ঋতুস্রাবঃ অশ্লীলতা নাকি বিকৃত মস্তিষ্কের চিন্তাধারা?

ঋতুস্রাব শব্দটির সাথে পরিচয় ঘটে ২০১৩ সালে, প্রাণীবিজ্ঞান বইয়ে “মানবদেহ” অধ্যায়টির বদৌলতে। অবশ্য ৯বম শ্রেণিতে থাকতে “পিরিয়ড” শব্দটির সাথে মোটামুটি পরিচিত বিজ্ঞাপন দ্বারা। যাই হোক তখনও বুঝতাম না বিষয়টা কি। মোটামুটি কলেজ জীবনে এসে বুঝেছি বিষয়টা।

নারী শরীরে ডিম্বানু উৎপন্নের ২৮ দিনের মধ্যে যদি শুক্রানুর সাথে নিষেক না ঘটে তবে নারীদেহ হতে সেই ডিম্বানুর অপসারণ হয়। এসময়ে রক্তপাত ঘটে এবং সেটিই ঋতুস্রাব হিসেবে পরিচিত।

ঋতুস্রাব নারীদেহের একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এটি নিষিদ্ধ একটা প্রসঙ্গ। বিকৃত বিনোদনের বস্তুও বটে। একটি মেয়ের ঋতুস্রাব হয়েছে শুনলে তার দিকে কুৎসিত হাসি ছুটে আসে। একটি মেয়ে যখন কোন ফার্মাসিতে যায় সকল পুরুষের নজর থাকে মেয়েটা কি কিনতে এসেছে। যদি সে ন্যাপকিন কিনে তো সবাই তারদিকে কুৎসিত একটা হাসি দেয়, যার কারণে ন্যাপকিন কেনার প্রক্রিয়াটি আড়ালে সম্পন্ন করতে চায়।

ঋতুস্রাব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এর কারণে একটি মেয়ে নারীতে রূপান্তরিত হয়। প্রতিটি মানুষের জন্মের জন্য এটি প্রয়োজনীয় একটি প্রক্রিয়া; তারপরও মানুষ এর মধ্যে কি অশ্লীলতা খুঁজে পায় আমি বুঝে উঠতে পারিনা। ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। একদিন প্রিয়তমার সাথে রিক্সায় করে বাড়ি ফিরছিলাম। রিক্সার ঝাকির সাথে সাথে সে কুকড়ে উঠলো। আমার চোখের সামনে আজো ভেসে উঠে ব্যাথায় ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া সেই মুখ, খামচি দিয়ে রিক্সা ধরে রাখার সেই দৃশ্য। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিলো। সেদিনই প্রথম নারীর ঋতুস্রাবের প্রক্রিয়ার সাথে প্রথম অভিজ্ঞতা। মুখ থেকে আমার এক ফোটা হাসি বের হয়নি, মস্তিষ্ক কোন অশালীন চিন্তা আনতে পারেনি। নিজেকে বেশি অসহায় লাগছিলো, তার ব্যাথা সহ্য করতে পারিনি। সেদিন থেকে নারীর প্রতি আমার সম্মান আরো অনেক বেড়ে গিয়েছে।

সত্যি বলতে আমি খুব অবাক হই যখন শুনি ঋতুস্রাব নিয়ে মানুষ ঠাট্টা করে, বিকৃত মজা নেয়। মুসলমানদের পবিত্র মাস রমজান। এ মাসে নারীদের সবচেয়ে বেশি হেনস্তা হতে হয়। রোযা রেখেছে কিনা এ প্রশ্ন দ্বারা নারীদের হেনস্তা করা হয়। আমিও আগে এই প্রশ্ন করতাম, যখন কেউ আমাকে রোযা রেখেছে কিনা জিজ্ঞেস করতো। তবে আমি প্রশ্ন কোনসময় ওসব চিন্তা করে করিনি। কেননা, আমি ওই বিষয়টা নিয়ে ওভাবে চিন্তা করিনি কখনো। আজ যখন বুঝি বিষয়গুলো নিজেকে নিজের কাছে অনেক নীচ মনে হয়।

ইসলাম শান্তির ধর্ম বলে পরিচয় দেয় মুসলিমরা। রমজান পবিত্র মাস হিসেবে পরিচিত। সেই পবিত্র মাসে অশ্লীলতার ইঙ্গিত করে নারীদের হেনস্তা করা কিভাবে পবিত্রতা হয় তা আমি বুঝিনা। গুটি কয়েক মানুষের জন্য একটা গোটা জাতিকে অবজ্ঞা করা অবিচার।

রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করে নারীদের হেনস্তা করা থেকে সকল মুসলিমরা বিরত থাকবে, সেই প্রত্যাশা করি। ঋতুস্রাব অশ্লীল কিছু না, এই শুভবুদ্ধির উদয় হয়ে একটি প্রচলিত কুৎসিত প্রথা থেকে মানব সমাজের মুক্তি ঘটবে সেই আশা রাখি।

মেয়েরা মায়ের জাত, ঋতুস্রাব জন্মের ধাপ। মেয়েদের অবজ্ঞা করা যেমন মায়েদের অবজ্ঞা করা। ঠিক তেমনি ঋতুস্রাবকে অশ্লীল নিষিদ্ধ প্রক্রিয়া বলা মানে নিজের জন্মটাকে অশ্লীল বলা। পরিশেষে একটা কথাই বলবো, “শুভ বুদ্ধির উদয় হোক, ঋতুস্রাব অশ্লীল প্রক্রিয়া নামক মিথ্যাচার থেকে মুক্তি পাক।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

70 + = 73