আলেক্সান্ডার দ্যুগিন: পি হান্টিংটন পরবর্তী পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দার্শনিক


বয়স ৫৫, প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩০, আর অন্যান্য রচনা সমগ্র অসংখ্যক, ১০টি ভাষায় স্বশিক্ষিত। মানুষটিকে ধরা হচ্ছে নব্য-উদারতাবাদের বিরুদ্ধে নতুন স্রোত সৃষ্টির কারিগর, ‘দ্যা ফোর্থ পলিটিক্যাল থিওরি’র মাধ্যমে যিনি ফুকুয়ামার ‘দ্যা এন্ড অব হিস্ট্রি’ কে ভুল প্রমাণ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘ফার নিউ রাইট’ এর গুরু আলা দু বেনোয়া যার দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত, যাকে বিভিন্ন পাশ্চাত্য গণমাধ্যমে আখ্যায়িত করা হয়েছে এই পৃথিবীর ‘মোস্ট ডেডলি ফিলসফার’ হিসেবে। হুম, তিনি হচ্ছেন- আলেক্সান্ডার দ্যুগিন(Aleksandr Dugin), যিনি ‘Putin’s Rasputin’ বা ‘Putin’s Brain’ নামেও পরিচিত; তিনি একজন একাধারে সমাজতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবেত্তা এবং দার্শনিক।

‘দ্যা এন্ড অব হিস্ট্রি’র সমসাময়িক ‘দ্যা ফোর্থ পলিটিক্যাল থিওরি’ পড়ে রীতিমত উদারতাকেও ঝেড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। ফুকুয়ামা বলেছেন ‘উদার গণতন্ত্র’ই মানুষের রাজনৈতিক ভাবধারার সর্বশেষ, চূড়ান্ত এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য আদর্শ।

দ্যুগিন বলছেন ফ্যাসিস্ট, কমিউনিস্ট- এদের মধ্যাকাশে(Mid Flight) গুলি করে নামিয়ে এনেছে উদারতা। এখন উত্তরাধুনিকতার যুগে এটি সামর্থ হয়েছে মানুষকে রাজনীতিবিমুখ করতে, এটমাইজ করতে, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রিকরণ(ব্যক্তিকেন্দ্রিক) করতে। ধর্ম, সংস্কৃতি, পরিচয়, জাতীয়তাবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সর্বোপরি রাজনীতি নিরপেক্ষ করে ফেলেছে। মানুষ এখন সম্মিলিত প্রচেষ্টা(Collective Action) থেকে বের হয়ে এসে কেবলই নিজের লক্ষ্য অর্জনের পেছনে ছুটছে।

এই উদারতাবাদ মুক্ত বাণিজ্যের কথা বলে মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি, পরিচয়, জাতীয়তাবাদ থেকে বের করে মানুষকে পুরোপুরি পশ্চিমা ভাবধারায় উদ্ধুদ্ধ করছে, স্বজাতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে বের করে এনে বৈশ্বিক নাগরিকে পরিণত করার প্রচেষ্টায় সফল হয়েছে যারা সরাসরি কিংবা অন্যভাবে পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে(এখানে ফেঁসে গেলাম লাগে!)। দ্যুগিন বলছেন, পূর্বের তিনটি থিওরি(লিবারেল, ফ্যাসিস্ট, কমিউনিস্ট) পুরোপুরি সময় এবং রেসিজম এর উপর দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত। এখন কথা হচ্ছে কিভাবে?

