সাম্প্রদায়িকপশুদের ভয়ংকর থাবা!

খোঁজ নিয়ে দেখেছি, আজকাল অনেক ছেলে-মেয়েই এধরনের ভুলশিক্ষার শিকার হচ্ছে। আর তাদের পিতামাতা জেনেশুনে তাদের বিষপান করাচ্ছে। ফুলের মতো শিশুদের মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এজন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাশাপাশি শিশুর পিতামাতা সর্বাগ্রে দায়ী। শিশুদের কাছে এখন মনুষ্যত্বের চেয়ে ধর্মকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। আর এদের নিয়মিত শেখানো হচ্ছে—শুধু একটা আরবি-নাম রেখে নিজেদের মুসলমান-দাবি করলেই সবকিছু হয়ে গেল! এই দেশে তোমরাই হলে সেরা! আর অন্য ধর্মের লোকদের ধর্ম ও চরিত্র কোনোটাই ভালো নয়! আজ এই হলো এই দেশের একশ্রেণীর মুসলমানের শিক্ষা।

সাম্প্রদায়িকপশুদের ভয়ংকর থাবা!
সাইয়িদ রফিকুল হক

দেশে-দেশে মানুষে-মানুষে এখন পরিকল্পিতভাবে ভেদাভেদসৃষ্টি করছে একটি চিহ্নিত-পশুগোষ্ঠী। এরা মানুষ-নামের অযোগ্য। এদের নরাধম বলাই সমীচীন। যত দিন যাচ্ছে একদল পশু ধর্মের জিগির তুলে মানবজাতিকে বিষিয়ে তুলছে। এদের চরিত্রে আজ সামান্য মনুষ্যত্ব নাই। কিন্তু এরা ধর্মের ধ্বজাধ্বারী। আর এই ধর্মকে অপব্যবহার করে আজ এরা মানবসভ্যতাসহ সমগ্র মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করার এক ভয়ানক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে শুধু ইসলামধর্মের তথাকথিত অনুসারীরাই ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে বিভেদসৃষ্টি করছে এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতায় লিপ্ত হচ্ছে। সবখানে এই সাম্প্রদায়িকপশুগোষ্ঠী থাবা বসাচ্ছে।

সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানোর দিক দিয়ে আমাদের বাংলাদেশ বিশ্বের ভিতরে প্রথম সারিতে রয়েছে। ঘরে-বাইরে সাম্প্রদায়িকপশুগুলো আজ ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। এরা নানাভাবে আর ইনিয়েবিনিয়ে ইসলামধর্ম প্রচারের নামে ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এদের কাছে আজ লোকদেখানো-মুসলমান-পরিচয়ই বড়। এরা অপর ধর্মের মানুষদের আজ মানুষই মনে করছে না। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখসহ অপরাপর সকল ধর্মের মানুষকে এরা শত্রুজ্ঞান করছে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ধীরে-ধীরে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই দেশটাকে আজ হিন্দুশূন্য করার জন্য একটি পশুগোষ্ঠী অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। এরা সাম্প্রদায়িক-কুকুর। আর এদের একমাত্র কাজ হলো মানুষকে কামড়ানো।

অতিসম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা এখানে তুলে ধরছি:

কিছুদিন আগের ঘটনা। পহেলা বৈশাখের পর বাসায় বেড়াতে এলো আমার দুই ভাতিজী। ওরা স্কুলে পড়ে। কথায়-কথায় ওরা একটা সময় আমার কাছে জানতে চাইলো—আচ্ছা চাচু, মেয়েদের কপালে টিপ পরা কি খারাপ? মুসলমান-মেয়েরা নাকি কপালে টিপ পরতে পারবে না!
আমি বললাল কেন?
ওরা বললো, “না তুমি আগে বলো—খারাপ কিনা?”
আমি নির্দ্বিধায় বলে দিলাম টিপ পরা খারাপ হবে কেন! এটি তো ভালো। মেয়েরা টিপ পরবে। একটু সাজগোজ করবে। এটি দোষের কিছু নয়। আমাদের দেশের রেওয়াজ এটি। আর শুধু আমাদের দেশ নয়—ভারতীয় উপমহাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে টিপের প্রচলন রয়েছে। এমনকি আমাদের রাসুলের দেশ আরবদেশের মেয়েরাও রাসুলের সময় নানাপ্রকার সাজগোজ করেছে এবং এখনও করছে। আর সাজগোছ-সাজগোজের বিষয়টি দেশাচার। এখানে, একটুখানি ভিন্নতা থাকতেই পারে।

