মালাউন

বেশ কয়েকবছর আগের কথা। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। কোন এক কারণে এক বন্ধুর মেসে যাচ্ছিলাম অন্য এক পাড়ায়। রাস্তার পাশে দুটো ছেলে ঝগড়া করছিলো, বোধহয় খেলতে খেলতে ঝগড়া লেগে গেছে, আট/দশ বছর বয়স হবে তাদের। একটা ছেলে আরেকজনকে হঠাৎ বলে উঠলো এই মালাউনের বাচ্চা।অন্য ছেলেটা নিশ্চুপ, কোন জবাব দিতে পারলো না। ব্যাপারটা শোনা মাত্র বুকে একটা ধাক্কা খেলাম। কিন্তু হায় ছেলেটাকে গিয়ে কিছু বলার বা একটু উপদেশ দেবার সাহস আমার হলো না।

/ALTERNATES/w640/ami+malaun+bolchhi.jpg” width=”512″ />

আরেকটি ঘটনার কথা বলি। তখন একটা সরকারী ব্যাংকে চাকরী নিয়েছি। মাস দুয়েক পরে হঠাৎ যেতে হলো শিক্ষাবৃত্তি দিতে কয়েকটা স্কুলে। নতুন চাকরী, এই ব্যাপারটাও নতুন, তাই প্রক্রিয়াটা সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিলো না। আমি আর আমার সাথে এক পিয়ন কয়েকটা প্রাইমারী স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে আসবো। যাতে কোন অনিয়ম না হয় সেজন্য সবাই নিজের নিজের র্কাড নিয়ে আসবে, প্রধান শিক্ষক ছাড়া অন্যরাও থাকবেন। কিন্তু কেউ উপস্থিত না থাকলে সে বাবদে টাকা ফেরত যাবে। পরবর্তীতে ব্যাংক শাখায় গিয়ে টাকা নিয়ে আসার সুযোগ আছে। শেষ যে স্কুলে গেলাম সেখানের হেড মিস্ট্রেস সব ছাত্রকে লাইন করিয়ে আমাদের সামনে আনতে একটু সময় নিচ্ছিলেন। হেডমিস্ট্রেস মাঝবয়সী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন হিন্দু মহিলা। সেই স্কুলসহ আরো কয়েকটি স্কুলের শিক্ষাবৃত্তিও সম্ভবত সেখানে দিয়ে ছিলাম আমরা। হোস্ট হিসেবেই হোক আর যে কারণেই হোক নিজের স্কুলের বৃত্তি নেয়ার ব্যাপারটা তারা রেখেছিলেন সবার শেষে। হঠাৎ দেখা গেলো এক বৃদ্ধ দাড়িওয়ালা অভিভাবক খেপে উঠেছে দেরীর কারণে। চিৎকার করে হেডমিস্ট্রেসকে মালাউন বেটি বলে গালি দেয়া শুরু করলো লোকটা। এতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হেডমিস্ট্রেসটির মুখ মলিন হয়ে উঠলো কিন্তু কোন প্রতিবাদ তিনি করতে পারলেন না। আমিও তো লোকটাকে একটা ধমক দিতে পারতাম কিন্তু কেন জানিনা পারলাম না। নিজের ধর্মীয় পরিচয় যে আমার মধ্যে একটা র্দূবলতা সৃষ্টি করেছিলো তা বলাই বাহুল্য। অথচ আমার সাথের মুসলমান পিওনটি খুব সহজে একটা ধমক দিয়ে লোকটাকে চুপ করিয়ে দিলো। সারাটা ফেরার পথ, সারাটা রাত, পরের কয়েকটা দিন শান্তি পাইনি। নিজেকে ঘৃণা করেছি, নিজের কাপুরুষতাকে ঘৃণা করেছি। নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়ে গেছি।

জানিনা অন্যদের কি হয়। এরকম পরিস্থিতিতে অন্যরাও নিশ্চয়ই পড়েন। আমার মতো না শোনার ভান করেই সরে পড়েন তারাও?

