লাইব্রেরীর দেশ এবং এশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গাঁজাখুরি গল্প।

চেক রিপাবলিককে বলা হয় লাইব্রেরীর দেশ, এর প্রতি ১৯৭১ জন মানুষের জন্য একটি করে লাইব্রেরী রয়েছে যেখানে অন্যান্য উন্নত ইউরোপীয় দেশগুলোয় গড়ে এর চারগুণ বেশি মানুষের জন্য আছে একটি করে আর যুক্তরাষ্ট্রে দশগুণ! দেশটিতে ১৯১৯ সালে আইন করে গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরী গড়ে তোলাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। সেই চেকস্লোভাকিয়া ভেঙ্গে গেছে কিন্তু চেক প্রজাতন্ত্র এখনও পরম মমতায় এই লাইব্রেরী সংস্কৃতিকে লালন করে যাচ্ছে।


১। চেক রিপাবলিককে বলা হয় লাইব্রেরীর দেশ, এর প্রতি ১৯৭১ জন মানুষের জন্য একটি করে লাইব্রেরী রয়েছে যেখানে অন্যান্য উন্নত ইউরোপীয় দেশগুলোয় গড়ে এর চারগুণ বেশি মানুষের জন্য আছে একটি করে আর যুক্তরাষ্ট্রে দশগুণ! দেশটিতে ১৯১৯ সালে আইন করে গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরী গড়ে তোলাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। সেই চেকস্লোভাকিয়া ভেঙ্গে গেছে কিন্তু চেক প্রজাতন্ত্র এখনও পরম মমতায় এই লাইব্রেরী সংস্কৃতিকে লালন করে যাচ্ছে।

এসব লাইব্রেরীতে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হয়, ভোট গ্রহণ হয়; ছোটদের জন্য পড়াশোনার ক্লাব আছে এবং এদের জন্য পাঠ বিষয়ক বিভিন্ন রকমের প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয়। অবসরপ্রাপ্তরা এবং শিশুরা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটায় এই লাইব্রেরীতে বসে।

এইসব সংখ্যা যদি কারও মনকে আকর্ষণ করে না থাকে তাহলে এই সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব কেমন তাঁর জন্যে কিছু পরিসংখ্যানের দিকে তাকাইঃ-

এর আয়তন প্রায় ৭৭,০০০ বর্গকিমি, জনসংখ্যা ১.৫ কোটি, মাথাপিছু আয় প্রায় $৩৩,০০০(PPP Adjusted), দেশটি অর্থনৈতিক সমতা’র(Equality) দিক থেকে বিশ্বে ৪র্থ এবং শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় ৬ষ্ঠ!

আরও বিস্ময়ের খবর কি জানেন?
-এদের জনসংখ্যার ৮৮.৫% ধর্মে অবিশ্বাসী!

২। ১৮৬৮ সালে জাপানে মেইজিরা পুনরায় ক্ষমতায় এলে(Meizi Restoration) অনেক যুদ্ধে জড়ায়, কিন্তু ১৯০৬-০৭ থেকে ১৯১১-১২ পর্যন্ত কোনও যুদ্ধে জড়ায়নি, তখন মোট রাষ্ট্রীয় ব্যায়ের ৪৩% শিক্ষা খাতে ব্যয় করেছিল! এই জাপানই প্রথম প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছিল ১৮৭২ সালে! এবং সম্ভবত তাঁরাই প্রথম শতভাগ শিক্ষিতের হার অর্জন করেছিল!

এই জাপানের বর্তমান অবস্থান নিয়ে আর কিছু বলার নেই।

৩। ফোর এশিয়ান টাইগারখ্যাত চারটি রাষ্ট্র- সিঙ্গাপুর, দঃ কোরিয়া, হংকং এবং তাইওয়ান এর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই দেশ গুলো ৫০’র দশক থেকে শুরু করে ৭০’র দশক পর্যন্ত মোট বাজেটের ৭.৫% থেকে ১৪% পর্যন্ত ব্যয় করেছিল শিক্ষাখাতে। এই শিক্ষাকাঠামোয় জোর দেয়া হয়েছিল বৃত্তিমূলক শিক্ষায়, হাতেকলমে শিক্ষাতে।

