বনানীতে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ

হুটহাট মন্তব্য

বনানীতে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ

নারী নিপীড়নের এক ধরনের শারীরিক প্রকাশ হচ্ছে ধর্ষণ। নারী নিপীড়ন!—বিষয়টি খুবই বহুমাত্রিক ও জটিল। নারীরা, আমাদের সমাজে কেনো, কোনো সমাজেই আজকে থেকে নিপীড়িত হচ্ছেন না; তারা সব সমাজেই হাজার হাজার বছর ধরে নিপীড়িত হচ্ছেন এবং নিপীড়ন বিভিন্নভাবেই হচ্ছে, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, শারীরিক, ভাষিক, সামাজিক — এটি কোনো একমাত্রিক ও সরল বিষয় নয়; বহু বিচিত্রভাবেই তাদের ওপর চলছে এ নিপীড়ন। আরো মজার কথা হচ্ছে, আমার জানামতে এমন কোনো প্রচলিত আধুনিক ও স্বকথিত উদারবাদী সমাজ নেই যেখানে নারীরা নিপীড়িত হচ্ছেন না। নারী নিপীড়নে সব সমাজই এক, এখানে “উন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত সমাজ” এসব ধারণা অপ্রয়োজনীয়; প্রাসঙ্গিকতা শুধু এইখানে সব সমাজে নারী নিপীড়ন একইভাবে হয় না, বিভিন্ন সমাজে নারী নিপীড়িত হয় বিভিন্নভাবে; কোথাও সেই নিপীড়ন হয় মানসিক, কোথাও শারীরিক, কোথাও লৈঙ্গিক, কোথাও সামাজিক বা অর্থনৈতিক, কোথাওবা কর্মে বা পেশায়—পার্থক্য শুধু এই জায়গায়। আমাদের সমাজে আমরা যেমন শারীরিকভাবে নারীকে নিপীড়ন করি, ইউরোপিয় সমাজে এই নিপীড়নটি নেই; সেখানে নারীরা কাজ করে, শিক্ষা অর্জন করে, উপার্জনও করে, তারপরেও তারা নিপীড়িত হয়! তাদেরকে স্বামী মারধর করে না, করলে জেলে যেতে হবে, তবুও তারা নিপীড়িত হচ্ছে; তারা নিপীড়িত হয় কর্মক্ষেত্রে—কখনো বস বা কলিগদের দ্বারা যৌনিক নিপীড়ন (সেটাও আবার শারীরিক, মৌখিকসহ অনেকভাবে হতে পারে), কখনোওবা প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন (যেমন—যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই বসের সহকারী হিসাবে কাজ করেছেন, সবাই প্রচলিত মেয়েসুলভ পেশাকেই [শিক্ষকতা, কর্পোরেট সার্ভিসিং] কর্মক্ষেত্রে বেছে নিচ্ছেন।

