ব্রজেন কাকা – নষ্টালজিয়া

কূয়াসায় ঢাকা ভোরের প্রকৃতি। সারা রাতে ঝরে পড়া শিশিরে ভেজা গ্রামের মেটো পথ। ঘড়িতে তখন সকাল ৭:০০ বাজলেও আকাশে সূর্য দেবতার কোন খরব নেই। নিজের প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হয়ে বাইসাইকেল নিয়ে বের হয়ে পড়লাম শিশিরে ভেজা গ্রামের মেটো পথ ধরে।ন করেছে। ক্ষমাও চেয়েছে।” হঠাৎই ব্রজেন কাকার চেহারায় কঠিন হয়ে উঠল এবং বলে বসল “জানিস ভাতিজা, এলোকটা রাতের আধারে মুখে কাল কাপড় বেঁধে ভয় দেখানোর জন্য আমাদের খেরের চিনে (খড়ের গাদাঁ)য় ও থাকার ঘরে আগুন লাগিয়েছে, আবার কিছুক্ষন পর কাপড় পাল্টিয়ে হাতে বালতি নিয়ে সে আগুন নেবাতে এসেছে, ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও কিছুই করার ছিল না”।

ব্রজেন কাকা

কূয়াসায় ঢাকা ভোরের প্রকৃতি। সারা রাতে ঝরে পড়া শিশিরে ভেজা গ্রামের মেটো পথ। ঘড়িতে তখন সকাল ৭:০০ বাজলেও আকাশে সূর্য দেবতার কোন খরব নেই। নিজের প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হয়ে বাইসাইকেল নিয়ে বের হয়ে পড়লাম শিশিরে ভেজা গ্রামের মেটো পথ ধরে। কিলোমিটার খানের রাস্তা পেছনে ফেলে আসার পর রাস্তার ধারে যেবাড়ীটির গুলির পাশ ঘেঁষে সাইকেলটি চলছে এগুলি এককালে হিন্দু বাড়ী ছিলো। মনে পড়ে খুব, এপাড়ার সর্ব দক্ষিনের বাড়ীটার পুকুরের পূর্ব পাড়টা দখল করে আছে চলাচলে রাস্তা। পুকুর পাড়ের উত্তর পূর্বকোনে একটি চালতা গাছ ছিলো। মা-ঠাকুরমা চালতা ভালবাসত বলে গাছের মালিকের দেখ-নো-দেখ করে গাছ থেকে তালতা পেঁড়ে বাড়ী ফিরতাম। গাছ থেকে চালতা পড়ার শব্দে মাঝে মাঝে বাড়ী লোক হাঁকডাক দিতো। আর তাতেই দৌঁড়ে পালাতাম। রাস্তার ধারে ঐবাড়ীটি এখনো আছে। রাস্তা থেকে দেখা যায়, বাড়ীর ভিতরে ঘর গুলি বেড়া ও ছাউনি দেখতে আগের মত ভাঙ্গা মছকা নেই। পুরাতন জীর্ণ ও দীনতার স্থলে অনেকটা পরিপাটি টিনের ঘর দেখা শোভা পাচ্ছে। কাঠ ও বাঁশের খুটি দিয়ে তৈরী কাঁচা পুকুর ঘাট নেই, তারস্থলে এসেছে রিইফোর্সমেন্ট ঢালাইয়ের শক্ত সামর্থ সিঁড়ির পাকা ঘাটলা। বাড়ীর আশপাশে পরিকল্পিত ঝোঁপঝাপ বেড়েছে বই কমেনি। বাড়ীর মেয়ে মানুষদের জন্য পর্দ্দা বলে কথা। নিরাপত্তার জন্য কাঁটা ঝোপের বেড়া ঘেরা আছে চারপাশের সীমানায়। কিন্তু যা নেই তা হলো এবাড়ীর পুরোনো আদি অকৃত্রিম মানুষ গুলো, যারা এবং যাদের পূর্বপূরুষরা এবাড়ীটি তিল তিল করে রুপ দিয়েছেলো।

