ইকুইলিব্রিয়ামঃ সিস্টেমের বিরুদ্ধে সংবেদনশীল মানুষের লড়াইয়ের ছবি

.png” width=”500″ />

বিশ শতকের শেষদিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হল। অল্প কিছু মানুষই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারলো। যারা পারলো তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালো যে, যুদ্ধের পেছনে মূল কারণ মানুষের আবেগ। আরো বিশিষ্টভাবে বললে তার অনুভব করার সামর্থ্য। তাই তারা ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ মানুষকে পুরোপুরি নিরাবেগ করে ফেলার এবং তার ভেতর থেকে যাবতীয় ব্যক্তিগততার বোধ উপড়ে ফেলার প্রকল্প হাতে নিল। তৈরি করলো লিব্রিয়া নামের এক নগর রাষ্ট্র। যার সর্বময় কর্তা ফাদার আর টেট্রাগ্র্যামাটন কাউন্সিল।

লিব্রিয়ার সব নাগরিককে বাধ্যতামূলকভাবে প্রোজিয়াম নামের একটা অষুধ নিয়ম করে সেবন করতে হয়। এই অষুধের কাজ মানুষকে অনুভূতিশূন্য করে তোলা। কেউ যদি এই অষুধ না খায় এবং/অথবা প্রকাশ্যে মানবিক অনুভূতি প্রদর্শন করে তাহলে তাকে সেন্স অফেন্ডার হিসেবে ট্রিট করে সর্বোচ্চ আইন পরিষদ গ্র্যামাটন ক্লেরিকস কঠোর শাস্তি দেয়।

লিব্রিয়ায় বই নিষিদ্ধ, গান নিষিদ্ধ, ছবি নিষিদ্ধ। এমনকি রঙও নিষিদ্ধ। যা কিছু মানবিক অনুভূতিকে উসকাতে পারে, নিষিদ্ধ।

লিব্রিয়ার পৃথিবী শাদাকালো।

পুরো লিব্রিয়ায় বড়ো বড়ো ভিডিও স্ক্রিণ আছে। সেখানে সারাক্ষণ ফাদারের বাণী প্রচার করা হয়। যিনি বলেন মানুষের অনুভূতির কিছু ভালো দিক থাকলেও খারাপ দিকগুলো যুদ্ধ ও সহিংসতা উসকায় বলে বৃহত্তর স্বার্থে মানুষকে অনুভূতিশূন্য করে তোলা হচ্ছে। পৃথিবীতে এখন আর কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হয় না। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শান্তি। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একত্ব। তবে সবাই লিব্রিয়াকে সহজভাবে মেনে নেয় নি।

নগর রাষ্ট্রের বাইরে কিছু পরিত্যক্ত এলাকা আছে, সেখানে পুরনো দিনের বই-গান-ছবি পাওয়া যায়, পাওয়া যায় রঙিন জিনিশপত্রও। গ্র্যামাটন ক্লেরিকস মাঝেমধ্যেই তাই অভিযান চালায় সেখানে। যতোটা পারে ধবংস করে ফেলে অনুভূতিসংক্রান্ত জিনিশপত্র। এইসব পরিত্যক্ত এলাকাতেই গড়ে উঠেছে এক আণ্ডারগ্রাঊণ্ড। এদের উদ্দেশ্য লিব্রিয়ার ফাদার আর টেট্রাগ্র্যামাটন কাউন্সিলের হাত থেকে লিব্রিয়ার জনগণকে মুক্ত করা। লিব্রিয়ার সরকারি পরিভাষায় এদেরকে টেররিস্ট বলা হয়। নগর রাষ্ট্রের বহু জায়গায় এদের লোক আছে, যারা বিপ্লবের সময়, ভেতর দিকে লিব্রিয়ার শান্তি-একত্ব-আনুগত্যের সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করবে।

