মেয়ে, নারী অতঃপর অপয়া

মেয়ে বা নারী শব্দটা পুরুষের বিপরীত লিঙ্গকে বুঝায়। আর এই লিঙ্গ প্রকারান্তের শব্দ দ্বারা মানুষের মাঝে পুরুষ মানুষ ও মেয়ে মানুষ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে। সেটা শুরু হয়েছে আদিকাল থেকেই।
সময়টা অনেক পুরনো। মেয়ে মানুুষ কে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন না করে শুধু মেয়ে অথবা নারী হিসেবে মূল্যায়ন করা হতো। ঘর বন্দি চলাফেরা আর দাস দাসীর জীবন-যাপন।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের তালেবান শাসনামলের কথা হয়’ত অনেকের মনে আছে। কত বর্বর আর নির্মম ছিলো তালেবান শাসনামল। “প্রকাশ্যে আফগান নারী হত্যা, জনতার উল্লাস” শিরোনামে ২০১২ সালের ৯ জুলাই প্রথম আলো’তে প্রকাশিত সংবাদে একটি মন্তব্য আমার প্রকাশিত হয়।
একে একে তেরটি গুলি করে নারীটির মাথা ও দেহ ছিন্নবিছিন্ন করার উল্লাসে মেতে ওঠেছে আফগানের মুষ্ঠিময় জনগণ। ভিডিওটা দেখে আমি সত্যিই মর্মাহত হয়েছি। অপরাধ স্বামীর বন্ধু জোড় করে একে৪৭ মাথায় ঠেকিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করার।
হতভাগ্য আফগান নারীকে বস্ত্রহীন অবস্থায় পাহাড়ের চুড়ায় জনতার সামনে গুলির আঘাতে আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছিলো।
সেই ঘাতক সহ উল্লাসিত জনতার অবস্থা দেখে মনে হয়েছিলো, নারী তাদের কাছে কোনো এক হিংস্র জন্তুজানোয়ার কিংবা সার্বোভৌমত্ত দখলকারী কোনো শত্রু।
আজ সেই ষড়যন্ত্র আমার দেশ সোনার বাংলাদেশেও হচ্ছে। সাথে তালে তাল মিলাচ্ছে এ দেশেরই আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা কিছু স্বার্থেন্বেষী মহল। আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে সহযোগীর মাধ্যমে তাদের হিংস্র থাবা প্রতিষ্ঠার জন্য ওঠে পড়ে লেগেছে।
একটু পিচনের দিকে ফিরে তাকালে বেশী কিছু সুন্দর চোখে পড়ে না। মেয়েদের কে পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ তথা রাষ্ট্র পর্যন্ত একঘরে রাখার মত হিংস্র মনমানসিকতা বাস্তাবায় করার লক্ষ্যে অনেক সময় অনেক পদক্ষ্যেপ গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু বার বার এ দেশের নারী সমাজ তা প্রতিহত করে নিজেদের যোগ্যতার আসন নিজেরাই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
এ সভ্যতায় এসেও আমরা যেন আমাদের নৈতিকতা এখনো পরিবর্ত করতে পারছিনা। দাম্পত্ত জীবনে প্রথম সন্তান মেয়ে হলে অনেক সংসারে নেমে আসে অত্যাচার নির্যাতন আর অবহেলা। নানান কুসংস্কারের খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়তে হয় গৃহবধূকে যার এখানে কোনো হাত থাকে না। শুরু হয় বংশ রক্ষার বলাবলি আর তিরস্কার। আবার অনেক পরিবারে ছেলে-মেয়ে দুটো থাকলে দু’রকম আদর যত্ম পরিচর্যা করা হয়। ছেলে হয় বংশের প্রদীপ আর মেয়েরা হয় অপয়া যে কিনা কিছুদিন পর অনেক কিছু নিয়ে চলে যাবে অন্যত্র।
আমাদের মেয়ে তথা নারীদের ছোটকাল থেকেই ভীতু করে গড়ে তোলা হয়। সামাজিক পরম্পনা, ধর্মীও রিতিনীতি আর বংশের দোহায় দিয়ে নানান ভাবে তাদের চিন্তা-চেতনা আর মন মানসিকতাকে ছোট করে গড়ে তোলা হয়। আরও একটু পরস্কিার করে বললে, অনেক নারীই হয়’ত পরিবার থেকে বিভিন্ন ভাবে অবহেলা সহ্য করতে না পেরে বাইরে পথ চলতে বাধ্য হয়েছিলো। উচ্চস্বরে কথা বলা যাবে না। নারীর কণ্ঠ পুরুষের কানে পৌছানো হারাম। খেলাধূলা কার যাবে না। মেয়েরা বেশী লেখাপড়া করে কি হবে (?) একদিন তো পরের ঘরে যেতেই হবে। সেখানে ডেকমাষ্টারি অর্থাৎ রান্নাবান্না আর ঘর ঘোছানোর কাজই তো তাকে করতে হবে। আবার অনেক মেয়ের জীবনে এমনও অভিজ্ঞতা আছে তার সামনেই তার ভাইকে আস্ত একটা ডিম বা এক গ্লাস দুধ দিয়েছে আর তাকে দিয়েছে অর্ধেকটা ডিম বা অর্ধেক গ্লাস দুধ। এই বৈষম্য এখনো আমাদের সমাজে বিড়াজ করছে।
