মানুষ এবং সাপের গল্প

গল্পটা পূর্ব-পাকিস্থানের নোয়াখালী, ঢাকা, রাজশাহী, ফরিদপুরের অথবা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, উত্তর চব্বিশপরগণা, নদীয়া, বর্ধমানের। স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ যখন তার নির্দয় কলমটা অথবা কলমের অবয়বে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ছুরিটা ভারতবর্ষের মানচিত্রের ব্যবচ্ছেদের কাজে ব্যবহার করলেন, যাকে আমরা বলি র‌্যাডক্লিফ লাইন; র‌্যাডক্লিফ লাইনের দাগটা আসলে কালির নয়, ভারতবর্ষের কোটি কোটি মানুষের তাজা রক্তের দাগ ওটা; শিশুর রক্ত, নারীর রক্ত, টগটবগে তরুণ-তরুণীর রক্ত, প্রৌঢ় কিংবা বৃদ্ধ-বৃদ্ধার রক্ত; হিন্দুর রক্ত, মুসলমানের রক্ত, শিখ, জৈন কিংবা বৌদ্ধ’র রক্ত; মাথার রক্ত, বুকের রক্ত, যোনির রক্ত, সারা শরীরের রক্ত! গল্পটা তখনকার-

প্রথমে তার মনে হলো নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ! তার, মানে মাখনলাল অথবা লাল মিয়ার; আমরা শুধু লাল বলেই ডাকবো। গায়ের রঙ দুধে আলতা বলেই বাবা-মা তার নাম রেখেছিলেন লাল। হ্যাঁ, যে শব্দটার কথা বলছিলাম, শব্দটা শুনে প্রথমে তার মনে হলো নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ। এটা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক, কেননা মানুষ রূপী একদল হিংস্র জন্তু হাতে লাঠি, বন্দুক, ধারালো ছুরি, কোঁচ, বল্লম, রামদা ইত্যাদি যার বাড়িতে যা ছিল নিয়ে এসে বাড়িটা ঘিরে ফেলে চিৎকার করতে করতে সদর দরজায় আঘাত করছিল দরজা খোলার জন্য। দরজা খুলতেই হবে, নইলে ওরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকবে। ঘর-বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজবে একটা অন্য জাতের, অন্য ধর্মের, ওদের ভাষায় বেজাত-বিধর্মীকে। তারপর তাকে পেলে কার আগে কে কোপাবে শুরু হবে সেই প্রতিযোগিতা! এই দাঙ্গার বাজারে একটা বেজাত-বিধর্মী মারা কম কৃতিত্বের কথা নয়! সারাজীবন দম্ভের সাথে সবাইকে বলে বেড়াতে পারবে, সমাজে তাকে নিয়ে আলোচনা হবে, তার কদর বাড়বে, বুড়োকালে চামড়ায় ভাঁজ পড়লেও নাতি-নাতনিদের কাছে যৌবনের নিভাঁজ চামড়ার বীরত্বগাঁথার স্মৃতি রোমন্থন করতে পারবে!

ওদিকে দরজা খুলতেই হবে; এদিকে তার মতো একজন টগবগে তরুণ, তাজা প্রাণ রক্ষার জন্য মরিয়া এই বাড়ির মানুষ। বাড়িটা লালের বন্ধু সুনীল অথবা ইসমাইলদের। আমরা বরং নীল বলি, লালের বন্ধু নীল। লালের ধর্ম আর নীল এবং তার পরিবারের ধর্ম আলাদা। হোক সে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, সবার আগে তো মানুষ, তাকে রক্ষা করতে হবে, মানুষকে রক্ষা করাই মানুষের ধর্ম। তাছাড়া লাল নীলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রায় বাড়ির ছেলের মতোই। এ বাড়িতে কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি নেই বিধায় লাল যখন তখন আসে, থাকে, খায়, ঘুমায়। তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করা যেমনি মানবীয় ধর্ম পালন করা, তেমনি এটা তাদের দায়িত্বও। এমনটাই ধারণা এই বাড়ির মানুষের।