বর্তমানে এবাড়ীতে যে মানুষ গুলো বসবাস করছেন এরা সবাই নতুন। বড় জোর বছর দশেক হলো এরা তাদের নতুন বাড়ীতে উঠেছে। এবাড়ীতে থাকার ঘর গুলোতে কত মানুষ থাকে তা বাড়ীর চারিদিকে আড়বেড়ার কারণে বাহির হতে বোঝার উপায় নেই। এখন যারা বাড়ীতে বসবাস করছেন এরা সবাই নতুন। বাড়ীর চেহারায় পরিবর্তন এদেরই আনা, আড়বেড়াও তাদের দেয়া। বাড়ীর নিজস্ব মানুষজন ব্যতীত রাস্তায় চলাচলরত পরপূরুষরা এবাড়ীর মেয়েছেলেদেরকে দেখবে তা কি হয়? এজন্য বাড়ীর চারপাশে এত সব আড়বেড়ার ব্যবস্থা করেছেন। অথচ বাড়ীটি বছর দশেক আগের বাসিন্দাদের এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবার ফুরতই ছিল না। আর থাকবেই কেন? ওরাতো শুধু মানুষ ছিল না, ওরা ছিল হিন্দু মানুষ। এবাড়ীর হিন্দু মানুষ গুলো সেই ১৯৪৭ সাল থেকে প্রতিটি দিনের প্রতি মুহুর্ত যুদ্ধ করেছে পেটে ক্ষুদার জ্বালা মিটাবার খরচ জোগাতে, সময় নষ্ট করেছে আমার মতো চালতা চোর তাড়াতে। একইভাবে নিজেদের গাছের পেয়ারা চোর, পেঁপে চোর, কলা চোর, ক্ষেতের কুইয়র (আখের আঞ্চলিক শব্দ) চোর ইত্যাদি ইত্যাদি তাড়াতে। অবশ্য এসব চোর তাড়াতে এদের ব্যস্ত থাকতে হয়েছে দিনের বেলায়। তবে রাতের বেলায় এরা পালাক্রমে জাগন (জাগ্রত) থাকতে হয়েছে অন্যরকম চোর তাড়াতে। যে তালিকায় ছিলো পুকুরের মাছ চোর, ঘরের সিঁদেল চোর, উঠতি যৌবনা মেয়েকে তুলে নেয়া নেবার চোর। এবাড়ীর মানুষদের কতরাত যে এভাবে জেগে থাকতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সবই এদের রুটিন মাফিক কাজ হয়ে গিয়েছিল। যে শিশু সন্তানরা এরুটিনের মধ্যে জন্ম নিয়েছিলো তারা মনস্ত্বÍত্তাত্বিক ভাবে মেনেই নিয়েছিলো এটাই জীবন মানুষের জীবনধারা। আর যারা জীবনের শুরুতে এগুলো দেখেনি কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে এসব রোজ চা নামতা শুরু করতে হয়েছে তাদের চিন্তায় ছিলো কি করে ভবিষ্যত বংশধরদেরকে এধরনের যন্ত্রনা থেকে মুক্ত করা যায়, সে ভাবনায়। ভাবনা থেকে একসময় মনে হলো তাদের চৌদ্দ পূরুষের বাসস্থান পৈত্রিক থেকে দূরে কোন জায়গায় স্থানান্তর হওয়া দরকার। তা না হলে একদিন সবাই পাগল হয়ে মারা যাবে। এ ধারণাকে আরো উৎসাহ যুগিয়েছেন বাড়ির নিকট দূরত্বের কাশিম আলী। তবে তাদের উৎসাহ দেবার ভঙ্গীটা আক্রমনাত্বক ছিলো না, বরং ছিলো শুভাকাঙ্খীর ভঙ্গিমা। বাড়ীর পূরুষ লোকরা যখন রাত জেগে পাহারা দিতো, তখন কাশিম আলী মাঝে মাঝে সাহায্য করার মানসে রাতে এসে চা বিস্কিট খেয়ে যেত। কখনো সত্যি সত্যি চোরের উপস্থিতি টের পেয়ে এবাড়ীর মানুষরা রাতে চিৎকার চেঁচামেচি করলে ত্বড়িৎ গতিতে কাশিম আলীই লাঠি নিয়ে হৈঁ হৈঁ করে এগিয়ে এসেছে। একবারতো কে বা কারা বাড়ীর খেরের চিনে (খড়ের গাঁদা) আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো, সে আগুন নেবাতে জগ মগ খোর বালতি নিয়ে কাশিম আলীই সবার আগে এগিয়ে এসেছিলো। বলা বাহুল্য এবাড়ীতে কে বা কারা জ্বালাতন করতঃ সেটা এবাড়ীর হিন্দু বাসিন্দারা বলতে না পারলেও, বুঝতে অসুবিধে হতো না যে কাশিম আলী এদের বিপদের বন্ধু (!) ছিলো। সে জন্যেইতো বছর দশেক আগে নিরাপত্তার খোঁজে নতুন জায়গায় এরা দেশান্তরিত হবার পূর্বে বাড়ীর বহু দিনের পুরোন বন্ধু (!) কাশিম আলীর নামে বাড়িটি লিখে দিয়ে গেছেন। আর সেই থেকে এটি আর হিন্দু বাড়ী নেই, বরং রাস্তার পার্শ্বে বাড়ীর দরজায় শোভাপাচ্ছে কালো রংয়ের উপর সাদা কালিতে কাসিম আলীর নতুন বাড়ী লেখা সাইনবোর্ডটি।