আমার কথা শুনে বড়জন বললো, “আমাদের স্কুলের একটি মেয়ে বলেছে—টিপ পরা নাকি হারাম! খুব গোনাহ! আর খুব পাপ! মুসলমানরা নাকি টিপ পরতে পারে না! এটা নাকি হিন্দুদের নিয়ম?”
আমি ওর কথা শুনে অবাক। হতভম্ব। তবুও ভেবেচিন্তে বললাম, “কথাটা তোমাকে কে বলেছে?”
এবার ভাতিজী বললো, “আমাদের ক্লাসে পড়ে একটি মেয়ে। ওরা নাম মেরাজুন্নাহার।”
আমি আরেকটু ভেবেচিন্তে বললাম, “ওই মেয়েটির মা কি বোরকা-হিজাব পরে? এবার আমার দুই ভাতিজী একসঙ্গে প্রায় লাফিয়ে উঠে বললো, “হ্যাঁ চাচু হ্যাঁ, কিন্তু তুমি জানলে কীভাবে? আমি বললাম জেনেছি। সে কথা পরে হবে।
আমার বড় ভাতিজীর বয়স মাত্র ৮+। আর সে মাত্র তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। ওর সহপাঠিনী মেয়েটির বয়সও হয়তো ৮+ কিংবা ৯ বছর। এরই মধ্যে সে এতোটা সাম্প্রদায়িক হয়েছে!
তারপর আমার বড় ভাতিজী বললো, “আচ্ছা চাচু, মুসলমান-মেয়েদের শাড়ি পরা নাকি হারাম!”
এবার আমি ভয়ানক ঘাবড়ে গেলাম। আর ভাবলাম—স্কুলে এখন ছেলে-মেয়েদের পড়ানোও বিপজ্জনক। আর মেরাজুন্নাহারের মতো মেয়েদের সংস্পর্শে আমাদের দেশের ফুলের মতো মেয়েদের চরিত্র, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও সততা সমূলে বিনষ্ট হবে।

একপর্যায়ে আমি ভাতিজীকে বললাম, “তুমিও তো পহেলা বৈশাখে শাড়ি পরেছো। তোমার মা পরেছে। তোমার খালারা পরেছে।”
ছোটজন বললো, “চাচু, আমিও শাড়ি পরেছি।”
এরপর বড়জন বললো, “আমরা পহেলা বৈশাখে শাড়ি পরেছি শুনে মেরাজুন্নাহার আমাদের বলেছে আমরা নাকি হিন্দু হয়ে গিয়েছি!”

আমি এবার একটুখানি কঠোর হয়ে বললাম, “ওসব বাজে কথা মা। ওরা ভালো নয়। ওরা রাজাকারের বংশ। ওদের বংশ ভালো নয়। ওরা অধম কুকুর। তাই, দেশের খেয়ে-পরে দেশেরই ক্ষতি করছে। আর আমাদের দেশে যে-সব রাজাকারের ফাঁসি হচ্ছে ওরা তাদেরই বংশধর। আর ওদের বাবা-মাও রাজাকারের দলে রয়েছে।”

বড় ভাতিজী আরও জানালো, “মুসলমানদের নাকি সবসময় সালোয়ার-কামিজ পরতে হবে!”
আর একথাটিও বলেছে জামায়েতে ইসলামী পাকিস্তানের চিরদোসর ও অনুসারী বোরকাওয়ালী মেরাজুন্নাহারের মা। দেশে এখন এইজাতীয় দুশ্চরিত্রা-মহিলার সংখ্যা বাড়ছে। এটি জাতির জন্য অশনী সংকেত।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। আমার ছোট ভাতিজীর বয়স মাত্র ৬ বছর। সে তার বড়বোনের সঙ্গে একই স্কুলে মাত্র কেজিতে পড়ে। সে বললো, “চাচু, হিন্দুদের মূর্তি দেখলে নাকি আমরা সাথে-সাথে হিন্দু হয়ে যাবো! মূর্তি দেখা নাকি বিরাট পাপ!”
ওর কথা শুনে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আমি আরও ঘাবড়ে গেলাম।
একটু শান্ত হয়ে বললাম, “তোমাকে কে বলেছে এসব?”
সে বললো ওদের ক্লাসের আরেকটি ৬বছরের মেয়ে আয়েশা। ওর মাও নাকি বোরকা পরে। আর ওরা এখনও পাকিস্তানরক্ষার জন্য জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পদলেহন করে।