পরশু রাতে লালের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, আপনজনেরা বেঁচে আছে না মরে গেছে সে জানে না, কোথায় যাবে কি করবে তাও জানে না! আবার রাস্তায় কারো নজরে পড়লেও নিশ্চিত মৃত্যু। উপায় না দেখে বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। যারা তাদের বাড়িতে আগুন দিয়েছে, অকাতরে তাদের জাতের মানুষ মেরেছে, নীল এবং তার পরিবারও সেই একই জাতের। তবে ওদের মতো দাঙ্গাপ্রিয় এবং রক্ত পিপাসু নয় এরা। তবু তার অভিমানী মন একবার বলেছিল আসবে না বন্ধুর বাড়িতে, তারপরও এসেছে বন্ধুর টানে-জীবনের মায়ায়, হয়তো সামনে অন্য কোনো দরজা খোলা ছিল বলে। নীল, নীলের বাবা-মা, বোন পরশু রাতে তাকে আশ্বাস দিয়েছিল কোনো ভয় নেই! তারা তাকে রক্ষা করবে। আশ্বাস পেয়ে যেন নিঃশ্বাস ফিরে পেয়েছিল সে। পরশু রাতের পর কাল দিন কেটে গেছে, রাত পেরিয়েছে। নীল খবর এনেছে তাদের পাড়া জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, পাড়ায় কোনো মানুষ তো দূরের কথা গাছে একটা পাখিও দেখতে পায়নি। অনেকেই আগুনে পুড়ে মারা গেছে, লাশ নিয়ে গেছে পুলিশ। তার পরিবারের কারো কোনো খোঁজ জানতে পারেনি নীল।

পরশু রাতের পর একবারও এই বাড়ির বাইরে যায়নি লাল, সারাক্ষণ ঘরের মধ্যেই থেকেছে, নিচু স্বরে কথা বলেছে। দিনেরবেলা একবার মাত্র ঘরের বাইরে পা রেখেছিল তলপেটে কামড় দিলে। প্রসাব করার জন্যও দিনের আলোয় বাইরে যায়নি সে, নীল একটা শালসার বোতল এনে রেখেছে খাটের নিচে, তাতেই সে ভারমুক্ত হয়েছে; ভরে গেলে নীল বোতলটা বাইরে নিয়ে গিয়ে খালি করে আবার এনে রেখেছে খাটের নিচে। কলতলায় গিয়ে স্নান করেছে কাল অন্ধকার নামার পর। তার দুশ্চিন্তা কাটাতে নীলের বোন দাবা নিয়ে এসেছে, দাবা খেলেছে সে, কখনও নীল কখনও নীলের বোনের সঙ্গে। নীলের মা আয়েশা অথবা আশালতা ঘরের মেঝেতে বসিয়ে আদর করে ভাত খাইয়েছেন, মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছেন, আর লালের গাল বেয়ে ঝরঝর করে জল পড়েছে তার মা-বাবা, ভাই-বোনের জন্য!

দরকার না পড়লে এই বাড়ির গেট খোলা হয়নি। বাড়ির তিনদিকে উঁচু দেয়াল, একদিকে দেয়ালের সমান্তরাল কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার ওপর সুপারি গাছের বাগড়োর আবরণ, তবে একটু চেষ্টা করলেই বাড়ির ভেতরটা দেখা যায় ফাঁক-ফোকর দিয়ে। লাল আসার পর এ বাড়িতে বাইরের কেউ আসেনি। তবু খবরটা কি করে বাইরে গেল সেটা একটা বিস্ময়! নীল এবং তার পরিবারের মানুষের ভেতরে অবিশ্বাসের ছিদ্র খুঁজে পায়নি লাল, কিন্তু খবরটা বাইরে গেল কি করে তাও সে বুঝে উঠতে পারছে না!