কাশিম আলীর নতুন বাড়ীর রাস্তার ধারের পুকুরটার উত্তর পূর্ব কোনে যেখানে চালতা গাছটা ছিলো, ঠিক ঐজায়গা বরাবর গ্রামের রাস্তাটাকে ষ্পর্শ করেছে ছোট্ট এটা সাঁকো। সাঁকোটি বড় কোন খাল বা নালার উপর দিয়ে ছিলো না। রাস্তার পূর্বপাশ ঘেষাঁ প্রায় ফুট পাঁচেক হবে এমন একটি নর্দমা উপর সাঁকো যা পূর্ব দিকের একটি ছাঁড়া ভিটিকে যুক্ত করেছিলো। ছাঁড়া ভিটি শব্দটি স্থানীয় ভাষায় ব্যবহৃত হয়। ছাঁড়া ভিটে মানে আশপাশের নিচু জমির মাঝে বসতঃ বাড়ী ঘেঁষা কৃত্রিমভাবে তৈরী উচু ভিটি জমি, যেখানে রবি শষ্য কিংবা বীজ তলা হিসেবে ব্যবহার হয়। ছাঁড়া ভিটিটা পেরুলেই আছে একটি বড় পুকুর । আর পুকুরের উত্তর পাড়ের গাছ গাছালী ভরা আরো একটি বাড়ী চোখে পড়ে। এক সময় এরাস্তা দিয়ে চলাচল করার সময় পুকুর পাড়ে ছাঁড়া ভিটের আলের উপর খুটি আর দঁড়িতে ঝুলে থাকত সাদা ধুতি, সধবা মহিলার রঙ্গিন শাড়ী, বিধবার থান কাপড়, বাচ্ছাদের পোশাক আরো কত কি। কাপড় গুলি ঐবাড়ীর আবাল বৃদ্ধা বনিতাদের স্নানের পরে রোধে শুকানো পরনের কাপড় ছিল। এখন আর সেসব কিছু চোখে পড়ে না। ছাঁড়া ভিটে গুলোতে আজ আর হরেকরকমের সবজ্বি চোখে পড়ে না। বরং কেমন অগোছালো, রং হীন ছোট ছোট জঙ্গলে ভরা ভিটে। পুকুরের পাড়টা কেমন ব্যবহারহীন গম্ভীরতা প্রকাশ করছে। পুকুরের উত্তর পাড়ের বাড়ীটা গাছগাছালির পাতার রং গুলিও আগের মত সবুজ নয়, বরং কেমন রক্ত জমাট কাল রং ধারণ করছে। যারা এ রাস্তা ধরে বিগত চার দশক হাঁটা করছে, এরা দেখা মাত্রই পার্থক্যটা বুঝতে পারে। এর কারণ বাড়ীটির পুরাতন বাসিন্দাদের পরিবর্তের বছর বিশেক হলো নতুন বাসিন্দা এসেছে। ফলে বাড়ীর মানুষ গুলোর সাথে সাথে এ বাড়ীর আঙ্গিনা, পুকুরঘাট, ছাঁড়া ভিটির চেহারা সবই পরিবর্তন হয়ে গেছে। পুকুর পাড় আর ভিটি জমির আলে খুটি আর দঁড়িতে টাঙ্গানো হিন্দু পরিবারগুলি আবাল বৃদ্ধা বণিতাদের হরেক রং এর কাপড় আজ আর দেখা যায় না। এর মূল কারণ এবাড়ীতে রাস্তার পশ্চিম পাশের নতুন বাসিন্দা কাশিম আলীর মত মীর আলীর পরিবার এসেছে বিগত দুদশক আগে। এরাই এখন এবাড়ীর স্থায়ী বাসিন্দা বনে গেছেন। মীর আলীর পূর্বে এবাড়ীর যারা পত্তন করছেন এরা হলো ব্রজেন তথা ব্রজলাল পালদের পূর্ব পূরুষ, যারা বিগত সার্ধশত বছরের বেশী সময় ধরে এবাড়ীতে বসবাস করে এসেছিলো। ব্রজলাল ছিলেন এবাড়ীর শেষ প্রজন্মের বাসিন্দা।

