ছোট গল্প: অবাঞ্ছিতের প্রলাপ!

৪১ বছর আগে যখন আমি জন্মেছি, তখন জন্মনিয়ন্ত্রন প্রথা বহুল প্রচলিত ছিলো না! সদ্য বিবাহিত জনক-জননীর যৌন উত্তেজনার অবাঞ্ছিত ফসল আমি!

৪১ বছর আগে যখন আমি জন্মেছি, তখন জন্মনিয়ন্ত্রন প্রথা বহুল প্রচলিত ছিলো না! সদ্য বিবাহিত জনক-জননীর যৌন উত্তেজনার অবাঞ্ছিত ফসল আমি! হাভাতে শিশুকাল কেটেছে আমার! এখনো কপালে বয়ে বেড়াই জনকের চার আনার চানাচুর কিনে দেবার অক্ষমতার ক্ষতচিহ্ন! শিশুকালে দুধের অভাবে ভাতের মাড় আর হুপিং কফের চিকিৎসায় তুলসী বাটা খাওয়া মানুষ আমি! জানিনা প্রকৃতি আমার পিতার বীর্যপাতের ভেতর থেকে আমার শুক্রাণুটিকেই কেনো ডিম্বস্ফুটনের জন্য বেছে নিলেন! অভাব আমার মাকে সঞ্চয়ী আর প্রবল কৃপণ করেছেন, কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি এখন! কিন্তু তার প্রথম বিবাহ মাসের দূর্ঘটনায় জন্মানো আমি আজও অবাঞ্ছিতই রয়ে গেছি!

আমি প্রবলভাবে ঘরকুনো, অসামাজিক, বর্বর একজন প্রাণী। সকল স্বাভাবিক প্রথা, আচার আর ধর্ম পালনের বদলে আমি হয়ে উঠেছি বেদ্বীন, কাফের, ধর্মদ্রোহী, নাস্তিক! যদিও মাইক লাগিয়ে বলতে পারি; বাংলাদেশে আমার চেয়ে বেশী ইসলাম জানা মানুষ খুব বেশী নেই!

বাংলাদেশের সমাজে প্রতিটি বিবাহীত সন্তান নিয়ে মায়েদের সকল মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার দায় নিয়মিত ভাবে তার বৌমার ওপর বর্তায়! আমার পরিবার, আমার বোনের পরিবার অথবা আমার শাশুড়ীর পরিবারেও তার ভিন্ন চিত্র নেই! তবে আমি আমার বিবাহের ৬ বছর পর মায়ের সংসার ছেড়েছি একটি ডিম ভেঁজে খাবার স্বাধীনতাহীনতা, অনেক রাত না খেয়ে থাকার অভিজ্ঞতা আর দখলদার হবার অপবাদ কাধে নিয়ে; সব দোষ বৌমার! কিন্তু আর কেউ না জানুক, আমি জানি আমার স্ত্রী এক্ষেত্রে সদ্যজাত নিষ্পাপ!

আমি আমার জন্মের জন্য সুখী নই, কৃতজ্ঞ নই, না নতজানু কারও কাছে। প্রতিনিয়ত সময়ের প্রহেলিকায় বয়ে চলা এক টুকরো স্পন্দন ছাড়া আমি ভিন্ন কিছু নই; খুব ভাল করেই জানি কিছুই অপেক্ষা করে নেই আমার জন্য, না অতীতেও ছিলো কিছু! প্রতিনিয়ত বোধের যে দাসত্ব করি আমি, তা আমার জীবনকে করছে সবচেয়ে বড় হাবিয়া দোযখ! সৃষ্টিকর্তা বলে যদি কিছু থেকেই থাকে, তবে তিনি এতটা নির্বোধ হতে পারেন না, যিনি একজনকে দুবার দোযখে পাঠানোর শাস্তি দেবেন!

সংসার, সন্তান, মরে যাবার পর স্মরণ করার মানুষের বাসনা আমার ভেতর কাজ করেনা! আমার হাজারও অক্ষমতার সাথে আমার স্ত্রীকে জড়িয়ে ফেলাটা জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ বলে বিবেচনা করি এখন! কিন্তু একথাও সত্য এই ৪১ বছরের জীবনে সে আমার একমাত্র অর্জন! আমি পৃথিবীর প্রতিটি পুরুষের জন্য তার মত সমব্যথী মানুষের কামনা করি, ভালবাসা এর বাইরে আর কী হতে পারে আমার তা জানা নেই!

আমি লোভী নই, আমার মায়ের ৬ তলা ভবন, ব্যাংক ভর্তি অলস টাকা আর আমার শশুর-শাশুরীর অঢেল সম্পত্তি আমাকে লালায়িত করে না, বিবাহসূত্রে প্রাপ্ত আমার স্ত্রীর সকল গহনা বিনাপ্রশ্নে তাকে দিয়েই দান করে দিয়েছি আমি; অথচ নিজেদের চিকিৎসা করানোর মত অর্থ নেই বলে আমার স্ত্রী সন্তানের বদলে বিড়ালের মা আর নানী হচ্ছেন নিয়মিত! তাকে তাবিজ আর পানিপড়া দিতে যাদের অভাব হয়না, তারাই কোটি কোটি টাকা অন্য সন্তানের জন্য গর্তে ফেলতে দ্বিধা করেন না! হয়ত এটাই পৃথিবীর নিয়ম, বাধ্য না করলে আপনি কেবল ডুবে যেতেই থাকবেন!

