স্মৃতিকোষ থেকে শবে বরাতের একাল সেকাল


কৈশোরের শবে বরাত ভাল ছিল। মাসখানেক আগে থাইকা মোররা কিংবা মরিচাবাতি (আতশবাজির মত, লোকাল প্রোডাকশন) বানানোর প্রস্তুতি চলতো। গরুর ঝিল্লি, পটাশ, ছররা, বড়ইয়ের ডালের কয়লা ইত্যাদি ইত্যাদি ছিল রসদ। ইলেক্ট্রিক মোররা বইলাও একটা জিনিস ছিলো, ওইটা লুঙ্গি কিংবা শাড়ি ভেদ কইরা যাইতে সক্ষম ছিল। কারেন্টের স্পার্কের মত আগুন দিয়া ছুইটা যাইতো। পাতি মোররাও উড়তো, কিন্তু দাপট থাকতো কম। শতশত পাতি আর ইলেকট্রিক মোররা বানাইয়া মজুদ করতাম, শবে বরাতের অনেকদিন আগে থেকে শুকাইয়া শুকাইয়া সন্ধ্যায় একটা দুইটা টেস্ট রান দিতাম। বিজনেসও হইতো, গুড়াগুড়া পিচ্চি ছোটভাইরা ৫ টাকা ১০ টাকার মোররা কিনতো, ওইটায় মোররা বানানোর বিনিয়োগ উইঠা যাইতো। প্রতি শবে বরাতে কোনো না কোনো চাচা খালার শাড়ি লুঙ্গির বারোটা বাজতো। নিজেদের জামাকাপড়ও বাদ যাইতো না। পাতি হাতবোম বানাইছিলাম একবারই, কিন্তু লাল পটাশ, সাদা পটাশ একলগে ডলা দিতে গিয়া হাত প্রায় উড়াইয়া ফেলতে নিছিলো পায়েল ভাই, ওই কাহিনির পরে কেউ আর সাহস করিনাই। মোররা বানানো রিস্ক ফ্রি ছিল, কেবল জ্বালাইলেই যা সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হইতো। একবার গ্যাস লাইনের উপর পইড়া আগুন লাগছিলো। মেইন পাইপলাইনে লিকেজ ছিল, গ্যাস বাইর হইতো, ওইখানে আগুন ধইরা গেছিলো। মাটির তলে পাইপ ছিল, দেখলাম ঘাসের উপর হুদাই আগুনের বুদবুদ। বালু ছালা পানি দিয়া সবাই মিলা নিভাইছিলাম। ওই জায়গা এড়াইতাম পরে।

শবে বরাত ভালো গেছে, ইবাদতে বিশ্বাসী না, চাওয়া পাওয়ার কিছু নাই, তবু গেছে। রাত জেগে দেড়টা মুভি দেখছি, চ্যাটাইছি, কথা বলছি। ভোরে দোস্তের সাথে গ্যাজাইতে গেজাইতে বিড়ি খাইছি, গালে হাত দিয়া তার নখ কাটা দেখছি। এরপর চোখ ধইরা আসলে ঘন্টা দুই ঘুমাইতেও সক্ষম হইছি।

কৈশোরের শবে বরাত ভাল ছিল। মাসখানেক আগে থাইকা মোররা কিংবা মরিচাবাতি (আতশবাজির মত, লোকাল প্রোডাকশন) বানানোর প্রস্তুতি চলতো। গরুর ঝিল্লি, পটাশ, ছররা, বড়ইয়ের ডালের কয়লা ইত্যাদি ইত্যাদি ছিল রসদ। ইলেক্ট্রিক মোররা বইলাও একটা জিনিস ছিলো, ওইটা লুঙ্গি কিংবা শাড়ি ভেদ কইরা যাইতে সক্ষম ছিল। কারেন্টের স্পার্কের মত আগুন দিয়া ছুইটা যাইতো। পাতি মোররাও উড়তো, কিন্তু দাপট থাকতো কম। শতশত পাতি আর ইলেকট্রিক মোররা বানাইয়া মজুদ করতাম, শবে বরাতের অনেকদিন আগে থেকে শুকাইয়া শুকাইয়া সন্ধ্যায় একটা দুইটা টেস্ট রান দিতাম। বিজনেসও হইতো, গুড়াগুড়া পিচ্চি ছোটভাইরা ৫ টাকা ১০ টাকার মোররা কিনতো, ওইটায় মোররা বানানোর বিনিয়োগ উইঠা যাইতো। প্রতি শবে বরাতে কোনো না কোনো চাচা খালার শাড়ি লুঙ্গির বারোটা বাজতো। নিজেদের জামাকাপড়ও বাদ যাইতো না। পাতি হাতবোম বানাইছিলাম একবারই, কিন্তু লাল পটাশ, সাদা পটাশ একলগে ডলা দিতে গিয়া হাত প্রায় উড়াইয়া ফেলতে নিছিলো পায়েল ভাই, ওই কাহিনির পরে কেউ আর সাহস করিনাই। মোররা বানানো রিস্ক ফ্রি ছিল, কেবল জ্বালাইলেই যা সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হইতো। একবার গ্যাস লাইনের উপর পইড়া আগুন লাগছিলো। মেইন পাইপলাইনে লিকেজ ছিল, গ্যাস বাইর হইতো, ওইখানে আগুন ধইরা গেছিলো। মাটির তলে পাইপ ছিল, দেখলাম ঘাসের উপর হুদাই আগুনের বুদবুদ। বালু ছালা পানি দিয়া সবাই মিলা নিভাইছিলাম। ওই জায়গা এড়াইতাম পরে।

