সুখি সমকামি যুগল নাকি অসুখি বিষমকামী দম্পতি?

বছর পনের আগের কথা। আমাদের মহল্লার এক ছটফটে তরুনীর বিয়ে হল খুব ঘটা করে। মেয়ে দেখার দিনে ছেলে অনুপস্থিত কিন্তু ছেলেপক্ষ ডায়মন্ডের আংটি নিয়ে এসেছিল সাথে করে, মেয়ের আঙুলের মাপ না জেনেই। ঢ্যাঙা গোছের শ্যামলা মেয়ের হাতের চা খেয়ে দামী গাড়িতে চড়ে আসা ছেলের মা, মিসেস চৌধুরি এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে নিজের হাতের বেশ চওড়া বালাগুলো তৎক্ষনাৎ খুলে মেয়েটির হাতে পরিয়ে দিতেও এক মুহূর্ত দেরি করেননি। শুকনো দুহাতে ঢলঢলে বালাদুটো পরে মেয়েটা যখন বিকেলে পাড়ার আর সব মহিলা আর সমবয়সী মেয়েদের সাথে আড্ডা দিতে আসত, আমার কেন যেন হাতে বেড়ি পরা জেলখানার কয়েদী মনে হত ওকে। টানাপোড়েনের সংসারে বেড়ে ওঠা মেয়েটি কিন্তু খুব সুখের হাসি হাসত তখন। মাস খানেকের মধ্যেই তড়িঘড়ি করে বিয়ে হয়ে গেল, আরও মাস তিনেক আমাদের পাড়ায় মেয়েটির স্বামী-সৌভাগ্য প্রতি বৈকালিন আড্ডার বিষয় হয়ে রইল।

তারপর একদিন হঠাৎ মেয়েটা একা একাই বাবার বাড়ি ফিরল। দুদিন যায়, পাঁচদিন যায় কিন্তু মেয়ে আর শ্বশুর বাড়ি যায়না, পাড়ার মেয়েদের আড্ডায় ও পাওয়া যায় না তাকে। স্বেচ্ছা বন্দী জীবন যেন তার। কানাকানির মাঝে হঠাৎ জানা গেল, মেয়েটির স্বামী পুরুষাসক্ত! পাড়ার মহিলাদের চক্ষু চড়কগাছ- সে কি রে বাবা? পুরুষ মানুষের একটু আধটু বর্হিমুখিতা মেনে নেওয়াই যায় কিন্তু তাই বলে অন্য পুরুষে আসক্তি এ সৃষ্টিছাড়া কথা কবে কে শুনেছে?

একটু একটু করে পুরো গল্প বেরিয়ে এল এবার। বিয়ের পর থেকেই স্বামী সবসময় উদাসীন থাকে, মেয়েটির প্রতি কোন অনুভূতি যেন নেই তার। কটূ কথা বলে না, মার-ধোর করে না, কিন্তু পারতপক্ষে মেয়েটির কাছেও ঘেষে না। অনুনয়-বিনয়- কান্নাকাটির পর ছেলেটি নিজেই জানিয়ে দিয়েছিল, সে সমকামি, পরিবারের চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে মেয়েটিকে বিয়ে করেছে। কিন্তু মেয়েটিকে ভালোবাসা কিংবাস্ বাভাবিক দাম্পত্য তার পক্ষে সম্ভব নয়। ছেলের সমকামিতার কথা জানতে পেরেই ছেলের বাড়ি থেকে অস্বচ্ছল পরিবারের মেয়েটিকে “ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে” বলে সোনা-গহনায় মুড়ে নিয়ে আসা হয়েছে। মেয়েটি চাইলে সব কিছু গোপন করে শ্বশুরবাড়ির আরাম-আয়েশে চিরকাল থাকতে পারে, অথবা স্বামীর ঘর করতে না পারার অপমান মাথায় নিয়ে বাপের বাড়ি চলেও যেতে পারে। আঠারো বছরের সদ্য তরুণির কাছে ভালোবাসা সবচেয়ে দামি মনে হয়েছিল, তাই চলে এসেছে বাপের বাড়ি। কিন্তু বাবা-মা মুখ কালো করে বলে দিল, বিয়ের পর স্বামীর ঘরই মেয়েদের আসল ঠিকানা। ..ওই এক সমকামিতার দোষ ছাড়া এমন হীরের টুকরো ছেলে আর কোথায় পাবে কেউ? অগত্যা দিন পনেরোর মাথায় মাথায় একহাত ঘোমটা টেনে ঢলঢলে সেই দামি সোনার হাতবেড়ি পরে মেয়েটা আবারো বাপের বাড়ির পাট তুলল।