ব্রজলালদের বাড়ীতে কত পরিবার ছিলো সেটি আমার অজানা ছিলো। তবে বাড়ীর চলাচলের পথে দূর্বা ঘাস গজাতে পারতো না। এতে বুঝা যেত কমপক্ষে জনা ২৫-৩০শেক মানুষতো ছিলোই। এবাড়ীর সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষটি ছিলো ব্রজেন পাল। আশি দশকে বিকম (পাস)ডিগ্রীটা তার পকেটে ছিলো। ব্রজেন পালকে পড়াশুনা শেষে শেষে হাইস্কুলে মাষ্টারী করতে দেখেছি। শ্যাম বর্ণের লম্বা গড়ন আর ডানগালে আড়াআড়ি ভাবে একটি কাটা চিহৃ ছিলো। কথা বলত সাবলীল বাচন ভঙ্গীতে। আমি ব্রজলাল পালকে পারস্পারিক ভাবে কাকা সম্মোধন করতাম। কেননা আমার দাদু ব্রজলালের বাবার সাথে ভাইয়ের সম্পর্ক ছিলো। ব্রজলাল কাকা স্কুলে শিক্ষকতা করলেও এবাড়ীর মানুষের মূল রুটি রুজি মূল ছিলো কৃষিতে জমিতে। বাড়ী ও ছাঁড়া ভিটি সংলগ্ন উর্বর নিচু জমি গুলিতে বছরে একবার ধান ফলাতো, আর ছাঁড়া ভিটে গুলোতে সারা বছর নানান সবজ্বি ফলানোই তাদের আয়ের মূল উৎস ছিলো। হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্রজলাল কাকারা পাল স¤প্রদায় ভূক্ত। তবে মাটির হাড়ি পাতিল তৈরীর কাজে এবাড়ীর পূর্ব পূরুষদের মধ্যে কেহ ছিলো কি না সেটা জানা না থাকলেও বুঝা যায় ব্রজেন কাকার বাপ কিংবা দাদা কৃষি উৎপাদনকেই প্রাধান্য দিতো। ফলে এবাড়ী লোকেরা উৎপাদিত ফসল, শাকসবজী, স্থানীয় ফল ফলাদি নিজেদের চাহিদা পুষিয়ে অতিরিক্ত অংশ বাজারে নিয়ে বিক্রি করতো। বলা যায় শুধুমাত্র শিল্পজাত দ্রব্য ব্যতীত এবাড়ীর কারোই বাইরের কোন কিছুর প্রয়োজন হতো না। শিশির ভেজা গ্রাম্য রাস্তায় সাইকেল চালাতে চালাতে ডান দিকে ঘাড় ফিরাতেই এবাড়ীর মানুষ গুলো কথা মনের মাঝে হু হু করে মনে পড়ল। ভেসে উঠল দুই দশকের পূর্বের ছবি। আর সেই ব্রজলাল কাকাকে তো বটেই।

