‘নিরপেক্ষতাবাদ’ সৃষ্টির ইতিহাস এবং মুসলিম বাংলাদেশ ও হিন্দু ভারতের অবস্থা

নিরপেক্ষতা আর ব্যাক্তি স্বাতন্ত্রবাদের সৃষ্টি খ্রীষ্টান ধর্মীয় সংস্কারের মধ্যে নিহিত। এর ইতিহাস হচ্ছে একাদশ শতকে শুরু হওয়া সেই বিখ্যাত ‘Investiture Conflict’। এটায় নেতৃত্ব দেন হিলদেব্র্যান্ড যিনি পরবর্তীতে পোপ ৭ম গ্রেগরি হন। তাঁর আগ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বে চার্চ ছিল স্টেইট এর কর্তৃত্বাধীন(Caesaropapist), আর রাজা বলতেন যে তাকে স্রষ্টা শাসন কার্য্যের জন্য নিযুক্ত করেছে। কাজেই রাজাই যতসব পোপ, কার্ডিনাল, বিশপদের নিয়োগ করতেন। এই যাজকরা বিয়ে করা এবং সন্তান জন্ম দান(Nicolaism) এবং সন্তানদের উত্তরাধিকার সূত্রে চার্চে নিয়োগ(Simony) দিতে পারত। আর চালু ছিল স্বামী মারা গেলে স্বামীর ভাইকে বিয়ে করা(Levirate), ফলে সম্পত্তি একই পরিবার/গোত্র/বংশের মধ্যে থেকে যেত(ইউরোপে নারীর উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিকানাপ্রাপ্তির ইতিহাস অনেক পুরনো, এবং তাঁরা নিজ থেকেও সম্পদ অর্জন করতে পারত), সন্তান সন্ততি না হলে তখন ডিভোর্স দেয়া যেত, একাধিক নারীর সাথে শয্যা যাপন(Concubinage) করা যেত কেবল উত্তরাধিকারি জন্ম দেয়ার জন্য। যাজকরা নানাভাবে রাজার কর্মকর্তাকে বৈধতা দিত শুধু রাজার অনুগ্রহ লাভ করার জন্য; যেমন ধরুন কারও চাষের ফসল কিংবা সম্পদ রাজার পাইক পেয়াদারা জোরপূর্বক নিয়ে গেল, তখন অসন্তোষ ছড়ানোর আগেই যাজক হাজির হয়ে বলত ‘তুমি পূর্ব জন্মে অনেক পাপ করেছো, তার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে’; আবার কেউ অনেক সম্পদের মালিক হলে কিংবা অনেক ফসল ফলালে যাজক তার কাছে গিয়েও বলত ‘গড রাজার মাধ্যমে তোমার উপর সুদৃষ্টি দিয়েছেন, এখন রাজাকে এর একটি অংশ দিয়ে ঈশ্বরে কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর’। পূর্ব ইউরোপে খ্রীষ্টানদের মধ্যে এখনও এসব প্রচলিত- এই ধারাটিকে বলা হয় ‘অর্থোডক্স’। অর্থোডক্সদের ধর্মীয় প্রধানকে বলা হয় ‘প্যাট্রিয়ার্ক’।

পশ্চিম ইউরোপে হিলদেব্র্যান্ড এসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তিনি এবং পরবর্তীতে পোপ ২য় প্যাস্কেল, কার্ডিনাল হুম্বারট দেখেন যে এসব যীশুর মতবিরুদ্ধাচরণ। কারণ যীশু গজপেলজ এর ম্যাথিউজ অংশে বলেন- “He that loveth father or mother more than me is not worthy of me: and he that loveth son or daughter more than me is not worthy of me.” তাই তাঁরা রোমান সম্রাট ৩য় হেনরির বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তাঁরা বলেন যে যাজকরা বিয়ে করতে পারবে না(celibacy), স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর ভাইকে বিয়ে করা যাবে না(স্বগোত্রের মধ্যে বিয়ে এমনিতেই খ্রীষ্টান ধর্মে নিষিদ্ধ), এবং ডিভোর্স নিষিদ্ধ; চার্চ হবে স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, এবং চার্চই নিজেদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। পরবর্তীতে ১১২২ সালে ‘Concordat de Worm’ এর মাধ্যমে তাঁদের এই দাবী পূরণ করা হয়। ফলে চার্চের মাধ্যমেই শুরু হয় আধুনিক আমলাতন্ত্রের যার বড় বৈশিষ্ট্য হল নিরপেক্ষতা(যেহেতু সন্তান জন্ম দেয়া যায় না, সম্পদ কুক্ষিগত করা যায় না)। এটি পরবর্তীতে পশ্চিম ইউরোপের আমলাতন্ত্রের মডেল হয়ে দাঁড়ায়, ওখানে মেধার মূল্যায়ন সর্বত্রই। তাঁরা সক্ষম হয়েছে পারিবারিকবন্ধনের চেয়ে দেশপ্রেমকে বেশি মূল্যায়িত করতে। তাঁদের দেশে কেউ কাউকে তাঁর পূর্বপুরুষের পেশার নাম ধরে গালি দেয়া না, আমাদের মত ‘রিক্সাওয়ালার ছেলে’, ‘জেলের ছেলে’, ‘বস্তির ছেলে’ গালি অতীতে ওখানে প্রচলিতও ছিল না। ওখানে জানে মেধা থাকলে সবাই তাঁর অবস্থান পরিবর্তনে সক্ষম, এমনকি হেয় করা ব্যক্তিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে! এটাই শ্রদ্ধা, মেধাতন্ত্র যার সাথে নিরপেক্ষতাবাদ বহুলাংশে জড়িত।