দ্যুগিন এর মতে- ফ্যাসিস্টরা বলছে জাতি হিসেবে তাঁরাই অন্যদের তুলনায় সেরা(রেসিস্ট মাইন্ড), এবং ভবিষ্যতে(সময়ের ব্যাপারটা এখানে চলে আসছে) এই অবস্থান ধরে রাখতে হলে অন্যদের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হবে।

কমিউনিস্টরা বলছে ধর্ম একটি আফিম(পূর্ব পুরুষদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে! হীন বলা হচ্ছে, যেটি এক ধরণের রেসিজম!) এবং বলা হচ্ছে ভবিষ্যতে(আবার সময়!) শ্রেণী সংগ্রামে শ্রমিকরা বিজয়ী হবে।

লিবারেলিজমে বারবার উন্নত, অনুন্নত জাতির মধ্যে বিভেদ করা হচ্ছে(যেটি রেসিজম) এবং ভবিষ্যত নিয়ে মানুষকে সারাক্ষণ উদকন্ঠায় রাখা হচ্ছে। এবং বলা হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে জীবন আরও উন্নত হবে, অর্থাৎ বর্তমান ও অতীতে বসবাসকারিরা ভবিষ্যতে হীন/সেকেলে ভাবধারার মানুষ হিসেবে গণ্য হবে(ফের রেসিজম)!

দ্যুগিন বলেছেন সময় সম্পর্কে এমন ভাবধারা মানুষকে আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে উন্নত ভবিষ্যতের আশায়! তিনি Husserl’র ‘মিউজিক্যাল সিম্ফোনি’ এর ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন একটি সুর এর কোনও বিচ্ছিন্ন অংশ ভাল লাগার নয়। পূর্বের অংশ শোনার সাথে সাথে বর্তমানের অংশ পাড় হয়ে এসে ভবিষ্যতে আসন্ন সুর যখন কানে বাজে তখন পুরো মিউজিকটি ভাল লাগে। কাউকে যদি একটি বিচ্ছিন্ন অংশ শোনানো হয় তাঁর সেটি ভাল লাগবে না, বা অন্যভাবে বাজানো হলে এটি বেসুরো শোনাবে। সময়ের ধারণাটিও অনুরুপ- ইতিহাসের প্রতিটি জিনিসই জরুরী মানুষের অবস্থানকে বুঝতে। তাঁর ভাষায় তথাকথিত উন্নত, উদার রাষ্ট্র গুলো বিভিন্ন ভাবে নিজেদের ইতিহাসকে লুকানোর জন্য, বা তাঁদের সকল কৃতকর্মের বৈধতা প্রদানের জন্য বিভিন্ন তত্ত্ব তুলে এনেছে। যেমনঃ ঔপনিবেশিক শাসনকে বৈধ করতে তাঁরা বণিকবাদকে সামনে নিয়ে এসেছে, ক্লদ লেভি স্ট্রস তাঁর স্ট্রাকচারালিজমের মাধ্যমে সব দেখতে বলেছেন।

দ্যুগিনের মতে মানুষ একটি রাজনৈতিক প্রাণী, এবং আমরা এমনিতেই মানুষ হয়ে উঠি না, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দরুণ মানুষ হয়ে উঠি। তাই আমাদের রাজনীতিতে ফেরত যেতে হবে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আস্থা রাখতে হবে। নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মকে আগলে রাখতে হবে। যথাসম্ভব বিজ্ঞানের চর্চাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ব্যবহারের জন্য সীমিত আকারে কোনও জায়গায়(সম্ভবত বদ্ধ কক্ষ) চর্চা করতে।

‘দ্যা ফোর্থ পলিটিক্যাল থিওরি’ তে তাঁর বলা একটি কুখ্যাত কথা ‘Pure war and pure peace both are murderous’ অর্থাৎ শুধু যুদ্ধ এবং শুধু শান্তি উভয়ই জীবনহানিকর। উদারতাবাদ এই কাজটিই করে আসছে, কোথাও শান্তির নামে শোষন চলছে, কোথাও যুদ্ধের মাধ্যমে শোষণ চলছে(এটি অন্য ভাবে হান্টিংটন তাঁর কুখ্যাত ‘The Clash of Civilizations and the Remaking of the World Order’ এ বলেছেন মার্কিন পলিসির বিভিন্ন ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের কথা তুলে ধরার মাধ্যমে, যেমন লিবিয়ায় গণতন্ত্র দরকার তাই সৈন্য পাঠানো হল, কিন্তু সৌদি আরবে দরকার নাই রাজতন্ত্রই থাকুক!)।