ব্রজলাল ছিলো তার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। সবাই ব্রজলালকে ব্রজেন নামে ডাকতো। ব্রজেন কাকার পূর্ব পূরুষদের কেহ ছয় হাতি ধুতির ব্যাতীত অন্য কোন বস্র পরিধান করেছেন বলে মনে হয়নি। একমাত্র ব্রজেন কাকাই প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি যিনি ইংলিশ হাফ প্যান্ট, পরে ফুল প্যান্ট ও লুঙ্গি পরার অভ্যাস করেছিলো। আর করবেনই না কেন, তিনিই তো এবাড়ীর প্রথম বি.কম গ্রাজুয়েট। ব্রজেন কাকা ১৯৭১ সালে কিশোর ছিলো, বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে ছিলো বলে বাবা আবদার রক্ষায় যুদ্ধে যাননি। অবশ্য যুদ্ধ করার জন্য তার বয়েস ও সক্ষমতাও ছিলো না। তবে তিনি পরোক্ষ ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছিলেন। একসময় টিকতে না পেরে এবাড়ী মাত্র দুজন পূরুষ মানুষ ব্যতীত ব্রজেন কাকার বাবা ও বাড়ী অন্যসব সদস্য আগরতোলায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলো। দেশ স্বাধীন হবার পর সবাই বাড়ীতে ফিরে দেখতে পেয়েছে বাড়ীতে ভগ্ন বেড়ার ঘরগুলি শুধু পড়ে আছে। অন্য সব কিছুই অবশিষ্ঠ ছিলো না অবশ্য বাড়ীর মানুষ গুলো আগরতোলা যাবার পূর্বে একটা বুদ্ধির কাজ করেগিয়েছিলো। তা হলো আগরতোলা যাবার পূর্বে কাঁসার তালা-বাসন, কিছু অলঙ্কারাদি ঘরের ভিটিতে গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে ছিলো। বাড়ীতে ফিরে যে যার ঘরের ভিটির মাটি খুড়ে কাঁসার সব তৈজসপত্র অক্ষত অবস্থায় পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো আর তা দিয়েই নতুন করে যাত্রা শুরু করলো।

১৯৭১ দেশের অনেক হিন্দু ভারতে গিয়ে আর ফেরেনি। কিন্তু ব্রজেন কাকাদের বাড়ী সহ এপাড়ার পাঁচটি বাড়ীর কেহই আগরতোলায় থাকেনি। ফলে স্বাধীনতার পর অর্ধ পোঁড়া খড় কুঠো নিয়ে নতুন করে পাঁচটি বাড়ী মানুষরা যাত্রা শুরু করলে ব্রজেন কাকাদের বাড়ীর লোকজনও বসে থাকেনি। তবে স্বাধীনতার বেশ কিছু দিন শান্তিতে থাকলেও ১৯৯০ সালে ভারতের বাবরী মসজিদ ধাক্কার জেনারেল হু মোঃ এরশাদ সাহেবের কল্যাণে ব্রজেন কাকাদের বাড়ীও স্পর্শ করেছিলো। নব্বই সালের ঐদিন কয়েকটি শুকনো মাটির ঢিল ছাড়া তেমন কিছু পড়েনি। তবে ভাল রকম ধাক্কা খেয়েছে এর দু বছর পর অর্থাৎ ১৯৯২ সালের ঘটনায়। রীতিমত রাত জেগে পালাক্রমে পাহারা দিতে হয়েছে এপাড়ার পাঁচটি বাড়ীর সকল মানুষ। ঘরদোর রক্ষায় হাতে লাঠি ও দেশী অস্ত্রে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হয়েছে সবাইকে। একাজে মাঝে মাঝে রাতে হাঁক ডাক দিয়ে সাহস জুগিয়েছে দক্ষিণ বাড়ীর কাশিম আলী আর এ বাড়ীর মীর আলীরাও। হাতে লাঠি নিয়ে রাতে এসে চা পানি খেয়ে সাহস জুগেছে মীর আলী। সেই ১৯৯২ সাল থেকে এবাড়ীতে আর শান্তি নেই। দিনে ভাল থাকলেও রাতে অযাচিত মানুষের অনাহুত উপস্থিতির উৎপাত আর উৎপাত। ভয় আর আংতকে সেই থেকে এরা রাত জেগে পাহারা দেবার পালা। ব্রজলালের বাড়ীর লোকেরা মাঝ রাতে অযাচিত ও অনাহুত মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে ভয়ে চিৎকার চেঁছামেছি শুরু করলে মীর আলীখেঁক শিয়ালের মত হাঁকডাক দিয়ে সাহস জোগাতে এগিয়ে এসে যথারীতি চা ও খিলি পান খেয়ে বিদেয় নিলে ঐরাতের মতো আর সমস্যা হতো না। এভাবে দিনের পর দিন কেটেছে এদের। শেষে বাড়ীর নারীদের সম্ভ্রমের কথা চিন্তা করে পুরোনো বাড়ীর মায়া পরিত্যাগ করে নিরাপদ নতুন ঠিকানার খোঁজা শুরু করেছিলো যে যার মতো।

