সুখের অভাবে সুখ মহড়া

আজকাল শর্মী নিজেকে আর একা মনে করে না। তার মনে হয় কে যেন একজন, একজোড়া কচি হাত সব সময় তার চারপাশে ঘিরে থাকে, ঘুরঘুর করে। সর্বদা একটা ডাক তাকে অস্থির করে তোলে। তাকে আলোড়িত করে রাখে।একটা সময় সে নিজেকে ভীষণ একা মনে করতো। পৃথিবীর কোন এক জনশূণ্য দ্বীপের একমাত্র বাসিন্দা মনে করতো। এখন আর একা একা লাগে না। এখন তাকে নিয়ে তার সারাটা দিন ভালোভাবেই কেটে যায়। শর্মীর নিঃসঙ্গ সময়ের এমন একটা মূহুর্তে সে আসলো যখন শর্মীর নিজেকে নিয়েও ভাবনার ইচ্ছেটুকু ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু এখন। এখন সে ছোট্র দুটো হাতের পরশে ঠিকই কাটিয়ে দিচ্ছে তার ব্যস্ত সময়। জাগতিক সকল ব্যস্ততা এখানে ম্লান। এক পরিচ্ছন্ন ভালোবাসার নির্মল আবহ সব সময় তাকে আষ্টেপিষ্টে ঘিরে রাখে।

সারাক্ষণ ঘুরঘুর করে। চারপাশে ছুটাছুটি করে বাড়িঘর মাথায় তুলে রাখে। ঘরদোড় গুছিয়ে রাখার পর আবার পরিস্কার করতে হয়। এখানে ওখানে ময়লা ফেলে রাখে। একবার ভাবে সে তাকে খুব করে বকা দেবে। কিন্তু বকা দেয় না। সে নিজেকে নিভৃত করে। কেননা এ যে তার বহু সাধনার ধন। বহুদিন আশায় থাকার পর, বহু আকাঙ্খার পর, অগণিত রাতদিন অপেক্ষার পর এ ধন সে পেয়েছে। তাই সে তাকে বকা দেয় না। বরং তার দুষ্টুমিটা শর্মী’র ভালোই লাগে। তবে বাচ্চাটার প্রতি তার এমন মনযোগীটা তার পরিবারের কেউ ভালোভাবে নেয় না। কেন নেয় না? বুঝতে পারে না। এটা নিয়ে বেশ কয়েকবার শর্মী তার স্বামীর সাথে ঝগড়া করেছে। সে তার স্বামীকে বুঝাতেই পারে না যে, সে যদি বাচ্চাটাকে আদর করে, সোহাগ করে তাহলে তার কি আসে যায়। সে তো কারো ভালোবাসায় ভাগ বসায় নি। সে এ সংসারে এক বহমান নদীর মতো এসে সংসারটাকে, সংসারের মানুষগুলোকে ভালোবাসার বাঁধনে বেঁধে রেখেছে।

শর্মী’র স্বামী বেচারা ভদ্রলোক, অনেকবার বুঝিয়েছে যে শর্মী যেটা ভাবছে, যেটা নিয়ে সব সময় সে মেতে থাকে সেটা কেবলই তার কল্পনা। বাস্তবতায় এর কোন ভিত্তি নেই। বাস্তবতায় এর কোন স্বীকৃতি নেই। যতবার বুঝাতে গিয়েছে ততবার শর্মী’র সাথে তার তুমুল ঝগড়া হয়েছে। একটা পর্যায়ে প্রায় প্রতিবার সে তার বাবার বাড়ি চলে গেছে। তখন তাকে সেখান থেকে আনতে যাওয়াও অনেক ঝক্কি ঝমেলার ব্যপার। শশুর শাশুড়ির সামনে ঘন্টাখানেক বসে থাকার পর কথা শুরু হয়। প্রায়ই শশুরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনা। শশুরের ধারনা তার জন্যই মেয়ের আজকে এ অবস্থা। তাই দায় দায়িত্ব তাকেই নতে হবে। প্রতিবার বলে আসে আর শর্মীর মতে বিরুদ্ধে কিছু বলবে না। কিন্তু শর্মীর আচরণ আজকাল এমন এক অবস্থায় এসে পৌছেছে যে কিছু না বলে পারা যায় না। তবে এখন কিছুটা মানিয়ে দিতে পারছে সে।

ছোট ছোট হাতের মায়ায় পড়ে থাকে শর্মী। খুব যতœ করে নিজ হাতে মেয়ের জামা কাপড় বানায়। ছুটির দিনের সারাক্ষণ এটা নিয়ে পড়ে থাকে। সকালে তাড়াহুড়া করে অফিসে যায়, অফিস থেকে ফেরার পর আবার মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে মেয়ের জন্য ব্যাগভর্তি শপিং করে নিয়ে আসে। কেনাকাটা করতে করতে বাড়িঘর বাচ্চাদের পোষাক দিয়ে ভরে ফেলেছে। তার স্বামীও আজকাল তাকে কিছু বলে না। বললেও যেহেতু শুনেনা তাই বলেই বা লাভ কি। বরং আরো ঝামেলা তৈরী হয়।

