নারীর উপর নির্যাতন-নিপীড়ন ও খুন-ধর্ষণ আর কত?

প্রতিনিয়ত ২ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধা মহিলাও এদেশে যে হারে ধর্ষণ-নির্যাতন ও হত্যার স্বীকার হচ্ছে ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভাবে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ হলেও সামাজিক দিক থেকে আজ উচ্চ যৌন নিপীড়নের দেশে পরিণত হয়েছে।

নারী-পুরুষের সম্মিলিত রক্তক্ষয়ী ৯ মাস সংগ্রামের মাধ্যমেই আজকের এই লাল সবুজের বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর-আল শামস কর্তৃক ৩ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানী হলেও মুক্তিযুদ্ধ কালীন ৯ মাস কোন বাঙ্গালী কর্তৃক বাঙ্গালী-আদিবাসী হত্যা, ধর্ষণ নির্যাতনের কোন ঘটনা ঘটে নাই। কিন্তু আজ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নারীই নির্যাতন, নিপীড়ন ও ধর্ষণের সঙ্কা বোধ করছে। নারীর উপর প্রতিনিয়ত নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা আজ স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

প্রতিনিয়ত ২ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধা মহিলাও এদেশে যে হারে ধর্ষণ-নির্যাতন ও হত্যার স্বীকার হচ্ছে ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভাবে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ হলেও সামাজিক দিক থেকে আজ উচ্চ যৌন নিপীড়নের দেশে পরিণত হয়েছে।

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে দেশে প্রায় দেড় হাজার ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৫৮টি ধর্ষণ ও ৫৫টি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ১৫টি ও ধর্ষণচেষ্টার ৬০টি ঘটনা ঘটেছে। পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের প্রথম চার মাসে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, নারী ও শিশু পাচার, যৌন নিপীড়ন, আত্মহত্যা, বাল্যবিবাহ, অপহরণ ছাড়াও বিভিন্নভাবে এক হাজার ৫৬৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।

গত ২৯শে এপ্রিল ২০১৭ গাজিপুরের শ্রীপুরে ৭ বছরের মেয়ের ধর্ষণে বিচার না পেয়ে হজরত মাহমুদ ও তার মেয়ে আয়েশা আক্তার (৭) কে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। গত ২৮শে মার্চ বনানীর একটি হোটেলে জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করা হয়। এছাড়া মাদারীপুরে ৫ বছরের শিশু শ্রেণীর এক শিশুকে ধর্ষণ, সাতক্ষীরাতে শিশু ধর্ষণ, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গীর খরতৈল এলাকায় ৮ বছরের এক শিশু ধর্ষণ, হবিগঞ্জ জেলার বাহুবলে চা বাগানে দ্বিতীয় শ্রেণীর স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ, গত ১৮ মে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার কাছারী করিমপুর গ্রামের হারুন মিয়ার মেয়ে শাম্মী আক্তার স্থানীয় তারাপাশা স্কুল অ্যান্ড কলেজের আইএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে প্রকৃতির ডাকে ঘরের বাইরে টয়লেটে যায়। সেখান থেকে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। শুক্রবার ওই গ্রামের নিকটবর্তী একটি টিলার মধ্যে তার লাশ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের রাষ্ট্র। সংখ্যার দিক দিয়ে বৃহৎ এই রাষ্ট্রে যদি কখনো একটি বীভৎস বা লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে, তাতে জনগণের এবং সরকারের খুব একটূ বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। মানুষ যেহেতু একটি প্রাণী, পাথর বা কয়লার মতো শিলাখণ্ড নয়, সুতরাং বিচার-বিবেচনাহীন নৈতিকতাবিবর্জিত দু-একজনের মধ্যে পশুত্ব থাকবেই। কোনো কোনো মানুষের মধ্যে পশুত্বের প্রকাশ বেশি। কিন্তু কোনো সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে যদি মনুষ্যত্বের চেয়ে এই পশুত্বের পরিমাণ বেশি থাকে, তাহলে সেই সমাজ অবশ্যই নিকৃষ্ট সমাজ। যে দেশে এই পশুত্বের সংখ্যা বেশী, যে দেশে নারীরা ঘরে বাইরে সব যায়গাই নির্যাতিত-ধর্ষিত, যে দেশে নারীর নূন্যতম নিরাপত্তা নাই সে দেশে উন্নয়ের বানী একটা ফাঁকা আওয়াজ মাত্র।