আমি ভাল উপার্জন করি, তারপরেও মাস শেষে চাল কেনার টাকা থাকে না মাঝে মাঝে, ধোঁয়া টানিনা, মদ খাইনা, নেশা করিনা, জুয়া, নারী, বন্ধু-বান্ধব সহ আমার এমন কোনো নেশা নেই যেখানে ১ টাকা খরচ হতে পারে! তারপরেও শেষ কবে আমার স্ত্রীকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দিয়েছি মনে করতে পারিনা এখন! কেবল প্রযুক্তি প্রেম, বিজ্ঞান, ধর্ম গবেষণা আর কয়েকজন এতিমকে পালতে গিয়ে আমি কপর্দকশূণ্য থাকি প্রায়ই! অবাঞ্ছিত মানুষদের আসলে এমনটাই হয়!

আমার চারপাশের মানুষের আদতে কোনো দোষ নেই, না আমার পিতা-মাতার, না আমার ভাই-বোনের, না আমার শশুর-শাশুরীর পরিবারের! আমি আসলে সময়ের ভুলে জন্মগ্রহন করা মানুষ! হয়ত হাজার বছর আগে অথবা হাজার বছর পরের সমাজে আমি যথাযোগ্য হতাম! তবে এই অবাঞ্ছিত যন্ত্রনাদায়ক জীবন আমাকে উপহার দেবার জন্য আমার পিতা-মাতাকে আমি শাস্তি দিতেই পারি; তাতে সন্তান হিসাবে সমাজে আমাকে যতই নিকৃষ্ট পরিচয় দেওয়া হোক, তাতে আমার, সময়ের, মহাবিশ্বের কিছু যায় আসে না! এই জুন-এ আমার ৪১ বছর পূর্তি হচ্ছে; তার আগেই আমি কিছু স্থির সিদ্ধান্ত নিচ্ছি! আজকের এই গল্পের বিষয়বস্তু সেখানেই:

আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সজ্ঞানে দুজনের মরদেহ মেডিক্যাল কলেজে দানের ব্যাপারে একমত হয়েছি! আমরা কোনোভাবেই কোন সন্তান জন্ম দেবো না বলে ঠিক করেছি! যদি কেউ আগে মারা যাই অন্যজন এসব বিষয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে! আমি জানি, যতটা অন্যায় আমাদের পরিবার আমাদের সাথে করেছেন তার চেয়ে আমি তাদের সাথে বেশী অন্যায় করছি; কারণ নরকের শান্তি পৃথিবীতে করা অপরাধের চাইতে অবশ্যই বেশী হয়!

সর্বপরি; আমার এই যন্ত্রণাদায়ক অবাঞ্ছিত জীবন দিয়ে পৃথিবীতে জন্ম দেবার জন্য আমার পিতা-মাতাকে আমি চূড়ান্ত শাস্তি দিতে চাই; তারা আমার পরিচয় দেবেন না, এবং আমার নামে কোনো সন্তান আছে তা বলতেও বাধ্য হবেন না! আমি তাদেরকে পূণরায় ত্যাজ্য করছি না, তবে তারা আমার মৃতদেহ দেখার অধিকারও আর রাখবেন না; তা আমি যতই ভুগে ভুগে মরি না কেনো! আমিও আমার পিতা-মাতা-ভাই-বোনের পরিচয় দেবো না, এবং মৃতদেহ সৎকার বা দেখতেও যাবো না! আর আমি সিদ্ধান্ত জানাচ্ছি, আমার মৃতদেহ যদি রাস্তার কুকুরকেও খেতে দেখা যায়, তবুও আমার পিতা-মাতা-ভাই-বোন দেখতে বা সৎকার করতে আসতে পারবেন না! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের ফেলা যাওয়া কোনো সম্পত্তি ইসলামী আইন অনূসারে যদি আমার ভাগে এসে বর্তায়, তার সবটুকু আমার দুই ভাই-বোন সমান ভাগে বন্টন করে নিতে পারবেন! যেহেতু আমরা নিঃসন্তান আছি এবং থাকবো, তাই কোনো উত্তরসূরী আসার প্রশ্নই আসেনা!

এই গল্পের পাঠকগন; আপনারা দরকারে সবার সামনে আমাকে থুতু দিয়ে ঘৃনা প্রকাশ করবেন, কিন্তু মনে রাখবেন পৃথিবীতে কাউকে জন্ম দেবার আগে একবার ভেবে নেবেন আপনাদের সাময়িক সুখ আর মা-বাবা ডাক শোনার বাসনায় আর কারও যেনো আমার মত অবাঞ্ছিত জীবনযাপনের বোঝা না বইতে হয়!

আজ এখন থেকে আমি অবাঞ্ছিত নরসুন্দর মানুষ, আমার পক্ষ থেকে আমার পিতা-মাতা-ভাই-বোনের মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করছি..!!! তারা সকলেই আজ থেকে আমার কাছে মৃত! একজন অবাঞ্ছিত মানুষ হিসাবে দুনিয়াতে আনার জন্য এটুকু শাস্তি আমি তাদের দিতেই পারি!……

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “ছোট গল্প: অবাঞ্ছিতের প্রলাপ!

  1. খুব কষ্ট লাগছে আপনার বেদনার্ত
    খুব কষ্ট লাগছে আপনার বেদনার্ত কাহিনী পড়ে। আসলে কোন কিছু বলার সাহস হচ্ছে না। আপনারা (স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই) সত্যি সংগ্রামী, সাহসী মানুষ। আপনাদের স্যালুট।

  2. আমি ভাবতাম দুনিয়াতে আমি-ই
    আমি ভাবতাম দুনিয়াতে আমি-ই একমাত্র হতভাগা, এখন দেখছি আমার মতো আরো দু-জন আছে!
    তবু এভাবেই আমাদেরকে বাঁচতে হবে…………

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

62 − 61 =