আমার ক্যানভাস

আমার ছোট্ট ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা কানে তুলতেই একটা মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এল, “হ্যালো কে বলছেন?” এবার আমার অবাক হবার পালা। গলাটাকে যথাসম্ভব মার্জিত করে বললুম ,”মাফ করবেন, কথাটা তো আমারই জিজ্ঞাসা করার কথা।” ও প্রান্ত থেকে, “কেন? এখান থেকে কিছুক্ষণ আগে ফোন এসেছিল।” আমি আকাশ থেকে পড়লুম, “সেটা কী করে সম্ভব , আমি তো আপনার মোবাইল নাম্বার জানি না।” সেই মিষ্টি কণ্ঠস্বরে হাসি শোনা গেল, “তাহলে বোধ হয় আপনার ঘরে ভূতের ছানা রয়েছে সেই করেছে।” মেয়েটি আমায় ঠাট্টা করছে। আশ্চর্য এতো বিনা দোষে আমায় কাঠগড়ায় তুলছে। বেশ শান্তিতে ছিলুম। হঠাৎ কথাবার্তা নেই একটি মেয়ে এসে বলছে , “ক্যান ফোন করলেন?” আমার ভারি রাগ হয়ে গেল, উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলুম, “দেখুন আপনাকে ফোন করতে আমার বয়েই গেছে, আপনি কে মশাই, রাণী ভিক্টোরিয়া?” ও প্রান্ত থেকে ঝংকার ভেসে এল, “দেখুন বেশি বকবেন না। আপনাদের মত ছেলেদের ভাল করে চিনি। মেয়েদের ফোন দেখলেই লাফিয়ে ওঠেন ফোন করবার জন্য।” মেয়েটিকে বোঝাতে পারলুম না, বোঝানো গেলনা , “আপনি যে মেয়ে আমি কি করে জানব?” মেয়েটি কট করে ফোন কেটে দিল। কিন্তু আমি অস্থির হয়ে গেলুম। সারাটা সময় মেয়েটিকে ভেবে কা্টালুম। মেয়েটিকে কিছু বলতে পারলুম না বলে হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে। কান্নাও পাচ্ছে। শুধু শুধু ও আমাকে বলছে আমি ফোন করেছি, এ সহ্য হয়? এমন সময় মা ডাকল খাওয়ার জন্য। রান্না ঘরে যেতেই মা বিরক্তির সাথে বলল, “কার সাথে ফোন করছিলি, কানেই কথা তুলিস না? কতবার ডেকেছি খেয়াল আছে? রাতে ঘুমোবার আগে হঠাৎ মনে হল মেয়েটির কণ্ঠটি ভারি সুন্দর। আরে এরকম কথা ভাবছি কেন? মেয়েটি তো আমার শত্রু। শত্রুর কিছু ভাল থাকতে নেই, ভাল দেখতে নেই… পরের দিন আমার ফোনটি বেজে উঠল, আমি কানে তুলতেই সেই মিষ্টি ধ্বনি, “মাফ করবেন, অনেক ভেবে দেখলাম ইচ্ছাকৃতভাবে আপনি ফোনটি করেননি, এটা জাস্ট মিসটেক। সুতরাং আপনাকে বলা কথাগুলো অকারণ হয়েছে। দুঃখিত তাই।” তবুও মেয়েটি বলছে আমি ফোন করেছি? কিন্তু ভুল স্বীকার করছে বলে মেয়েটিকে মাফ করাই যায়। মুখে বললুম, “বিশ্বাস করুন আপনাকে আমি ফোন করিইনি।” সঙ্গে সঙ্গে ও প্রান্ত থেকে ,” না না এটা মিসটেক মাত্র। আমি লজ্জিত ।” আমার রাগ গলে জল হয়ে গেল। একটা মিষ্টি কণ্ঠের অধিকারিণী যদি বার বার ভুল স্বীকার করে, তার উপর রাগ করে থাকা যায়? ও ভুল বুঝে থাকুক না যে আমি ফোন করেছিলাম। তার জন্য ও তো আমায় আর দোষারোপ করছে না। সেই মিষ্টি কণ্ঠ, “আমার নাম রিতা সেন। আমি
