বিদ্রোহী রণক্লান্তের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা!

বিদ্রোহের কবি সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তুলে ধরেছিলেন শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ দূর্দশার কথা তিনি লিখেছিলেন, ‘দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে! / চোখ ফেটে এল জল, এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?

ভোর হলো দোর খোলো/খুকুমণি ওঠ রে! ঐ ডাকে যুঁই-শাখে/ফুল-খুকি ছোটরে! ছোট বেলায় মায়ের মিষ্টি কন্ঠে এ মধুর ছড়াটা শুনে ঘুম ভেঙ্গেছি অনেকের। ঘুম থেকে উঠেই মায়ের মিষ্টি মধুর কন্ঠে এই ছড়াটা যেন সারা দিনের পথ চলার প্রেরণা যোগায়। আর এই সুন্দর ছড়াটার সাথে যে মানুষটির কথা মায়ের মুখ থেকে শুনেছিলাম তিনি আর কেউ নন আমাদের দুখু মিয়া যার কবিতায় বিদ্রোহের মশাল জ্বালিয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, যার লেখনি প্রতিবাদের শক্তি যুগিয়েছিলো যুব শক্তিকে। তাঁর প্রত্যয়ী ও বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে মানুষকে মুক্তিসংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছেন, জাগ্রত করেছেন জাতীয়তাবোধ। তার কলম শাসকের অস্ত্রের চেয়ে বেশি শক্তিমান ছিল। তিনি ছিলেন মানবতার কবি। তিনি বিদ্রোহী, সংগ্রামী। তিনি প্রেমিক, আবার তিনিই সাম্য ও শান্তির বার্তাবাহক।

বিদ্রোহের কবি সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তুলে ধরেছিলেন শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ দূর্দশার কথা তিনি লিখেছিলেন, ‘দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে! / চোখ ফেটে এল জল, এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা আজ অনেক ক্ষেত্রই নির্যাতিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত নারীকে আজ উপস্থাপন করা হয় পণ্য রুপে। নারীকে মানুষ ভাবা হয় না, তারা শুধুই নারী। বিদ্রোহের কবি তাঁর কবিতার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নাই। নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই আজকের এই সুন্দর পৃথিবী। তিনি লিখেছেন,

‘সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?
তারে বলো, আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।
অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,
ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।’

মা এমন একটা শব্দ যেখানে বর্ণমালার কমতি থাকতে পারে ভালবাসার নয়। পৃথিবীতে মা শব্দের চেয়ে অতি আপন শব্দ আর দ্বিতীয়টি নেই। মা! ছোট্ট শব্দটিই যেন ভীষণ মমতার, ভালোবাসার। কবির কবিতাতেও মায়ের প্রতি অকৃত্তিম ভালোবাসা ফুটে উঠেছে।

তিনি লিখেছেন, ‘যেখানেতে দেখি যাহা
মা-এর মতন আহা/একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই, মায়ের মতন এত/ আদর সোহাগ সে তো
আর কোনখানে কেহ পাইবে ভাই! হেরিলে মায়ের মুখ/দূরে যায় সব দুখ, মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
মায়ের শীতল কোলে/সকল যাতনা ভোলে/ কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান। কত করি উৎপাত / আবদার দিন রাত, সব স’ন হাসি মুখে, ওরে সে যে মা! আমাদের মুখ চেয়ে/নিজে র’ন নাহি খেয়ে,
শত দোষী তবু মা তো তাজে না।’

পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ জাত-পাত কত রকমের বিভেদ। তবে কবি এসব জাত-পাত ধর্মের উর্ধ্বে গিয়ে মানুষের একটাই পরিচয় দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সল কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’

‘যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।’

‘ হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসে কোন জন হে, কাণ্ডারি বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র।’

কারার ঐ লৌহ কপাট/ ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট,’ বা, ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির,’ অথবা, ‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত…’ এমন জাগরণী পঙক্তি দিয়ে এদেশবাসীকে পরাধীনতার শিকল ভেঙে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে । তার বাবা ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম।

১৯০৮ সালে নয় বছর বয়সে তার বাবা মারা যায় । পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে দশ বছর বয়সে তাকে কাজ করতে হয়। হয়তো এ কারনেই ছোট বেলায় তাঁর ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’ ।

বাল্য বয়সেই একটি লেটো (কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমান নাট্যদল) দলে যোগ দেন। লেটো দলেই সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। ১৯১৭ সালে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

১৯২০ শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল সম্পাদিত অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত নবযুগ পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯২২ সালের ১২ই আগস্ট নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করে। এটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশিত হতো।

১৯৪২ সালে জুলাই মাসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। একই বছরে শেষের দিকে তিনি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন।

১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এরপর কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

বাংলায় সর্বোচ্চসংখ্যক তিন সহস্রাধিক গানের স্রষ্টা কাজী নজরুল ইসলাম। নিজস্ব ধারার সঙ্গীত রচনা করেছেন তিনি। প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ভাসিত কবি মানুষের সংকীর্ণতা, দীনতা, মূঢ়তা ও নীচতাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করেছেন। শোষিত মানুষের মুক্তির প্রথম বার্তাবাহক কবি নজরুলের লেখা কবিতা-গান আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুুগিয়েছে। তার লেখা ‘চল চল চল’ আমাদের রণসঙ্গীত। গান ও কবিতার মতো তার লেখা গল্প, নাটক, উপন্যাসও এ জাতির অনন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নজরুল তার একটি গানে বলেছিলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’-তার এই ইচ্ছার বিষয়টি বিবেচনা করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করা হয় ।

‘যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে’
কবির এই মহান উক্তি আজ সত্য, নিরলস সত্য আমরা তাকে খুঁজি প্রতিনিয়ত খুজি তাঁর কর্মে তাঁর কবিতায়।

‘পথের দেখা এ নহে গো বন্ধু/এ নহে পথের আলাপন। এ নহে সহসা পথ-চলা শেষে /শুধু হাতে হাতে পরশন।
নিমেষে নিমেষে নব পরিচয়ে?হ’লে পরিচিত মোদের হৃদয়ে।’ ঠিক তেমনি আপনার পরিচয় আপনার কৃতকর্ম এই বাংলা যতদিন থাকবে ততদিন আমাদের হৃদয়ে থাকবে।

প্রেম-দ্রোহ, সাম্য-মানবতা ও শোষিত মানুষের মুক্তির বিদ্রোহের কবি ও আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮ তম জন্মবার্ষিকী ও ১১৯ তম জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

আল আমিন হোসেন মৃধা
লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

37 − = 28