বাঙালি জাতীয়তাবাদ

স্বাধীনতাকে আমরা আরো গভীরতর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বুঝতে শুরু করলাম ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে। ওই পর্যায়ে আমাদের জাতিচেতনা দ্বিজাতিত্ত্বের ধর্মকেন্দ্রিক সংকীর্ণ সংজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়ে উন্নীত হয় বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি, এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের ভিন্ন একটি জাতীয়তাবোধে। জাতীয়তাবোধের রাজনৈতিক রূপায়নই জাতীয়তাবাদ। সেই জাতীয়তাবোধ এবং জাতীয়তাবাদের আমরা নাম দিয়েছি “বাঙালি জাতীয়তাবাদ”।

আমরা ধর্মকেন্দ্রিক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত বৃহৎ পরিসরের বাঙালি জাতীয়তাবাদে উন্নীত হলাম। এটা বিরাট অর্জন আমাদের। এই অর্জনেও একটু খুঁত থেকে গেছে কি? আমরা বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কথা যথেষ্ট যত্নের সাথে ভাবিনি। তারা নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বাঙালি নয়। “বাঙালি জাতীয়তাবাদ” কি তাহলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জাতীয়তাকে অগ্রাহ্য করে? অন্তত তাদেরকে “বাঙালি হয়ে যাওয়া” র পরামর্শ দেওয়াটা জাতীয়তাবাদের চরম রূপ ফ্যাসিবাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। যাহোক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বাঙালি নয়, প্রত্যেকে স্বতন্ত্র।তবে তাদের কারো মধ্যেই ভিন্ন জাতীয়তাবাদী চিন্তা এখনো গড়ে উঠেনি। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৬ নং অনুচ্ছেদে আনা সংশোধনী মতে নাগরিক হিসেবে তারা বাংলাদেশী, এবং জাতি হিসেবে বাঙালি।জাতিচিন্তা সম্পর্কে এটাও বিতর্কিত একটা ব্যাপার বলে মনে করেন অনেকেই । আমি মনে করি তারা প্রত্যেকেই বাঙালির চাইতে ভিন্ন নৃগোষ্ঠী মাত্র, এখনো জাতি হয়ে উঠতে পারেনি, বা হয়ে উঠার যথেষ্ট আকাঙ্ক্ষাও দেখায়নি। বরং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মধ্যেই তারা নিজ নিজ সাংস্কৃতিক সত্তা বজায় রেখে রাষ্ট্রীয় আনুগত্য স্বীকার করে এবং রাষ্ট্রের থেকে সকল নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তা লাভ করে সম্মানের সাথে বাঁচতে চায়।তাই আমার মতামত এই যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদ থেকে এখনো অনেক দূরে দাড়িয়ে আছে।শঙ্কিত হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ নেই। তবে পাহাড়ে যা ঘটছে তার কতটুকু বিশুদ্ধ জাতীয়তাবাদী প্রেরণা থেকে আর কতটুকু রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লোভে সেটা গভীর বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

যেহেতু ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বাংলাদেশ অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠা, এবং যেহেতু এই জাতীয়তাবাদ উত্থানের পেছনে রয়েছে ধর্মের নামে গজিয়ে উঠা পাকিস্তান নামক অপরাষ্ট্রের দুঃশাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা, তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে আমরা ধর্মকে কোন স্থান দিইনি। অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদ কনসেপ্টচ্যুয়ালি এবং বাই ডিফল্ট অসাম্প্রদায়িক একটা বোধের রাজনৈতিক বহি:প্রকাশ।’বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ধারণাটার মধ্যেই আসলে মিশে আছে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা(ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অসাম্প্রদায়িকতা ভিন্ন জিনিস) এবং বাংলা ভূখণ্ডে বসবাসকারী সকল জাতির(ধর্ম সম্প্রদায় এবং নৃগোষ্ঠীর) ঐক্য। তারপরও আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি আলাদা অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছে।

ভুলে গেলে চলবেনা যে এই অসাম্প্রদায়িক বোধ এবং ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বাঙালিদের পাকিস্তানিদের হাতে শোষন-শাসন হওয়ার অভিজ্ঞতাজাত এবং মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত মেইনস্ট্রিম এবং ডমিনেন্ট আইডিওলোজি হিশেবে কার্যকরী ছিলো। তার পাশাপাশি সুপ্ত আকারে ছিলো সাম্প্রদায়িকতা এবং পাকিস্তানপন্থা। সময়ের পরিক্রমায় এবং ভাগ্যের পরিহাস এই যে যেটা একাত্তরে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলো সেটা আজ দানবীয়রূপে জীবন্ত। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলে ছিল আপেক্ষিক অর্থনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতি। পূর্ববাংলার বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসন অর্জনের সংগ্রাম এ বিশ্বাসকে ভিত্তি করে অগ্রসর হয় যে, বাঙালিদের নিজেদের অর্থনৈতিক ভাগ্যনির্ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা না দেওয়াতেই অঞ্চলটি আপেক্ষিক বঞ্চনার শিকার হয়েছে।

