দেশের কোণে কোনে স্থাপিত হোক মৃণাল হকের ভাস্কর্য্যের অবিকল প্রতিরুপ!


মৃণাল হকের ভাস্কর্য্যকে আর জায়গামত নেবার কোন উপায় নেই। কিন্তু আমার মনে হয় যারা ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছেন না, তারা সহিংস না হয়ে অন্য পদক্ষেপও নিতে পারেন। যেমন, দেশের নানা স্থানে বানানো যেতে পারে শত সহস্র অবিকল একই ভাস্কর্য্য ওরফে হেফাজতীদের মতে দেবী থেমিসের মূর্তি ওরফে দেশের উচ্চপদে থাকা কারো কারো মতে গ্রীক দেবী থেমিসের দেশি ভার্সন অদ্ভুত মূর্তি। ভাস্কর্য্য কিংবা মূর্তি কোথাও স্থাপন দেশের আইনানুসারে এখনো অবৈধ নয়। হেফাজতীদের দাবী মানতে গেলে তখন দেশের আইন পালটে মূর্তি ও ভাস্কর্য্যই নিশিদ্ধ করতে হবে। আর সেটাই যদি হয়, তখনই দেশের মানুষ জাগবে। কারণ, এমন অসহিষ্ণু দেশ দেশের নাগরিকদের সিংহভাগই চায়না।

মধ্যরাতে অপকর্মটি সম্পন্ন হলো। অপকর্ম ঢাকতে রাতের আঁধার বেশ ভালো আড়াল। কিন্তু মানুষ রাতের মৃদু আলোতেও দেখে। নিকষ অন্ধকারে আলো ছাড়া সরানোও কঠিন। তবু ভালো ডায়মানাইট দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়নি। আফগানিস্তানে তালেবানরা সেটা করেছিল। বুদ্ধের সেই মূর্তি গুড়িয়ে দেবার ব্যাপারে মহাত্মা জাকির নায়েক বলেছিলেন, সেটা আফগানিস্তানের নিজের ব্যাপার। তারা তাদের আইনকানুন অনুসারে ব্যবস্থা নেবেন। এই একই যুক্তিতে ধর্মনিরপেক্ষ কিংবা অন্য ধর্মভিত্তিক কোন রাষ্ট্র তাদের দেশের মসজিদগুলো গুড়িয়ে দিত তবে উনি সেটার বিপক্ষে কি যুক্তি দিতেন তা জানবার ইচ্ছা জাগে।

যাইহোক, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম। রাষ্ট্র আবার ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতিতে রেখে দিয়েছে সংবিধানে। এই বিপরীতমুখী দুই নীতি কিভাবে একইসাথে সংবিধানসম্মত হয় তা বোঝা একটু কঠিনই। আমি স্বল্পবুদ্ধির মানুষ, এতকিছু বুঝিনা, তাই এত কঠিন প্রশ্ন করব না। তবে মুক্তিযুদ্ধের একটা বড় আদর্শ ও লক্ষ্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সেটা হয়েছিলও। কিন্তু ইসলাম ঢুকে গেল। পিতার আমলের সংবিধান এবং রাষ্ট্রের মূলনীতি থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কেন সরে আসলেন আমি সেটা জানিনা। মন্তব্যও করব না। খালেদা কিংবা এরশাদের চেয়ে উনি অন্ততঃ অনেক বিবেচক ও উদার বলেই এখনো ভাবি আমি। উনি নিশ্চয় ঠিক জেনেই সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম আলাদাভাবে উল্লেখ করাটাকে মেনে নিয়েছেন।

আবার, যে মোল্লা শফিকে উনি নিজে তেতুল হুজুর খেতাব দিয়েছিলেন। তার সাথে উনার এ বছর হঠাৎ সদ্ভাব আদর্শ ও নীতির সাথে সমঝোতা বলেই মনে হচ্ছে। ঠিক এমনটাই আমি ভাবি দেলোয়ার হোসেন সাইদীর ফাঁসি না হবার ব্যাপারে। এই ফাঁসি না হওয়ার সিদ্ধান্তটা হয়তো রাজনৈতিক নমনীয়তা ছিল। কারণ, সাইদীর অন্ধভক্ত অনেক, তারা অরাজকতা তৈরি করতে পারে ব্যাপকভাবে যদি ফাঁসি হয়। ভালো, সরকার অরাজকতা এড়াতে কঠিনতম শাস্তি থেকে সরে এসেছে হয়তো, তাও জনতার স্বার্থেই। সরকার জনগণের মংগল চায়। আদালতের বিচারের প্রতি আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে এখনো। একই অপরাধের শাস্তির মাত্রা অনেকই হতে পারে। তারা যে শাস্তি দিয়েছেন তা হয়তো তাদের যুক্তিতে সঠিক। আমার কেবল ওইরকম ভাবনা এসে যায় অকারণে, আমার চিন্তাভাবনাও মাঝেমাঝে অযোউক্তিক লাইনে যায়।

