হেফাজতের দাবীর মুখে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে ভাস্কর্য সরানো নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা……

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গনে রোমান যুগের ন্যায়বিচারের প্রতীক লেডি জাস্টিসের আদলে একটি ভাস্কর্য স্পাপন করা হয়েছিল। ভাস্কর্যটির শিল্পী মৃণাল হক। কাল রাতে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলা হয়। সরিয়ে ফেলার কারন হেফাজত এবং কিছু ইসলামী সংঘটনের প্রবল আপত্তি। তারা সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করছিল। এবং ভাস্কর্য না সরালে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে এমন হুমকি দিয়ে আসছিল।সরকার অবশেষে তাদের দাবী মেনে নিয়েছে।

ইসলামী সংঘটনগুলোর দাবী কতটা যৌক্তিক বা ছহি?

এই বিতর্কে যাওয়ার আগে কিছু ব্যাপার খুব ক্লিয়ারলি বুঝতে হবে। সংঘটনগুলোর নেতারা একটা নির্দিষ্ট ধর্মের ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে ভাস্কর্য সরানোর দাবী তুলেছেন। তাদের কাছে এটা কালচারাল সংঘাত নয়। বা ভাস্কর্যটি শিল্পের বিচারে কেমন হলো এটাও মুখ্য ব্যাপার নয়। অর্থাৎ তাদের কাছে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসটাই মুখ্য এবং সে বিশ্বাসটা তারা রাষ্ট্রের উপর আরোপ করতে চেয়েছে। অনেকে আবার ইসলাম দিয়েই তাদের কাউন্টার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।কিন্তু এভাবে একটা নির্দিষ্ট ধর্মের টেক্সট দিয়ে, বিশ্বাস দিয়ে এই ইস্যুতে বিতর্ক করার কিছু ত্রুটি আছে। প্রথম ত্রুটি হচ্ছে ইসলামে এমন কিছু রেফারেন্স আছে যা তাদের দাবীর পক্ষে যায়। আবার এমন কিছু রেফারেন্স আছে যা যায়না। সুতরাং একটা নির্দিষ্ট ধর্মের ন্যারেটিভের আলোকে ভাবলে এই সমস্যাটা শুধুমাত্র বিশ্বাসের সংঘাত ছাড়া আর কিছুই হবেনা।

কিন্তু যদি ব্যাপারটাকে এভাবে দেখা হয় যে রাষ্ট্র এবং ধর্ম একে অপরের উপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারেকিনা বা দুটো পৃথক থাকা যৌক্তিক কিনা তবে পক্ষে বিপক্ষে বিতর্কের একটা ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।এবং হেফাজতের দাবী কতটা ক্ষতিকর সেটা নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে।

ধর্মীয় বিশ্বাস খুবই ব্যাক্তিগত একটা ব্যাপার। একই ধর্মে বিশ্বাসী হলেও মানুষে মানুষে বিশ্বাসের তারতম্য ঘটে। ভিন্ন ধর্মের কথা বাদ দিলাম। এখন কার বিশ্বাস ঠিক এই প্রশ্নের মোকাবিলা করা অসম্ভব। কারন প্রমানের বদলে এখানে বিশ্বাসটাই মুখ্য এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয় প্রবল অন্ধবিশ্বাসের। আর এই অন্ধবিশ্বাসগুলোকে কেন্দ্র করেই আমরা যুগের পর যুগ দেখে এসেছি ধর্মযুদ্ধের নামে একের পর এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ।আর এসব কিছুর সমাধানও বিভিন্ন যুগের চিন্তানায়কেরা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। যার একটা আউটকাম আমরা বলতে পারি আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের কনসেপ্ট। যেখানে ধর্ম এবং রাষ্ট্র পৃথক অবস্থানে থাকবে। তা না হলে সংঘাত অনিবার্য। একটা উদাহরন দেই। ভারতের কিছু রাজ্যে গোহত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এবং গরু খাওয়ার অপরাধে মুসলিমদের হত্যাও করা হয়েছে। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা অনেকেই করেছে। কিন্তু এদেশের যেসব মুসলিম বিশ্বাসী মানুষ মনে করে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মবিশ্বাসীদের বিশ্বাসের আলোকে রাষ্ট্র চলবে তারা কি এই নির্যাতন মেনে নেবেন? তাদের লজিক কিন্তু তাই বলে। ভারত যদি হিন্দুধর্মের আইন অনুযায়ী চলে আর সে আইনের কারনে যদি মুসলিমরা নির্যাতিত হয় তবে মুসলিমরা কি সেটা মেনে নেবে? নেবেনা। এটাই হচ্ছে ধর্মীয় সংঘাতের সমস্যা যা রাষ্ট্রের উপর আরোপ করা হলে আসলে যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন সমাধান নেই। কারন এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের বিশ্বাসের মিল নেই। আবার এক ধর্মের ভেতর আছে নানা রকমের বিশ্বাস এবং চর্চা। এখন কার বিশ্বাস ঠিক? রাষ্ট্র কার বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেবে? এই সমস্যার একটাই সমাধান। সেটা হচ্ছে ধর্ম এবং রাষ্ট্র একই নীতিতে চলতে পারবেনা। রাষ্ট্র কোন নির্দিষ্ট ধর্মের নিয়ম কানুন নিজের উপর আরোপ করে বায়াসড হতে পারবেনা। এই পয়েন্ট অব ভিউ থেকে যদি ভাবা হয় তবে হেফাজতের ভাস্কর্য সরানোর দাবী অযৌক্তিক এবং ক্ষতিকর।