সম্প্রতি সমকামি সন্দেহে কেরানিগঞ্জে সাতাশজনকে র্যাব আটক করেছে সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পেরে বহু বছর আগের সেই ঘটনা মনে পড়ে গেল। “বিবেক-বিবর্জিত”, “ধর্মভ্রষ্ঠ” “মানসিক বিকারগ্রস্ত” এই মানুষগুলোর প্রতি আমাদের কোন সহানুভূতি জাগে না কখনও। এই মানুষগুলোর বাকি সকল পরিচয় ছাপিয়ে সমাজের চোখে এদের একটাই পরিচয় এরা সমপ্রেমের অপরাধে অপরাধি। সমকামি বা সমপ্রেমিদের নিয়ে লেখালেখি করি বলে অনেকেই বেশ টিপ্পনী কাটে, কটূ কথা শুনতে হয় আমাকে প্রায়শই। বহু বছর বিলেতে বসবাস করার কারণে সমকামি মানুষের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে, কাজ করেছি একসাথে, বেশ গভীরভাবে জেনেছে তাদেরকে। বিশ্বাস করুন এই মানুষগুলো আপনার আমার মত; সুখে হাসে, দুঃখ পেলে কাঁদে, প্রিয়জন হারিয়ে হৃদয় ভাঙে ওদেরও।

প্রিয় সন্তানটি সমকামি জানার পর পরিবার তাকে যখন ছুড়ে ফেলে দেয়, বাবা-মা-পরিবার হারিয়ে মানুষগুলোর কি যে করুণ দশা হয় তা আমি নিজ চোখে দেখেছি। না পারে পরিবার ছাড়তে,না পারে নিজেকে বদলাতে- এমন অবস্থায় ‘আমি এমন কেন?’-নিজেকে দোষারোপ করতে করতে ভয়ঙ্কর ডিপ্রশন, সেল্ফ হামরিং এমনকি আত্মহত্যার চেষ্টা ও করতে দেখেছি আমি।

বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেছি, শুধুমাত্র আর দশজনের চেয়ে ভিন্ন হওয়ার অপরাধে বাবা-মা কেমন করে সন্তানকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে? প্রশ্ন করেছি, সমকামিতা নামের ‘মানসিক বৈকল্য’ দূর করতে আমরা বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে জোর করে তাদের বিয়ে দিয়ে প্রতিনিয়ত এই সমকামি আর ওই বিষমকামী মানুষগুলোর জীবন বিষিয়ে তুলেছি- তা কী কোন অপরাধ নয়?

সমকামি আচরণকে স্বীকার করা মানে সমাজ রসাতলে চলে যাওয়া নয়, অজাচার আর অনাচারকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। সমকামিতা প্রকৃতি-সিদ্ধ স্বীকার করলে আমরা একজন মানুষকে স্বীকার করে নেই, তার ভালোবাসার অধিকারকে স্বীকার করে নেই, সেক্সচুয়ালিটিকে স্বীকার করে সেই মানুষটিকে একটি সুস্থ-স্বাভাবিক-নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দেই।

আমরা গায়ের জোরে অস্বীকার করতেই পারি সমকামিতাকে, আইন করে এর গায়ে লাগিয়ে দিতে পারি ঘৃণ্য অপরাধের তকমা, ধর্মের দোহাই দিয়ে হীন আর ঘৃণার চোখে দেখতে পারি একজন সমকামিকে। কিন্তু এই অস্বীকারের ফলাফল কী আদৌ কোন শুভফল বয়ে আনবে? শুরুর গল্পের মেয়েটির মত অন্য কোন মেয়ে, অন্য কোন ছেলে সমাজের চোখে ঠুলি পরিয়ে অসুখি দাম্পত্য জীবন কাটাবে।

আজ আপনি জোর গলায় ধর্মের নীতি বাক্য শোনচ্ছেন, আইন করে কোমরে দড়ি বেঁধে ওদের জেলে পুরছেন, ডাক্তার-কবিরাজ ডেকে সমকামিতা নামক অসুখের নিরাময় করছেন; আপনি কী নিশ্চিন্তে বলতে পারবেন আপনার বিষমকামি ছেলে বা মেয়েটার সমাজের প্রতিদিনকার ভ্রুকুটি এড়াতে আত্মগোপনে থাকা কোন সমপ্রেমি বা সমকামি মেয়ে বা ছেলের সাথে বিয়ে হবে না? সমকামিতাকে অস্বীকার করা মানে প্রকৃতি থেকে, সমাজ থেকে সমকামি মানুষ বা প্রাণিকে নির্মুল করে ফেলা নয় একেবারেই। সমকামিতা প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়, বরং ভীষণরকম স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করার অর্থ হল আমাদের মাঝেই অস্বাভাবিক সম্পর্কের সৃষ্টি করা।