দাঙ্গাবাজদের আক্রমণের মুখে মানবতায় বিশ্বাসী এই বাড়ির মানুষগুলো লালকে রক্ষার চিন্তায় যখন দিশেহারা; বুঝে উঠতে পারছিল না খাটের তলায়, মাচায়, ছাদে না কোথায় লুকোবে এই টগবগে প্রাণকে; তখনই নীলের কিশোরী বোনের মাথায় খুলে গেল একটা সমাধানের দুয়ার। বাড়ির পোড়ো মন্দির অথবা পোড়ো মসজিদই লালকে লুকোবার একমাত্র নিরাপদ জায়গা। নীলদের ঘরটা এল প্যাটার্ন, ঘরগুলোর ভেতর দিয়ে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাবার দরজা। নীল আর ওর মা লালকে নিয়ে দ্রুত ঘরগুলো অতিক্রম নিয়ে আসে উত্তরের ঘরটিতে, তারপর পিছন দরজা দিয়ে বেরিয়ে এই পোড়ো মন্দির অথবা পোড়ো মসজিদের কাছে। লাল তখন ঝড়ের মুখের সুপারিগাছ! এরপর মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে দরজা দিয়ে ঢুকে এই মন্দির অথবা মসজিদের অন্ধকারে মিশে আছে সে।

এই পোড়ো মন্দির অথবা মসজিদটা কতোকাল আগের তা জানে না কেউ। এটা হতে পারে দুশো-আড়াইশো বছর কিংবা তারও আগের কোনো রাজার আমলের মন্দির অথবা নবাবী আমলের কোনো নাওয়ারা জমিদারের তৈরি মসজিদ; এটা নাকি আগে অনেক উঁচু ছিল, ক্রমে ক্রমে মাটিতে বসে গেছে। এখন দরজার ওপরের দিকটাই মাটির কাছকাছি এসে ঠেকেছে, যেখান দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকেছে লাল।

এই বাড়িটা নীলদের পৈত্রিক বাড়ি নয়, ওরা এই বাড়িটা কিনেছে। কেনার পর ওর বাবা এই পোড়ো মন্দির অথবা মসজিদটি ভাঙেননি। নীলের মায়ের কাছে ভূতের বাড়ি মনে হওয়ায় মন্দির অথবা মসজিদটি তিনি ভাঙতে বলেছিলেন। কিন্তু নীলের বাবার যুক্তি, ‘এটা আছে থাক, এটার একটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে। এটা এই বাড়ির আদি মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করছে।’

তাই মন্দির অথবা মসজিদটা সব হারানো সম্রাটের মতো এখনও টিকে থাকলেও তার অতীত গৌরব মানুষের অজানা! বাইরের দেয়ালে চামচিকা আর বাদুর ঝুলতে দেখা যায়। বট-অশ্বত্থের চারা বেরিয়ে একটু বড় হতেই নীলের বাবা তা কেটে দেন। স্যাঁতা পড়া দেয়ালের ইট যেমনি ক্ষয়রোগগ্রস্ত তেমনি তার গায়ে পথসন্ন্যাসীর দেহের ছিন্ন বস্ত্রের মতো ঝোলে লতা-পাতা। চূড়ার ত্রিশূল অথবা বাঁকা চাঁদ-তারা দক্ষিণে ঈষৎ বাঁকা, যেন মর্যাদা হারানোর অভিমানে। এটা হলো মন্দির অথবা মসজিদটির বহিরঙ্গ, আর অন্তরঙ্গ কেমন তা দেখা দুঃসাধ্য হলেও জীবন বাঁচাতে এখন সেই দৃশ্য অবলোকন করার দূর্ভাগ্য হয়েছে লালের। কিন্তু দৃশ্য কোথায়? কেবলই অন্ধকার, নিজের হাতও যে দেখা যায় না!

