হরতাল, নীতিহীন অন্যায় – অধিকারের ব্যাবহার নাকি অপব্যাবহার???

‘হরতাল’ একটি গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অধিকার ব্যাবহারের চাইতে অপব্যাবহার হচ্ছে বেশি। জনগনের সম্পদ ধ্বংস, বাস – ট্রেন পুড়ানো, মানুষ খুন কোন ধরনের অধিকারের আওতাতে পরে কিনা আমার তা জানা নাই।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক কর্মসূচী হিসেবে ‘হরতাল’ পালনের সুযোগ থাকবে এটাই গনতন্ত্র। বাংলাদেশের ইতিহাসে হরতাল এবং অসহযোগ আন্দোলন একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে।

হরতাল হতে পারে। তবে তা হতে হবে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। আমি কখনোই বলব না হরতালের মতন একটা রাজনৈতিক হাতিয়ার বন্ধ করে দিয়ে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্থ করা হউক। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হরতাল গণতন্ত্রের ক্ষতি বৈ উপকার করছে না। মানুষের বিশ্বাস দিনে দিনে কমছে মাননীয়দের প্রতি।

হরতালকে যদি একটা কাঠামোর ভেতর আনা যায় তাহলে হয়তবা হরতাল কেন্দ্রিক এ সব ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির লাগাম টানা গেলেও যেতে পারে। আমি আবার বলছি, হরতাল বন্ধ করা কোন সমাধান নয়। বরং এতে একটা সীমা রেখা টেনে দেয়া ভীষণ জরুরী।

হরতালকে একটি বিধিবদ্ধ নীতিমালার আওতাতে সহজেই আনা যেতে পারে। এই সীমারেখা লঙ্ঘন না করে হরতাল ডাকা যেতেও পারে।

নীতিমালা তৈরির দায়িত্ব আমাদের না। এ দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হল আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দলাদলি নিয়াই ব্যাস্ত। এ ক্ষেত্রে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট দায়িত্ব নিতেই পারেন। আর সাংবিধানিক ভাবে সেই সাহায্য চাইবার অধিকার আমাদের আছে।

নিচে এ ক্ষেত্রে উল্লেখিত সাংবিধানিক ধারা গুলি দেয়া হল-


102. (1) The High Court Division on the application of any person aggrieved, may give such directions or orders to any person or authority, including any person performing any function in connection with the affairs of the Republic, as may be appropriate for the enforcement of any of the fundamental rights conferred by Part III of this Constitution.
(2) The High Court Division may, if satisfied that no other equally efficacious remedy is provided by law –

(a) on the application of any person aggrieved, make an order- (i) directing a person performing any functions in connec-tion with the affairs of the Republic or of a local authority, to refrain from doing that which he is not permitted by law to do or to do that which he is required by law to do ; or

(ii) declaring that any act done or proceeding taken by a person performing functions in connection with the affairs of the Republic or of a local authority, has been done or taken without lawful authority and is of no legal effect ;

37. Every citizen shall have the right to assemble and to participate in public meetings and processions peacefully and without arms, subject to any reasonable restrictions imposed by law in the interests of public order or public health.

44. (1) The right to move the High Court Division in accordance with clause (1) of article 102, for the enforcement of the rights conferred by this Part is guaranteed.

আমরা আদালতের কাছে নিম্নলিখিত নীতিমালা চাইতে পারি ( এতে কিছু আস্তে পারে বা বাদ যেতেই পারে )-
১) হরতাল ডাকার আগে জনগনকে হরতালের দাবী সম্পরকে জানানো, জনমত গঠন, হরতালের প্রচার ও জনগনের প্রস্তুতির জন্যে (স্বাভাবিক জীবনের) কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা সময় দিতে হবে। হরতালের স্বপক্ষে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তির সাক্ষর বা সম্মতি (এস এম এস এর মাধ্যমে) থাকতে হবে।

২) হরতালের দাবী হতে হবে জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ও জনগনের কল্যাণে (ব্যাক্তি বা দলীয় স্বার্থে নয়)। জাতীয় সংবিধানের মুল ও অপরিবর্তন যোগ্য কোনও ধারার পরিবর্তনের দাবীতে হরতাল ডাকা যাবে না।