এরপর সর্বশেষ ইস্যু থেমিসের মূর্তি অপসারণ। কিন্তু মূর্তিটা যে থেমিসের নয় তা এর ভাস্কর মৃণাল হক নিজেই দাবী করেছেন। উনি বলেছেন, “এ ভাস্কর্য কোনো গ্রিক দেবীর নয়। বরং এটি বাঙালি মেয়ের ভাস্কর্য। যার হাতে ন্যায়বিচারের প্রতীক।” শুনেছি মৃণাল হক বিএনপির সাবেক এক এমপির শালা লাগেন সম্পর্কে। আমি জানি আদালত এইধরণের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ভাস্কর্য্য সরাবার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বিবেচনাতেই আনেননি। যারা দলকানা, তারাই কেবল সন্দেহ করবে।

প্রথম আলোয় পড়ছিলাম উনি বলেছেন, “আমার কিছু বলার নেই। আমাকে চাপ দিয়ে ভাস্কর্যটি সরানো হচ্ছে। এখন এটি সরানো হচ্ছে, এরপর নির্দেশ আসবে অপরাজেয় বাংলা ভাঙার।” তিনি বলেছেন, দেশের শান্তি রক্ষার স্বার্থে যত্ন করে ভাস্কর্যটি সরাচ্ছেন। তিনি না থাকলে এটি নয় টুকরা করা হতো। কিন্তু এখন এটি অক্ষত অবস্থায় অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।

উনার জন্য খারাপ লাগছে, নিজের সৃষ্টির এই পরিণতি দেখলে কারোই ভালোলাগবার কথা নয়। তবে লাখলাখ মানুষ উনার সাথে আছেন, এটাও বড় ব্যাপার। আপনার মত একই অনুভূতি আমাদেরও মৃণাল হক। এই রাষ্ট্রটা এমন হবার কথা ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ধর্মের নাম করে একশ্রেণির মানুষ লাখ লাখ মানুষ মেরেছে, লাখ লাখ নারী ধর্ষণ করেছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে, তারা এই সময়ে আরও সঙ্গবদ্ধ। তাদের আদর্শ এবং লক্ষ্য আজও একই। সুপ্রীম কোর্টের সামনে থেকে কথিত দেবী থেমিসের ভাস্কর্য্য অপসারণের দাবী তার জন্য একটি ছুতো মাত্র। কিন্তু মৃণাল হক নিজেই বলেছেন তা গ্রীক দেবীর নয়, বাঙালী নারীর। এখন কোন সরকারী অফিস আদালতে যদি ধর্মপ্রাণ মুসলিম থাকেন, তাদের অনুভূতিকে শ্রদ্ধ্যা জানাতে কি মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর ছবি সরিয়ে ফেলা হবে? সম্পূর্ণ মুখ, চুল আচ্ছাদিত না থাকবার কারণে সেই ছবিগুলোও তো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে।

মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ভাস্কর্য্য সরাবার সিদ্ধান্ত আদালতের। যাক, উনারা আদালতকে সম্মান করেছেন। নিজের ব্যক্তিগত মতামতের কারণে উনারা কিছু করেননি। প্রধানমন্ত্রীরও ব্যক্তিগত মতানুসারে ভাস্কর্য্যটির সেখানে থাকা পছন্দ ছিলনা। আমরা সকলেই জানি উনিও ধর্মপ্রাণ, ব্যাপারটা ভালো। আর সবচেয়ে ভাল হয়েছে আদালতের সিদ্ধান্তেই এটাকে সরানো। কিন্তু বহুবছর সেটা একই জায়গায় থাকবার পরেও আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কিছু করলো না এটা দুঃখজনক। অসঙ্গতি যদি থাকেই, তবে তা চোখের সামনে থেকেও দৃষ্টিগোচর হতে এত দীর্ঘসুত্রিতা ও সিদ্ধান্ত দিতে এমন দীর্ঘসূত্রিতার অবসান যাই। যা হবে সব ঝটপট হোক।

আমার ব্যক্তিগত মতে এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল মন্তব্য করেছেন চারুকলা অনুষদের ডীন নিসার হোসেন। প্রথম আলোতে পড়লাম উনি বলেছেন,

