বাংলার মুসলমান অথবা বাঙালি মুসলমানের জাতীয়তাবাদী ভাবধারার রূপান্তর (চতুর্থ পর্ব)


বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব,বিকাশ এবং পরিণতি বেশ কিছু স্তর পার হয়ে ক্রমে ক্রমে বিকশিত হয়েছে ।প্রথম পর্যায়ে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন, তারপরে পাকিস্তান কর্তৃক অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত হওয়া, সেই উপনিবেশে ধর্মের নামে পাকিস্তানী দুঃশাসন, জাতিগত নিপীড়ন এবং সাম্প্রদায়িক আচরণ ইত্যাদির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে বাঙালির জীবনযাত্রা। পাকিস্তান যদি বাংলাভাষী মানুষের উপর উর্দু চাপিয়ে না দিতো বাঙালি হয়তো আরো অনেকদিনই নিজেদের জাতিসত্তা সম্পর্কে অচেতন থাকতো।ভাষা আন্দোলন কি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বাঙালির জন আন্দোলনে পরিণত হয়েছিলো সেকথা স্মরণযোগ্য।

বাংলার মুসলমান থেকে বাঙালি মুসলমান হয়ে উঠা :

যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেল,তখন বাঙালি মুসলমান ভাবল পাকিস্তান রাষ্ট্রে তাদের বস্তুগত উন্নয়ন অর্থাৎ ভালো সরকারি চাকরি, উচ্চপদে বেশীসংখ্যক বাঙালি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রভৃতি উন্নয়ন কর্মকান্ড বিদ্যুৎ বেগে এগিয়ে যাবে। কিন্তুু বিধি বাম।ভোট দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করার পরও পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদেরকে অর্থাৎ বাঙালিদেরকে এবার “খাঁটি পাকিস্তানি” হওয়ার পরামর্শ দিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা।যেন রাষ্ট্র গঠনের পর এবার জাতি গঠনের প্রজেক্ট হাতে নিলো পাকিস্তান।ঠিক যেমন ইটালি সম্পর্কে একজন বলেছিলেন “We have made Italy, now we have to make Italians.”

এককালে মুসলমানেরা যেমন স্বদেশের চাইতে আরব, ইরান,আর তুরস্ককে বেশী কাছের মনে করতো, নিজেদের ঐতিহ্য অনুসন্ধান করতে ওসব দেশ হাতড়িয়ে মরতো, সেই স্থানে এখন নতুন যোগ হলো পাকিস্তান। তাই পশ্চিম পাকিস্তানিদের পরামর্শ অনেককে বিস্মিত করলেও অনেকেই আবার খাঁটি মুসলমান হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে যায়। এভাবেই হয়তো চলতো যদি না পশ্চিমারা বাঙালিদের উপর উর্দু চাপিয়ে দিতো।পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোয় বাঙালি মুসলমানের চিন্তায় প্রথম বাঙালিত্ববোধের ঢেউ ওঠে মাতৃভাষা বাংলাকে কেন্দ্র করে। ভাষা প্রশ্নেই বাঙালির রাজনৈতিক চৈতন্যে প্রথম আধুনিকতার প্রকাশ দেখা যায়। এতোদিন বাঙালির চিন্তায় প্রচ্ছন্নভাবে নিজেদেরকে স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে ভেবে থাকলেও জাতীয়তাবোধের পূর্ণাঙ্গ ভাবনা অনুপস্থিত ছিল।প্রথমবার তারা চেষ্টা করেছিলো পাকিস্তানি হতে।তাদের জাতীয়তাবাদ ছিলো “মুসলিম জাতীয়তাবাদ”।ভারতবর্ষের উত্তর পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের সাথে তারা নিজেদেরকেও মুসলমান জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ভেবেছিলো।তাই তারা সকল মুসলমান মিলে পাকিস্তান হতে চাইল। কিন্তুু ভাষার প্রশ্নে সে প্রথম স্বতন্ত্র একটা জাতি হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করে এবং ক্রমান্বয়ে ভাষা ছাড়াও সংস্কৃতির অন্যান্য উপাদানকে জাতীয়তার ভিত্তি হিসেব স্থান দেয় এবং সেই জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভের জন্য সচেষ্ট হয়।

বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব,বিকাশ এবং পরিণতি বেশ কিছু স্তর পার হয়ে ক্রমে ক্রমে বিকশিত হয়েছে ।প্রথম পর্যায়ে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন, তারপরে পাকিস্তান কর্তৃক অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত হওয়া, সেই উপনিবেশে ধর্মের নামে পাকিস্তানী দুঃশাসন, জাতিগত নিপীড়ন এবং সাম্প্রদায়িক আচরণ ইত্যাদির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে বাঙালির জীবনযাত্রা। পাকিস্তান যদি বাংলাভাষী মানুষের উপর উর্দু চাপিয়ে না দিতো বাঙালি হয়তো আরো অনেকদিনই নিজেদের জাতিসত্তা সম্পর্কে অচেতন থাকতো।ভাষা আন্দোলন কি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বাঙালির জন আন্দোলনে পরিণত হয়েছিলো সেকথা স্মরণযোগ্য।

যদিও আবুল মনসুর আহমেদ ‘মোহাম্মদী’তে ১৯৪৩ সালে লেখেন “তমুদ্দুন বা সংস্কৃতির দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান ধর্মভাই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা জাত”, তবুও আমরা দেখতে পাই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালির প্রথম রাজনৈতিক জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে। এর আগে পর্যন্ত তারা নিজেদেরকে মুসলমান জাতি ভেবছিলো, সেই সাথে পাকিস্তানি হওয়ার চেষ্টাও করেছিলো।ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানের অপশাসন, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করা এবং জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় এবং অভিজ্ঞতায় বাঙালি আরো বেশী করে বুঝতে শেখে যে সে পাকিস্তানি নয়, তার জাত ভিন্ন, সে বাঙালি। আমরা এখানে Ernest Renan এর জাতির সংজ্ঞা স্মরণ করতে পারি – “What constitutes a nation is the possession,first, of a common history,particularly of sufferings of a store,that is,of common memories which are a source of common sympathy and pride.” ভাষার প্রশ্নে বাঙালির ভেতর সেদিন নিজেদের সম্পর্কে এমনই এক বোধের উন্মোচন ঘটেছিল।

ধর্মের মোহজাল ছিন্ন করে জাতীয়তা সম্পর্কে এই সত্যটুকু বুঝতে বাঙালির এতোদিন লেগে গেলো! তখন আমাদের স্বাধীনতার ধারণা আরো একটু ম্যাচুরিটি অর্জন করলো।জাতীয়তাবাদের উপাদানে এবার ধর্ম প্রচ্ছন্ন হয়ে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, এবং বাঙালিত্ব প্রকট হলো। এই ম্যাচুরিটি অর্জনে ইতোমধ্যে আমাদের অনেক সময় ও শক্তি ক্ষয় হয়েছে। ইউরোপেরও হয়েছিলো। আমাদের উচিত ছিল ইউরোপ থেকে শিক্ষা নেওয়া। কিন্তুু আমরা নিতে পারিনি।

(পরবর্তী পর্বে ইউরোপের বিষয়ে সামান্য আলোচনা থাকবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

37 + = 38