এখন চলে আসি, আসল কথায়—আমরা মোটামুটি সবাই জানি যে, বনানীতে দুই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে; এটি নিয়ে সর্বত্রই প্রতিক্রিয়া দেখানোর কারণে ধর্ষকরা গ্রেফতার হয়েছেন। এই বিষয়টি নিয়ে মোটামুটি সবাই সচেতন আছে—পুলিশ, উকিল, প্রশাসন, ব্লগার, শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ সবাই। মানুষ ফেইসবুকে বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে, রাজনীতিবিদরা এ বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন, সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীসহ সবাই এই বিষয় নিয়ে খুবই সংবেদনশীল মনোভাব পোষণ করছেন—অবস্থাটা দেখে মনে হতে পারে যে, আমরা মনে হয় লৈঙ্গিক সাম্য সমাজে বাস করছি! এখানে নারীর ওপর কোনোকালে কোনো নিপীড়ন হয়নি, এই সমাজে পুরুষ ও নারীর সব ধরনের অধিকার সমান, কোথাও কোন বৈষম্য নেই। নারীরা এখানে ধর্ষিত হয় না, নিপীড়িত হয় না; ধর্ষণের বা নিপীড়নের এই একটিমাত্র ঘটনা ঘটেছে, এরকম ন্যাক্কারজনক ঘটনা আর কখনোই ঘটেনি বাংলাদেশের সমাজে, বিষয়টি কিন্তু মোটেই তা না; বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলছে, বিগত চার মাসে হত্যা, ধর্ষণ নির্যাতনের শিকার প্রায় দেড় হাজার নারী। অ্যাকশনএইডের জরিপ বলছে, ২৩ শতাংশ নারী ঢাকায় প্রত্যক্ষভাবে অপমানের শিকার হন গণপরিবহনে। নারীকে ধর্ষণ, লাঞ্ছনা, অবমাননা, অপমান, নিপীড়ন করা — এসব আমাদের সমাজে নতুন কোনো কিছু নয়। আমাদের সামাজিক কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে নারীকে নিগৃহীত করার বিভিন্ন কৌশল ও সুযোগ রয়েছে। নারীকে নিপীড়ন করা — এই বিষয়টি শুধু আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়, আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এই বাস্তবতা অতীতেও খুব ভালোভাবেই বিদ্যমান ছিলো; বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে একালের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াররাও এ বিষয় খুব ভালোই চর্চা করে থাকেন, কেউ সাহিত্যে, কেউ ব্যক্তিগত জীবনে, কেউ কর্মজীবনে — পার্থক্য শুধু এইখানে। তাহলে হঠাৎ করে কেনো আমরা সবাই বনানীতে সাম্প্রতিক ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে খুব বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ছি? হঠাৎ কেনো রাজনীতিবিদরা, সাংবাদিকরা, বুদ্ধিজীবীরা এই বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করছেন? তারা কেনো অতিসচেতন হয়ে ওঠছেন? আমার মনে হয় এসব প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত। নারী নিপীড়ন নিয়ে সমাজের মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও প্রতিক্রিয়া কেমন তা জানতে ও বুঝতে এসব প্রশ্ন করা উচিত এবং প্রশ্নগুলোর উত্তরও অনুসন্ধান করা উচিত; তা না হলে নারী নিপীড়নের সম্পূর্ণ চিত্রটা বোঝা যাবে না। আমরা কেনইবা হঠাৎ করে শুধুমাত্র এই বিষয়টি নিয়ে খুব আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল হয়ে যাচ্ছি? — এই প্রশ্নটির উত্তরও আমাদের খোঁজা উচিত।

আমার মনে হয় বনানীতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনার বেশ কিছু দিকের প্রতি আমাদের মনোযোগ দেয়া উচিত :

এখানে অভিযুক্ত ধর্ষকরা খুবই বিত্তশালী ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল এরকম পরিবারের খবর ছাপাতে চায় প্রধানত ব্যবসা ও জনপ্রিয়তার কারণে। বিত্তশালী ও প্রভাবশালী পরিবারের নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হলে, এসব খবরকে ধামাচাপা দেওয়ার বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ঐ পরিবারগুলো অনেক টাকা খরচ করবে; এতে করে সংবাদপত্র ও চ্যানেলের খুব ভালো আয়ের সুযোগ উন্মুক্ত হয়। আরেকটা কারণ হচ্ছে এসব বিত্তশালী ও প্রভাবশালী পরিবার নিয়ে সাধারণ জনগণের (যারা সংখ্যাধিক্য) আগ্রহের সীমা অসীম, এসব পরিবার সম্পর্কিত কোনো নেতিবাচক বা কুকর্মের খবর সাধারণ জনগণ লুফে নেয়; আর তাই সংবাদপত্র ও চ্যানেল তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য এরকম অর্থনৈতিক-অভিজাত ও প্রভাবশালী পরিবারের আসামি ও অভিযুক্তদের নিয়ে খবর প্রকাশ করে। এরকম খবর প্রকাশ করা মানে পত্রিকা ও চ্যানেলগুলো মোটেই নারীবাদী হচ্ছে না বা তারা নারীবাদ চর্চাও করছে না, তারা এটাও ভাবছে না যে, মেয়ের প্রতি অবিচার বা অন্যায় করা হয়েছে; এই খবর প্রকাশ করে আমাদের মিডিয়া তার ব্যবসায়িক বিভিন্ন স্বার্থ ও সুবিধা হাসিল করার কথা ভাবছে, তারাই তো বিভিন্নভাবে প্রতিনিয়ত নারীদেরকে অসম্মান করছে, তাদেরকে পণ্যে পরিণত করছে। এই একই ধর্ষণের ঘটনা যদি এক মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ঘটাতো, তাহলে বিভিন্ন মিডিয়া বোধকরি এরকম আগ্রহ ও উৎসাহ প্রকাশ করতো না, যেভাবে এই খবরের বেলায় করেছে।

