রাখাইনদের এদেশে আগমনের ইতিহাস (শেষ পর্ব)


রাখাইনরা ২৩০ বছর আগে এদেশে আসার ফলে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ভিত্তি স্থাপিত প্রসারিত হয়েছিল । রাঙ্গাবালী দ্বীপ ধীরে ধীরে রাখাইনরা ছড়িয়ে পড়েছিল-বড়বাইশদিয়া , মেীডুবি , কলাপাড়া ,তালতলী ,কুয়াকাটায়।১৯৪৫ সালের হিসাব অনুযায়ী দক্ষিনাঞ্চলের পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় রাখাইন এর সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার আর পাড়ার সংখ্যা ছিল ২২০টিরও বেশি । পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় ১৯৭০-১৯৭১ সালের জরিপ অনুযায়ী রাখাইন এর সংখ্যা ছিল ১০ হাজার আর পাড়ার সংখ্যা ছিল-২৮টি । ১৯৯০-৯১ সালের জরিপে এদের সংখ্যা ছিল ৫২৮২ জন আর পাড়ার সংখ্যা ছিল-২৮টি । ২০০০-২০০১ সালের জরিপে এদের সংখ্যা ছিল ১৫৬০ জন আর পাড়ার সংখ্যা হল-২৮টি ।

রাখাইনরা যখন উপকূলীয় এলাকায় বসবাস শুরু করে তখন এ অঞ্চল ছিল অরন্যভূমি,বনজঙ্গল ,দুর্গম ও হিংস্র শাপদের বিচরন ভূমি ।বাঘ ,বন্য মহিষ ,গরু, বিষধর সাপ ডাঙ্গায় আর জলে কুমির । তবুও রাখাইনরা বহু কস্টে জায়গা পরিস্কারের জন্য গাছপালা কেটে ঝোপঝাড় পরিস্কার করে ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি বের করে।হিংস্র প্রানীর হাত থেকে বাঁচার জন্য উচু মাচা বানিয়ে তার উপর ঘর বাড়ী তৈরি করে।বাড়ীর চারপাশে বেড়া দিয়ে রাখতো। সমস্ত এলাকা ১০/১২ হাত উচু সুন্দরী কাঠ দিয়ে প্রাচীর বানিয়ে রাখতো।বন্য মহিষ ,শুকর ,বন্য গরু ,হরিণ ইত্যাদি প্রাণী ফসল নষ্ট করে ফেলত । ফলে আবাদি জমির চারপাশে বেড়া দিয়ে রাখতো।এছাড়াও ছিল বড় বড় ইদুরের উপদ্রব।

রাখাইনদের মুখমন্ডল গোলাকার ,নাক প্রশস্ত এবং চ্যাপ্টা ,চুলের রং কালো ,পুরুষের মুখে দাড়ি কম । এরা মাঝারি আকৃতির এবং বেশ শক্তিশালী ও কর্মঠ।গায়ের রং উজ্জল ফর্সা । অধিকাংশই দেখতে সুন্দর। বিশেষ করে মেয়েরা খুব সুন্দরী হয় । এদের শিশুরা দেখতে খুবই সুন্দর ।
রাখাইনদের পোশাক আসাক খুবই সাধারন।রাখাইনরা সুন্দরের পূজারী।মেয়েরা রূপচর্চা খুব পছন্দ করে ।রাখাইনরা এক ধরনের উপাটন ব্যবহার করে যা তাখোদা নামে পরিচিত । ছেলে-মেয়ে উভয়ই এটা ব্যবহার করে । তাখোদা ব্যবহারে চেহারার উজ্জলতা ও লাবন্য বাড়ে এবং গায়ের রং হয় ফর্সা ।মেয়েরা লুঙ্গি ও ব্লাউজ পড়ে । পুরুষেরা লুঙ্গি ও ফতুয়া ব্যবহার করে । রাখাইনদের পোশাক এরা নিজেরাই নিজেদের তাতেঁ তৈরি করে থাকে । পুরুষ-মহিলা উভয়েই অলংকার পড়তে ভালবাসে। বাংলাদেশীদের মতই এরা মাছ ভাত খায় । এছাড়া গো মাংশ মহিষ ,ছাগল,শুকর , এদের প্রিয় খাবার । মদ এরা নিজেরাই তৈরি করে থাকে । পরিমিত মাত্রায় মদ পান এবং উৎসব পার্বনে মদ এদের অনুষাঙ্গী । বর্তমান সমাজ পরিবর্তনের আধুনিকতার ছোয়া এদের পোশাক পরিচ্ছদে এনেছে বিশাল পরিবর্তন ।