জন প্রেসটন একজন একজন হাই র‍্যাংকিং ক্লেরিক। সেন্স অফেণ্ডার হওয়ায় তার স্ত্রীর ফাঁসি হয়েছিল। পরিত্যক্ত এলাকায় এক অভিযান চালানোর সময় সে আবিষ্কার করে তার সহকর্মী এরল প্যাট্রিজ প্রাচীন পৃথিবীর কবি ইয়েটসের একটা কবিতার বই বাঁচানোর চেষ্টা করছে। এটাকে সে নেয় একটা সেন্স অফেন্স হিসেবে। খুন করে প্যাট্রিজকে। কিন্তু মৃত্যুর আগে প্যাট্রিজের পড়া কবিতার লাইন ঢুকে যায় তার মাথার মধ্যে। অনেকদিন পরে ঘুমে সে স্বপ্ন দ্যাখে স্ত্রীকে।

প্রেসটনের দৈনিক প্রোজিয়ামের স্টক দুর্ঘটনাক্রমে ভেঙে যায়। সে বিভিন্ন আবেগময় মুহূর্তের মুখোমুখি হয় এবং বুঝতে পারে তার ভেতরে এখনো কিছু মানবিক অনুভূতি অবশিষ্ট আছে। সে প্রোজিয়াম না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং অষুধগুলো স্নানঘরের আয়নার পেছনে লুকিয়ে রাখে।

প্রেসটনের নতুন সহকর্মী হয় ব্র্যাণ্ডট নামের একজন। এক অভিযানে মেরি ওব্রায়েন নামের একজন মহিলা সেন্স অফেন্ডারকে ঘটনাস্থলে খুন না করে ইন্টারোগেশনের জন্য বাঁচিয়ে রাখায় ব্র্যাণ্ডট সন্দেহ করে প্রেসটনকে। এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে, একদল ‘টেরোরিস্টকে’ হাতের কাছে পেয়েও প্রেসটন তাদেরকে বাঁচিয়ে দেয়ার বৃথা চেষ্টা চালায়, এতে ব্র্যাণ্ডটএর সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়।

অকস্মাৎভাবে আন্ডারগ্রাঊণ্ডের নেতা জুর্গেনের সাথে দ্যাখা হয় প্রেসটনের, প্রেসটন তাকে বিপ্লবী হিসেবে মেনে নেয়। জুর্গেন সিদ্ধান্ত নেয় প্রেসটন সিস্টেমকে বিট্রে করবে। খুন করবে ফাদারকে। কিন্তু ফাদার পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে জন প্রেসটনকে অনেক বড়ো একটা স্যাক্রিফাইস করতে হবে। আর সেটা হচ্ছে মেরির মৃত্যুদণ্ড মেনে নেয়া। জুর্গেন বলে এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। মেরিকে বাঁচাতে গেলো ফাদারকে মারা যাবে না।

এক ঘটনায় প্রেসটনকে হাজির করা হয় ফাদারের ছেলের সামনে, সে প্রথমে প্রেসটনের ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু প্রেসটন তাকে এই বলে কনভিন্স করতে সক্ষম হয় যে সিস্টেমের ভেতর থেকে ক্লেরিকদের কেউ একজন বিট্রে করছে বলেই আণ্ডারগ্রাউণ্ডকে ধরা যাচ্ছে না। সে ফাদারের ছেলেকে নিশ্চয়তা দেয় আণ্ডারকভার এজেন্ট হিসেবে আণ্ডারগ্রাঊণ্ডে ঢুকে কে সেই ট্রেইটর তা খুঁজে বের করার। এরই মধ্যে মেরির মৃত্যুদণ্ডের দিন চলে আসে। প্রেসটন জানতে পারে পুড়িয়ে মারা হবে মেরিকে। সে নিজের মানবিক আবেগ সামলাতে পারে না, মেরিকে বাঁচানোর মরিয়া ব্যর্থ চেষ্টা করে। মেরির মৃত্যুতে সে প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়ে, ব্র্যাণ্ডট তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে, সেন্স অফেন্ডার হিসেবে গ্রেপ্তার করে। প্রেসটন একটা কৌশলের মাধ্যমে ব্র্যাণ্ডটকে বিপদে ফেলে, আপাতদৃষ্টিতে ফাদারের ছেলেকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় ব্র্যাণ্ডটই সেই ট্রেইটর, অতএব ব্র্যাণ্ডট গ্রেপ্তার হয়।