মুসলিম কিংবা হিন্দু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই জিনিস হয়ে উঠছে না কারন মুসলিমদের বেলায় গোত্র প্রথা, একই বংশ/গোত্রতে বিয়ে প্রচলিত আছে। ফলে সম্পদশালি বংশ চায় নিজেদের মত কারও সাথে কিংবা নিজেদের মধ্যে বিয়ে দিয়ে সম্পদ পুঞ্জীভূত করতে। হুজুররা বিয়ে করতে সক্ষম, অনেক পীর, খতিবের ছেলেও খতিব হয় আবার মানুষের মনে এই জিনিসের উদ্ভব হয় যে সন্তানটাও বাবার মত গায়েবি কিছু বাবার কাছ থেকে পেয়েছে! একাধিক বিয়ে প্রচলিত। এখানে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে আমির, মাওলানা, খতিব, মোহাদ্দিস নিয়োগ দেয়া হয়, ধর্ম মন্ত্রণালয় আছে এমনকি আমাদের দেশে দেখা যায় ওলামা লীগ এর মত প্রতিষ্ঠানও। তাঁর উপর এখানে অনেক মুসলিম আছে যারা দলিত হতে ধর্মান্তরিত হওয়া। এরা পরবর্তীতে অনেক পীর আউলিয়ার প্রভাবে ধর্মান্তরিত হয়। এরপর বিশাল স্বাধীনতা লাভ করে, কিন্তু তাঁরা তাঁদেরকে আগে যেভাবে পেশা নিয়ে হেয় করা হত তা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি, আমার মনে হয় তারাই পরবর্তীতে একটু উপরের অবস্থানে গিয়ে ‘জেলের বাচ্চা’, ‘চামারের বাচ্চা’, ‘বস্তির ছেলে’ গালি গুলো দেয়া শুরু করেছে। এখানে মধ্যপ্রাচ্যের ন্যায় বাবা-দাদা ছাড়া চেনা কঠিন, নিজে কোন ‘ছাই’ তা বলবে না কিন্তু ঠিকই বাবা-দাদার নাম বেঁচে খাবে।

আর হিন্দুদের বেলায় সমাজ সবসময় রাষ্ট্রের চেয়ে ক্ষমতাশালী ছিল। অন্যান্য দেশের রাজাদের সাথে হিন্দু সম্রাজ্যের রাজাদের বিশাল ফারাক ছিল। অন্যান্য জায়গায় রাজারা আইন প্রণয়ণ, সংস্কার করতে পারত, তৃতীয় পক্ষ হিসেবে বিচার কাজ সম্পন্ন করতে পারত। কিন্তু হিন্দু রাজার কাজ ছিল বর্ণ এবং জাতি প্রথা সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করা। ব্রাহ্মণরাই যত্তসব প্রথা সৃষ্টি করে বসে আছে, তাঁরা যা বলে তাই সই। অমর্ত্য সেন নিজেও তাঁর এক ক্ল্যাসিকে বলেছেন ভারতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিম্নবর্ণের মানুষরা এখনও অবহেলিত। ভারত এখনও সেই অবস্থা বের হয়ে আসতে পারেনি। বর্ণ ভিত্তিক স্বজনপ্রীতি ও বিরোধ এখনও চলমান সেখানে। ———– (চলবে)

Source: The Origins of Political Order (Volume-I), Political Order & Political Decay(Volume-II) by Francis Fukuyama, An Uncertain Glory: India and its Contradictions by A Sen, Development as Freedom by A Sen.

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1