এইসব পিতামাতা আজ ছেলে-মেয়েদের ভুলশিক্ষা দিয়ে তাদের শিশুকাল থেকে সাম্প্রদায়িকপশু বানানোর চেষ্টা করছে। শিশুরা হলো কোমলমতী—ওদের একবার যা শেখানো হবে ওরা তা-ই শিখবে। আর শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু মেরাজুন্নাহার ও আয়েশাদের মতো শিশুরা জাতির জন্য কী? আর এদের সংখ্যা বাড়লে জাতির ভবিষ্যৎ কী? দেশে এগুলো দেখার আজ কেউ নাই।

খোঁজ নিয়ে দেখেছি, আজকাল অনেক ছেলে-মেয়েই এধরনের ভুলশিক্ষার শিকার হচ্ছে। আর তাদের পিতামাতা জেনেশুনে তাদের বিষপান করাচ্ছে। ফুলের মতো শিশুদের মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এজন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাশাপাশি শিশুর পিতামাতা সর্বাগ্রে দায়ী। শিশুদের কাছে এখন মনুষ্যত্বের চেয়ে ধর্মকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। আর এদের নিয়মিত শেখানো হচ্ছে—শুধু একটা আরবি-নাম রেখে নিজেদের মুসলমান-দাবি করলেই সবকিছু হয়ে গেল! এই দেশে তোমরাই হলে সেরা! আর অন্য ধর্মের লোকদের ধর্ম ও চরিত্র কোনোটাই ভালো নয়! আজ এই হলো এই দেশের একশ্রেণীর মুসলমানের শিক্ষা।

সাম্প্রদায়িকপশুরা সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে বিষ ছড়াচ্ছে। এই পশুরা আমাদের শহীদমিনারে ফুল দেওয়াকে হিন্দুয়ানি বলছে, জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাওয়াকে শিরক বলছে, বাঙালির নববর্ষবরণকে হিন্দুয়ানি বলছে, মঙ্গলপ্রদীপ-প্রজ্জ্বলনকে হিন্দুয়ানি বলছে, এমনকি দেশের জাতীয় সঙ্গীতকে আজ হিন্দুয়ানি বলার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে!
সাম্প্রদায়িক-কুকুরগুলো আজ আমাদের প্রতিনিয়ত কামড়াচ্ছে। আর কতকাল এভাবে আমাদের কামড়াবে? আমরা কি তাহলে জলাতঙ্করোগী হয়ে মারা যাবো?

কেস-স্ট্যাডি করে জেনেছি, এসব ঘটনা দুই-চারটি নয়। এখন দেশের সর্বত্র এসব ঘটছে। আর স্কুল-কলেজের কোমলমতীশিক্ষার্থীদের মন ও মস্তিষ্ককে পাকিস্তানী বিজাতীয় ভাবধারায় গড়ে তোলার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এরা বাংলাদেশরাষ্ট্রের চিরশত্রু। আর সাম্প্রদায়িকতার এই বিষবাষ্প ছড়ানোর মূলে রয়েছে দেশের ‘হেফাজতে শয়তান’, ‘কওমীমাদ্রাসার পাতিহুজুরচক্র’, ‘জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান’, ‘ইসলামী ছাত্রশিবির পাকিস্তান’, ‘তাবলীগজামাতের পাতিহুজুরচক্র’, ‘চোরমোনাইয়ের মতো একশ্রেণীর দেশদ্রোহী ভণ্ডপীরগোষ্ঠী’ ও ‘বিভিন্নজাতের পাতিহুজুরচক্র’।

৩০লক্ষ শহীদের বাংলাদেশ আজ বড় অসহায়! এর কোনো অভিভাবক নাই। শাসক নাই। কিন্তু শোষক আছে। তাই, দেশবিরোধী ভণ্ডদের দাপট এতো বেশি। এরা জাতির মূলস্তম্ভ শিশুদের মন ও মস্তিষ্কের মধ্যে আজ কুপরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানী-নষ্টবীজের চারা রোপণ করছে। তবুও কেউ দেখার নাই। তবু কেউ ভাবার নাই!

দেশটাকে এভাবেই খুবলে খাবে বুঝি একাত্তরের পরাজিত সেই শকুনগোষ্ঠী?

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
২৪/০৫/২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 52 = 57