প্রেসটন আপাতদৃষ্টিতে আণ্ডারগ্রাঊণ্ডের নেতৃবৃন্দকে সিস্টেমের হাতে ধরিয়ে দেয় এবং এর পুরস্কার হিসেবে সুযোগ পায় ফাদারের সাথে সাক্ষাতের। নির্ধারিত দিনে সে ফাদারের সাথে দ্যাখা করতে গিয়ে আবিষ্কার করে ব্র্যাণ্ডট আসলে কোনোদিন গ্রেপ্তারই হয় নি, একেবারে শুরু থেকেই তাকে ব্যবহার করা হয়েছে, প্রেসটন আর আণ্ডারগ্রাঊণ্ডকে ধরতে। প্রেসটনের লয়ালিটি নিয়ে সিস্টেম বরাবরই সন্দিহান ছিল।

প্রেসটন আরো একটা ভয়াবহ তথ্য আবিষ্কার করে। ফাদার আসলে অনেক আগেই প্রাকৃতিকভাবেই মরে গেছে। ফাদারের নামে প্রকাশ হওয়া ভিডিওগুলো সব ফেইক। এসবের পেছনে আছে, হ্যা, ফাদারের সেই ছেলে। যে ফাদারের নাম ব্যবহার করে ক্ষমতায় আছে। ফাদারের ছেলে প্রোজিয়াম নেয় না, তার নিজের যথেষ্ট অনুভূতি আছে, এটাও প্রেসটন টের পায়। সে বুঝতে পারে লিব্রিয়ার জনগণের সাথে সুপরিকল্পিতভাবে প্রতারণা করা হচ্ছে এবং এতে সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

ফাদারের দেহরক্ষীদের খুন করে প্রেসটন ফাদারের ছেলের অফিসে প্রবেশ করে হতবাক হয়ে যায়। সে দ্যাখে পুরো নগর রাষ্ট্রের বিবর্ণ করে রাখা হলেও ফাদারের ছেলের অফিসে রঙিন জিনিসপত্রের কোনো অভাব নেই। সে বুঝতে পারে লিব্রিয়ার পুরো সিস্টেম দাঁড়িয়ে আছে সুপরিকল্পিত ভণ্ডামির উপরে।

সে ব্র্যাণ্ডট আর ফাদারের ছেলেকে খুন করে। জুর্গেন আর তার সাথীরা তৈরি ছিল, সিগনাল পেয়েই, সিস্টেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিপ্লবীদের বাহিনীর যুদ্ধ হয়। নিরাপত্তা বাহিনী হারে। ফাদারের সব ভিডিও সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। লিব্রিয়ার জনগণ শেষ পর্যন্ত প্রাণভরে শ্বাস নেয়। মানবিক অনুভূতি প্রকাশ করার অধিকার ফিরে পায়।

ইকুইলিব্রিয়াম ২০০২এর একটা ডিসটোপিয়ান সাই ফাই মুভি। যা লিখেছেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন কুর্ট উইমার। সিনেমাটির ওপরে অরওয়েলের ১৯৮৪র প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে। একত্বের ধারণাটির জায়গায় ফ্যাসিজমের সাথে মিল রয়েছে, যা কোনো বৈচিত্র্য সহ্য করে না। লিব্রিয়ার পতাকাও দেখতে নাজি জার্মানির পতাকার মতো। যদিও এই নগর রাষ্ট্রের শাসকরা যুদ্ধ নয়, শান্তির নামে, প্রতারণা করে জনগণের সাথে। সমষ্টির স্বার্থের নামে ব্যক্তিগততার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া লিব্রিয়াকে সামন্ত-পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মতোই লাগে যা চরিত্রগত দিক দিয়ে ফ্যাসিস্ট।

ভরসার জায়গা হল, মানুষ থাকবে এবং সেইসাথে থাকবে মানুষের সংবেদনশীলতাও, কোনো সিস্টেম মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। পিতৃতান্ত্রিক প্রতারণার বিরুদ্ধে সংবেদনশীল মানুষের লড়াই চলবে। ইকুইলিব্রিয়াম সেই লড়াইয়েরই একটি গল্প স্বার্থকভাবে দেখিয়েছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 5