গল্প নয় সত্যি।

হুমায়ুন আহমেদের নাম শুনেছেন না ?
গল্পটা ওনার পরিবারের।
সৌখিন পুলিশ অফিসার ফয়েজ আহমেদ। স্ত্রী আয়েশা ফয়েজ আর ছয় ছেলে মেয়ের দারুণ সংসার । ১৯৭১ সালে অনেক বীর পুলিশের মত ফয়েজ আহমেদ তার পরিবার কে পেছনে ফেলে আমাদের কে রক্ষা করার জন্য , একটা স্বাধীন দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন, শহিদ হলেন।

স্বামী হারা এতিম ছয় সন্তান নিয়ে মহা বিপদে পরলেন মা আয়েশা ফয়েজ। মাথা গোজার ঠাই ছিলনা, বঙ্গবন্ধু একটা বাড়ি দিলেন ঢাকার মোহাম্মদপুরে।

ছয় সন্তান নিয়ে বিধবা সেই মহিলা স্বামী হত্যার বিচার তো পাননি বরং স্বাধীন দেশে শহীদ পরিবার হয়েও চরম জিল্লতির শিকার হয়ে ছিলেন পাঠকদের জন্য লজ্জাজনক সেই বর্ণনা তুলে ধরলাম আয়েশা ফয়েজের লেখনী থেকে ।

“একজন সুবেদার মেজর (রক্ষীবাহিনীর) এসে জিজ্ঞেস করল, এ বাড়ি আপনি কোথা থেকে পেলেন? আমি বললাম, সরকার আমাকে দিয়েছে। আমার স্বামী যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন তাই। সুবেদার মেজর কিছু না বলে চলে গেল। আমার মনের ভেতর হঠাৎ করে একটা খটকা লেগে গেল, হঠাৎ করে রক্ষী বাহিনী আসছে কেন? খানিকক্ষণ পর হঠাৎ করে আরেকজন সুবেদার মেজর হাজির। সে একা নয়, তার সাথে এক ট্রাক বোঝাই রক্ষীবাহিনী। সবার হাতে অস্ত্র। সুবেদার মেজরের নাম হাফিজ, ভেতরে ঢুকে বলল, এই বাড়ি আমার। শেখ সাহেব আমাকে দিয়েছেন।

আমি বললাম, সে কি করে হয়? আমার কাছে বাসার অ্যালটম্যান্ট রয়েছে- সে কোনো কথা না বলে টান দিয়ে ঘরের একটা পর্দা ছিড়ে ফেলল। সাথে আসা রক্ষীবাহিনীর দলকে বলল, ছেলেমেয়েদের ঘার ধরে বের কর। আমি এতদিনে পোড় খাওয়া পাথর হয়ে গেছি। রুখে দাঁড়িয়ে বলেছি, দেখি তোর কত বড় সাহস। …কাজল ( হুমায়ুন আহমেদের ডাক নাম) মুহসীন হলে ছিল, খোঁজ পেয়ে এসেছে,তাকেও ঢুকতে দিলো না। সারা রাত এভাবে কেটেছে। ভোর হতেই আমি বের হলাম। পুলিশের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলাম। তারা বললো, আমরা গোলামীর পোশাক পড়ে বসে আছি! রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা কি করব?

বঙ্গভবন , গণভবন এমন কোনো জায়গা আমি বাকি রাখলাম না সাহায্যের জন্য। কিন্তু লাভ হলো না। আমি তুচ্ছ মানুষ, আমার জন্যে কার এত মাথাব্যথা। রাতে ফিরে এসেছি। আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না, অনেক বলে ভেতরে ঢুকেছি। রাত আটটার সময় রক্ষীবাহিনীর দল হঠাৎ করে লাথি মেরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল। ইকবাল আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে, একজন বেয়োনেট উঁচিয়ে লাফিয়ে এলো। রাইফেল তুলে ট্রিগারে হাত দিয়েছে, চিৎকার করে কিছু একটা বলছে, গুলি করে মেরে ফেলবে আমাদের? আমি ছেলেমেয়েদের হাত ধরে বের হয়ে এলাম। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাকে প্রথমবার গৃহহারা করেছিল। বাংলাদেশ সরকারের রক্ষীবাহিনীও আমাকে গৃহহারা করল। ” (প্রাগুক্ত, পৃ.৯২-৯৩)

এই গল্প বলার একটা কারণ আছে। ১৯৭২ থেকে এই দেশে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার শুরু হয়। একটা অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছিল মানুষের জীবন। আজ ২০১৭ সালে রক্ষীবাহিনীর প্রতিরূপে আবির্ভুত হয়েছে “ছাত্রলীগ”। রক্ষীবাহিনী আর ছাত্রলীগের সাথে দারুণ মিল উপরের গল্পের। জানি না ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে রক্ষীবাহিনীর সেই অত্যাচার, অন্যায় আর অপকর্মের শোধ দিতে হয়েছিল কি না জীবন দিয়ে ! তবে এটা নিশ্চিত যে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় দল আওয়ামীলীগকে এই একাবিংশ শতাব্দীতে চরম খেসারত দিতে হবে এই ছাত্রলীগ নামধারী অতিলীগার, গুণ্ডা, সন্ত্রাসী,অসভ্যদের জন্য।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আবারো সেই শহীদ পরিবারের সন্তান কে পদে পদে লাঞ্ছিত করেছে এই ছাত্রলীগ। প্রফেসর ড জাফর ইকবাল কে প্রথমে সিলেটে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে, পরে ক্যাম্পাসে গাইয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।
ছাত্রলীগ এখন “গণজাগরণ মঞ্চ” কে ঢাকা ও সিলেটে অবাঞ্ছিত করেছে, রবীন্দ্রনাথ কে শহিদ মিনারে অবাঞ্ছিত করেছে, রফিউর রাব্বি অর্থাৎ ত্বকির বাবা কে অবাঞ্ছিত করেছে, মুক্তিযুদ্ধাদের পিটানো ত এখন ছাত্রলীগের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এরা একে একে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের, সংগঠন কে অবাঞ্ছিত করে চলেছে। এই দেশে শুধু আওয়ামীলীগ আর ছাত্রলীগ থাকবে। তাদের নেত্রী এদের নিয়ন্ত্রণ করে না, আবার তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়া যাবে না।

সেই ১৯৭২ সালের রক্ষীবাহিনীর মত বাংলাদেশে কে মগেরমুল্লকে পরিণীত করেছে ছাত্রলীগ।

একটা কথা স্পষ্ট মনে রাখবেন ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ইতিহাসের পুনঃআবৃত্তি ঘটে।

শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “গল্প নয় সত্যি।

  1. বাহ, বেশ সুন্দর ঙ
    বাহ, বেশ সুন্দর ঙ

    আমার লেখা পড়ার ও ফেসবুকে আমার “বন্ধু” হওয়ার আমন্ত্রণ রইল। আগের আইডি ছাগলের পেটে।এটা নতুন লিংক :
    https://web.facebook.com/JahangirHossainDhaka

Leave a Reply to ড. লজিক্যাল বাঙালি Cancel reply

Your email address will not be published.