নারীর প্রতি অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গি, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রভাব বিচারহীনতার সংস্কৃতি নারী নিপীড়নের অন্যতম প্রধান কারণ। নারীকে পণ্যরুপে বিজ্ঞাপণে উপস্থাপণ, মোবাইলে পর্নোগ্রাফি এখন হাতের মুঠোয়, সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য ও বিচাহীনতার সংস্কৃতি আজ নারী নির্যাতনের সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌছেছে। বাংলাদেশে প্রকৃত নির্যাতনের চেয়ে নির্যাতনের শঙ্কায় আজ নারীর মনোবলকে বেশি বিপন্ন করছে। আর এই নির্যাতীত হবার শঙ্কা নারীর জীবনে অনেক বেশি বিপর্যয় ডেকে আনবে। চলমান ধর্ষণ-খুন-নির্যাতনের ফলে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নারীই নির্যাতনের শঙ্কা বোধ করছেন।

কালের বিবর্তনে যতবার নারীর উপর নির্যাতন, ধর্ষণ-হত্যার ঘটনা ঘটেছে ঘটনাগুলোকে ধর্ম ব্যবসায়ীরা ব্যাখ্যা করেছেন নিপীড়িত-নির্যাতিত ও ধর্ষিত ঐ মা-বোনকে দোষারোপের মাধ্যমে। আল্লামা শফী নারীদের নিয়ে মন্তব্য করেছেন, নারীরা তেঁতুলের মতো। নারীরা সামনে আসলে তো পুরুষদের দিলে লালা ঝরবেই।’ নারীদের কে নিয়ে যারা এমন মন্তব্য বা যুক্তি করেন তারা কেউই নারী নির্যাতনকারীদেরকে বিচার-শাস্তির দাবী করেন না। তাদের মনোভাব এমন যে, নারীরা ঘরের বাহিরে বেড়িয়েছে বা হিজাব বিহীন বেড়িয়েছে, তাই লাঞ্ছিত বা ধর্ষিত হলে দোষ তো তাদেরই। পুরুষের আবার দোষ কি? এ মতানুযায়ী, ৩-৪ বছরের শিশু ধর্ষণের কারণও ঐ শিশুটি! সম্প্রতি মাদারীপুর সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের মধ্য পেয়ারপুর গ্রামের এক ভ্যানচালকের মেয়ে শিশু শ্রেণীর ছাত্রী (৫) ধর্ষিত হয়। গত ১৮ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গীর খরতৈল এলাকায় ৮ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর একদিন পরেই ধর্ষিত হয় হবিগঞ্জের বাহুবলে চা বাগানে ২য় শ্রেণির এক শিশু। ধর্ম ব্যবসায়ীরা কি বলবেন এটাকে। অবুঝ শিশুরা পর্দা করেনি বলে তাদের এই পরিণতি। যারা নূন্যতম ধর্ম সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তারা সবাই জানেন, একজন নারী বিবস্ত্র থাকলেও তাকে ধর্ষণ তো দূরের কথা স্পর্শ করার অনুমতি কোন ধর্ম দেয় নি।

