঠার ক্ষমতা থাকে, এগুলো বিশেষ এডভান্টেজ।

বেশি বয়সী পুরুষের সাথে অসুবিধা কিছু নেই, বরং অনেক ক্ষেত্রে যুবকের চেয়ে বেশি পাগলাটে হয় তারা, বাইরে না হলেও যুবতীর সাথে বিছানায় তারা মরণ কামড় দিতে খুবই পারদর্শী, রংঢং কোনো কিছুতেই কিছু ঘাটতি হয় না, শুধু তাদের লুকাতে হয় সবকিছুতে -এই যা।

ষাটের বেশি বয়স ওনার। তিন্নির বয়শ তখন বিশ। চল্লিশ বছর মুহূর্তে মূল্যহীন হয়ে গিয়েছিল নেশায়। তিন্নিকেও তখন সীমাহীন কৌতুহল ও খেলায় পেয়ে বসেছে।

ও দেখতে চায় শ্রেণিকক্ষের একজন প্রভাবশালী অধ্যাপক, টক শোর বক্তা কীভাবে চার দেয়ালের মাঝে এসে মেয়ের বয়সী নগ্ন নারীর দুই উরুর মাঝে আশ্রয় খুঁজে পায়। পুরুষের এ অসহায়ত্ব তিন্নিকে দিনকে দিন সীমাহীন আকর্ষণ করছে। অভ্যস্ততায় শরীরটাও এখন ওর নেশাগ্রস্ত হয়েছে।

আজকে যেন নেশার ঘোরটা একটু বেশি। দামী ব্রান্ডের মদ খেয়েছে ওরা। এ মদ মাতাল করে না, শুধু সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ করে দেয় একে অপরে। তিন্নিও আজকে তাই অধ্যাপকে নিমগ্ন। প্রথা ভেঙ্গে আজকে নিজেই নিজের পোশাক খুলেছে সড়সড় কর।

বক্ষ উন্মুক্ত করে গোলাপী একটা দুধ অধ্যাপকের গালে প্রবেশ করিয়ে তাকে বাধ্য করেছে লাল পানির গ্লাস নামিয়ে রাখতে।

বর্বর পুরুষ, কামুক পুরুষ, প্রেমিক পুরুষ এবং অপুরুষ -এই চার ধরনের পুরষের দেখা তিন্নি এ পর্যন্ত পেয়েছে। তবে বেশিরভাগ পুরুষ প্রায় একই, কামুক ওরা সবাই, শরীরে না হলেও মনে।

তিন্নি প্রেমিক পুরুষের দেখা পেয়েছে খুব কম। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পুরুষের মধ্য থেকে প্রেম কমতে থাকে এবং কাম বাড়তে থাকে। তবে এই অধ্যাপকটা প্রেমিক এবং কামুক।

এতটা ভালোবেসে গিট খুলতে পারেনি কেউ। এই বয়সেও এত সুন্দর করে দুধের নিপলে জিভ বুলাতে যে পারে সে তো প্রেমিকই। ঝর্ণাধারার মত নির্দিধায় সে নেমে গিয়েছে কোমর হতে দুই ইঞ্চি নিচে যেখানে আজ সত্যিই ফুল ফুটেছে। বয়স যেমনই হোক স্বৈরিণী কোনো নারী কি তাকে ভালো না বেসে পারে?

এত এত রাজা উজিরকে অর্ধনর্মিত করে তিন্নি এখন মনে মনে মহারাণী হয়ে উঠেছে। দুই বছর একই ধরনের জীবনযাপনে শরীরে-মনে ক্লান্তিও এসেছে। এখন তাই ও জীবন ধারা একটু বদলেছে, বিভিন্ন সভা সমাবেশে যায়, রাজনীতির কথা টথাও বলতে চায়।

সাহিত্যপ্রেমী লম্পটদের কাছ থেকে সাহিত্য কিছু শিখেছে, ফলে সেগুলোও আওড়াতে চায়। এতদিনের স্বৈর জীবন থেকে শেখাও হয়েছে অনেক কিছু, তবে সত্য হচ্ছে- শেখা হয়নি যা সেটিই বরং বেশি মূল্যবান।