ধর্ম নিয়ে পলিটিক্যাল গেম…

এটা নিয়ে অনেক কিছুই বলা যায়। কিন্তু এ পোস্টে শুধু কিছু প্রাসঙ্গিক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করব।

এ দেশের প্রধান দুটো দল আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি গত কয়েক দশক ধরে দেশের ক্ষমতায় আছে। তারাই কখনো সরকারে আবার কখনো বিরোধীদলে আছে এবং ছিল। এবং দু দলের পলিসি মেকাররাই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেছে। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যাবহার করেছে। এ বিষয়ে আমার দিক থেকে সরাসরি আলোচনা করাই ভালো। যেহেতু আমি কোন রাজনৈতিক দল করিনা বা আমার কোন রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নাই তাই এ ব্যাপারে ডিপ্লোম্যাটিক হওয়ারও কোন যৌক্তিক কারন নেই। প্রথমত রাজনীতি আবেগ দিয়ে চলেনা। রাজনীতিতে চাল পাল্টা চালটাই মুখ্য।এই চাল গুলো কখনো কারো ইচ্ছার সাথে মিলে যায়, আবার কারো ইচ্ছার সাথে মিলেনা। শেখ হাসিনা আমার নেত্রী না। আওয়ামীলীগের আদর্শের অনুসারীও আমিনা। তারপরও আমি নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছিলাম। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিলাম। তার কিছু কারনের মধ্যে অন্যতম একটা কারন ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এই বিচার যেহেতু আমাদের প্রজন্মের অনেকেই চেয়েছিল তাই এটা একটা কালেক্তিভ ডিমান্ডে পরিনত হয়েছিল। এখন প্রশ্ন করা যেতে পারে আওয়ামীলীগের সাথে জামাতের বিভিন্ন সময় আঁতাতের খবর কি আমরা জানতাম না? অবশ্যই জানতাম। আমরা অনেকেই জানতাম। জানতাম বলেই আমরা এই এনালাইসিস করেছিলাম যে জামাতের সাথে আওয়ামীলীগের সম্পর্ক কেমন আর বিএনপির কেমন। সেটা খুব কঠিন কোন কাজ ছিলনা। কিছুটা রাজনৈতিক বুদ্ধি থাকলেই যে কেউ বুঝে যাবে আওয়ামীলীগ একটা নিরাপদ দুরুত্ত রেখেই জামাতকে দাবার গুটির মত ব্যাবহার করতে চেয়েছে। জামাতের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা কখনো তুলে দেয়নি। তাদের পলিসি ছিল দরকার হলে তারা জামাতকে ধ্বংস করতেও প্রস্তুত। অপরদিকে বিএনপি শুধু জামাতের সাথে জোটই করেনি, তাদের শীর্ষ নেতা যারা শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী তাদের মন্ত্রী বানিয়েছে। এমনকি কলেজ ইউনিগুলো পর্যন্ত শিবিরের দখলে চলে গিয়েছিল। আমরা বুঝেছিলাম বিএনপি ক্ষমতা থাকা মানেই জামাত আরো শক্তিশালী হওয়া। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেরত প্রশ্নই আসেনা। আমাদের হাতে অপশন ছিল দুটো। আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি। কিন্তু বিএনপির তখন জামাতের সাথে দহরম মহরম। তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করলেও বিচার আদায় করা যাবেনা। অপরদিকে আওয়ামীলীগ। যাদের জন্য জামাত প্রয়োজনীয় না। এদের উপর চাপ প্রয়োগ করার সুযোগ আছে। তাছাড়া তারা বলেছে ক্ষমতায় আসলে বিচার করবে। এবং এখন দেখা যাচ্ছে আমরা ঠিকই ছিলাম। বিচার শুরু হওয়ার পরও যখন সরকার জামাতকে নিয়ে নির্বাচনের আগে দাবা খেলার পরিকল্পনা করছিল ঠিক তখনই শাহবাগের জন্ম। এবং চাপ প্রয়োগে আমরা সফল হয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশী শক্ত লবিংকেও উপেক্ষা করে বিচার চালিয়ে যেতে যে ভূমিকা রেখেছেন তা প্রশংসনীয়। বিচার চাওয়ায় বেগম খালেদা জিয়া আমাদেরকে তখন নষ্ট তরুন বলেছিলেন। এবং ফলাফলই প্রমান করে জামাত এবং যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে আওয়ামীলীগের উপর বিশ্বাস রেখে আমরা ভুল করিনি। আবার এমন অনেক ইস্যু আছে যেখানে আওয়ামীলীগের উপর বিশ্বাস রাখা ভুল হয়েছে।যা কাল মাঝরাতে প্রমানিত হয়েছে।