দেশে চলমান একের পর এক ধর্ষণ, নারী লাঞ্ছনা-নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে আলোচিত দু-একটার কালক্ষেপনে বিচার হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রায়শই প্রশ্রয়মূলক। একদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্যদিকে সরকার বা প্রশাসনের প্রশ্রয়মূলক এই কর্মকান্ড শুধু বিচার ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবৃদ্ধ করছে না বরং নারী নিগ্রহকারীদের উৎসাহিত করছে। অতীতেও আমরা দেখেছি, ১৯৯৮ সালের ঘটনা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা জসীম উদ্দিন মানিক শত ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরী উৎযাপন করলে তাকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবীতে জাবিয়ানসহ সারা দেশের মানুষের তীব্র প্রতিবাদের মুখেই সরকার ও প্রশাসনের ছত্র ছায়াই দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল। দিনাজপুরে ইয়াসমিনকে পুলিশ কর্তৃক ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সাত জনকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। গত বছর ২০ শে মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনুকে ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে সমগ্র দেশের মানুষ ধারাবাহিক তীব্র প্রতিবাদ জানালেও আজ অবধি কূলকিনারা হয়নি এই আলোচিত হত্যাকান্ডের বিচার। শফী হুজুর নারীকে তেঁতুলের সাথে তুলনা করায় শেখ হাসিনা এর প্রতিক্রয়া জানিয়েছিলেন। একজন নারী হিসেবে এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া জানানো নিশ্চয় কাম্য। তিনি বলেছিলেন, ‘ ইসলাম যেখানে নারীদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে সেখানে কোনো ধর্মীয় নেতার কাছ থেকে মহিলাদের সম্বন্ধে এমন অসম্মানজনক কথা বিভ্রান্তিকর। মহিলাদের সম্পর্কে এই যে নোংরা কথা বলা – উনি কি মায়ের পেট থেকে জন্মান নাই? তো মায়ের সম্মানটুকু উনি রাখবেন না? ওনার কি বোন নেই? নিজের স্ত্রী নেই? তাঁদের সম্মান রাখবেন না? এরকম নোংরা জঘন্য কথা বলবেন।’ কারোর নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন,’উনি যে নেতাটির পাশে বসেছেন, তাঁকে যদি উনি তেঁতুল মনে করেন এবং তার জিহ্বাই পানি আসে – তাহলে আমার কিছু বলার নাই।’ কিন্তু বছর না গড়াতেই এই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই যখন শফী হুজুরকে গণভবনে ডেকে কুশল বিনিময় করেন, তার সাথে আতাত করেন তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না।

বহু বছর পূর্বে ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারী জাতির দুর্দশা দেখে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, যে দেশে পুরুষজাতির দয়া নাই, ধর্ম নাই, ন্যায় অন্যায়ের বিচার নাই, হিতাহিত বোধ নাই, স্বদ্বিবেচনা নাই, কেবল লৌকিকতা রক্ষায় প্রধান কর্ম ও পরম ধর্ম, আর যেন সে দেশে হতভাগা অবলা জাতি জন্মগ্রহণ না করে। একের পর এক নারীর উপর নিপীড়ন-ধর্ষণ নির্যাতন যে ভাবে ঘটেই চলেছে তাতে এ দেশে এ নারীরা জন্ম নেওয়াই বোধেহয় আজন্ম পাপ।

গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই নিয়েই আমাদের সংবিধান, আমাদের আজকের এই লাল সবুজের বাংলাদেশ। শাসকগোষ্ঠী সংবিধানের এই চার মূলনীতি থেকে বারে বারেই সরে এসেছে; কাঁটাছেড়া করেছে অসংখ্যবার। যদি ৭২ এর সংবিধানের আলোকে দেশ পরিচালিত থাকতো তা হলে আজ নারীর উপর এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটতো না।

এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীর জন্য না, তাই নারীর উপর সকল প্রকার অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন, নির্যাতন, খুন -ধর্ষণের প্রতিরোধে আজ নারীদেরই এগিয়ে আসতে হবে। এদেশে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধী দলীয় নেত্রীরা নারী হলেও নারীর উপর সহিংসতা এদেশে আজ বন্ধ হবে না। তাই এর বিরুদ্ধে নারীদেরকই ব্যারিকেড গড়ে তুলতে হবে। নারী জাগরণে অগ্রদূত বেগম রোকেয়া বলেছিনে, ‘ইশ্বর তাহাকেই সাহায্য করেন যে নিজে নিজের সাহায্য করে, (“God helps those that help themselves”) তাই বলি আমাদের (নারীদের) অবস্থা আমরা চিন্তা না করিলে আর কেহ আমাদের জন্য ভাবিবে না। ভাবিলেও তাহাতে আমাদের ষোল আনা উপকার হইবে না।’ নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হলেও আজ নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভবপর হচ্ছে না, তাই আপনারা নারীরা কেবল ধিক্কার নয়, ঘৃনা নয়, আপনাদের সক্রিয় প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে সভ্যতার এ লাঞ্ছনা রুখে দাঁড়ান।

আল আমিন হোসেন মৃধা
লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 − 64 =