ধর্ষণের শিকার নারীরা খুব সাহসী একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন; তারা অভিযোগ করেছেন, মুখ খুলেছেন — এক্ষেত্রে তারা দু’ধরনের ভয়কে জয় করেছেন; প্রথমটি সামাজিক ভয়, দ্বিতীয়টি ব্যক্তিক-পীড়ন ভয়। তারা সামাজিক লোকলজ্জা, সম্মান, সমালোচনা ইত্যাদিকে শেষপর্যন্ত তাড়িয়ে আইনি অভিযোগ করার মন-মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সাথে সাথে তারা ব্যক্তিগতভাবে আবারো ক্ষতির বা পীড়নের শিকার হতে পারেন — এই ভয়টিও জয় করেছেন। গুম হয়ে যাওয়া, খুন হওয়া, ব্ল্যাকমেইল করা, ভয় দেখানো — এরকম বিবিধ ভয়কে তারা জয় করেছেন। এই দুই ধরনের ভয়কে জয় করা ও জয় করে নিপীড়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার প্রবণতা আমাদের এই রক্ষণশীল সমাজে খুবই বিরল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০১৫’ বলছে, নিপীড়নের শিকার হওয়া নারীদের মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আইনি সহায়তা নিয়েছেন। সমাজের সার্বিক চিত্র যখন এরকম, তখন ধর্ষণের শিকার হওয়া এই দুই তরুণীর এরকম আইনি সহায়তা চাওয়া অসামান্য সাহসের পরিচায়ক! আমাদের বর্তমান সমাজে এটি খুব বড় একটি দৃষ্টান্ত। এরকম দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য এই দুই তরুণী সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন, তাদের কাছে এই দুই তরুণী ও ধর্ষণের ঘটনার খবরের বিরাট চাহিদা রয়েছে; এই চাহিদা পূরণের জন্যই তাদের (দুই তরুণী) ও এই ঘটনা সম্পর্কিত খবর বিভিন্ন মিডিয়া বিভিন্নভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরছে। যদি তারা এরকম সাহসী পদক্ষেপ না নিতেন, তাহলে তাদের ওপর নিপীড়নের এই ঘটনাটি অন্য সব ঘটনার মতো হারিয়ে যেতো।

মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা ও সদস্যরা — তারা যে খুব নারীবাদী বা নারীবাদ চর্চা করে থাকেন এরকম কিন্তু নয়; তারাও নারী নির্যাতন করেন বা বিভিন্নভাবে পুরুষতন্ত্রকে বৈধতা প্রদান করেন, তারা অনেকেই তাদের স্ত্রীদেরকে শারীরিক নির্যাতন করেন। বিবিএসের ঐ জরিপ বলছে, প্রায় ৭২ শতাংশ নারী স্বামীর নির্যাতনের কথা গোপন রাখেন; এছাড়া মানসিক-যৌনিক-অর্থনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের নির্যাতন তো রয়েছেই। তাহলে, তারা হঠাৎ এই নিপীড়নের ঘটনা নিয়ে এতো আবেগি হয়ে যাচ্ছেন কেনো? তারাই তো কথার ছলে, অর্থনৈতিক-সামাজিক সুবিদা চেয়ে নারীদেরকে নিপীড়ন করেন। ব্যাপারটা আমার কাছে মনে হচ্ছে, এই দুই শ্রেণির মানুষের এক ধরনের ক্ষোভ ও হিংসা কাজ করে উচ্চ-বিত্ত শ্রেণির মানুষদের প্রতি, উচ্চ-বিত্ত শ্রেণির টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ি, আমোদ-প্রমোদ, ইত্যাদির প্রতি এক ধরনের মোহ ও স্বপ্ন কাজ করে এই দুই শ্রেণির মানুষদের মাঝে; তারা তাদের জীবনে উচ্চ-বিত্ত শ্রেণিতে না পৌঁছানোর কারণে এক ধরনের ঘৃণা ও হতাশা জন্মে। ফলে, তারা উচ্চ-বিত্ত শ্রেণির নেতিবাচক আচরণ বা কুকর্মের যখন সন্ধান পান, তখন তারা পুলকিত বোধ করেন; তারা ভাবেন এসবই হচ্ছে অতিরিক্ত টাকার ফল, আর তাদের অতিরিক্ত টাকা না থাকার কারণে তারা খুশি হোন, কারণ অতিরিক্ত টাকা থাকলে বাজে কাজে জড়িয়ে যেতেন; যেহেতু নেই, অতএব, তারা ভালোই আছেন। এই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরাই হচ্ছেন সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর প্রধান গ্রাহক, কারণ তারাই উচ্চ-বিত্ত শ্রেণির মানুষদেরকে নিয়ে এক ধরনের অতিউৎসাহ বোধ করেন; এই শ্রেণির মানুষেরা সংখ্যায় বেশি হওয়ার কারণে মিডিয়াগুলো খবর বেচতে পারে, ফলে তারা এরকম বিষয় নিয়ে খবর লেখে বা তৈরি করে, বিনিময়ে তাদের কাছে টাকা ও জনপ্রিয়তা আসে।