হেফাজতকে ট্রাম হিসাবে প্রথম ব্যাবহার করেছে বিএনপি। এখন আওয়ামীলীগ ওভার ট্রাম করেছে। খুবই বিপদজনক খেলা। আওয়ামীলীগ এখন প্রবল ভাবেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে নিমগ্ন হয়ে আছে। আর এখানে আওয়ামীলীগের উপর চাপ প্রয়োগ করতে সেকুলার এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামীলীগ ডান বাম দুদিকে যেতেই প্রস্তুত।যারা টান দিতে পারবে আওয়ামীলীগ সেদিকেই যাবে।

পরিশেষে

ধর্মকে সব যুগেই শাসকগোষ্ঠী তাদের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে ইউটিলাইজ করেছে। সিআইএ এর আর্থিক সহযোগিতা এবং ট্রেনিং এর মাধ্যমে তালেবানরা কিভাবে একসময় শক্তিশালী হয়েছিল তা আমরা সবাই জানি। আমাদের দেশেও সুপরিকল্পিত ভাবে সেই ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু এখন ভেবে দেখতে হবে তারা কেন সফল হচ্ছে। তারা কিন্তু অযৌক্তিক ধর্মবিশ্বাসকেই কাজে লাগাচ্ছে। তারা বাংলাদেশ, পাকিস্থান, আফগানিস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে যে ধরনের ষড়যন্ত্র করতে সক্ষম হচ্ছে তা কিন্তু অন্য কোথাও পারবেনা। কারন সেসব জায়গায় অন্ধবিশ্বাসি মানুষ কম। আমরা প্রায়ই বলে থাকি আমাদের দেশের মানুষ ধর্মভীরু। তাই তাদের বিশ্বাসে আঘাত করা ঠিক না। কিন্তু এখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমরা যদি মনে করি তাদের অনেক বিশ্বাস ভ্রান্ত তবে মানব সভ্যতার ভালোর জন্য সেটাই কি আমাদের করা প্রয়োজন নয়? যখন বলা হয়েছিল পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে তখন অনেক সাধারন মানুষ যারা খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী তাদের মনেও আঘাত লেগেছিল। কিন্তু তা বলেত অনুসন্ধান বন্ধ করে রাখা যাবেনা। তেমন হলেত সভ্যতার বিবর্তনই বন্ধ হয়ে যেত। তাই অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে সরে এসে যৌক্তিক ভাবে চিন্তা করতে শিখলে সাম্রাজ্যবাদী মহলও ধর্মের নামে যা ইচ্ছা তা করে ফেলতে পারবেনা। তাই মুক্তচিন্তার চর্চা করতে হবে বলে মনে করি।

সমাজের মধ্যে অনেক কিছুই দ্বান্দ্বিক অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। যেমন কোন মতবাদকে কেন্দ্র করে কোন সমাজ কাঠামো গড়ে উঠলে সেই মতবাদের বিপরীত মতবাদও বিদ্যমান থাকে। কিন্তু তখন যাচাই বাছাই করে দেখতে হয় আমরা যা চর্চা করছি তা আসলেই একমাত্র যৌক্তিক পথ নাকি তার চেয়েও উন্নত কোন রাস্তা আছে আমাদের হাঁটার জন্য। উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই সমাজ বারবার পরিবর্তিত হয়েছে, বিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তন কখনো থেমে থাকে না কারন পরম সত্য বলে কোন ব্যাপার নেই। বরং পরম সত্য ভেবে অতীতের বদ্ধমূল ধারনা নিইয়ে বসে থাকাটাই সামাজিক বিকাশ কিংবা মানুষের আত্মবিকাশের পথে বাঁধার সৃষ্টি করে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 7 = 3