বাংলা সিনেমায় ‘সিঁড়ি’তে ধারণকৃত দৃশ্যে দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অসমতার প্রতিচ্ছবি

অনেক বাংলা সিনেমায় ‘সিঁড়ি’র অংশে ধারণ করা দৃশ্যগুলো সিনেমার টার্নিং পয়েন্ট হয়ে থাকে। এই ‘সিঁড়ি’ তে ধারণকৃত দৃশ্য গুলো নানান রূপের হয়ে থাকে সিনেমার কাহিনী অনুযায়ী। বলা যায় আধুনিক কালে বাংলা সিনেমায় আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক অসমতার সকল হৃদয়ভাঙ্গা গল্প এই ‘সিঁড়ি’র আগায় শুরু হয়, শেষ হয় ‘সিঁড়ি’র গোঁড়ায়!

দেখা যায় হঠাত ঘরের সদর দরজা খুলে নায়ক ওসা সিঁড়ি বেয়ে নায়িকার নাম ধরে উঠতে লাগলে নায়িকার বাবা তাঁকে থামিয়ে দেয় ‘কি চাই?’ বলে। তখন বুকের বাম পাশ উঁচু করে ধরে বাহাত নেড়ে নেড়ে কোষ্ঠকাঠিন্যমাখা গলায় নায়িকার বাবাকে বলে ‘চৌধুরী সাহেব, আমি শুধু আপনার মেয়েকে চাইছি, আপনার এই প্রসাদপম বাড়ী নয়।’ চৌধুরী সাহেব তাদক্ষণিক ভাবে সমাজে তাঁদের মধ্যকার ব্যবধান স্মরণ করিয়ে দিয়ে গার্ডকে ডেকে বলেন –‘তোরা কে আছিস, একে ঘাড় ধরে বের করে দে!’ তখন তাঁকে ‘সিঁড়ির গোঁড়া’ থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে দেয়া হয়।

নায়ক বারা প্রেমিকাকে হারানোর ভয়ে ‘তোমরা সবাই থাকো সুখে, আগুন জ্বলুক আমার বুকে; মনটাকে বলি তুমি কেঁদো না, প্রেমের নাম বেদনা…’ গেয়ে ‘সিঁড়ির আগা’ টু ‘গোঁড়া’ চক্কর দেয় বোতল হাতে। অনেক দর্শক গালি দেয় অসমতাকে, চোখের কোণে জল গড়িয়ে পড়ে।

এই ‘সিঁড়ি’তে ধাক্কা খেয়ে নায়িকার হাত থেকে বই খাতা পড়ে যায়, আর নায়ক ‘স্যরি দেখিনি’ বলে উপুড় হয়ে বই খাতা গুছিয়ে তুলে নিয়ে নায়িকার হাতে তুলে দেয়ার জন্য ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে পড়ে আর তখনই দুজন চোখাচোখি থাকে যথক্ষণ না সাথে থাকা বন্ধু বান্ধবীরা পেশী শক্তি ব্যবহার করে হাসি দিয়ে উঠছে, এখান থেকেই প্রেমানুভূতির ডোজ লাভ করে কেউ একজন কিংবা উভয়েই।

এই ‘সিঁড়ি’র উপর দাঁড়িয়ে ঘরের কর্তা কিংবা কর্তী ছেলে কিংবা মেয়েকে ত্যাজ্য করে। ‘তুই কখনও আমার ছেলে/মেয়ে হতে পারিস না, আমার/আমাদের বংশের নাম তুই ধুলোয় মিশিয়ে দিলি। যা, বের হয়ে যা।’

এই ‘সিঁড়ি’তে দাঁড়িয়ে নায়িকার বাবা গায়ে মখমলের চাদর কিংবা নাইট গাউন পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে হুকুম করে ‘আমার বন্দুক কই? এনে দে, আমি একে গুলি করে মারব!’ আর নায়িকা ‘না’ বলে দৌড়ে এসে বন্দুকে হাত দিয়ে বলে ‘ভালবাসা কি পাপ? আমিওতো ওকে ভালবাসি, ওকে মেরো না বাবা, আমাকে মেরে ফেলো তুমি’ আবার মাথা ঘুরিয়ে নায়ককে বলে ‘সাগর তুমি এখান থেকে চলে যাও, আমাদের ভালবাসার দোহাই লাগি!’ এরপর ছবির কাহিনী চলতে থাকে যতক্ষণ না প্রেম ভালবাসার যুদ্ধ সমগ্র বাংলাদেশ ৫টন এর ওজন লিমিট না ছাড়াচ্ছে।

এই ‘সিঁড়ি’র গোঁড়ায় অনেক সিনেমার ‘লাস্ট ফাইট’ হয়, হুট করে পুলিশ এসে ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না’ বলে অপরাধীদের সাইজ করে। এভাবে সমাপ্তি ঘটে। অতীতের সকল দুঃখ ভুলে চরিত্ররা খুনসুটি করে পারিবারিক জোটে ফিরে যায়।

রাজনৈতিক দিক থেকে এই ‘সিঁড়ি’কে আমাদের সংসদীয় অধিবেশনে বসার স্থলের সব সারির সাথে তুলনা দিতে পারেন; তুলনা দিতে পারেন আমাদের রাজনৈতিক মঞ্চের সাথে। এই সিঁড়ি অনেক আর্থ সামাজিক অসমতার প্রতীক।

আপনার আবাসস্থলের ‘সিঁড়ি’ সবসময় ধুয়ে মুছে রাখুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1