“আমার দুটো মতামত। একটা শিল্পের দিক থেকে। আরেকটা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা শক্তির তৎপরতার দিক থেকে। সাম্প্রদায়িকতার শক্তির তৎপরতার দিক দিয়ে আমি অবশ্যই এর বিরোধিতা করি। কিন্তু শিল্পের বিচারে শুধু এটাই নয়, ঢাকা শহরের ৯০ ভাগ ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়া উচিত। এত নিম্নমানের, লজ্জাজনক, কী বলব। আমি একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলাম ঢাকা শহরের অধিকাংশ সড়কদ্বীপ, রাস্তার ওপরে, রাস্তার মধ্যে, যেসব ভাস্কর্য আছে, অধিকাংশের দিকে তাকানো যায় না, নিম্নমানের, কুরুচিপূর্ণ। তার মানে এই নয় যে ভাস্কর্য থাকবে না।

খুব ভালো একটা কমিটি করে, যাঁরা মানসম্পন্ন শিল্পকর্ম কিছুটা বোঝেন, তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে এবং ভালো শিল্পীদের নির্বাচন করে তাঁদের দিয়ে অবশ্যই প্রতিটি সড়কদ্বীপে ভালো ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম স্থাপন করা উচিত। এটি হচ্ছে শিল্পের জায়গা থেকে। বাংলাদেশে কোথায় ভাস্কর্য থাকবে, কোথায় থাকবে না, এটা যাঁরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন, বাংলাদেশকে মানেন, তাঁরা বলবেন। যারা বাংলাদেশ চায়নি, সেই আলবদর-রাজাকারদের কথার ওপর চলবে নাকি দেশ! তাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কেন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে? এটা লজ্জাজনক। সরকার সিদ্ধান্ত নেবে ঠিকই, কিন্তু নেবে শিল্পের বিচারে। এখন যেভাবে নেওয়া হচ্ছে, তার তীব্র প্রতিবাদ করি। শিল্পের বিচারে ভালো একটি শিল্পকর্ম এখানে বসানো উচিত।”

মৃণাল হকের ভাস্কর্য্যকে আর জায়গামত নেবার কোন উপায় নেই, অসম্ভব ব্যাপার। ভাস্কর্য্যটি ভালো নাকি খারাপ তা নিয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু আমার মনে হয় যারা ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছেন না, তারা সহিংস না হয়ে অন্য পদক্ষেপও নিতে পারেন। যেমন, দেশের নানা স্থানে বানানো যেতে পারে শত সহস্র অবিকল একই ভাস্কর্য্য ওরফে হেফাজতীদের মতে দেবী থেমিসের মূর্তি ওরফে দেশের উচ্চপদে থাকা কারো কারো মতে গ্রীক দেবী থেমিসের দেশি ভার্সন অদ্ভুত মূর্তি। ভাস্কর্য্য কিংবা মূর্তি কোথাও স্থাপন দেশের আইনানুসারে এখনো অবৈধ নয়। হেফাজতীদের দাবী মানতে গেলে তখন দেশের আইন পালটে মূর্তি ও ভাস্কর্য্যই নিষিদ্ধ করতে হবে। আর সেটাই যদি হয়, তখনই দেশের মানুষ জাগবে। কারণ, এমন অসহিষ্ণু দেশ দেশের নাগরিকদের সিংহভাগই চায়না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “দেশের কোণে কোনে স্থাপিত হোক মৃণাল হকের ভাস্কর্য্যের অবিকল প্রতিরুপ!

  1. এই ধরণের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে
    এই ধরণের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ সিরিয়া কিংবা ইরাকের মত হতে চলেছে, হেফাজতে ইসলাম এক সময় দেশের সব নারীকে বোরকা পরতে বাধ্য করার জন্য পিড়াপীড়ি করতে পারে, দেশের সব হিন্দুকে মুসলিম বানাতে বাধ্য করতে পারে, দেশে শরীয়া আইন চালু করার প্রচেষ্টা তো করবেই।

  2. সাইদির ফাঁসি না হবার কারণ যদি
    সাইদির ফাঁসি না হবার কারণ যদি রাজনৈতিক হয়ে থাকে, অন্য সব নেতার ফাঁসি হবার কারণ রাজনৈতিক নয় কেন? এতে কি বুঝা যায়না, বিচারে কি রায় হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে রায়ের পর পরিস্থিতি সামলানো যাবে কিনা – তার উপর। ন্যায়বিচার, যুক্তি, সাক্ষ্য প্রমাণ – এগুলো আসলেই আমলে নেয়ার মত কোন ব্যাপার নয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 72 = 78