রাখাইনরা মূলত কৃষি নির্ভরশীল । ধান ও বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি এরা উৎপাদন করে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থ্যা আধুনিকতার ছোয়া এদের মধ্যে পেয়েছে।কর্ম ক্ষেত্রের বিশাল পরিবর্তন । বর্তমানে কৃষি ছাড়াও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত । চাকুরী ক্ষেত্রে এদের জন্য রয়েছে বিষেশ কোটা পদ্বতির ফলে রাখাইনরা এখন চাকুরি পেশায় দক্ষতা দেখাতে সক্ষম ।

রাখাইনদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি।রাখাইনরা নিজেদের মধ্যে নিজেদের ভাষায় কথা বলে। রাখাইনদের রয়েছে নিজেদের ভাষার শিক্ষা প্রতিষ্টান।রাখাইনদের ভাষার শিক্ষা প্রতিষ্টানকে বলে কিয়াং। সাধারনত বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কিয়াং এ পাঠদান করে থাকে । এদের সংস্কৃতিতে রয়েছে বিশেষ বৈচিত্র ।

রাখাইনরা রক্ষনশীল জাতি। তাদের রয়েছে নিজম্ব আচার-প্রথা ।রাখাইনদের বড় বড় সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে -প্রবারনা পূর্নিমা , মাঘী পূর্নিমা , জলকেলী (লেই খেখু ), নববর্ষ ,কঠিন চিবরদান , বিয়ে । রাখাইন সমপ্রদায়ের বিয়ে উৎসব ,মৃত্যর পড়ে সৎকার তাদের অনুষ্টান গুলোর অন্যতম।

রাখাইনদের বিয়ে :সাধারনত ফসল তোলার মৌসুমে এরা বিয়ের অনুষ্টান করে থাকে। বিয়ের জন্য ছেলে পক্ষ মেয়ের খোজ করে।এ সময়ে নির্বাচিত হলে ছেলে পক্ষ মুরুব্বি/পাড়ার প্রধান/ সম্মানিত কাউকে মেয়ে পক্ষের নিকট বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাঠায়। মেয়ে পক্ষ প্রস্তাব মনঃপুত হলে ছেলে পক্ষকে আলোচনা ও বাগদান করার জন্য খবর পাঠায়। ভাল দিন তারিখ দেখে পাড়ার মাতুব্বর, মুরুব্বি, আত্মীয়-স্বজন, ছেলে ও বন্ধু সহ মেয়ে পক্ষের বাড়িতে যায়। আংটি পড়ানোর মাধ্যমে বাগদান সম্পন্ন হয়। পুরোহিত ডেকে পত্রিকা দেখে বিয়ের শুভ দিনক্ষন ঠিক করা হয়। উভয় পক্ষ ছেলে মেয়েকে কি কি দিবে তার হিসাব করা হয়। বিয়ের কয়েক দিন আগে থেকে চলে ছেলে এবং মেয়ে বাড়ি উৎসব। মেয়ের বাড়ীতেই হয় বিয়ের প্রধান আয়োজন ।পাত্র পক্ষ বাজি ফুটিয়ে , বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে কনে বাড়ী আসে । এ সময় ঐতিহ্য অনুযায়ী বরের প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র ছাড়াও -একটি লম্বা দা ,পাখা ,তামাক খাবার পাইপ সাথে নিয়ে আসে ।বিয়ের আসরে আসার পর বর-কনের জন্য সজ্জিত মঞ্চে বরকে বসতে দেয়া হয় । নাস্তা ছাড়াও এ সময় তবরক দেয়া পান খেতে দেয়া হয় । বিয়ের লগ্ন শুরু হবার পূর্বে কনেকে সাজিয়ে বরের পাশে বসানো হয়।মোম জালিয়ে মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে পুরোহিত বিয়ের কাজ শুরু করেন ।একজন বয়স্ক মহিলা বর-কনের হাত একত্রিত করে তাদের জন্য তৈরি পায়েস খাইয়ে দেয় । এরপর বর -কনে একে অন্যকে খাইয়ে দেয় ।ঐতিহ্য অনুযায়ী বিয়ের দিন বর পড়ে লুঙ্গি ,ফতুয়া ও পাগড়ি এবং কনে পড়ে লুঙ্গি ,ব্লাউজ ,ওড়নার মত একখন্ড কাপড় । বর ৩/৪ দিন কনে বাড়ী থেকে কনে নিয়ে বাড়ী চলে যায় ।
জলকেলী (লেই খেখু ) : রাখাইনদের আর একটি বড় উৎসব হল লেই খেখু । তিনদিন ব্যাপী এই উৎসব হয় । বর্ষ বরনের মত এই অনুষ্ঠানের তিনদিনই রাখাইনরা আকর্ষণীয় পোশাক পড়ে ।বাড়ীতে খাবার রান্না করে আত্মীয়-স্বজন,বন্ধুদের পরিবেশন করে । নারী-পুরুষ সবাই দল বেধে ঘোরে । পরস্পর পরস্পরের প্রতি পানি ছিটিয়ে আনন্দ করে। নাচ গান হয় ।এ অনুষ্ঠানের সময় অনেক তরুন-তরুনীর মধ্যে ভাবের আদান – প্রদান হয় । এ থেকে হয়ে যায় জীবন সঙ্গী ।

