ভ্যাণ্ডাল থেকে হেফাজতে ইসলামঃ অন্ধকারের কাছে যেখানে আলোর পরাজয়

?_nc_eui2=v1%3AAeF6r47jWOe7FXuhgOx0qBv2UakpUjX5thW0VJ6ptt_KPto3-h3DcMp2UEB5HqM15KGCSdmg8NFKc7dIp23cnxYDs30tyt90AfyAzmOTqmTk9Q&oh=9408e264a2bd51d439a38926753f2589&oe=599C2576″ width=”500″ />

Vandal রা ছিলো একটি বর্বর জার্মান উপজাতীয় যোদ্ধা জাতি। ৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে তারা রোম আক্রমণ করে এবং ব্যাপক ধংস্বলীলা চালায়। এসময় গথিক আর অন্যান্য জার্মান ট্রাইবগুলোও রোমে হামলা চালালেও ভ্যাণ্ডালরা কুখ্যাত অপর একটি কারণে।

ভ্যাণ্ডালরা শুধুমাত্র খুন , ধর্ষণ ,আর লুটতরাজই চালায়নি অন্যান্য বর্বর গোষ্ঠীর মতো। সেই সাথে তারা করেছিলো ব্যাপক ভাবে শিল্পকর্মের ক্ষতিসাধন। গ্রীকদের মতোই রোমানরাও ছিলেন শিল্পকর্ম বিশেষত ভাষ্কর্য প্রিয় জাতি। সারা রোম নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে তারা স্থাপন করেছিলো সে যুগের প্রখ্যাত ভাষ্করদের অসংখ্য মর্মর ভাষ্কর্য। কিন্তু অশিক্ষিত বর্বর ভ্যাণ্ডালদের কাছে কোন মূল্যই ছিলোনা এই অবিশ্মরণীয় সৌন্দর্যের্। নিজেদের যেহেতু শৈল্পিক কোন স্বত্বা ছিলোনা , সেহেতু শিল্পের প্রতি ছিলো তাদের বিজাতীয় ঘৃণা। আর তাই রোম আক্রমণের সময়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো ভাষ্কর্য আর শিল্পকলার উপরে। উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলো ধ্বংসযজ্ঞে।

সুন্দরের প্রতি অসুন্দরের এই ক্ষোভ যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে। বখতিয়ার খিলজির নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ , হালাকু খানের বাগদাদ লাইব্রেরীর ধ্বংসযজ্ঞ , আফগানিস্তানে তালেবানদের বামিয়ানের বৌদ্ধ মূর্তি উড়িয়ে দেয়া , সিরিয়ায় আইএস দের বিভিন্ন শিল্পকর্ম মঠ মন্দিরের ধংস্বলীলা এসবই সেই একইসূত্রে গাথা।
আর এযুগের ভ্যান্ডলরা এখন ভ্যাণ্ডালিজমের খড়গ বয়ে নিয়ে এসেছে অধুনা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামের রূপ নিয়ে।
ইতিহাস শুধুই ফিরে ফিরে আসে।
?_nc_eui2=v1%3AAeES8iLU0bCl9wJkTNQWrUCi493_vXHb853C7NdRIgk__r_clCkaiPYIJu4H9WicGRl6atpAK0en_zvCnH5RZzU5uPof5hXTvkNgwRbBWj4t5w&oh=0eeb58c1b1508755873c73fa9fe52f85&oe=59B2BD6A” width=”500″ />
ধর্মীয় অনুভূতির জুজু তুলে সুপ্রীম কোর্টের সামনে স্থাপিত লেডী জাস্টিসিয়ার ভাষ্কর্যটি নিয়ে সারা দেশে ভ্যাণ্ডলদের মতোই উন্মত্ততা ছড়িয়ে দিয়েছিলো হেফাজতে ইসলাম।আর তাদেরকে খুশী রাখতে সেকুলার রাজনীতির ধ্বজাধারী আওয়ামীলীগ সরকার এক প্রকার নতজানু হয়েই রাতের অন্ধকারে সুপ্রীম কোর্টের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন লেডি জাস্টিসিয়ার ভাষ্কর্য। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হননি হেফাজতের ভ্যাণ্ডলরা। এবার দেশের সকল ভাষ্কর্য অপসারণ করার দাবী জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এমনটাই যে হতে যাচ্ছে , তা আগেই বহুবার ভবিষতবাণী করেছিলেন অনেকেই।গত শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে এক সমাবেশে হেফাজতের ঢাকা মহানগরের সহ সভাপতি মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী বলেন, ‘বাংলার মাটিতে আর কোনও মূর্তি স্থাপন করা যাবে না। এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে তৌহিদী জনতা দাঁতভাঙা জবাব দেবে।’