ভেতরে ঢুকেই দরজার বাঁ দিকে গুটি-সুটি মেরে বসে আছে লাল। দাঁড়ানোর উপায় নেই, মাথায় ছাদ ঠেকে যাবে, আর ছাদে বাদুর না চামচিকা ঝুলছে তাই বা কে জানে! ভেতরে ভয়াল অন্ধকার, কেবল দরজার কাছটায় পথভোলা কান্ত পথিকের মতো দ্বিধাগ্রস্ত ম্রিয়মান আলো।

ওদিকে শোরগোল চরমে উঠলো, সদর দরজা খুলে দেওয়া হলো। দাঙ্গাবাজদের দাবি এই বাড়িতে একটা বেজাত-বিধর্মী প্রাণি আছে, প্রাণিটিকে ওদের হাতে তুলে দিতে হবে। বাড়ির মানুষ যতোবার জানালো যে তাদের বাড়িতে কোনো বেজাত-বিধর্মী নেই, ওরা তার অধিকবার দাবী করলো যে আছে। কম্পিত বুকে সব কথাই শুনতে লাগলো লাল। একজন দাঙ্গাবাজ তার সৃষ্টিকর্তার নামে শপথ করে বললো, ‘আমি ভোরবেলায় লালকে এই ঘর থেকে উঠোনে নামতে দেখেছি, কলতলায় মুখ ধুতে দেখেছি, ওর কথাও শুনেছি।’

যে বললো লাল তাকে চেনে, তার থেকে বয়সে বড় হলেও কতো বিকেলে একসাথে ফুটবল-দাঁড়িয়াবাধা খেলেছে! এক বর্ণও মিথ্যে নয় ওর কথা, সত্যিই সে ভোরবেলায় কলতলায় হাত-মুখ ধুয়েছে, নিচুস্বরে কথাও বলেছে নীলের সাথে। মিথ্যে বলছে নীল এবং তার পরিবারের সবাই; শুধু মিথ্যে বলছে না, মিথ্যেটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। অথচ এদের মুখে কোনোদিন মিথ্যে কথা শোনেনি লাল!

এরপর বাড়ির লোকদের ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে দাঙ্গাবাজরা ঘরে ঢুকলো। খাটের নিচে, মাচার উপরে-নিচে, আলনা-আলমারির পিছনে, হাঁড়ি-পাতিল সরিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো। রান্নাঘর-টয়লেট খুঁজলো, বাদ রাখলো না খড়ির ঘরও।

এদিকে অন্ধকারে বসে লালের বুকের স্পন্দন যেন আপনা-আপনিই বন্ধ হতে চাইছে, সতর্কভাবে নিঃশব্দে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো সে। তখনই শোসানোর মতো শব্দটা কানে এলো তার। বাইরের চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যেও শব্দটা ক্রমশ জোরালো হলে সচেতন হলো সে। আর তখনই নাকে এলো একটা চেনা গন্ধ! গন্ধটা একটু বিদঘুটে, খানিকটা গা গোলানোও। কিন্তু গন্ধটা পেয়ে এই মুহূর্তে যতো না তার গা গুলাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি বুকের রক্ত যেন বরফ হয়ে যাচ্ছে! গোখরো সাপের হাম ছাড়ার গন্ধ এটা, আর শব্দটা শিসের! সাপকে ভীষণ ভয় পায় লাল! আকবর আলী সাপুড়ে যখন খেলা দেখাতে আসতো পাড়ায়, তখন সে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখতো নির্বিষ সাপের খেলা, তবু হাত-পা সিরসির করতো। সাপের হামের গন্ধের সাথে তখনই পরিচয় তার।