বড়বাড়ী শহীদ আবুল কাশেম কলেজে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার এ পড়ি । আপনার নাম কী?” আমি বিনীত স্বরে জানালুম, “অধমের নাম শৈলেন রায়। কিছু করি না। এধার ওধার ঘুরে বেড়াই। সঙ্গে সঙ্গে ও প্রান্ত থেকে, “কেন কেন ? কণ্ঠে কৌতূহল রয়েছে।” আমি বললুম, “আমি পড়াশুনোয় একেবারে ভাল ছিলুম না কিনা। সে বলল কিছু তো করেন? বললুম- অর্নাস সেকেন্ড ইয়ার,লালমনিরহাট সরকারী কলেজ, তারপরেই তাড়া ভাব কণ্ঠস্বরে, “এই রে দেরি হয়ে গেল, ট্রেন মিস করে ফেলব। বাই। পরে কথা বলব।” ফোনটা কেটে গেল। কিন্তু একটা রেশ থেকে গেল। বার বার মেয়েটির হাস্যধ্বনি ভেসে আসছে কানে।
কয়েক দিন খুব ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেল । রাত বারোটা প্রায়ই। আপন মনে সিগারেট টানছি। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। কানে তুলতেই সেই মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ঘুমোচ্ছেন? সঙ্গে সঙ্গে সিগারেটটা জানালার বাইরে ফেলে দিলুম, মনে হল যেন মেয়েটি দেখে ফেলবে আমি সিগারেট খাই।” আমি -না না কবিতা পড়ছি,। ও প্রান্ত থেকে, “আপনি কবি?” সঙ্গে সঙ্গে বললুম, “মোটেই না। কবি একটা গ্রেট শব্দ। আমি জাস্ট একজন কবিতা পাঠক মাত্র।” -ওভাবে বলবেন না, আপনার মধ্যে কবি কবি ভাব রয়েছে।” আমি কথা পাল্টাবার জন্য বললুম, “কী করছেন এখন?” মেয়েটি এবার অনুযোগের সুরে বলতে লাগল, “আর বলবেন না। কাল কলেজে পাক্ষিক পরীক্ষা,আর পড়তে ইচ্ছা করছে না । মনে হল আপনার সঙ্গে কথা বলে বোরিং ভাবটা কেটে যাবে।” হঠাৎ মেয়েটি বলে উঠল, “আচ্ছা, আমরা দেখা করতে পারি না? আমার তখন ক্লান্তিতে চোখের পাতা আপনা থেকে বুঁজে আসছে। ঘুম ঘুম স্বরে বললুম, “পারি।” মেয়েটি আমার ঘুম ঘুম ভাবকে পাত্তা দিল না, বলে চলল, “আপনি শিমুলতলা যাএী ছাউনিতে আসবেন? আমি কাল ৯টায় দাঁড়িয়ে থাকব ওখানে, নীল শাড়ি পরে । হাতে থাকবে কালো ভেনিটি ব্যাগ। বুঝলেন তো?” আমি তখন ঘুমের জগতে চলে গেছি। মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে গেল। পর দিন সকাল ১০ টায় ঘুম ভাঙ্গল। কালকের রাতের ঘটনাটা মনে পড়ল এবং দারুণ লজ্জিত হলুম, এইরে মেয়েটি কী ভাবল কে জানে! মেয়েদের কাছে এটা অপমানজনক। কিন্তু কী করব, এত ক্লান্তি ছিল। মেয়েটি আমাকে দেখা করার কথা বলছিল না? কিন্তু কীভাবে? আমার মনে পড়ে পড়ল না ও কী বলেছিল। রাত ৮ টার সময় ফোন বেজে উঠল। মেয়েটির ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আপনি কি ভেবেছেন আমি কিছু বুঝতে পারবো না?” আমি বিস্ময় প্রকাশ করি, “ক্যান, কী হয়েছে?” মেয়েটি- শ্যাট আপ। আপনি ভদ্রলোকের মুখোশ পরে থাকেন, কিন্তু আপনি ছোটলোক । ‘আমার অপমানে কান লাল হয়ে গেল। মেয়েটির রুদ্র রূপে প্রচণ্ড কষ্ট অনুভব করছিলাম। মেয়েটি বলে চলল, “আপনাকে বলেছিলাম শিমুলতলা যাএী ছাউনিতে আমি ৯টায় দাঁড়িয়ে থাকব , নীল শাড়ি পরে । হাতে থাকবে কালো ভেনিটি ব্যাগ। অমনি বদমাস বুদ্ধি জেগে উঠল। আপনি আমার পিছন নিলেন। তারপর ছবি তোলার খুব শখ না, যেদিকে আমি যাচ্ছি সেদিকে আপনি