শর্মীর কাছে সবচেয়ে উপভোগ্য হলো তার মেয়েকে গোছল করানোর ব্যাপারটা। খুব যতœ করে প্রতিবার গোছল করায়। পানি গরম করার সময় কয়েকবার দেখে নেয়। তার হাতটা চুবিয়ে দেখে পরিমান মত গরম হয়েছে কিনা। বিরাট আয়োজন করে তার মেয়েকে গোছল করাতে বসে। এটা দেখে তার স্বামী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলতে পারে না। যখন সে এভাবে তাকিয়ে থাকে, শর্মী দেখে তার স্বামীকে শাষাতে থাকে। তখন সে অন্য কোথাও গিয়ে অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। মেয়ের জন্য বিভিন্ ব্রান্ডের লোশন, সাবান, শ্যাম্পু দিয়ে ঘর ভরে ফেলেছে। একেকদিন একেক সাবান শ্যাম্পু নিয়ে মেয়েকে গোছল করাতে বসে। একেক দিন একেক লোশন, ওলিভ অয়েল দিয়ে মেয়েকে সাজায়। সবশেষে কপালের একপাশে একটা মোটা করে কাজলের টিপ এঁকে দেয়, যাতে মেয়ের দিকে কারো নজর না লাগে। শর্মীকে দেখে মনে হয় আজকাল তার দিনটা ভালোই যাচ্ছে। সে আপন মনে মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। পারিপাশ্বিক কোন জটিলতা তাকে ছুঁতে পারে না। বৈশ্বিক অদৃশ্য দেয়াল সবকিছু থেকে তাকে আলাাদা করে রেখেছে।

দিনদিন শর্মীর ব্যাপাারটা নিয়ে তার স্বামী বেশ বিপাকে পড়ে গেছে। দিনদিন তার পাগলামিটা বেড়েই চলছে। সেদিন শর্মীর অফিসের এক কলিগ তাকে ফোন দিয়েছিল। আর ফোনে যে ব্যাপারটা বলল, সেটা শোনার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। কিছুদিন আগে শর্মীর অফিসের পাশের একটা ডে কেয়ারে তার মেয়েকে অফিস সময়ে রাখার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়েছিল। ফরম এনে তার পূরণ করে জমাও নাকি দিয়ে এসেছে। সাথেই ছিল সেই কলিগ। তিনিও কিছু বলেন নি। আর এসব ঘটনা এতদিনে শর্মী তার স্বামীকে বলেনি। সবকিছু নিজের মধ্যেই চেপে গেছে।

একদিন অফিস থেকে ফেরার পর ভাবছে সে শর্মীকে কিছু প্রশ্ন করবে। এর আগেই শর্মী অনেকদিন পর তার স্বামীর কাছে এসে লজ্জিত ভঙ্গিতে কিছু একটা বলবে বলবে করছে। এটা দেখে তিনি বললেন,
“ কিছু বলবে ? ”
“ অনেকদিন ধরে ভাবছি তোমাকে একটা কথা বলবো। তুমি আবার কি মনে কর তাই বলতে পারছি না।”
“কিছু মনে করবো না, তুমি বরতে পার। নির্দ্বিধায় বলতে পার।”
“আমরা তো অফিসে চলে যাই, মেয়েটা একা একা বাসায় থাকে। আমার ভীষণ চিন্তা হয়। তাই ভাবছি ওকে দিনের বেলায় আমার অফিসের কাছাকাছি একটা ডে কেয়ারে রাখবো। মাঝেমাঝে যখন মনে পড়বে তখন তাকে দেখে আসবো। আমিও চিন্তা মুক্ত হলাম, মেয়েটাও ভালো থাকলো।”

শর্মী একটানা কথাগুলো বলে গেল। তার স্বামী বাধ্য বালকের মত কথাগুলো শুনলো। কিছু বললে আবার যদি কিছু তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে দেয়, সেই ভয়ে কিছুই বললো না। সব কথা তার সহ্য হয় কিন্তু মেয়ের ব্যাপারে কিছু বললে তার ঘোর আপত্তি। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
“ কি হলো, কিছু বলছো না যে?”
কি বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে। কি বলতে কি বলে ফেলবে, তাতে আবার কি ঘটনা ঘটে যায় সেই ভয়ে কিছুই বলে না। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর আড়মোড়া ভাঙ্গে।