লালের একবার মনে হলো বের হয়ে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই মত পাল্টালো। বাইরে বের হওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যু, আর এখানে ক্ষীণ হলেও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। ডান পায়ের পাতায় সূচের মতো কিছু একটা বিঁধতেই শিউরে উঠে হাত দিয়ে চাটি মেরে হাতটা চেপে ধরলো পায়ের পাতায়। চোখ বন্ধ করে মুখ দিয়ে স্বস্তির বাতাস ছাড়লো। না, সাপের দাঁত নয়! পায়ের পাতায় আঙুল ঘষে আঁঠালো কিছুর অস্তিত্ব টের পেলো সে, বুঝতে পারলো কামড়টা মশার; রক্তে পেট ভরা মশাটা মরেছেও।

একটুক্ষণ বন্ধ থাকার পর শোসানোর শব্দটা আবার ভেসে এলো কানে, গন্ধটা নাকে। উহ! এখন যদি আপনা-আপনিই প্রাণটা তার দেহ থেকে বেরিয়ে যেতো! নিজের স্বাভাবিক মৃত্যু কামনা করে সে তার সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে লাগলো মনে মনে। আর তখনই সে বাঁ পায়ের পাতার বাইরের পাশে চলমান শীতল কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে এক হাতের আঙুল অন্য হাতের আঙলের ফাঁকে ঢুকিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলো, সেই সঙ্গে সাময়িক বিরতি পড়লো তার বুকের হাপরে। সাপটা তার পায়ের পাতা ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছে। সাপটা যেদিকে যাচ্ছে সেদিক থেকেও ভেসে আসছে শোসানি, নিশ্চয় আরেকটি সাপ আছে ওদিকে। ক’টা আছে তাইবা কে জানে! আলো জ্বাললে হয়তো দেখা যাবে তার চারপাশে কেবল সাপ আর সাপ! সে পাতালপুরের নাগরাজের মতো সাপের আখড়ার মাঝখানে বসে আছে!

দাঙ্গাবাজরা সব ঘর, সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও লালকে না পেয়ে হতাশ। তবু আনাচ-কানাচে চোখ বুলাতে লাগলো তারা। কেউ একজন বললো, ‘খোঁচা দিয়ে দ্যাখ তো ওর ভিতরে ঢুকেছে কিনা?’
একজন বললো, ‘আরে না! ওর ভিতরে কেউ ঢোকে!’

তবু কৌতুহলী একজন এসে হাতের কোঁচ ঢুকিয়ে দিলো পোড়ো মন্দির অথবা মসজিদের দরজা দিয়ে। লাল যে পিছিয়ে যাবে সে উপায়ও নেই, সাপটা এখনও তার পা ঘেঁষে! দ্বিতীয়বার কোঁচটা ভেতরে ঢুকতেই সাপটা ফুঁসে উঠে ছোবল মারলো লালের বাঁ হাতের কব্জিতে। লেজ দিয়ে জড়িয়ে ধরলো তার বাঁ হাত। চামড়ায় সাড়াশির মতো দাঁত বসিয়ে আঁকড়ে ধরে রইলো সাপটা। লাল ঘোরলাগা অবস্থায় ডান হাতে সাপটির গলা ভীষণ জোরে চেপে ধরে হ্যাচকা টান মেরে ছাড়াতেই মনে হলো তার কব্জির মাংস ছিঁড়ে গেল কিছুটা।
কৌতুহলী লোকটা কোঁচটা বাইরে টেনে নিলো, হয়তো সাপটার শরীরের সামান্য অংশ-ই কোঁচবিদ্ধ হয়েছে। কোঁচটা আবার ভেতরে ঢোকার মুহূর্তে চিৎকার করলো লাল, ‘মারিস না, আমি বের হচ্ছি!’

কোঁচ ঢুকলো না ঠিকই কিন্তু বাইরে থেকে উল্লাস ধ্বনি উঠলো, যেন আফ্রিকান কোনো আদিবাসী দল বহুক্ষণ ধরে শিকারের পিছে ছুটতে ছুটতে অবশেষে গর্তে খুঁজে পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত খরগোশ কিংবা সজারু!