আরেকটা ঘটনা বলে এই প্রসঙ্গ শেষ করবো। গিয়েছিলাম একটা মিস্টির দোকানে। ম্যানেজার আর দুই কর্মচারী ছিলো সেখানে। তার মধ্যে একটি একেবারেই কিশোর কিন্তু খুবই ছটফটে চালাক টাইপের। অন্য লোকটা মাঝবয়সী। সে বাইরে থেকে ভেতরে এসে ঢুকতেই কিশোরটি বলে উঠলো “দেখো, মালাউনটা এতোক্ষনে আসছে।” লোকটা একটা বোকার হাসি হাসলো, কোন প্রতিবাদ করলো না। আমিও নির্লিপ্তের মতো সব শুনে বেরিয়ে এলাম।

মালাউন একটা ছোট শব্দ, কিন্তু এর মধ্যে যে তাচ্ছিল্য, যে ঘৃণা লুকিয়ে আছে তা কিন্তু ছোট না। এমনি করেই দিন যায়, হিন্দু পাড়ায় এসে এমন গালি দিয়ে গেলে হয়তো প্রতিবাদের লোক খুঁজে পাওয়া যাবে কিন্তু অচেনা পরিবেশে বা অচেনা জায়গায় এমন শব্দের মুখোমুখি হলে আমার মতো নিজের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখাকেই শ্রেয় মনে করবেন হয়তো অনেকেই। এই আত্মসম্মান বোধ এর অভাব থেকে আমরা কি আদৌ কখনো বেরিয়ে আসতে পারবো? হয়তো আমার র্পূ্বপুরুষকে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে, সম্ভবত আমার পরবর্তী প্রজন্মকেও একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হবে। আমার জীবনে এখনো আমাকে কোন সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সম্মুখীন হতে হয়নি, ভবিষ্যতে কি হবে না হবে জানিনা।

হুমায়ুন আহমেদ আমার প্রিয় লেখকের কাতারে পড়েন না, তবে একটা উপন্যাসে তার একটা ভাবনা পড়ে মনে হয়েছিলো ধারণাটা সত্যি। উপন্যাসের অন্যতম প্রধান একটি চরিত্র ছিলো হিন্দু একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, নায়িকা যাকে ভালোবাসতো, তার সম্পর্কে হুমায়ুন লিখেছিলেন তার চোখে মুখে একধরনের আত্মবিশ্বাস, সাহস চোখে পড়ে যা সচরাচর বাংলাদেশের হিন্দুদের মধ্যে দেখা যায় না। বাংলাদেশের হিন্দু বাঙ্গালি মাত্রেই বোধহয়, নির্জীব, নিরীহ, দু’একটা ব্যতিক্রম বাদে। সৎ সাহস বাদ দিলাম এমনকি চুরি, বাটপাড়ি করার অসৎ সাহস ও বেশিরভাগেরই নেই তাই তারা বিশ্বস্ত কর্মী।

আমার মনে হয় বাঙ্গালি হিন্দুর মৃত্যু ঘটেছে ১৯৪৭ এ, তারপর মৃতের আবার মৃত্যু ঘটেছে ৫০, ৬৫, ৭১, ৯১,২০০১ হয়ে অদ্যাবধি। এদেশ তাদের চায়না, তাদের সামান্য সম্পদটুকু রেখে তারা যে চুলোয় যাক তাতে কার কি? আরও বিশ বা পঞ্চাশ বছর পর যখন জনসংখ্যা আরও অনেক বেড়ে যাবে তখনকি এদেশ হিন্দুদের বসবাসের উপযোগী থাকবে? আমি তো খুব একেটা আশাবাদী হতে পারিনা।সম্পদশালী হিন্দু বাংলাদেশীর অবস্থা আপনা মাসে হরিণা বৈরী। এরা তো বহু আগেই পালিয়েছে। বাকী যারা ঝরতি পড়তি পড়ে আছে তাদের কি হবে।

এইদেশটা কি আমার নয়? কিন্তু এইসব অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা, চিন্তা কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনে ধর্মীয় উস্কানিমূলক মন্তব্য দেখে নিজেকে আর প্রথম শ্রেণীর নাগরিক ভাবতে পারিনা। ইউরোপ, আমেরিকা চলে যাবার মতো বয়স বা উৎসাহ এখন আর নেই। তাছাড়া সেখানেও তো সেই দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েই বাঁচতে হবে। ভারতে গিয়ে ভিখারীর জীবন যাপনের কোন কারণও খুঁজে পাইনা। আবহমানকাল খেকে আমাদেরই র্পূবপুরুষদের এই ভূমিতে হয়তো এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে আমরা শেষ হয়ে যাবো।ততোদিন পর্যন্ত আমাদের কানের কাছে কেউ না কেউ চিৎকার করে বলে যাবে মালাউন। মাঝে মাঝে ভাবি, হায় এদেরই র্পূবপুরুষ আমাদেরই র্পূবপুরুষদের কোন এক সুদূর অতীতে হয়তো রক্তের সম্পর্কের ভাই ছিলো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 − = 59