“ তুমি যেটা ভালো মনে কর সেটাই করবে। মেয়েকে আর বাসায় একা রাখা যায় না। তোমার কাছাকাছি থাকলে তারও ভালো লাগবে, তুমি ভালো থাকেবে।”
কথাটা শুনে শর্মীর মুখে একটা চমৎকার হাসি খেলে গেলো। এমন হাসি অনেকদিন হলো দেখে না। একটা সময় যার মুখে শুধু হাসি লেগে থাকতো। আজ কতদিন সেই মুখে কোন হাসি নাই। অকারণে তার মুখের হাসি দেখে কত দিন বকাঝকা করেছে তার কোন হিসাব নেই। বকা শুনে আবার হেসে গড়িয়ে পড়তো। থামতে বললে আবার হাসতো। হাসতে হাসেতে কোন কথা বলতে পারতো না।

এই হাসির জন্য কত না কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে তার ঘর বেঁধেছে। সুখ শান্তিতে ভরে ছিল তাদের সংসার। শুধু সুখ আর সুখ। সারাদিন অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেত, প্রায়ই রাতে বাইরে খেয়ে আসতো। ছুটির দিনে তারা তাদের আনন্দের সময়টুকু নিজেদের মত কাটাতো। কতই না আনন্দমুখর ছিল তাদের জীবন। প্রথমে শর্মীও এমন অস্বাভাবিকতা কেউ ধরতে পারেনি। তাই তার বাবা মা তার এমন আচরণের কথা শুনে প্রথমে অবাকই হয়েছিল। তাদের মেয়ে আগে এমন ছিল না। এখন কেন এমন হলো?

ধীরে ধীরে শর্মীর আচরণ অস্বাভাবিকাতার চরম মাত্রায় চলে গেল। সে এখন তার মেয়ে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারে না। অফিসে গেলে যদি তার মেয়ের কোন অযতœ হয় তাই এখন ঠিকমত অফিসে যায় না। ডে কেয়ারের সবাই তার আচরণে অবাক হয়েছিল। তাদের বিভিন্ন প্রশ্নে অতিষ্ট হয়ে এখন আর সে ওখানে যায় না। সারাদিন বাসায় থাকে আর মেয়েকে দেখাশুনা করে। তার সবটুকু অস্বিত্ত্ব জুড়ে তার একমাত্র সন্তান। আর কেউ নাই সেখানে।

অনেক সাধনার, ত্যাাগ তিতিক্ষার সংসারে একটা সন্তান হবে। ঘরময় হৈ হুল্লুড়ে ভরে থাকবে। এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটানো থাকবে তার খেলনা, কাপড় চোপড়। কিন্তু বিয়ের আট বছর পর সংসার আলো করে শর্মীর সংসারে কেউ আসে নি। অনেক চিকিৎসা করেছে। অনেক টাকা খরচ করেছে। যে যেখানে যেতে বলেছে, যে ডাক্তারের কাছে যেতে বলেছে সেখানেই গেছে। এমনকি কবিরাজ, ঝাঁরফুঁক করতেও সে দ্বিধা করেনি।

যখন অফিসে তার সহকর্মীরা তাদের সন্তানদের গল্প করতো সে মনযোগ দিয়ে সব কথা শুনতো। আর মনের ভেতর তার সন্তানের জন্য একটা বসত, একটা সুন্দর ছবি গড়ে তুলতো। এখন তার মনে হয় একটা ছোট্র হাত সব সময় তাকে খাঁমচে ধরে। সে তার হাত দুটো আস্তে করে সরিয়ে নেয়। কপালে চুমু খায়। হাতে, পায়ে চুমুতে ভরিয়ে রাখে।

মাঝেমধ্যে তার গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম থেকে ওঠে দোলনাতে রাখা আদরের কলিজার টুকরাকে দেখে দেখে হাসে। তার সাথে খেলা করে। কোলে নিয়ে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করে। তার স্বামী শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে। কিছু বলতে পারে না। তাকে বুঝাতে চায়, বুঝাতে পারে না। কি বলবে তাকে। কি কথায় তাকে সান্তনা দিবে ? ভাবতে পারে না কিছুই।

আজকাল শর্মী ঘুমে কিংবা জাগরণে মা ডাক শুনতে পায়। সব সময় তার কানে বাজে কে যেন তাকে মা বলে ডাকছে। সে ছুটে আসে। সেও মা মা বলে ডাকে। মায়ের কান্না থামায়। মাকে বুকে জড়িয়ে আদর করে। চোখের পানি মুছে দেয়। কোলে নিয়ে চুমু খায়। বিছানায় শুয়ে তার স্বামী চেয়ে চেয়ে দেখে। কিছুই বলার নাই তার। আজকাল মাঝেমধ্যে সেও হাসে। শর্মীর সাথে মিলেমিশে সেও মেয়েকে আদর করে। ভালোবাসে। সারাক্ষণ মেয়েকে নিয়ে খেলা করে। ভালোবাসার সময়গুলো ভালোই যাচ্ছে তাদের। এখানে কিছু বলার কেউ নেই। নিজেদের সুখ নিজেদের মত রচনা করে যায়। ভালোবাসার মহৎ পথের সঙ্গী এখন তারা দুজন। তাদের একাকীত্বের সঙ্গী শুধু তাদের মেয়ে, তাদের ভালোবাসা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 66 = 69