চাঁদের আশ্রয়ে

স্কুল পড়ুয়া ছেলেটি বেশ কিছুদিন পর বাড়ী যাচ্ছে। মনে নানা শঙ্কা, বাল্য বন্ধুকে দেখতে পাবে কিনা। সে শুনেছে ওর বাল্যবন্ধু মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। তখনকার দিনে বাল্য বিবাহকে অনৈতিক বা আইন বিরুদ্ধ বলে কেউ জানত না বা এমন একটা আইন ছিল কিনা তোও ছেলেটির জানা ছিলনা। আইন থকলেও অমন অজপাড়াগয়ের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিতদের মাঝে অমন আইনের কথা শুনাবে, এমন কেউ ছিল বলে মনে হয় না। এখনকার অনেক মেয়েকে দেখি স্ব-উদ্যোগে নিজের বাল্য বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে আলোড়ন ফেলে দেয়। এতে নারীর দারুণভাবে জেগে ওঠার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তখনকার মেয়েদের মনে এমন সাহস বা মানের জোড় ছিল না। অথবা তারা বড্ড বেশী পড়িবারের কথা, মুরুব্বীদের কথা চিন্তা করে নিজেদেরকে সপে দিত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। নিজেদেরকে হাসিমুখে (নাকি হৃদয়টাকে কুঁচি কুঁচি করে কেটে, চোখের জলে) খাঁচায় বন্ধী করত পড়িবারের সুখের জন্য।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন, ছিল কি ছিল না সেটা অবশ্য জানার বয়সও ছিল না ছেলেটির। ওরা পাশাপাশি বাড়ীর বাসিন্দা হলেও ওদের দুই পরিবারের মধ্যে পারিবারিক ঝগড়া বিরাজ করাতে ওদের পরস্পরের মধ্যে কথা বলা, খেলাধোলা করার সব রাস্তা রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল বেশ কিছুদিন। ইতিমধ্যে ছেলেটি বাড়ী থেকে দূরে চলে যায় শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য। যাওয়ার সময়ও মেয়েটির সাথে দেখা করে যাওয়া সুযোগ পায়নি। মেয়েটি শুনেছিল ও চলে যাচ্ছে, উভয়েই আকিবুকি করেছিল একটু দেখা করতে, কথা বলতে, পারেনি।

এর মধ্যা মেয়েটিকে ওর বাবা-মা বিয়ে দিয়ে দেয়। এ কথা ছেলেটি শুনেছিল দূর থেকেই। এ সংবাদ শুনে ছেলেটি মনে মনে খুশিই হয়েছিল। কারণ সে পড়া লেখায় তেমন মনযোগী ছিল না। এ রকম একটা ধারী মেয়ের বিয়ে করে সংসারী হওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে করেছিল ছেলেটি। এর পেছনে কারণও ছিল। ছেলেটি সব সময় মেয়েটিকে উপদেশ দিত। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলে ওর ফলাফল দেখে ব্যথিত হত। কিছুতেই কিছু হয়নি। তবে সে ছিল ওর একান্ত অনুগত, বাধ্যগত যাকে বলে। সে নানা ভাবে পরীক্ষা করে দেখেছিল ওদের সাথে কোন একটা ব্যাপারে পরস্পরের মন দু’টো ছিল বিনিসূতায় গাঁথা।

বাড়ীর পথে হাঁটতে হাঁটতে না না কথা, না না স্মৃতি বারে বারে জেগে উঠতেছিল তার মনে। নিতান্তই ছেলে মানুষের মত ভাবছিল, আজও সম্ভবত মেয়েটিকে সে দেখতে পাবে সেই আগের মত তাল পাতার হাত পাখা নিয়ে সে সেই নিদৃষ্ট গাছ তলাতে দাঁড়িয়ে আছে। এমনটি সে অনেকবার ভেবেছে আর ঠিক ঠিক ওকে ওখানেই, ঐ অবস্থাতেই আবিষ্কার করেছে। মনের মাঝে আবার সঙ্কা, ও তো এখন শ্বশুর বাড়ীতেও থাকতে পাড়ে। দুর, ওর তো এখন বিয়ে হয়ে গেছে, ওকি এখনো পরীক্ষা পাশের জন্য ওভাবে পাখা হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি? বয়েই গেছে এখন তুমার জন্য, তুমার মনের মত করে ওখানে থাকতে, নিজেকে প্রবোধ দেয় ছেলেটি।

এমনই নানা ভাবনার মধ্যে ডুব দিয়ে ছেলেটি গ্রামে প্রবেশ করে। গ্রামে প্রবেশের পরেই তার এক আত্মীয় দৌড়ে এসে মেয়েটির নাম ধরে বলে, ‘বিয়াই শুনেছেন, ও না শ্বশুর বাড়ী থেকে এসেই বিষ পানে আত্মহত্যা করেছ’ ছেলেটির বিয়াই জানত যে ওদের মাঝে বিশেষ সখ্যতা ছিল, তাই সে আগ্রহ নিয়েই বলে কথাটা। কথাটা শুনার সাথে সাথে মনে হয়েছিল পৃথিবী গতি, তার হৃদস্পন্দন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গিয়েছিল। আমরা অনুভব করতে পারি ওর সেই মূহুর্তের অনুভূতি প্রকাশের জন্য যে ভাষা থাকার প্রয়োজন, তেমন যোগ্যতা সে কোন দিন অর্জন করেতে পারবে না। আসুন পাঠক, আমরা বুঝে নেই।

সত্যিকারের কিছু একটা হারানোর বেদনা সেই উঠতি তারুন্যেই সে অনুভব করে ফেলে। এ আঘাতে তার হৃদয়টা কঠিন হয়ে উঠে। গলন্ত লোহার লেই হঠাৎ পানিতে ফেললে যেমন কঠিন হয়ে যায়, তার হৃদয়টাও তেমনি কঠিন, কঠোর হয়ে যায় সেদিন থেকেই। তাই হৃদয়ের একটা অংশ হারিয়েও সেটা যে হারিয়েছে তা কেউ বুঝতে পারেনি, সে চেপে ছিল সুনিপুণ ভাবে। কিন্তু এ জন্য যে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ হয়েছিল সেটা সে আজও অনুভব করে। তার একটা কথা বার বার মনে পড়ে। মেয়েটি এক পূর্নিমার জ্যোস্নাস্নাত সন্ধ্যায় একটা গাছের লতা হাতে ধরিয়ে বলেছিল, ‘কথা দে, ভুলবি না’। ছেলেটিও আকাশের চাঁদকে নির্দেশ করে বলেছিল, ‘ঐ চাঁদকে সাক্ষী রেখে বল, তুইও ভুলবি না’। উভয়েই উভয়কে কথা দিয়েছিল। ছেলেটি আজো ভুলতে পারেনি, সে আমৃত্যু মনে রাখবে, ভুলতে পারবে না কোন দিন। মেয়েটির হয়তো শঙ্কা ছিল, পারিবার, স্বামী, আগামী দিনে অনাগত সন্তাগমনের কারণে ছেলেটিকে দেওয়া কথা রাখা দূরহ হয়ে পড়বে। সেই আশঙ্কাতেই হয়তো সে চাঁদের কাছে গিয়ে আশ্রয় অধিকতর নিরাপদ মনে করে সে চাঁদের কাছেই আশ্রয় নিয়েছে।।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 1