বিভিন্ন মহলে গিয়ে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে বটে রূপ এবং আচমকা মুখস্ত করা দু’একটি ভারী কথা বলায়, তবে অচিরেই প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে অন্তঃসারশূন্যতা।

বিশেষ কোনো জায়গায় স্থান না হলেও আতেল গ্রুপে ওর একটি স্থান হচ্ছে বর্তমানে। সম্ভ্রান্তদের বিছানায় যেমন ও ছিল মধ্যমণি এখন ভবঘুরেদের আড্ডায়ও তিন্নি মধ্যমণি। এভাবে আরো দুটি বছর কেটে যায়।

দুটি জীবনের মধ্যে ফারাক ও টের পায়। এক জায়গায় যৌনতা মূখ্য, সাহিত্য রাজনীতি উপলক্ষ্য এবং তা আসলে আয়-খ্যাতির উপাদান মাত্র। আর এই ভবঘুরেদের জীবনে সাহিত্য-রাজনীতি-ভালোবাসাই মূখ্য, যৌনতা সেখানে কিছু বাধ্যবাধকতা শুধু।

ভবঘুরে জীবনের প্রতি তিন্নির মায়া হয়, তবে আকর্ষণ অনুভব করে উপরের মহলের নিভৃত প্রাসাদেই। আবার সেখানে ফিরতে শুরু করে। দুই জীবনের মধ্যে ও এখন একটি সেতুবন্ধন করে নিয়েছে।

সব মানুষই নিজের জীবন ধারায় কিছু যুক্তি এবং মহানুভবতা যোগ করতে চায়। তিন্নি ভেবেছে, উপরেরে মহলটা যদি ভবঘুরেদের ভাবনা ও জীবনে কাজে লাগানো যায়।

ও এতদিনে এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে উপরের মহলের ওগুলো ধাড়ি শয়তান। ওর মত সামাজিক বেশ্যা তাদের ফ্লাটে প্রতি সপ্তাহে বদলে যায়, কারো কারো সকাল বিকাল বদলে যায়।

তিন্নির পড়াশুনা শেষ হয়। শরীরও আজকাল ভীষণ অনাগ্রহী হতে শুরু করে, হৃদয় ব্যাকুল হয় হতাশার সাথে পাল্লা দিয়ে। সহপাঠীরা সবাই যখন চাকরি খুঁজছে, চাকরি পাচ্ছে তখনো ও এপাশ ওপাশ করে ফিরছে।

হতাশা বাড়ছে, ভুল-বিভ্রান্তি সবই বাড়ছে সুদেআসলে। এখন আর আসক্তি নেই। শুধুই অভ্যস্ততা। তিন্নি চেষ্টা করছে বেরিয়ে আসার, কিন্তু হচ্ছে না। মাতবরির নেশা, মধ্যমণি হয়ে থাকার নেশা যাচ্ছে না কিছুতে।

জ্ঞান বাড়েনি কিছু কিন্তু ভাব বেড়েছে, আড়ম্বর বেড়েছে, ভড়ং বেড়েছে, বিভিন্ন মহলে চলতে চলতে সবকিছুর শিরোণাম জানে। যেখানেই যায় বলতে চায় ওসব। মানুষ দ্রুতই বুঝে যায় ওর মনবৈকল্য।

ও আর সইতে পারে না কিছুতে। অবহেলা সইতে সে একেবারেই অনভ্যস্ত। অসহায়, অনাহূত, সমালোচিত তিন্নি দিগ্বিদিক হয়ে পড়ে।

আজকের রাতটা যেন বড্ড বেশি দুঃসহ ঠেকে। ভালোবেসেছিল, ভালোবাসতে চেয়েছিল যারা তাদের কথাই ঘুরেফিরে মনে পড়তে থাকে। পিতা-মাতার কথা মনে পড়ে।

বারান্দার রেলিং ধরে ও দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। জীবনের সাথে বোঝাপড়া করতে করতে আর পেরে ওঠে না অবশেষে, শেষ রাতে ও নিজেকে সঁপে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নীরবে লোকান্তরে।
-চলবে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “মুক্তি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

92 − 87 =