আর বিশাল জনসংখ্যা যখন শিক্ষিত হয়ে উঠল তখন শুরু হল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট পাওয়া। তারপর বাকিটা ইতিহাস- একে একে স্যামসাং, এলজি, ফক্সকন প্রভৃতির মত উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগতভাবে সফল কোম্পানির উত্থান ঘটল।

৪। ফিনল্যান্ডের অর্থনীতির এক বিশাল চালিকাশক্তি ছিল ‘নোকিয়া’, কিন্তু এই নোকিয়া ক্ষতির মুখ দেখতে দেখতে এক সময় না পারতে মাইক্রোসফটের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। মাইক্রোসফট এটি অধিগ্রহণ করার পর নোকিয়ার অনেক কর্মচারীকে ছাটাই করে। কিন্তু দেখুন, এই ছাটাইকৃতরা দেশকে হতাশ করেনি। তাঁরা ফিরে আসে গেইম নির্মাতা কোম্পানী- ‘রোভিও এন্টারটেনমেন্ট’ এর মাধ্যমে, আর তাঁদের নির্মিত সেই বিখ্যাত ‘Angry Birds’ পৃথিবীর সব স্মার্টফোনেই সম্ভবত অন্তত একবারের জন্যে হলেও ইন্সটল করা হয়েছে!

ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা জীবনমূখী এবং সৃষ্টিশীল বলে এরা প্রয়োজনীয় মুহুর্তে বুদ্ধিমত্তা এবং সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিতে পারে, দেশকে সঠিক পথে রাখতেও সক্ষম।

৫। বাংলাদেশ এর অবস্থা জানেন? এখানে আছে কয়েক ঘরানার শিক্ষা ব্যবস্থা, ন্যাশনাল কারিকুলামের ইংরেজী মিডিয়াম এবং বাংলা মিডিয়াম, আবার আছে ইংলিশ মিডিয়ামের কেম্ব্রীজ কারিকুলাম ও অক্সফোর্ড কারিকুলাম, মাদ্রাসা মাধ্যমে কওমি ও আলিয়া, তারপরে আবার ক্যাডেট স্কুল-কলেজ! এগুলোয় যেমনি আছে পাঠ্যক্রমের ভিন্নতা, আছে সৃষ্টিশীলতার অভাব, তেমনি আছে আর্থ-সামাজিক কারণে সৃষ্ট নানান অসমতা।

আর শিক্ষা খাতে গত এক দশকে আমাদের গড় বরাদ্দ ২.২%!

১৮৯৬তে লেখা Gustav Le Bon তাঁর বিখ্যাত ‘The Crowd: A Study of The Popular Mind’ এ বলেন-‘The acquisition of knowledge for which no use can be found is a sheer method of driving a man to revolt.’ অর্থাৎ নিজের সমস্যা সমাধানে সৃষ্টিশীলতার অভাবে কেউ যখন ব্যর্থ হয় তখন সে বিদ্রোহ করতে চাইবে, আর সেই সুযোগে এদের হাত করে নেবে কুচক্রী রাজনীতিবিদরা। আমাদের শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস এরই ফসল।

(সূত্রঃ Project Syndicate; World Bank Report on Four Asian Tigers; An Uncertain Glory: India & Its Contradictions by Amartya Sen; History of Industrialized Japan by Foster)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “লাইব্রেরীর দেশ এবং এশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গাঁজাখুরি গল্প।

  1. কিন্তু কিভাবে আসবে এই
    কিন্তু কিভাবে আসবে এই সৃজনশীলতা? যেখানে রাজনীতিবিদ গণই সৃজনশীলতার গুরুত্ব উপলব্ধি করে না। তাই যদি করত তাহলে শিক্ষাখাতে ব্যায়ের হার এই হত না। তবে এটা ঠিক মুখে কেউ কেউ শিক্ষা সম্পর্কে অনেক বুলি আউড়ান।কিন্তু সেটা মুখেই।

    1. নামকাওয়াস্তে যে সৃজনশীলতা তার
      নামকাওয়াস্তে যে সৃজনশীলতা তার সাথে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা যোগ হলে পুরোটাই অন্ধকার দেখতে পাই… কেরানী বানানোর শিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার এদের সদিচ্ছার অভাবে থমকে দাঁড়িয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1