যাচ্ছেন এবং ছবি তুলছেন। আপনাকে বারণ করা সত্বেও আপনি শোনেননি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, আপনাকে দেখা করবার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম।” আমার প্রচণ্ড রাগ হল, মনে হল এই পাগলী মেয়েটাকে আমি মিছেই মূল্য দিয়েছি্লুম। আমি বললুম, “আপনি কী করে বুঝলেন ঐ ফটো তোলা লোকটি আমি? মেয়েটি চেঁচিয়ে ওঠে, “ওই সময় আপনি ছাড়া কেউ জানত না আমি দাঁড়িয়ে থাকব। তাছাড়া যে খ্যাপাটে খ্যাপাটে চেহারা, আপনি না হয়ে যান না। আপনি পালিয়ে গেলেন কেন, আমার চড় খেয়ে? সঙ্গে সঙ্গে নিজের গালে হাত দিলুম, কখন আমায় ও চড় মারল? মেয়েটি বলল, “মনে রাখবেন আমি ভদ্র ঘরের মেয়ে। আপনাকে পুলিশে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। আপনার সাথে সমস্ত সম্পর্ক শেষ।” বলেই ফোনটা কেটে দিল। আরে কবে আমার সাথে সম্পর্ক হল যে ও শেষ করে দেবে? আমি কিন্তু খুব কষ্ট পেলুম। সারা রাত ঘুমতে পারলুম না। কী বাজে অভিযোগ করল…আর আমার সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিল? কোন দিন আর ফোন করবে না আমায়?
দুই দিন খুব বিচ্ছিরিভাবে কাটল। তৃতীয় দিন মনটা একটু শান্ত হয়েছে। আপন মনে আমার ঘরে সিগারেট টানছি। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। ফোনটা তুলতেই সেই মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল, “আমি কান ধরছি, আমি ভুল করেছি। ওটা আপনি ছিলেন না, এক বদমাস ছিল।” আমি বললাম, “আপনি অদ্ভুত তো, প্রথমে আমায় অপমান করবেন, তারপর ভুল স্বীকার করবেন। আপনার সাথে এখন কথা বলতে ভয় পাই।” মেয়েটি কান্না জড়ান গলায় বললেন, “আপনার সব কথা সত্যি। আপনার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করত। আপনার কথা খালি মনে হত। যেদিন আপনাকে বললাম আমি আপনার সাথে দেখা করব, তখন আপনি পাত্তা না দিয়ে ফোন অফ করে দিলেন। দারুণ অপমানিত বোধ করেছিলাম। আমার অহঙ্কার ছিল আমাকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আপনি সেই অহঙ্কার ভেঙ্গে দিলেন। সেই জন্য প্রতিশোধ নেবার আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল।’ কিন্তু আমি আপনাকে ভুলতে পারছি না।আপনার সাথে দেখা করতে চাই। প্লিজ আমার সাথে দেখা করুন… সঙ্গে সঙ্গে আমার রাগ গলে জল হয়ে গেল”। বললুম,” কীভাবে দেখা করব?” মেয়েটি বলল, “আমি শিমুলতলা যাএী ছাউনিতে আমি ৯টায় দাঁড়িয়ে থাকব , নীল শাড়ি পরে , হাতে… কথা কেড়ে নিয়ে বললুম, “হাতে থাকবে কালো ভেনিটি ব্যাগ।” মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল, “হ্যাঁ।’ আমি আবার বলি, “”আমার যে প্রচুর ফটো তুলতে ইচ্ছে করবে।” রিতা খিল খিল করে হেসে উঠল, “তুলবেন যত খুশি।’ আমি মিষ্টি স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করলুম

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

50 + = 56