শবে বরাতের বিকালের দিকে একটু কষ্ট হইতো। আম্মুর ড্যানা ব্যথার (হাত ব্যথা) কারণে পিচ্চিকালে পোলা হইয়াও চাইলের রুটি বেলা লাগতো। হালুয়া, ফিরনি নাড়তে থাকা, হালুয়া কাটা, সেপ দেয়া, এরপর অন্তত ১৫-২০ বাসায় বিলি বন্টন, বিশাল বিরক্তির কাজ। কিন্তু সব বিরক্তি ছাপাইয়া আনন্দ ছিল ওই আতশবাজি, মোররা, পটকা, চকলেট বোম এইসব। তারাবাত্তি ছিল শিশুদের নিরীহ বিনোদন। রাতভর চলতো। সবচেয়ে বেশি ফুটতো মসজিদের পাশে। বাপচাচার ঝাড়িপট্টি, মাইর, ধর্মের বুলি কিছুই কাজে দিত না। আমাদের সময়ে মিরপুরে এইটাই ছিল শবে বরাতের স্বাভাবিক দৃশ্য, উদযাপন। এখন মিরপুরের কিছু পকেটে এইসব চলে, তবে পোলাপান সামাল দিতে রাতভর পুলিশি টহল লাগে না তেমন। সবচে মজার ব্যাপারই ছিল ছাদ থাইকা রাস্তায় হাইটা যাওয়া পুলিশের উপর ইলেক্ট্রিক মোররা মারা। কতজন ধরা খাইয়া ব্যাপক প্যাদানিও খাইছে, থানায়ও নিছ। কিন্তু এই উচ্ছাস অদম্য…

আরও বড় হইলে দূরে দূরে ঘুরতে যাইতাম। নামাজ পড়তাম তখন, ধর্মে কিঞ্চিত বিশ্বাস মওজুদ ছিল। কিন্তু মসজিদে ঢুকতাম কম। শাহ আলীর মাজারের ওইদিকে নেশাগ্রস্থদের নাটক হইতো, আজব কাজকারবার। তিল রাখার জায়গা থাকেনা এখনো সারারাত। এদের সামান্যই ইবাদতের নামে আসে, বেশিরভাগই আসে নমুনা দেখতে। হাজার হাজার পোলাপানের গাঞ্জা আর বিড়ির অভিষেক হয় এই শবে বরাতের দিনে। যেইসব পোলাপানের হাতখরচের বাজেট কম, তারা মনে হয় এই রাত কল্পনায় চা বিড়ি আর রাতভর হাল্কা নাস্তার জন্য আলাদা সঞ্চয় রাখে।

খুব প্রিয় কেউ বলতেছিল তার মা আল্লামা হয়ে গেছেন, উনিই কেবল শবে বরাত মানেন। সে হালকা মানে নাকি নিশ্চিত না, কিন্তু ঝোকের বসে বইলা ফেললাম, আন্টিরে বলো জমিজমা বেইচা তিন শবে বরাত ধরতে। শবে বরাত তো আর দুনিয়াব্যাপী একদিনে সম্পন্ন হয়না। নানা স্লট আছে নানা দেশের জন্য। মরক্কোয় একদিন, সৌদিতে আরেকদিন, এইদেশে আরেকদিন। দুনিয়া গোল, চাঁদ উঠার সাইকেল সম্পন্ন হইতে হইতে শবে বরাত ভিন্ন ভিন্ন সময়ে শুরু হয় ভিন্ন ভিন্ন দেশে। কারো পয়সা থাকলে এক বছরেই তিন শবে বরাত ধরতে পারে। একদিন আগে সৌদিতে শবে বরাত পালন কইরা দিন শুরু হইতে না হইতে প্লেনে উইঠা ৫ ঘন্টা উড়াল দিয়া দেশে আইসা আরেক রজনীর নাগাল পাওয়া যাবে।

যাইহোক, রুটি হালুয়া কালচার খারাপ না। মানুষ উৎসবপ্রেমী, উৎসবে মানুষের আরও কাছাকাছি আসে। শবে বরাত এইদেশে উৎসবের মতই। পেপারে দেখলাম শবে বরাতের কেনাকাটা নিয়া আলাদা রিপোর্ট করছে। পুরান ঢাকায় স্পেশাল খাবারের বাজা বসে শবে বরাতের জন্য। যারা সত্যি বিশ্বাস কইরা ইবাদতে মাতে, তারা করুক ইবাদত। ইবাদত করা অপরাধ না। মানসিক শান্তিও আসে, কেউ কেউ ভরসা পায়। যাদের হাতে কোনো দান থাকেনা জীবন নিয়া, তারা অলৌকিক দানের ভরসায় থাকে। বাঁচতে এইসবও জরুরী হয় অনেকসময়। তবে আমার কাছে এখন কেবলই কিছুটা ভিন্নভাবে কাটানো একটা দিন, যা আগে আরও অন্যরকম ভাবে কাটতো। সময় বদলায়, আবেগও। কিন্তু মানুষ স্মৃতিকাতর, স্মৃতি জাগরুক থাকে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 1 =