অশ্রাব্য গালি মিশ্রিত বাক্যে তাকে বাইরে বেরুনোর আদেশ দিলো দাঙ্গবাজরা। লাল বাঁ হাতে পেচানো সাপের গলা ডান হাতে একই ভাবে ধরে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বের হলো। সাপটা তার হাতের মধ্যে মোচড়ানোর চেষ্টা করছে, শরীরের শক্তি প্রয়োগ করছে। সাপ আর তার নিজের রক্তে ভেসে গেছে বাঁ হাত। ওকে এহেন অবস্থায় দেখে প্রাথমিকভাবে সবাই হতবাক! লাল আঁকড়ানো সাপটাকে অনেক কষ্টে বাঁ হাত থেকে ছাড়িয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো একপাশে। যার হাতে কোঁচ ছিল সে পুনর্বার সাপটার কোমরে কোঁচবিদ্ধ করলো, সাপটা এবার লেজ দিয়ে কোঁচ আঁকড়ে ধরে বার দুয়েক ছোবল মারলো কোঁচের বাঁশে; তারপর কামড়ে ধরলো কোঁচের শলাকা।

লালের দুঃস্বপ্ন দেখার অনুভূতি হলো! মনে হলো যা ঘটলো, যা ঘটে চলেছে এসব সত্য নয়! এইসব দাঙ্গাবাজ, বিষধর গোখরো সব মিথ্যে! কিন্তু বাঁ হাতের রক্তাক্ত কব্জির দিকে তাকাতেই যেন সম্বিত ফিরে পেল সে। আকুতি ভরা কণ্ঠে আবেদন জানালো, ‘আমাকে বাঁচাও, আমাকে সাপে কামড়েছে, আমাকে বাঁচাও!’

বল্লম হাতে একজন বলে উঠলো, ‘বেশ করেছে শালা বেজাত-বিধর্মী! সাপও বেজাত-বিধর্মী চেনে! মর তুই!’
সাপের বিষ তার শরীরে ক্রিয়া শুরু করেছে, বাঁ হাতের চামড়ার নিচে যেন আগুন জ্বলছে, আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসছে। আবারও সে কাকুতি-মিনতি করে বললো, ‘আমাকে আগে হাসপাতালে নিয়ে চলো, তারপর মারো-কাটো যা করবার কোরো।’
রোদ পড়ে যার হাতের রামদা হাসছে সে বললো, ‘দিই শালার ধড় থেকে মাথাটা নামিয়ে।’
একজন বললো, ‘আরে রাখ রাখ, সাপের বিষে একাই মরুক, মজাটা দেখ!’

নীল, নীলের বাবা-মা আর বোন সবাইকে অনুরোধ করলো ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য, কিন্তু কেউ ওদের কথা শুনলো না। উপরন্তু ওদের শাসালো, ‘আগে বেজাত-বিধর্মীটাকে মারি, তারপর তোমাদের বিচার করবো!’

নীল লালের কাছে ছুটে আসতে চাইলে দু’জন দাঙ্গাবাজ ধাক্কা মেরে তাকে ফেলে দিলো মাটিতে।

লাল এবং কোঁচবিদ্ধ সাপটাকে ওরা নিয়ে গেল স্কুলের মাঠে। মাঝখানে বসে আছে লাল, তার থেকে কিছুটা তফাতে কোঁচবিদ্ধ সাপটা। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে মানুষের গোলাকার বেষ্টনি তৈরি হয়ে গেল। নানান বয়সী মানুষ ভিড় করেছে, কেউবা ছুটে আসছে।

লাল এখন নিশ্চুপ। সে আর বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে না কারো কাছে। সে বুঝে গেছে এদের কাছে বাঁচার আকুতি জানানো বৃথা। মাটিতে লেপটে বসে উল্লসিত মানুষগুলোর মুখ দেখতে লাগলো সে, প্রায় প্রতিটা মুখে ফুঁটে উঠেছে একটা বেজাত-বিধর্মী মরতে দেখার আনন্দ! বিজয়ের হাসি!