আরেকটি ব্যাপার এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে জনসংবেদনশীলতা। এই জনসংবেদনশীলতা পুরুষতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, তার শাসন ও শোষণকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য। আজকে অনেকেই সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাটি নিয়ে সংবেদনশীল আচরণ প্রকাশ করছেন, তারা এই বিষয় নিয়ে দুঃখ পাচ্ছেন, কষ্ট পাচ্ছেন। তাহলে, কি তারা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে আচরণ করছেন? তারা কি আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ চাচ্ছেন না? আমরা দেখি, অতীতেও মানুষ নারীর ওপর বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, সমালোচনা করেছে, নারীর অধিকার আদায়ের প্রতি সোচ্চার থেকেছে। কিন্তু, কতোটুকু? যতোটুকু পুরুষ বা সমাজ চেয়েছে, ততোটুকুই। পুরুষ বা সমাজ চেয়েছে তারা ভোটাধিকার পাক, তাই পেয়েছে; তারা বাহিরে কাজ করুক, তাই তারা বাহিরে কাজ করছে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই পুরুষ বা সমাজ নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ করেছে; ভোট দিতে পারবে, কিন্তু তোমার পছন্দে নয়, স্বামীর বা সিস্টেমের পছন্দ বা নির্ধারিত পন্থায়; কাজ করতে পারবে, কিন্তু সব কাজ নয়, কিছু কাজ তুমি চাইলেই করতে পারবে, যেমন —শিক্ষিকার কাজ, সেলাইয়ের কাজ, সার্ভিসের কাজ; কিন্তু, অন্য কাজগুলো, যেমন — পুলিশের কাজ, প্রশাসনের কাজ, নিরাপত্তার কাজ, এগুলো তুমি করতে পারবে না। সমাজ বলছে এসব কাজে তোমার নিরাপত্তা নেই; যেহেতু নিরাপত্তা নেই, সেহেতু এসব কাজ তুমি করতে পারবে না, এসব কাজের জন্য পুরুষ রয়েছে, তারাই এসব কাজ করবে। নারীর কাজের ওপর পুরুষতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ তো আছেই, সাথে উপহার হিসাবে রয়েছে বেতন বৈষম্য। অনেক কর্মক্ষেত্রে দেখা যায় যে, পুরুষের জন্য যে পরিমাণ বেতন, নারীর জন্য ঐ একই কাজে বেতনের পরিমাণ আলাদা, বেতন তুলনামূলক কম। পুরুষতন্ত্রের একটি ব্যাপার হচ্ছে সে আপোষ করতে পারে ও সংবেদনশীল হতে পারে। নারীরা যখন বাহিরে কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করে দিলো, যখন সমাজ দেখলো যে, তাকে নারীদের এই দাবি মেনেই নিতে হবে, তখন সে বললো, ‘আচ্ছা যাও, মেনে নিলাম তোমাদের দাবি, এখন কাজ করো’ কিন্তু কোন কাজ? সব কাজ? না, সব কাজ না, যেগুলো আমরা অনুমোদন করবো, শুধু সেগুলো, বাকীগুলো তোমাদের জন্য নয়, আমাদের জন্য; আগে বাসায় সেলাইয়ের কাজ করতে, পরিবারের সবার যত্ন নিতে, এখন কর্মক্ষেত্রে (ইন্ড্রাস্টি বা কর্পোরেট হাউসে) সেই সব কাজ করবে; আর ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত সব কাজ আমরাই করবো। তাই বস পুরুষ, পিএস নারী; সেলাইয়ের কাজ নারী করে; নার্সিংও তারা করে। ঘরে নারীর প্রতি নিপীড়ন দেখে সমাজ এতোই আবেগি ও বিপ্লবী হলো যে, সে নারীকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসলো, এসে নতুন এক ধরনের পীড়ন ব্যবস্থার মাঝে ফেললো। তাই আবেগ, দরদ, সংবেদনশীলতা — এগুলো পুরুষতন্ত্রে এক ধরনের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে, পুরুষতন্ত্রের প্রভাব বিদ্যমান রাখার জন্য, পীড়নকে দীর্ঘায়িত করার জন্য। বনানীর ধর্ষণের ঘটনায় সবাই যে, এতো আবেগি, সংবেদনশীল ও প্রতিবাদী হচ্ছে তার স্বরূপটি বুঝতে হবে; আর না হলে এটি পুরুষতন্ত্রের অস্ত্র হিসাবে কাজ করবে, নতুন আঙ্গিকে নারীকে পীড়ন করার জন্য, নতুনভাবে পুরুষতন্ত্রের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করার জন্য।