৩) হরতাল আহ্বানকারী দলকে হরতাল বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে সাধারন মানুষকে বুঝাতে হবে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে যাতে সাধারন মানুষ সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন হরতালের পক্ষে বা বিপক্ষে। হরতাল বিরোধীরা হরতালের বিপক্ষে জনমত গঠন করতে পারবেন।

৪) হরতালের ৩৬ ঘণ্টা আগে থেকে হরতাল সমর্থনে বা বিপক্ষে কোনও মিছিল বা পিকেটিং করা যাবে না, অবরোধ বা হরতাল পালনে কাওকে বাধ্য করা যাবে না। ভয় দেখান যাবে না, জান-মালের ক্ষতি করা যাবে না।

৫) সহিংসতা বন্ধের জন্যে হরতাল আহবান কারী দল বা গোষ্ঠী হরতাল আহ্বান কালীন সময়েই স্পষ্ট করে ঘোষণা দিবেন যেন দলীয় নেতা কর্মীরা কোনও রকম সহিংসতা না করেন এবং করলে দল তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেবে, সকল প্রচার কর্মে সেটা উল্লেখ থাকতে হবে, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে তা প্রচার করতে হবে এবং সেই মতো ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।

৬) হরতাল আহ্বান এর সময়ই আহ্বান কারী দল নিন্মক্ত জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, জরুরি ও সেবামূলক খাত গুলকে হরতালের আওতামুক্ত ঘোষণা করবেন এবং তাঁদেরকে হরতালে অংশ গ্রহন করতে নিষেধ করবেন।
হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স, হাসপাতালে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারী বৃন্দ, ঔষধের দোকান ও ঔষধবাহী গাড়ি ইত্যাদি
আদালত ও আদালত সংশ্লিষ্ট সব ব্যাক্তিবর্গ এবং তাদের যানবাহন
এয়ারপোর্ট, এয়ারপোর্টের কর্মকর্তা ও কর্মচারী বৃন্দ, বিদেশ গমনরত বা বিদেশ থেকে আগত ব্যাক্তিবর্গ এবং এই সংশ্লিষ্ট সকল যানবাহন।
রপ্তানিমুখী পন্য উৎপাদনে জরিত সকল ব্যক্তিবর্গ, সংশ্লিষ্টদের যানবাহন এবং রপ্তানিমুখী পন্যবাহী যানবাহন।
সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান যেমন পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও পরিস্কার পরিচ্ছনতা সংশ্লিষ্ট কর্মী বৃন্দ এবং তাদের যানবাহন
বাংলাদেশে আগত বিদেশী অতিথি বৃন্দ ও তাদের যানবাহন
বন্দর কর্মী ও কর্মকর্তা বৃন্দ ও তাদের যানবাহন
জাতীয় পরীক্ষা ও পরীক্ষার্থী বৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট সবার যানবাহন

৭) হরতালের দিন নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে পিকেটিং ও মিছিল না করার ঘোষণা বারবার মিডিয়াতে প্রচার করতে হবে এবং দলের নেতা কর্মী দের জানাতে হবে যে গ্রেফতার হলে বা পিকেটিং ও মিছিল করার প্রমান পেলে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।

৮) হরতালে মিছিল, পিকেটিং বা সহিংসতায় অংশগ্রহনের প্রমান পেলে তাঁদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করতে হবে।

৯) হরতালের সময় পিকেটিং, মিছিল বা সহিংসতা করার সময় গ্রেফতারক্রীতদের রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে দাবী করা যাবে না এবং মুক্তি দাবী করা যাবে না।

১০) হরতালের সময় যাতে কোনও সহিংসতা না হয় সে দায়িত্ব হরতাল আহবান কারী দলকেই নিতে হবে।

১১) হরতালে কারো কোনও ক্ষয়ক্ষতি হলে এবং যদি প্রমান হয় এই ক্ষয়ক্ষতির কারন আহ্বান এবং ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবেন। হরতাল আহ্বান কারী দলকে একটি বেলাঙ্কেত ইন্সুরেঞ্চে করতে হবে যাতে ক্ষতি গ্রস্ত ব্যাক্তি সরাসরি সেই ইন্সুরেন্সে কোম্পানি থেকে ক্ষতি পূরণ পেতে পারেন।