কঠিন চিবরদান উৎসব : বেীদ্ধ ভিক্ষু হওয়ার জন্য দীক্ষা প্রদান অনুষ্ঠান হল কঠিন চিবরদান । বেশ জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এর শুরু বা সমাপ্তি হয় । এ অনুষ্ঠানে সবাই উপসি’ত থাকে । থাকে ভোজের ব্যবস্থা । সৃস্টি কর্তার ( ফারাতার ) কাছে মঙ্গল কামনা করে প্রর্থনা ।

মৃত্যর পড়ে সৎকার : মৃত্যুর পড়ে অনেক সময় মৃত্যু ব্যাক্তির দেহকে সংরক্ষন করা হয় । পড়ে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মৃত্য ব্যাক্তির দেহকে বারুদের মাধ্যমে আকাশে উড়িয়ে দেয়া হয় । ভাবা হয় এর মাধ্যমে মৃত্যু ব্যাক্তির দেহকে সৃস্টি কর্তার কাছে বা স্বর্গে পাঠানো হয়েছে। ৫/৭ দিন ধরে চলে এই উৎসব । থাকে গান ,সৃস্টি কর্তার ( ফারাতার ) কাছে মঙ্গল কামনা করে প্রর্থনা ।

রাখাইনরা পূর্ন গনতান্ত্রিক । এদের রীতি অনুযায়ী ছেলে -মেয়ে , বাবা-মায়ের সম্পত্তির সমান ভাগ পায়।রাখাইন পাড়া গুলো বিভিন্ন ব্যাক্তির নামে গড়ে ওঠে।রাখাইন সমাজের দানশীল ব্যাক্তি বা নেতাদের নামনুসারে পাড়ার নামকরন করা হয় । অন্যান্য রাখাইন পরিবার এখানে এসে ঘরবাড়ী তৈরি করে বসতি গড়ে।একটি পরিবার থাকা পর্যন্ত এই সম্পত্তি কেউ বিক্রি করতে পারবেনা।পাড়ার নেতা বা মাতুব্বর নির্বাচন করা হয় সম্পূর্ন গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। প্রত্যক্ষ ভোটাভুটির মাধ্যমে । পাড়ার সকল পুরুষ একত্রিত হয়ে ভোটাভুটির মাধ্যমে পাড়ার হেডম্যান/নেতা/মাতুব্বর নির্বাচন করা হয় । তবে রাখাইন স্বার্থ বিরোধী কাজ করলে মাতুব্বর অপসারন করে নতুন মাতুব্বর নিবার্চন করা হয় । নেতা/ মাতুব্বর নির্বাচনে নারীদের কোন ভূমিকা নেই। নারীদের ভোট দানের ক্ষমতা নেই।

সরকারি কোটা পদ্ধতির ফলে সর্বক্ষেত্রে রাখাইনদের সফল উপসি’তি লক্ষনীয় । এরা এখন অনেকেই চকুরীজীবি ও উন্নত পেশায় নিয়োজিত । আধুনিক জীবন ধারায় অভ্যস্ত । রাখাইনদের এদেশে আসার মূল কারণ ছিল আরাকান যুদ্ধে পরাজিত হওয়া । এদেশে তারা স্থায়ী ভাবে বসবাসের জন্য আসেনি ।কিন্তু আরাকান বিজয় রাখাইনদেও জন্য কখনোই সম্ভব হয়নি । বাংলাদেশের মাটিতে সাময়িক আশ্রয় গ্রহণকারী রাখাইনরা স্থায়ী হয়ে গেছে । এদের শিকড় এখন এদেশের মানুষের সাথে এক হয়ে গেছে। এরা আমাদের ঐতিহ্য , সংস্কৃতির অবিচ্ছেদাংশ।বাঙালীর স্পর্শে এরাও বাঙালী হয়ে গেছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 83 = 93