দেশের এক শ্রেণীর শিক্ষিত হিসেবে যারা লেখালেখি করে বিত্তবান হয়েছেন তারাও কিন্তু এই বর্বরতা করতে কম করে না। তার একমাত্র স্বাক্ষী তার সাহায্যকারী বা বাড়ীর কাজের মেয়েটি। মেয়ে বা নারী শব্দ জুড়ে খুব সুন্দর সুন্দর কবিতা বা প্রবন্ধ লিখে নিজেকে বিখ্যাত করা সম্ভব কিন্তু এই মেয়ে বা নারীদের প্রকৃত অধিকারের প্রশ্নে অনেকেই যেন নিরব। তাদের কলম আর চলতে চায় না, চায় না লিখতে।
নারী কখনো মমতাময়ী, মায়াবিনী, স্বর্নজ্জ্বল রমনী, প্রেমিকা বা ভালোবাসার এক টুকরো হৃদয়। আবেগ আর ভালোবাসা যখন খতম হয়ে আসে কিংবা জোৎস্না রাতের স্নানের পর এই নারী হয়ে যায় উর্বশী (পতিতা)।
আমরা এখনো নারীদের কে ব্যাবহার করে আসছি। হয়’ত আঙ্গিনা পরিবর্তন হয়েছে।
যে কোন সুপারিশের জন্য বস্ কে নয়, বসের বস্ (স্ত্রী) কে কিংবা নিজের স্ত্রী কে দিয়ে সুপারিশ করিয়ে থাকি।
শরীরের চাহিদা মিটানোর জন্য সামান্য টাকার বিনিময়ে নিজের একান্ত আপন আলোয় আলোকিত করে একাকার হয়ে যাই আবার সমাজের নষ্ট চরিত্রের উপাধি দিয়ে নিজেই বিচারক বনে যাই। পুলিশি প্রহরায় তাদের মাঠ ছাড়া করি। সামাজিক ও রাষ্ট্র নাগরিক করতে অস্বীকৃতি জানাই। তাদের (পুরুষদের) সন্তান কে বিদ্যালয়ের পাঠদান হতে বঞ্চিত করার আইন খুজি। এমন কি তাদের নামাজের জানাজ ও দাপন কাপনে বাধা দিতেও আমাদের নৈতিকার প্রশ্নে থু থু ফেলি।
মেয়েরা নষ্ট, তারা মানুষ না। নারীরা অপয়া, তারা মানুষ না। বাচ্চা জন্ম আর ঘর সংসার করাই এক মাত্র কাজ। নারীরা ঘরের বাইরে যেতে পারবে না, পাপ হবে। নারীরা মুক্ত মনে কিছু লিখতে পারবে না পাপ হবে। নারীরা আন্দোলনে যেতে পারবে না তারা বেশ্যা হবে।
একটা সময় কিছু স্বার্থেন্বষী মহল মেয়ে, নারী অতঃপর অপয়া প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও ধীরে ধীরে এই নারীরাই সেই অপয়া থেকে বেরুতে আপ্রাণ চেষ্ঠা করার পরিপ্রেক্ষিতে আজ একটা সময়ে প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলিয় নেতা নারী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নারী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী নারী, মানবাধিকারকর্মী নারী, গণজারন মঞ্চে নারী, বিচার ব্যবস্থায় নারী, পুলিশে নারী, সেনাবাহিনীতে নারী, কবি-সাহিতিকে নারীর জয় জয়কার দেখে আবার সেই পুরোনোর ষড়যন্ত্রকারী মহল নিজেদের জানান দিচ্ছে। নতুন করে নারীদের ঘরবন্ধি করে রাখার আবার অপকৌসল হাতে নিয়েছে।
আজ যেখানে সংসদ নারীদের নেতৃত্বে মুখরিত সেখানেই স্বার্থেন্বেষী মহলের নোংরা থাবা গিজ গিজ করছে। বিভিন্ন কৌসলে আবার নারীদের জীবন জীবিকা দাস দাসির মত করে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে। আর এই স্বার্থেন্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থের কারনে কখনো নারী নেতৃত্ব হারাম আবার প্রয়োজন হলে নারী নেতৃত্ব আরাম বলতেও দ্বিধা করে না।
আমি বিশ্বাস করি, আমাদের নারীরাই তাদের অধিকার আদায়ে সচেতন হবে। নিজেদের বিরুদ্ধে সকল অপপ্রচার রুখে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশ কে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
নারী, মা, মাটি, দেশের প্রতি প্রতিষ্ঠিত হোউক সবার সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।

