এই রাষ্ট ও সমাজের যৌনাক্রম, ধর্ষন, যৌনাধিকার আর যৌন-অশিক্ষার….. সমাচার

এদেশের রাষ্ট্র-সমাজ ও পরিবার যৌনশিক্ষাটাকে এতো এতো ট্যাবু করে রেখেছে যে, এই শিক্ষা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যোজন যোজন দুরে রাখা হয়। এই যেন নিষিদ্ধ কোনো শিক্ষা। এই যেন ঔষদের মতো ভয় দেখিয়ে বলার মতো, -শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন! যৌনশিক্ষা কেন ট্যাবু হবে? এই শিক্ষা কেন ছোটকাল থেকে শিশুকে দেয়া হয় না? সঙ্গম, সেক্স, মিলন, সহবাস, মৈথুন….. এই শব্দগুলো মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। এটা কেন আমাদের ছোটকাল থেকে বলা হয় না? এটা কি নিষিদ্ধ কোনো গন্ধম? এটা মানব জীবনের বাইরের কোনো অংশ? যৌনশিক্ষা তো দুরের কথা, আমাদের এই রাষ্ট-সমাজ মেয়েদের যৌন-স্বাধীনতা কি তা পর্যন্ত বুঝতে দেয়না। যৌনতা যে ট্যাবু নয়, যৌনতা যে একটি স্বাভাবিক শারিরীক জৈবিক চাহিদা এই সাধারণ জ্ঞাণটুকু শৈশবে জানার সুযোগ তৈরি করেনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের এখন ছোট বাচ্চাদের শেখানো হয়, ‘ও’ তে ওড়না, ‘ব’ তে বোরখা, ‘স’ তে সালাম, ‘ঈ’ তে ঈদের নামাজ। ‘ম’ তে মসজিদ। ‘ন’ তে নামাজ! আমাদের শেখানো হয় না, ‘ম’ তে মানুষ, মনুষ্যত্ব ও মানবিকবোধ। ‘ন’ তে ন্যায় আর নৈতিকতা। একটি পুরুষ সঠিক যৌনশিক্ষা না পেলে সেই কি অবদমিত হয়ে বুনো ষাঁঢ়ের মতো কোনো কিশোরীকে একা পেয়ে ধর্ষন করে বসবে? এমনটা নাও হতে পারে। কিন্তু! আমাদের ভুল শিক্ষাটা হচ্ছে অন্য জায়গায়। জীর্ণ নিয়ম-রীতির ধর্মগুলো আমাদের বলছে, মা তুমি কাপড় দাও! তুমি মেয়ে, তুমি একটু ঢেকে ঢুকে চল। তোমার বুকে ওড়না দাও। তুমি বোরখা পড়। তুমি হাত-মোজা, পা-মোজা পড়, যাতে তোমার হাতের আঙ্গুল, পায়ের আঙ্গুল দেখে পুরুষরা উত্তেজিত না হয়। তুমি মেয়ে, গলা চড়িয়ে কথা বলো না, খিলখিলিয়ে হেসো না। পাছে পুরুষগুলো না উত্তেজিত হয়ে যায়!

এই পৃথিবীর সকল ধর্মই আপাদমস্তক পুরুষতান্ত্রিক। ধর্ষিত হয়েছে মেয়েটি, রক্তাক্ত হয়েছে মেয়েটি, ধর্ষণের যন্ত্রনায় বুক ছেঁড়া আর্তনাদ করেছে মেয়েটি, কিন্তু আমাদের এই রাষ্ট্র, এই সমাজ, এই পরিবার নির্লজ্জভাবে নিষ্পেষিত, ধর্ষিত মেয়েটির দোষ খুঁজে বেড়ায়। তার দিকে অপমান আর গ্লানিকর তীর ছুঁড়তে থাকে……

-মেয়েটি কাপড় ঠিক ছিল না বলেই তো ধর্ষণের শিকার হয়েছে!

-ঐ মেয়েকে কেন ধর্ষণ করল? নিশ্চয় রাস্তা ঘাটে বেলাল্লাপনা করে বেড়ায়!

-যে মেয়ে পরিবারের বাপ-ভাইয়ের কথা কথা শুনে না, পুরুষের মতো চলাফেরা করে, মাথায় কাপড় দেয় না, বুকে ঠিকঠাক মতো ওড়না রাখে না, সেই মেয়েকে ধর্ষণ না করে বোনের দৃষ্টিতে দেখবে? ধর্ষণ অইছে ভালো অইছে!

-বোরখা না পড়লে ধর্ষণ তো হবেই!

-মেয়েটা নিশ্চয় বেয়াদব বেহায়াপনা ছিল, না হলে পুরুষগুলো শুধু তাকে ধর্ষণ করতে যাবে কেন?

-বনানীতে আপন জুয়েলার্সের ছেলের হাতে যে মেয়ে দুইজন ধর্ষনের শিকার হয়েছে, ওরা হল একেকটা বেশ্যা মাগী! মাগী না হলে কেউ বন্ধুর বার্থডেতে দাওয়াত পেয়ে রাতে হোটেলে যায়? উচিত অইছে! ওদের আরো কয়েকবার ধর্ষণ করা উচিত ছিল। তবেই বেয়াদব মেয়েগুলোর শিক্ষা হত!

