লীগ – হেফাজতের হাতেই কি বাংলাদেশের মৃত্যু পরোয়ানা লেখা হচ্ছে?

হেফাজত তথা মৌলবাদী শক্তিকে আন্ডার এস্টিমেট করার সুযোগ নেই। ক্ষেত্র মোটামুটি প্রস্তুত। আপাত দৃষ্টিতে তাঁদেরকে আওয়ামীলীগের লেজুড় হিসেবে প্রতীয়মান মনে হলেও অদূর ভবিষ্যতে এরা অঘটন ঘটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এঁদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকরণের মাধ্যমে একেবারে বুনিয়াদ লেভেলে ফিল্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী ১৫/২০ বছর সময়ের মধ্যে যেসব তরুণের প্রোডাকশন সাধারণ ধারার শিক্ষার মাধ্যমে আসছে তাঁরা ধর্মান্ধ হয়েই বিকশিত হবে। তাঁরা তখন ‘অমুক জায়গায় ভাস্কর্য কেনো?’ এই প্রশ্ন করবে না; শাবল নিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তুলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এ কারণে এই গ্রুপকে এই সময়ের প্রেক্ষিতে ‘মুসিবত’ বলছি। বিএনপি – জামায়াত মধ্য ডানপন্থী/ ডানপন্থী দল হলেও কৌশলগত কারণে প্রাতিষ্ঠানিক মৌলবাদের চর্চা এযাবতকালে করেনি বা সাহস পায়নি। এ কারণে এরা সবসময় আপদ হিসেবে ছিল। আর আওয়ামী লীগের ডানপন্থায় ঢুকে যাওয়াকে দেখছি পুত্রের ঔরসে পিতার নবজন্ম হিসেবে। অর্থাৎ যে মুসলিম লীগ তথা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে এর মধ্যপন্থি দল হিসেবে আওয়ামী লীগে উত্তরণ সেটা উৎসে ফিরে যাচ্ছে। এই বিবেচনায় এরা বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

হেফাজত তো একটা সাইনবোর্ড। এর পেছনে মৌলবাদী শক্তির উত্থানের পদধ্বনি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। আমরা বড্ড মিস রিড করছি, কম গুরুত্বসহকারে নিচ্ছি সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে। অথচ চোখের সামনে ইরান – আফগানিস্থানের সেকাল – একাল উদাহরণ হিসেবে জ্বলজ্বল করছে। সুতরাং আবহমানকাল থেকে চলে আসা সেকুলার বাঙালি ধর্মভিরু হলেও মৌলবাদকে মেনে নেবে না টাইপ ডগমা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়ে গেছে। এক জামায়াতে ইসলাম এদেশে মৌলবাদের যে অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে দিয়েছে সেই সামান্যের ঠেলায় জেরবার অবস্থা। এখন তো ধর্মান্ধদের জয়জয়কার। আমাদেরকে বুঝতে হবে লীগ তাঁর ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে একটা দুর্বল প্রতিপক্ষ চায়। মৌলবাদীরা সেই অভাব পূরণে এগিয়ে এসেছে বা বলা ভাল মৌলবাদকে সাদরে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সমস্যা হলো এরা এক পা এগোলে আরো দুই পা এগোনোর ম্যান্ডেট নিয়েই এগোয়। সরকারের অপেক্ষাকৃত সেক্যুলার অংশ হয়তো ভাবছে নাটাইটা তাঁদের হাতেই আছে। অসুবিধা কী, প্রয়োজনে সুতো ছাড়া হবে আবার দরকার মতো গুটিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু রাজনীতির হিসেব নিকেশ অতো সরল নয়। ইতিহাসে নাটাইয়ের হাতবদল তো কম দেখলাম না। ভয়ের দিক এটাই।

আগামী ২০১৮/১৯ এর ইলেকশন নিয়ে আমি ভাবছি না, ভাবছি ২০ বছর পরের বাংলাদেশ নিয়ে। ওই বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরানের প্রতিচ্ছবি। যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ একটা গিনিপিগ দল হিসেবে টিকে আছে মোল্লাতন্ত্রের ইচ্ছায়, বামদলগুলো বিলীন হয়ে গেছে। শিল্পকলা উঠে গেছে। মানবিক সব প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হয়েছে।

পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও মৌলবাদকে একসাথে ও আলাদাভাবে গুরুত্বসহকারে পাঠ করতে না পারলে আপদ, বিপদ ও মুসিবত একযোগে হাজির হবে। টিভিতে এড দিচ্ছে দেখলাম, রবি হালাল প্যাকেজ। এছাড়া কথিত ইসলামি ড্রেসকোডের বিষয় তো আছেই। মোল্লারা টকশোতে নিয়মিত হাজিরা দিতে শুরু করেছে। মুনাফা সর্বস্ব টিভি মিডিয়া সময় বুঝে ওদেরকে তোয়াজ করা শিখে নিয়েছে। মজহারদের মতো বদমাইশ বুদ্ধিজীবী জুটে গেছে গো-মূর্খ্যদের বক্তৃতা বিবৃতি লিখে দেওয়ার জন্য। পদসেবা করতে আগ্রহী আরো অনেক বুদ্ধিশয়তান লাইনে আছে। সুযোগের অপেক্ষায় আছে। ওদিকে পেট্রো ডলারের ঘাটতি পড়ার শংকা নেই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের ছকের মধ্যে আছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে, বিলম্ব না করে এখনই এই সমাজকে পাঠ করে কমপক্ষে আগামী ২০ বছরের কথা ভাবতে হবে। একটা নতুন জেনারেশন পেতে যাচ্ছে ওরা। ওই জেনারেশন এখনকার মতো আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগবে না। বাঙালি না মুসলমান না কী মুসলমান বাঙালি এই প্রশ্ন তাঁদের মনে উদয় হবে না। তাঁদের শেকড় প্রোথিত এই সবুজ-শ্যামল বাংলায় না কী আরবের রুক্ষ্য মরুভূমির খেজুর গাছের তলায় এই জিজ্ঞাসাও থাকবে না। কারণ ওরা জানবে, ওরা বিশ্বাস করবে ওদের জাতিগত পরিচয় বাঙালি নয়, মুসলিম। সুতরাং, আগামী কয়েকবছরের মধ্যে রাজনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটলে, ঘটাতে না পারলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। তখন আওয়ামী লীগ কিংবা হেফাজতকে তথা মৌলবাদকে আলাদা করা দূরূহ হয়ে পড়বে।

পরগাছা সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তির এখনো একটা ভরকেন্দ্রের প্রয়োজন হচ্ছে বটে, তবে সে প্রয়োজন ফুরোবে বলেই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। হেফাজতের সাথে প্রধানমন্ত্রীর কিছুদিন আগের বৈঠকের কথা স্মরণে আনুন। পরদিন প্রথম আলোয় একটা ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। শেখ হাসিনা দাঁড়িয়ে মেরুদণ্ড বাঁকা করে, ৩০ ডিগ্রি ঝুঁকে শফি হুজুরের সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ দেখলে কে যে প্রধানমন্ত্রী সেটা বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা। ছবিটা সিম্বলিক কিন্তু ভীষণ তাৎপর্যপপূর্ণ। ওই ছবিতে যেনো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দেখলাম! কেঁপে উঠেছিলাম, বিষণ্ণ হয়েছিলাম। আতঙ্কে, বিষাদে, ঘৃণায় নিজেকে পরাজিত মনে হয়েছিল।

হ্যাঁ, ২০ বছর পরের ওই অসুস্থ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগই আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে। যে দেশ একজন মুক্ত মানুষের জন্য বসবাস অযোগ্য হিসেবে দেখা দেব। তাঁরা ভাবছে, লাগামটা আজকের মতোই মিশন ২০৪১ পর্যন্ত হাতে থাকবে। সেটা আলবৎ হবে না। ওই পর্যন্ত নামকা ওয়াস্তে ক্ষমতা ধরে রাখতে (যদি ধরেও নিই লীগই থাকছে) মৌলবাদকে তুষ্ট রাখতে এবং ফ্যাসিজমের চর্চা নির্বিঘ্ন করতে যে পরিমাণ ঘুষ (এই ঘুষ কেবল অর্থ দিয়ে পরিমাপ করবেন না) দিতে হবে তাতে লালন-হাছনের সুফীবাদী বাঙলাকে সনাক্ত করা যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + = 16