১২) হরতালকালীন সহিংসতা প্রমানিত হলে দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি প্রদান করতে প্রয়োজনীয় আইন করতে ও দ্রুত বিচার আইনে বিচার করার বিধান রাখার জন্যে মহান সংসদকে পরামর্শ দেবেন।

১৩) যারা নাশকতায় অংশ গ্রহন করবেন এবং তা প্রমানিত হবে তাঁর ক্ষতিপূরণ জরিত ব্যাক্তির কাছ থেকে আদায় করা হবে (ব্যক্তিগত সম্পত্তি সহ) এবং অনাদায়ে তাঁর শাস্তি বৃদ্ধী পাবে।

১৪) প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া কে সচেতন হতে হবে যাতে শুধু প্রচারের জন্যে মিডিয়া কে জানিয়ে কেও নাশকতা না করেন এবং নাশকতার ছবি ও ভিডিও দিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনিকে সন্ত্রাসিদের সনাক্ত করতে সহযোগিতা করবেন।

১৫) হরতালের আগে নিরাপত্তা জনিত কারন দেখিয়ে কাওকে গ্রেফতার করা যাবে না এবং শুধুমাত্র হরতাল কালিন সময়ে সুনির্দিষ্ট কারন ও প্রমান থাকলে গ্রেফতার করা যাবে। এবং তা দ্রুত বিচার আইনের আওতায় অবিলম্বে বিচার করতে হবে।

১৬) জাতীয় পরীক্ষার দিন (এস এস সি, এইচ এস সি, জে এস সি ইত্যাদি) গুলোতে হরতাল ডাকা যাবে না।

১৭) জাতীয় ছুটির দিন গুলোতে হরতাল ডাকা যাবে না।

১৮) এক সপ্তাহে ১ দিনের বেশী হরতাল ডাকা যাবে না।

১৯) হরতালের পর কোনও দল হরতালের সফলতা সম্পর্কে কোনও বিবৃতি দিতে পারবেন না, জনগনই বুঝে নেবেন হরতালের সফলতা বা বিফলতা ।

এই নীতিমালার খসড়া বাইবেল নয়। এটা পরিবর্তিত হতেই পারে। সকলের মতামত কাম্য। সকলের সহযোগিতাতেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের ইতিহাস।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “হরতাল, নীতিহীন অন্যায় – অধিকারের ব্যাবহার নাকি অপব্যাবহার???

  1. আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায়
    আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায় কাউকেই কোনো কারণে বা শর্তে হরতাল করতে দেয়া অসম্ভব | করতেই কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না | হরতালের মায়েরে বাপ | হরতাল দেখলেই লাঠি সত নিয়া ধাওয়া দিন |আমার সামনে পড়লে তো কামড়ায়া … :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :ঘুমপাইতেছে: :মানেকি:

  2. যদি পারেন তো বন্ধ করেন রুশো
    যদি পারেন তো বন্ধ করেন রুশো ভাই। কিন্তু এটা অসম্ভব। আর জেহুতু বন্ধ করা সম্ভভ না টাই একে শিথিল করতে নীতিমালা দরকার।

    টাই আমরা নীতিমালা চাচ্ছি, আরও কঠিন কোন ধারা চাইলে জানাতে পারেন।

  3. এত নীতিমালা বুঝি না, হরতাল
    এত নীতিমালা বুঝি না, হরতাল করতে হলে আদালতে যাইতে হইব!!
    আদালত অনুমুতি দিলেই কেবল হরতাল…
    অর্থাৎ আগে তাদের ইস্যুটার আইনি ভিত্তি থাকতে হবে, না হয় কোন হরতাল না।

  4. ভালো বলেছেন। কিন্তু আমাদের
    ভালো বলেছেন। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলা এমনিতে একে অন্যের ছায়া না মারালেও, নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফেভিকল লাগায়া এক হয়ে যায়।

  5. হরতালকে একটি বিধিবদ্ধ

    হরতালকে একটি বিধিবদ্ধ নীতিমালার আওতাতে সহজেই আনা যেতে পারে। এই সীমারেখা লঙ্ঘন না করে হরতাল ডাকা যেতেও পারে।

    সহমত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

26 − = 24