-ঔ মেয়ে ধর্ষণ অইবো না কেন? মেয়েটি একটা খানকি! সারাদিন বেডাগোর মতো টাইটফিট জিন্স প্যান্ট আর টিশার্ট পড়ে ঘুরে বেড়ায়। বুকে ওড়না পর্যন্ত দেয় না। এই মেয়ে ধর্ষণ অইবো না কলাগাছ ধর্ষণ অইবো?

উপরের উল্লেখিত কথাগুলি আমার না, এই সমাজেরই বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষেরই কথা। আমি আশ্চর্য হই তখনই, যখন দেখি এ কথাগুলো এক মেয়ে আরেক ধর্ষিতা মেয়েকে বলে বেড়ায়। কি নিদারুণ মুর্খতা! আজ যে মেয়েটি জিন্স-টপস পড়েছে এজন্য সেই ধর্ষন হয়েছে বলে তার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলছে, উল্টো তাকে দোষ দিচ্ছে। এদেশে ধর্ষিতার পক্ষে যখন প্রতিবাদী হয়ে ১০ জন মেয়ে রাজপথে দাঁড়ায়, তখন এদেশে ধর্ষিতার বিপক্ষে ( পরোক্ষভাবে ধর্ষকের পক্ষে দাঁড়ায়) দাঁড়িয়ে যায় ১০ হাজার নারী! এই নারীগুলো ধর্ষিতা মেয়েটির দোষ খোঁজার জন্য সমীকরণ শুরু করে দেয়। নিশ্চয় মেয়েটির কাপড় ঠিক ছিল না, হয়তো ওড়না ঠিক ছিলনা। বোরখা পড়লেও মেয়েটির বোরখাটি টাইটফিট ছিল, নাহলে বোরখার উপর নিশ্চয় স্তন আর নিতম্ব ভেসে উঠেছিল। বকাটে ছেলেরা না হলে শুধু শুধু ওকে ধর্ষণ করতে যাবে কেন?

ধর্মজীবি মৌল্লারা আজ বলবে, ও মেয়ে জিন্স টপ পড়িয়ো না। মেয়েদের এসব আঁটশাট পোশাক পড়তে নেই। তুমি ছেলে না, তুমি একজন মেয়ে। এরপর মেয়েটি জিন্স টপ ছেড়ে সাদাসিদে জামা-ওড়না ব্যবহার করতে লাগল। এরপর মৌল্লাটি বলবে, মেয়েদের হাত, পা, চুল, মুখমণ্ডল উদ্যম রেখে চলা উচিত নয়। ভালো মেয়ে এসব পোশাক পড়েনা। তারপর মেয়েটি থ্রিপিচ ছেড়ে বোরখা পড়া শুরু করল। এর কয়েকদিন পর মৌল্লা আবার বলবে, মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া উচিত নয়, মেয়েদের পর পুরুষের সামনে চলাফেরা ঠিক নয়। এতে পুরুষ উত্তেজিত হতে পারে। ভালো মেয়েদের ঘরে থাকা উচিত। এরপর মেয়েটি ঘরের মধ্যে জীবন কাটাতে লাগল। এই পর্যন্ত এসে থমকে আছে। এরপর মৌল্লারা কোনো একদিন হয়তো বলে বসবে, এই মেয়ে! ঘরের ভেতর থেকে তোমার মেয়ে কন্ঠী আওয়াজ বের হচ্ছে কেন? এরপর মেয়েটি কি সিদ্ধান্ত নেই আমার জানা নেই।

ও মেয়ে, তুমি যখন সমাজের কাছে ভালো থাকার জন্য ধর্মধারী, সমাজধারীদের কথা একে একে মেনে নেবে, তখন তোমার নিজের অধিকার বলতে আর কিছুই থাকবে না। যারা তোমাকে দমন করার সুযোগ পেয়েছে, তারা এই সুযোগ বার বারই নেবে। দুর্বলের প্রতি দমন করার স্পৃহা এটা মানুষের নতুন নয়, অভ্যাসগত।

–আজ যেইসব মেয়েরা ধর্ষিতাদের কাপড় চোপড় আর তাদের চরিত্র ঠিক নেই বলাবলি করছেন, একদিন তারা বোরখা পরেও যে ধর্ষিত হবেন না তার নিশ্চয়তা কি? আসলে তারা ধর্ষিতা মেয়েদের বিপক্ষেই শুধু বলছে না, আগামীতে তারাও যাতে একে একে ধাপ পেরিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় সেই পথটুকু প্রশস্ত করছেন মাত্র। আমাদের তো আবার যতক্ষন না নিজের গাঢ়ের উপর কোপ এসে না পড়ছে, ততক্ষন পর্যন্ত আঁচ করতে পারিনা কোপটা কতোটা যন্ত্রনাদায়ক। কতোটা কষ্টদায়ক। প্রথমে উল্লেখ করেছিলাম যৌনশিক্ষার কথা। যে সমাজে অধিকাংশ নারীরা নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়, সব সময় নারীত্ব আর মাতৃত্বের মোহে মোহাবিষ্ট হয়ে শুধু নিজেকে বাচ্চা উৎপাদনের যন্ত্র আর সংসার-সেবাদাসী মনে করে, সেই সমাজে যৌনশিক্ষার কথা বলা, যৌনাধিকারের কথা বলা অনেকটা মুর্খের কাছে প্রলাপ বকা। অনেকটা অত্যুক্তি করা…..

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

52 − 50 =