এবার আসি রাজনীতিবিদদের প্রসঙ্গে; অনেক রাজনীতিবিদই এই ধর্ষণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, তাদের অবস্থান কিন্তু মোটেই আদর্শিক নয়; বরং রাজনৈতিক কৌশলগত একটি অবস্থান। যেদেশের রাজনীতিবিদরা মেয়েদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিশেষ আইনে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী; তারাই তো ধর্ষণকে বৈধতা দেয়, তুমি ধর্ষণ করলে কোনো সমস্য হবে না, যদি তুমি ধর্ষিতাকে বিয়ে করে ফেলো। যে এতো সামাজিক ও আইনি নিরাপত্তার মাঝে বিয়ের আগে ধর্ষণ করতে পারে, বিয়ের পর ধর্ষণ তার জন্য উন্মুক্ত! “বিশেষ বিবেচনায় ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে দেয়া যাবে”, তো কী সেই “বিশেষ বিবেচনা”? যে সমাজ বিয়ের আগে মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে সমাজ বিয়ের পর মেয়েদের নিরাপত্তা দিবে — এরকম অযৌক্তিক কল্পনা করা তো হাস্যকর। যেদেশের রাজনীতিবিদরা নারীর বিরুদ্ধে এরকম পীড়নকে আইনি বৈধতা দিতে পারেন, তারা আবার ধর্ষণের বিপক্ষে অবস্থান করেন, ধর্ষকদের শাস্তি চান! তাদের এই অবস্থান ও চাওয়া ভোটের জন্য, নারী অধিকারের জন্য নয়। সংখ্যাধিক্যের রাজনীতি ভালোমন্দ, ন্যায়অন্যায় হিসাব করে না, হিসাব করে কোন পক্ষে কতোজন আছেন, যে পক্ষে মানুষ বেশি, রাজনীতি সেই পক্ষই অবলম্বন করে। রাজনীতিবিদরা দেখছেন যে, এই ঘটনায় তরুণ প্রজন্ম, নারী, মানবাধিকার কর্মী — সবাই খুবই সংবেদনশীল আচরণ করছে; তাই ধর্ষণের পক্ষে অবস্থান নেয়া যাবে না, অবস্থান নিলে তাদের ভোট হারাতে হবে, আর ভোট হারালে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না, তাই তারা এই ঘটনায় ধর্ষণের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন, তারা দোষীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছেন — এসবই তাদের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, ক্ষমতায় যাওয়ার ও টিকে থাকার অস্ত্র।