এলোমেলো বিছিন্ন ভাবনা ভাবতে থাকছি আর দু’চাকার সাইকেলের প্যাডেল চাপছি। এভাবে চলতে চলতে একসময় উচ্ছেদ হওয়া হিন্দু পাড়াটি (সংখ্যায় পাঁচ বাড়ীর) গুলি অতিক্রম করে মেইন রাস্তায় কখন যে পৌঁছে গেলাম টেরই পেলাম না। শীতের সকালের ভারী কূয়াসায় আবছা আলোয় দেখতে পেলাম ধুসর রংয়ের জ্যাকেট আর মাফলারে মাথা ও মুখ মোড়া আর শীত থেকে বাঁচানোর জন্য হাতদুটি প্যান্টের পকেটে দিয়ে রাস্তার ধার ঘেঁসে লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটছে মধ্য বয়েসী একটা লোক। আস্তে আস্তে সাইকেল চালাতে চালাতে হাঁটার ধরন দেখে বুঝতে পারলাম বোধ হয় লোকটি আমার পরিচিতদের কেহ একজন হবে। সাইকেলের প্যাডেল চেপে লোকটির সামনে গিয়ে মুখের দিকে তাঁকালাম, কিন্তু চেনার উপায় নেই, প্রকৃতিকে যেমন ঘন কূয়াসায় ঢেকে রেখেছে, মানুষের দৃষ্টি যেমন কয়েক ফুটের বেশী এগোয় না, ঠিক তেমনি মাফলারে ঢাকা মুখ মন্ডলে লোকটির চোখ ছাড়া আর কিছু দেখতে পেলাম না। অপরিচিত ভেবে, সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দিতে বলে লোকটি পেছন থেকে উঠল ভাতিজা। আমি হতবিহ্বল হয়ে পেছয়ে তাকাতে গলা ছেড়ে বলে উঠল “আমি তোর ব্রজেন কাকা”!

আমি বিস্ময়ে হতবাক। হঠাৎ ব্রজেন কাকা এখানে কেন? উনাকে দেখেছি বছর বিশেক আগে। এবাড়ী ছেড়েছেন তাও বছর ১৪-১৫ তো হবে। কিছুটা বিস্মৃত ও কিছুটা আশ্চর্য হয়ে সাইকেল থামালাম। খুবই আগ্রহ ভরে কুশলাদির সাথে কুয়াসা ঢাকা ভোরে এভাবে দেখার পাবার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি ও তার পরিবারের লোকজন ভারতের কোথায় থাকেন তাও জিজ্ঞেস করতে ভুল করিনি। ব্রজেন কাকা বললেন,

• “আমি ভারত যাব কেন? এদেশেই আছি, ব্যাংকে চাকুরী করছি, ১৯৯৬ এর আওয়ামীলীগ সরকারের সময় চাকুরী হয়েছে, বর্তমানে চট্রগ্রামে পোষ্টিং”।

• আমি জানার ভঙ্গিতে বললাম, “যে সকল হিন্দু ইতোপূর্বে বাড়ী ছেড়েছে, এদের সবাই তো ভারতের কোথাও না কোথাও বাসা বেঁধেছে? তাহলে আপনি কেন এদেশে?”

• উত্তরে তিনি জানালেন, নিজ রক্তে চলমান হৃদপিন্ড থেকে যে কান্না আসে, সে কান্নায় এদেশ ছাড়তে বাঁধা দেয়, তাইতো যেতে পারিনি।

কোথায় বাড়ী করছেন – এমন প্রশ্নের উত্তরে বললেন বাড়ী নয়, চট্রগ্রামের মীরসরাইতে একটু জায়গা কিনে ঘর তুলেছি, ওখানে স-পরিবারে আছেন। ওনার বাবার কথা জানতে চাইলে, চোখের কোনে শিশিরের মত অশ্র“ বিসর্জন দিয়ে জানাল এবাড়ী ছেড়ে যাবার পর কয়েক মাসের মধ্যে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন, চট্রগ্রামেই শবটা দাহ করা হয়েছে।

এত ভোরে এলাকায় আসার কারণ জানতে চাইলাম, বললেন “পূর্ব পুরুষের বাড়ীটি দেখতে এসেছি”। আমি বললাম, বাড়ীটিতো আর আপনাদের নেই, শুনেছি মীরআলী কিনে নিয়েছেন। তিনি জানালেন, “ঠিকই শুনেছিস, মীর কাকাকে বাবা লিখে দিয়েছেন, আমি গতকাল রাতে এসেছি, আমাদের পুরোনো ভিটায় ওনার নতুন ঘরেই ঘুমিয়েছি। মীর কাকা অসুস্থ, আর্থিক অবস্থাও তেমন ভাল নেই।

আমি বললাম কেন? উনিতো আপনাদের সকল জায়গা কিনেছেন, আর্থিক অবস্থা খারাপ হবে কেন?

