ইতিহাসের যুগান্তকারী বাজেট যার ১০ শতাংশই ব্যয় হবে ঋণের সুদ পরিশোধে।


স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট (৩০ জুন ১৯৭২) ৭৮৬ কোটি টাকা দিয়ে শুরু, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এবার বাজেটের যুগান্তকারী ইতিহাস রচিত করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যদিও বাংলাদেশে বাজেটের যুগান্তকারী ইতিহাস প্রতিবারই রচিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের এ মেয়াদের চতুর্থ এই বাজেট উপস্থাপনা শুরু হয় (০১ জুন ২০১৭) দেশের অর্থনীতিতে গত সাত বছরের সাফল্যের একটি মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এ বাজেট দেশের ৪৬তম, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭তম এবং অর্থমন্ত্রী আবুল মালের একাদশ বাজেট প্রস্তাব এটি।

‘উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ সময় এখন আমাদের’ নামে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটের এই ব্যয় বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে ১৭ শতাংশ এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ২৬ শতাংশের বেশি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের ৫০ হাজার গুণেরও বেশী ।

প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি অনুদানসহ মোট আয়ের পরিমাণঃ
বাজেটে ব্যয় মেটাতে সরকারি অনুদানসহ আয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাথ ৯৩ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। মোট ঘাটতি ১ লাখ ৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে (এডিপি) ১ লাখ ৫৩ হাজার৩৩১ কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরে যা ধরা হয় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের অর্থায়নে অভ্যন্তরীন ব্যবস্থা থেকে ঋণ ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত উন্নয়ন বাজেটে মোট খাত ওয়ারী ব্যয়ঃ
উন্নয়ন বাজেট ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপরই বরাদ্দ পেয়েছে বেশি শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাত ৬ দশমিক ১ শতাংশ, কৃষি খাতে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, জনপ্রশাসন খাতে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য খাত ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

প্রস্তাবিত অনুন্নয়ন বাজেটে মোট খাত ওয়ারী ব্যয়ঃ
প্রস্তাবিত অনুন্নয়ন বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সরকারের সুদ পরিশোধে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। এরপরই শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ, জনপ্রশাসন খাত ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, প্রতিরক্ষা খাত ৯ দশমিক ১ শতাংশ, পেনশন খাত ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, জনশৃংখলা নিরাপত্তা খাত ৮ দশমিক ০ শতাংশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এবং ভর্তুকি খাত ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাত ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, কৃষি খাতে ২ দশমিক ৬ শতাংশ, পরিবহন ও যোগাযোগে ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য খাত ৭ দশমিক ৯ শতাংশ ।

প্রস্তাবিত (উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন) জাতীয় বাজেটে মোট খাত ওয়ারী ব্যয়ঃ
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। যা ঋণ পরিশোধেই ব্যয় হবে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। এছারা শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ, জনপ্রশাসন খাত ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ, পরিবহন ও যোগাযোগে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন খাতে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে ৬ দশমিক ০ শতাংশ, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ, কৃষি খাতে ৬ দশমিক ১ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে ৫ দশমিক ২ শতাংশ, প্রতিরক্ষা খাত ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, জনশৃংখলা নিরাপত্তা খাত ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, এবং ভর্তুকি খাত ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাত ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, কৃষি খাতে ২ দশমিক ৬ শতাংশ, গৃহায়ন বিনোদনসহ অন্যান্য খাত ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ।

প্রস্তাবিত বাজেটে অন্যান্য বিষয়বস্তঃ
জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ধরে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমান অর্থবছরে মতোই আগামী বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ধরা হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। নারী ও ৬৫ ঊর্ধ্ব করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ টাকা। আগামী তিন বছর ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থাকছে। এছাড়া অঞ্চলভিত্তিক ন্যূনতম করের হার ৫ হাজার, ৪ হাজার ও ৩ হাজার টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব কারখানায় আয়কর ১৪ শতাংশ। তৈরি পোশাক শিল্পের করপোরেট কর হার ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব।ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এর কর অব্যাহতির সীমা বার্ষিক ৩০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৬ লাখ টাকা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতঃ
শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন না হলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার সাফল্য এর কথা বারবার তুলে ধরলেও শিক্ষার গুণগত মান অর্জনে বাংলাদেশ সরকার তেমন কোন পদক্ষেপ অদ্যবধি দেখা যায়নি, বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেটের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করলেই তা সকলের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। শিক্ষা মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ছাব্বিশ নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সংবিধানেই শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাহাত্তরের সংবিধানের পনেরো ও সতেরো নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে এবারে বরাদ্দ হয়েছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ।শিক্ষা ও প্রযুক্তি দুটি আলাদা মন্ত্রনালয় হলেও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে এক। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত মিলিয়ে মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বিগত সাত বছরের শিক্ষা বাজেটে গড় বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ১৩.৭%। অন্যদিকে গত দুই দশকে জিডিপি’র মাত্র ২% শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে।

অথচ ইউনেস্ক’র পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের নূন্যতম ২৫ শতাংশ হওয়া ব্যঞ্চনীয় এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপি’র নূন্যতম ৬ শতাংশ হওয়া উচিত। উচ্চশিক্ষাখাতে অর্থায়নের বিষয়টি আরো অপর্যাপ্ত। বাংলাদেশ মঞ্জুরী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী শিক্ষাখাতের সমগ্র ব্যয়ের মাত্র ১১% ব্যয় করা হয় উচ্চশিক্ষা অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় খাতে প্রতিবছর, যা জিডিপি’র মাত্র ০.১২%।উচ্চশিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষার এই খাতে খুবই লজ্জাজনক। দেশে জিডিপি’র ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও শিক্ষাখাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে ১৬১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় শেষের দিকে।

অন্যদিকে কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। উন্নয়নের ‘মহাসড়কে’ বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ের যে ফর্দ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদের সামনে উপস্থাপন করলেন শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসহ লক্ষ লক্ষ বেকারের বেকারত্ব ঘোচাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকে তাহলে এই বড় বাজেট নিন্ম বিত্ত-মধ্য বিত্ত মানষের কাছে নিছকই হাস্যকরে পরিণত হবে।
আল আমিন হোসেন মৃধা ( লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী )

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

36 − 33 =