বিজ্ঞান বলে, একটি দেশ বা সংস্কৃতিতে প্রায় ১%থেকে ৫% সমকামি মানুষ থাকতে পারে। সমকামিতাকে যখন আমি-আপনি অস্বীকার করব, তখন এই সমকামি মানুষগুলো কোথায় যাবে? সমাজের ১% থেকে ৫% সমকামি মানুষগুলো তখন মুখরক্ষার জন্য সম শতাংশ বিষমকামি মানুষের সাথে বৈবাহিক বা যুগল সম্পর্কে জড়াবে। কিন্তু জোর-জবরদস্তিতে এই সম্পর্ক সমাজের চোখে টিকে গেলেও আদতে আমরা সর্বোচ্চ প্রায় ১০% মানুষকে অসুখি দাম্পত্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

নিদারুণ যন্ত্রনায় কাটানো ভালোবাসাহীন এক অসুখি দম্পতির চেয়ে কী দুটো আলাদা সুখি যুগল আপনার-আমার সবার কাম্য নয়? হোক না তারা বিষমকামি কিংবা সমকামি? কী এসে যায় তাতে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “সুখি সমকামি যুগল নাকি অসুখি বিষমকামী দম্পতি?

  1. মোহাম্মদ নিজে একজন নারীসক্ত
    মোহাম্মদ নিজে একজন নারীসক্ত পুরুষ ছিলেন, কিন্তু আবার নারীদের জন্য কোনো ভালো অধিকারের ব্যবস্থা করেননি তিনি, তার তৈরী করা আইন-কানুনগুলো মেনে চলে সৌদী-আরব, কাতার, কুয়েত, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান সহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো, এসব দেশের সরকার এবং অধিকাংশ মানুষ কী একবারও ভাবতে পারেনা যে সমকামিতা কোনো অস্বাভাবিকতা নয়, বোরকা পরতে সব নারীর ইচ্ছা হয়না, বোরকা চেহারা গোপনকারী একটি পোশাক, একজন মানুষের চেহারা গোপন করার কী দরকার? মুসলিমরা যুক্তি দেখান যে পর-পুরুষের যৌন-নজর থেকে বাঁচতে এই পোশাক, আরে ভাইয়েরা নারীদেরও যৌন উত্তেজনা আছে তাছাড়া আপনাদের জন্য বোরকা বা চেহারা ঢাকার ব্যবস্থা নেই কেন? বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যদি ভাবতো যে কুরআন কী আসলেই আলাহর বাণী নাকি মোহাম্মদের নিজের? আল্লাহর অস্তিত্ব কী আসলেই আছে নাকি মোহাম্মদ বানিয়ে বলেছেন? আর যদি কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব থেকেই থাকে তাহলে তার নাম কী আল্লাহ নাকি অন্য কিছু?

  2. মোহাম্মদ নিজে একজন নারীসক্ত
    মোহাম্মদ নিজে একজন নারীসক্ত পুরুষ ছিলেন, কিন্তু আবার নারীদের জন্য কোনো ভালো অধিকারের ব্যবস্থা করেননি তিনি, তার তৈরী করা আইন-কানুনগুলো মেনে চলে সৌদী-আরব, কাতার, কুয়েত, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান সহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো, এসব দেশের সরকার এবং অধিকাংশ মানুষ কী একবারও ভাবতে পারেনা যে সমকামিতা কোনো অস্বাভাবিকতা নয়, বোরকা পরতে সব নারীর ইচ্ছা হয়না, বোরকা চেহারা গোপনকারী একটি পোশাক, একজন মানুষের চেহারা গোপন করার কী দরকার? মুসলিমরা যুক্তি দেখান যে পর-পুরুষের যৌন-নজর থেকে বাঁচতে এই পোশাক, আরে ভাইয়েরা নারীদেরও যৌন উত্তেজনা আছে তাছাড়া আপনাদের জন্য বোরকা বা চেহারা ঢাকার ব্যবস্থা নেই কেন? বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যদি ভাবতো যে কুরআন কী আসলেই আলাহর বাণী নাকি মোহাম্মদের নিজের? আল্লাহর অস্তিত্ব কী আসলেই আছে নাকি মোহাম্মদ বানিয়ে বলেছেন? আর যদি কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব থেকেই থাকে তাহলে তার নাম কী আল্লাহ নাকি অন্য কিছু?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 63 = 68