ব্রজেন কাকা আপেক্ষা করে জানালেন, “আমরা আমাগো ছাঁড়া ভিটিতে শাক সবজ্বি ফলাতাম, তা বিক্রি করে বছরে কয়েক লক্ষ টাকার আয় হতো, তা দিয়ে আমাদের সংসার চলত। এখন এরা কিছুই করতে পারে না, সব জায়গা জঙ্গল আর ঘাঁশে ভরে গেছে।”

ব্রজেন কাকা, মুখ উজ্জল করে বলল “গতরাতে মীর আলী কাকা আমাকে খুব আদর যত্ন করেছে। ক্ষমাও চেয়েছে।” হঠাৎই ব্রজেন কাকার চেহারায় কঠিন হয়ে উঠল এবং বলে বসল “জানিস ভাতিজা, এলোকটা রাতের আধারে মুখে কাল কাপড় বেঁধে ভয় দেখানোর জন্য আমাদের খেরের চিনে (খড়ের গাদাঁ)য় ও থাকার ঘরে আগুন লাগিয়েছে, আবার কিছুক্ষন পর কাপড় পাল্টিয়ে হাতে বালতি নিয়ে সে আগুন নেবাতে এসেছে, ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও কিছুই করার ছিল না”।

আমি বললাম, খরের চিনের আগুন লাগা আর থাকার ঘরের কোনে আগুন তো আপনাদের পাড়ার প্রায় সবক’টি বাড়ীতে লেগেছিল। ব্রজেন কাকা বললেন, “আমাদের পাড়ার ৪টি বাড়ী উচ্ছেদ হবার প্রেক্ষাপট গুলি প্রায় একরকমই ছিল, কেহ ভয় দেখিয়েছে, আবার কেহ অভয় দিতে এসেছে। পরে জেনেটি দুটি ঘটনাই একই জায়গা থেকে এসেছে”।

আমি জানার উদ্দেশ্যে বললাম, “তাই বলে এবাড়ী গুলি যে সব লোকেরা কিনেছেন, এরাই সেই অন্ধকারের নির্দেশদাতা আর আলোতে অভয় দাতা ছিলেন? ব্রজেন কাকা বললে, “ঠিকই ধরেছিস”।

আমি ব্রজেন কাকার নিকট জানতে ছেয়েছি, এধরনের দ্বৈত আচরণকারী মানুষ আপনার মীর আলী কাকার উপর রাগ হয় না?

উত্তরে ব্রজেন কাকা জানাল, রাগ করে কি লাভ? মীর কাকা এখন রোগ শোক ব্যাধি, অভাব আর দারিদ্রতায় যে শাস্তি পাচ্ছেন, এবং এদের পরবর্তী বংশধররাও একই শাস্তি পাবেন, এবং এদের শাস্তি ঈশ্বরই দেবেন”।

হ্যাঁ ব্রজেনরা চৌদ্দপুরুষের বাস্তুভিটে থেকে নাটকীয় ভাবে উচ্ছেদ হয়ে যায়। যাদের কারণে এরা নিরবে নিভৃর্তে উচ্ছেদ হয়, তাদেরকে এরা চিনতে পারে, কিন্তু উত্তাপ দেখায় না, বরং বিশ্বাস করে এসব কাশিম আলী আর মীর আলীদের শাস্তির বিধান ঈশ্বরই একদিন করবেন। আদতে এসব কাশিম আলী ও মীর আলীরা তাদের জীবদ্দশায় মনস্ত্বাত্বিকভাবে ভীষন যাতনা পায় এবং বংশ পরম্পরা এদের পরিবারগুলি কম বেশী একই যাতনা ভোগ করে। কিন্তু বিধি এদের প্রতি এতই নিমর্ম যে, কখনো এদের জ্ঞান চক্ষু কখনো খোলে না, ফলে এরা কখনোই বুঝতে পারেনা নতুন বাড়ীতে উঠার পর রোগ শোক এবং দৈন্যদশার মত জাগতিক যন্ত্রনাগুলির কিসের জন্য ভোগ করছে।
======

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

86 + = 94