মাটিতে প্রোথিত কোঁচ। সাপটা কখনও ফণা তুলছে আবার কখনও ফণা গুটিয়ে মাটি বেয়ে এগিয়ে যেতে চাইছে কিন্তু টান পড়ছে তার কোঁচবিদ্ধ কোমরে। আবার মাথা ফিরিয়ে আনছে কোঁচের কাছে, কোঁচের শলাকায় কামড় বসাচ্ছে, ফণা তুলে জিভ বের করছে।

লালের শরীর শিথিল আসছে। দৃষ্টি কিছুটা ঝাপসা, তবু ঝাপসা চোখেই তাকিয়ে দেখতে লাগলো এতোদিনের চেনা মানুষগুলোর মুখ। মুখগুলো কী ভীষণ বদলে গেছে এখন! ব্যতিক্রম কেবল শিশুদের মুখ, ওদের চোখে ভয় আর বিস্ময়, হয়তো খানিকটা দরদও; মুখগুলো মলিন আর মায়াময়। আজ যে শিশুর চোখে-মুখে ভয় এবং মায়া, আগামীতে এই শিশুর হৃদয়ই হয়তো পৈশাচিকতার দীক্ষা নেবে এইসব দাঙ্গাবাজদের কাছ থেকে! জানবে বেজাত-বিধর্মী হত্যা ন্যায়সঙ্গত! রক্তের হোলি খেলতে শিখবে অদম্য বন্য উল্লাসে!

গ্যাঁজলা উঠতে শুরু করলো লালের মুখ থেকে, শরীরের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ তার আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ পিছন দিকে পড়ে গেল চিৎ হয়ে। আকাশটাও এখন ঝাপসা। বাঁ দিকে মাথা কাত করে সাপটাকে দেখলো সে, সাপটা ফণা তুলে ঘন ঘন জিভ বের করছে। সাপটার পরান এতো শক্ত! সে ঝাপসা চোখের মণি ঘুরালো দাঙ্গাবাজদের মুখের দিকে। হাসছে সবাই। সাপের মতো ফণা তোলা মুখগুলো, জিভটা নড়ছে সাপের মতোই! ওদের হাসি-গুঞ্জন এখন মৃদুভাবে কানে আসছে তার। নীল আকাশটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে, নীল ক্যানভাসে ঢুকে দখল নিতে চাইছে কালো রঙ; যেমনি তার দেহের সমস্ত লাল রঙের দখল নিয়েছে সাপের বিষ! ঝাপসা হতে হতে একসময় কালোয় ছেয়ে গেল নীল আকাশটা!

গল্পটার জন্ম না হওয়াটাই কাম্য ছিল অথবা দূর্ভাগ্যজনক ভাবে গল্পটার জন্ম যখন হয়েছিল-ই তখন ওখানেই শেষ হতে পারতো গল্পটা। কিন্তু নির্মম এবং বাস্তব সত্য হলো গল্পটা আজও শেষ হয়নি ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতবর্ষে কিংবা পূর্ব-পাকিস্থানকে কবর দিয়ে নতুন করে জন্ম নেওয়া এই স্বাধীন বাংলাদেশে! গল্পটা আজও লেখা হচ্ছে ভারতবর্ষের মানচিত্রে আখলাকদের তাজা উষ্ণ রক্ত দিয়ে; বাঙালীর স্বপ্নের বাংলাদেশের আনাচ-কানাচে হাজারো পূর্ণিমা, সুবল এমনকি পৃথিবীর আলো না দেখা মাতৃগর্ভের শিশুর রক্ত দিয়ে; মানুষ এবং সাপের গল্প…!

ঢাকা।
সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

38 − 34 =