এই ভদ্রলোক রাশিয়ার প্রেস্টিজিয়াস মস্কো স্টেইট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করতেন; রাশিয়ার ক্রিমিয়া অধিগ্রহণকে তিনি ত্বরান্বিত করতে বলেন এবং প্রয়োজনে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়ার কথা বলেন, তৎক্ষণাৎ তাঁর কর্মস্থলে ছাত্র ছাত্রীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং তাঁকে অব্যাহতি দেয়ার দাবিতে গণস্বাক্ষর অভিযান পরিচালনা করলে তা সফল হয়।

ক্রিমিয়া অধিগ্রহণের পেছনে তাঁর উদ্ভাবিত ‘Eurasian Nationalism’ মূল কারণ ছিল, এই জাতীয়তাবাদ অনুসারে সকল সাবেক সোভিয়েত সম্রাজ্যের অধীনস্ত দেশগুলো একত্রিত হয়ে রাশিয়ার ছায়াতলে এসে ইউরোপ ও এশিয়ার সংমিশ্রণে উক্ত জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করবে।

১৯৯৭তে দ্যুগিনের বেস্টসেলিং বই ‘The Foundation of Geopolitics’ বের হয়(এখনও ইংরেজীতে অনূদিত হয়নি) যেটি রাশিয়ান মিলিটারিতে পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয় এবং এটিকে সাঙ ঝু’র ‘দ্যা আর্ট অব ওয়ার’র আধুনিক বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। এই বইয়ে একবিংশ শতাব্দীতে ‘Eurasian Nationalism’ কে সার্থক করতে রাশিয়াকে কি পরিকল্পনা করতে হবে এ সম্পর্কে বলেন-
‘It is especially important to introduce geopolitical disorder into internal American activity, encouraging all kinds of separatism and ethnic, social and radical conflicts, actively supporting all dissident movements- extremist, racist and sectarian groups, thus destabilizing internal political processes in the US. It would also make sense simultaneously to support isolationist tendencies in American politics… ’
বলা হচ্ছে এর ফলস্বরুপ গত মার্কিন নির্বাচনে হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট’রা ট্রাম্পের পক্ষ নিয়েছে, এবং ট্রাম্পের সাথে পুতিনের দহরম মহরমের কথা কারও অজানা নয়।

স্বয়ং নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ Paul Krugman তাঁর ‘The Conscience of A Liberal’ গ্রন্থে বলেন- ‘The legacy of slavery, America’s original sin, is the reason we’re the only advanced economy that doesn’t guarantee health care to our citizens. White backlash against the civil rights movement is the reason America is the only country where a major political party wants to roll back the welfare state.’ এই আমেরিকার ভেতরকার অনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের বিকাশ সেখানে আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক যে বিভেদ এবং অসমতা সৃষ্টি করেছে তা নিয়ে বলতে গিয়ে Joseph Stiglitz আব্রাহাম লিংকনের দেয়া বিখ্যাত গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটিকে ব্যাঙ্গ করে লেখেন ‘Vanity Fair’ ম্যাগাজিনে- ‘(Democracy is) of the 1%, by the 1% and for the 1%’

এখন আমেরিকার এহেন পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে দ্যুগিনের ভাষ্যমত রাশিয়া কাজ করে যাচ্ছে বলে অনেক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের ‘The Clash of Civilization’ বইটি যদি পশ্চিমাদের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বড় প্রভাবক হয় সে ক্ষেত্রে দ্যুগিনের উক্ত বইদুটো রাশিয়ান তথা পূর্ব ইউরোপের ক্ষেত্রে বড় প্রভাবক। হান্টিংটনের সাথে দ্যুগিনের এক বড় পার্থক্য হচ্ছে- দ্যুগিন একজন দার্শনিকও বটে। দেখা যাক ভবিষ্যত কার বিজয় দেখতে পায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 2