এখানে আরেকটি বিষয় আলোকপাত করা জরুরি, আর তা হচ্ছে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা; তারা টকশোতে, বক্তৃতায়, লেখায় নারীর বিরুদ্ধে এই নিপীড়ন, অর্থাৎ ধর্ষণের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। কিন্তু তারা কি আসলেই নারী স্বাধীনতা চান? তারা কি সত্যিকার অর্থেই চান যে, নারী সকল প্রকার নিপীড়ন থেকে মুক্তি পাক? সমাজে যারা শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, স্বকথিত ও তথাকথিত সজ্জন, তারাই বুদ্ধিজীবী হিসাবে সমাদৃত। মুশকিলটা হচ্ছে, কথায় ও আচরণে সজ্জন হলেও, বুদ্ধিজীবীরা আসলে উদ্দেশিকভাবে সজ্জন নাও হতে পারেন; আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, সব ধরনের শাসক বা সিস্টেম, তা যতোই উত্তম বা অধম হোক, তার গুণগান, জনপ্রিয়তা ও বৈধতাকরণের জন্য বুদ্ধিজীবীর প্রয়োজন। এই বুদ্ধিজীবীরা কথায়, বক্তৃতায়, লেখায়, আলাপআলোচনায় প্রচলিত শাসননীতি ও পদ্ধতিকে জনপ্রিয় ও বৈধ করে তুলেন জনসাধারণের কাছে; বিনিময় হিসাবে, তারা শাসকের কাছ থেকে অর্থ ও রাষ্ট্রিক সম্মান পান, সিস্টেম থেকে নিজেদের ফায়দা হাসিল করেন, ইত্যাদি। তারা নারী নিপীড়ন সম্পূর্ণ বন্ধ হোক, বা নারী সব ধরনের নিপীড়ন থেকে মুক্তি পাক—এরকম কোনো কিছুই তারা চাইবেন না; তারা বরং দরদ দেখাতে চাইবেন, সহানুভূতি প্রকাশ করতে চাইবেন। তারা কখনোই বলবেন না যে, নিপীড়নের জন্য পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদ দায়ী, সিস্টেমটাই নিপীড়নমূলক, এই আধিপত্যবাদ ও সিস্টেমের উচ্ছেদ দরকার; কিন্তু আধিপত্যবাদ ও সিস্টেমের উচ্ছেদ হলে এই বুদ্ধিজীবীদের ভাত বন্ধ হয়ে যাবে, তারা আর টাকা পাবেন না, বুদ্ধি বিক্রি করে বিভিন্ন সুযোগসুবিধাদি হাসিল করতে পারবেন না; তাই তারা কখনোই ভুল করেও চাইবেন না যে, পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদ ও সিস্টেমের অপসারণ দরকার। খুব বেশি হলে, তারা নারীদেরকে করুণা করবেন, দরদ দেখাবেন, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন—এর বাহিরে তারা তেমন কোনো কিছুই করবেন না।

উপর্যুক্ত যুক্তিগুলোর বাহিরে অনেকেই বিভিন্ন কারণে এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসাবে, নিপীড়ন মাত্রাধিক্য বিধায়, উদার মন-মানসিকতা, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক ভাবনা-আচরণ, ইত্যাদি; কিন্তু আমার কাছে যেটি মনে হয়, আমরা খুব কমই, তা নারী-পুরুষ, উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, পুরুষতন্ত্র ও সিস্টেমের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারি, বেশিরভাগই এই পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমের কাছে কয়েদি। আমাদের মন-মনন-মগজ-চলাফেরা-কথাবার্তা-উঠা-বসা — সবকিছুতেই এই সিস্টেম আমাদের মাথার ওপর সদা ভর করে আছে, এর থেকে কতোটুকু আমরা মুক্ত? যারা এই ঘটনায় বিভিন্ন সাহসী-আবেগি-বোদ্ধিক-বৈপ্লবিক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, তারা কতোজনই চান পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদ থেকে নারীর মুক্তি, এটির পরিবর্তন ও উচ্ছেদ?—এই দিকটি আসলেই ভেবে দেখা দরকার।

আমি মনে করি, এই ঘটনায় ধর্ষকদের শুধু আইনের আওতায় নিয়ে আসলে কাজ হবে না; কার মতলব কী সেটা জানতে ও বুঝতে হবে। কে কী ধরনের আচরণ করছে, কেনো করছে, কী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, কেনো দেখাচ্ছে, কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা? নারী নিপীড়নের এসব বিবিধ বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে; তা না হলে ধর্ষণ বা নিপীড়ন কমবে না, বরং তা ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে অব্যাহত থাকবে।

কৃতজ্ঞতা : সিনথি আহমেদ, রাসেল আল মাসুদ, সরোয়ার তুষার, মৌ, রেজাউল করিম — যারা কষ্ট করে লেখাটি পড়ে ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন।

বি. দ্র. লেখাটি যেকোন সময় পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত ও সংশোধিত হতে পারে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 1 =