তার মানে এবার অপরাজেয় বাংলা , রাজু ভাষ্কর্য , স্বোপার্জিত স্বাধীনতা , বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য , জননী ও বর্ণমালা সহ মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত সকল ভাষ্কর্যই হারিয়ে যাবে লাল সবুজের বাংলাদেশের বুক থেকে। এদেশ পরিচিত হয়ে উঠবে বর্বরদের দেশ , মূর্খদের দেশ হিসেবে। কারণ একমাত্র মূর্খ আর বর্বররাই ভাষ্কর্য আর মূর্তিপূজার মধ্যে পার্থক্যটা অনুধাবন করতে পারেনা। আর পারেনা বলেই শিল্প ,সাহিত্য ,ভাষ্কর্য ,সঙ্গীত ,নৃত্যকলা সবকিছুই তাদের কাছে বর্জনীয়।

এদের চোখে ভাষ্কর্য হারাম , সংগীত হারাম , সিনেমা হারাম। হারাম জগৎ এর যাবতীয় সুন্দর সুকোমল বৃত্তিসমূহ। ২০১৭ সালে এসে সারা পৃথিবীর মানুষ যখন জ্ঞান বিজ্ঞানের চরম উতকর্ষতার লক্ষ্যে দিবানিশি সাধনা করে চলেছেন , তখন এরা আকড়ে ধরতে চাইছে মধ্যযুগের বর্বরতাকে।

কচু কাটতে কাটতেই ডাকাতে পরিণত হওয়া যায়। শুধুমাত্র জাস্টিসিয়াকে নিয়ে যে ধর্মান্ধদের দাবী দাওয়া শেষ হবেনা , সেটা বুঝতে শার্লক হোমস হতে হয়না। আর তাই ব্লগে ,ফেসবুকে অসংখ্যবার সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন প্রগতিশীল এক্টিভিস্টরা। কিন্তু সুকুমার রায়ের “চক্ষু কর্ণবিহীন সর্প” এর মতে সেই আকুলতা দাগ কাটতে পারেনি কর্তৃপক্ষের মনে। তাই ভোটের রাজনীতির জয়পরাজয়ের হিসেব মেলাতে রাতের অন্ধকারে চোরের মতোই সরিয়ে ফেলা হলো জাস্টিসিয়া। অন্ধকারের কাছে হলো আলোর পরাজয়।
মৌলবাদের হুংকারের কাছে মাথা নত করে শুরু হয়েছে পেছল পথে যাত্রা। আর আজ সব ভাষ্কর্য সরিয়ে ফেলার দাবী জানিয়ে এই ধর্মান্ধ শক্তি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। কারণ ধর্মের দোহাই দিয়েও পাকিস্তান রক্ষা করতে না পারার মর্মজ্বালা তারা ভুলতে পারেনি কখনোই। শুধু ছিলো সূযোগের অপেক্ষায়। আর তাদের মূল টার্গেটই ছিলো অপরাজেয় বাংলা। কেননা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত এই ভাষ্কর্যটি বারেবার স্মরণ করিয়ে দিতো তাদের ন্যাক্কারজনক পরাজয়ের ইতিহাস। আর তাই সব মূর্তি সরিয়ে ফেলার আহবান ভেসে এসেছে তাদের শিবির থেকে।

এখনো যারা প্রতিবাদ না করে নিরপেক্ষতার ভূমিকা বজায় রেখেছেন তাদের উদ্দেশ্যে কবি আহসান হাবীবের ভাষায় বলতে হয় ,
“তোমার আমার দিন ফুরায়েছে যুগটাই নাকি বৈপ্লবিক,
গানের পাখিরা নাম সই করে
নীচে লিখে দেয় রাজনীতিক
থাকতে কি চাও নির্বিরোধ?
রক্তেই হবে সে ঋণ শোধ।
নীড় প্রলোভন নিরাপদ নয় বোমারু বিমান আকস্মিক
আরব্ধ গান এইখানে শেষ আজকে আহত সুরের পিক ”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ভ্যাণ্ডাল থেকে হেফাজতে ইসলামঃ অন্ধকারের কাছে যেখানে আলোর পরাজয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 2