একাত্তরে ঘুমিয়ে থাকা বা সাময়িকভাবে পিছু হটা সেই দানবগুলো কী? একটা তো হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। বড় দাগে অন্যটা হলো শ্রেণী বৈষম্য। পাকিস্তান নামের জায়গায় বাংলাদেশ হয়েছে। কিন্তুু সমাজকাঠামোর পরিবর্তন হয়নি৷। মুক্তিযুদ্ধকে ঠিক বিপ্লব বলা যায়না সে অর্থে, যদিও বৈপ্লবিক পরিবর্তন কিছু হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় বাঙালীদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য লাভ, ব্যবসায় বাণিজ্য, সরকারি চাকরিতে, সেনাবাহিনীতে ইত্যাদি যেসব জায়গায় সুযোগ লাভের জন্য বাঙালিরা এতোদিন আন্দোলন সংগ্রাম করেছে, সে সমস্ত ক্ষেত্রে বাঙালির নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ব্যাস, ওইটুকুই।এখন যদি চোখ মেলে সেই আধিপত্য লাভকারী বাঙালিদের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো এরা সকলেই একই শ্রেণী চরিত্রের লোক। সমাজের উপরতলার শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত এবং রাজনৈতিক এলিটেরা রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সকল প্রকার সুফলভোগী হয়েছে। এদেরকে হয়তো বুর্জোয়া বলা যায়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্তত নব্বই ভাগ যোদ্ধা এসেছিলেন গ্রাম থেকে, কৃষকেরা শ্রমিকেরা। যুদ্ধ শেষে তারা আবার গ্রামে মাঠে ক্ষেতে ফিরে গেছেন। আর শহুরে বুর্জোয়ারা স্বাধীনতার ফল ভোগ করেছে। কৃষকের কথা, গ্রামের কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, নারীর কথা, বীরাঙ্গনার কথা, আদিবাসীদের কথা সব ভুলে গেছে।পাকিস্তানি বর্বরতার প্রথম ও প্রধান শিকার হয়েছে হিন্দু জনগোষ্ঠী;স্রেফ হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারনেই তাদের প্রতি এই বাড়তি আক্রোশ। এই কথাও কেউ বলেনা। স্বাধীনতার ফল এদের কারো ঘরেই তেমনভাবে পৌঁছাল না, অথচ স্বাধীনতার জন্য এরাই দিয়েছে সর্বাধিক। স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক বইপত্রে দেখি সব বুর্জোয়া দল আর রাজনৈতিক ও সামরিক এলিটদের ভূমিকার কথা। অধ্যাপক আহমেদ কামাল তাঁর ‘কালের কল্লোল’ বইয়ের মুখবন্ধে সঠিক কথাটিই লিখেছেন -” রাজনৈতিক আলোচনা আর ইতিহাসের গল্পের প্রায় সবটাই জুড়ে আছে বাংলাদেশের সমাজের উচ্চবর্গের চিন্তা,চেতনা আর তাদের গৌরবের ক্লান্তিহীন কাহিনী “। যেন মুক্তিযুদ্ধে কোন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, বেকার যুবক ইত্যাদি অংশগ্রহণ করেনি। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এই শ্রেণীর লোকই ছিলো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এদেরই হওয়ার কথা মেইনস্ট্রিম। কিন্তুু শহুরে এলিট বুদ্ধিজীবী আর গবেষকদের হাতে পড়ে এরা হয়ে গেছে সাবলটার্ন। ইতিহাসে যারা ছিলো সম্মুখ সমরে,ইতিহাসের বইয়ে তারা হয়ে গেলো অজ্ঞাতকুলশীল। এ এক বিরাট ট্র্যাজেডি। এই ট্র্যাজেডি দেখেই জাতি চরিত্র সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।

স্বাধীনতার সাথে বস্তুগত উন্নয়নের সম্পর্কই শেষ কথা নয়। এর সাথে আত্মমর্যাদাবোধের যোগ আছে। আমরা রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীন হয়েছি, কিন্তুু আত্মমর্যাদাশীল জাতি হয়ে উঠতে পারিনি এখনো। আজও আমাদের জাতির মেরুদণ্ড ঋজু নয়। কিছুদিন আগে সাঁওতালেরা সরকারের দেওয়া ত্রাণ ফেরত দিয়ে যে আত্মমর্যাদাবোধের পরিচয় দিয়েছে, আমরা বাঙালিরা তার ধারেকাছেও নেই। মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপে সস্তা শ্রমিক রপ্তানি করাকেই বিশাল সাফল্য মনে করি আমরা। আমরাতো আমাদের ঘরের কাজের লোককে যথেষ্ট সম্মান দিই না, ঘরের কাজ করাকে কোন বড় কাজ করাও মনে করিনা। তাহলে সৌদি আরবের মতো বর্বর সংস্কৃতির দেশে নিম্নমজুরীর বিনিময়ে গৃহকর্মী রপ্তানি করাকে আমরা কোন যুক্তিতে সাফল্য হিসেবে দেখি? দেশের গার্মেন্টস শিল্পে স্রেফ দর্জির কাজ করাকে খুব উঁচু গলায় উন্নয়নের জোয়ার বলে প্রচার করি।এসব কাজকে আমি ছোট করে দেখছিনা। কিন্তু বিশ্ব কোথায় চলে গেছে!আর আমরা কোথায়? আমাদের কাছাকাছি সময়ে স্বাধীন হওয়া দেশগুলো যেসব কাজ ছেড়ে দিচ্ছে, আমরা সেসব কাজ করাকেই কৃতিত্ব বলে প্রচার করছি। ইউরোপের লোকেরা কয়েকবছর পরে ব্যক্তিগত নভোযানে বিভিন্ন গ্রহ উপগ্রহে ভ্রমনের আয়োজন করবে। আর আমরা কেবল সেদিন নিজ দেশে সাইকেল বানানো শুরু করেছি। স্বাধীনতা যুদ্ধ আসলে কতখানি স্বাধীন করেছে আমাদের? এই প্রশ্নের উত্তর আজও সন্দেহযুক্তই রয়ে গেল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1