সাংবাদিক, কলামিষ্ট
সেলফোন- ০১৭১১০৭৫১৮৭, ০১৯১১৬৮২৯০০
[email protected]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১০ thoughts on “মেয়ে, নারী অতঃপর অপয়া

  1. আমি বিশ্বাস করি, আমাদের

    আমি বিশ্বাস করি, আমাদের নারীরাই তাদের অধিকার আদায়ে সচেতন হবে। নিজেদের বিরুদ্ধে সকল অপপ্রচার রুখে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশ কে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
    নারী, মা, মাটি, দেশের প্রতি প্রতিষ্ঠিত হোউক সবার সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।

    সহমত। ভালো লিখেছেন।

  2. যবে থেকে ধর্ম বিশেষ করে
    যবে থেকে ধর্ম বিশেষ করে একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকল তবে থেকে কেমন করে জানি এই বিশ্ব পুরুষের হতে শুরু করল!! আমি আজও ঠিক বুঝতে পারি না মানব জাতির যে অংশ এই মানব সভ্যতার বিকাশে সবচে কঠিন অবদানটি রাখল তাঁকে কি করে আমরা পুরুষেরা আমাদের মুখাপেক্ষী মনে করে বা মানুষ ভিন্ন অন্য কোন প্রাণী মনে করে বিভিন্ন নীতি করে বন্ধী করি?
    নারী-পুরুষ বলে আলাদা কিছু নাই সবাই সমান অধিকার নিয়ে এই দুনিয়াতে আসে…

    1. নারী-পুরুষ বলে আলাদা কিছু নাই
      নারী-পুরুষ বলে আলাদা কিছু নাই সবাই সমান অধিকার নিয়ে এই দুনিয়াতে আসে…
      ধন্যবাদ তারিক লিংকন।

    1. ”প্লিজ
      নাস্তিক বলবেন

      ”প্লিজ
      নাস্তিক বলবেন না”
      আমি দেশপ্রেমিক ভাই, যারা বলার তারা ভালো হলেও সমালোচনা কিংবা নাস্তিক বলবেই। ভয় কে কর জয়…
      ধন্যবাদ মন্তব্য করায়।

    1. ”শুধু নারীরা সচেতন হইলেই চলব
      ”শুধু নারীরা সচেতন হইলেই চলব না, আমাগো ও পুরা সাপোর্ট দিতে হইব”
      সৌ রভ ভাই, এবমত তবে অধিকার সম্বন্ধে আগে নারীদেরকেই অগ্রনীভূমিকা পালন করতে হবে।
      ধন্যবাদ।

  3. আমি বিশ্বাস করি, আমাদের

    আমি বিশ্বাস করি, আমাদের নারীরাই তাদের অধিকার আদায়ে সচেতন হবে। নিজেদের বিরুদ্ধে সকল অপপ্রচার রুখে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশ কে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

    চমৎকার লিখেছেন । শুভেচ্ছা রইল । :তালিয়া:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 3 =